সাবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করে দীর্ঘ বছরের রীতি ভেঙেছেন, তৈরি করেছেন ইতিহাস। কিন্তু তারপর দেড় সপ্তাহ হতে চলল, এখনও বাড়িতে ফিরতে পারলেন না বিন্দু এবং কনকদুর্গা। কোচির এক গোপন ডেরায় পুলিশি নিরাপত্তায় দিন কাটছে প্রাক্তন নকশাল নেত্রী বিন্দু এবং কেরালার সরকারি কর্মী কনকদুর্গার। বিজেপি, আরএসএসসহ বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের হুমকির মুখে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁদের। সম্প্রতি নিজেদের অভিজ্ঞতা জানালেন সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে।
২ রা জানুয়ারি ২০১৯, বিন্দু ও কনকদুর্গার জীবনের এক অন্যতম স্মরণীয় দিন। সেদিন ভোররাতেই মন্দিরে প্রবেশ করেন তাঁরা, তারপর থেকেই উত্তাল কেরালার রাজনীতি।
গত বছর ২৮ শে সেপ্টেম্বর দেশের শীর্ষ আদালত ঐতিহাসিক রায় দেয়, ঋতুমতী মহিলারাও প্রবেশ করতে পারবেন সাবরীমালায়। তা সত্ত্বেও কোনও মহিলা মন্দিরে ঢুকতে পারছিলেন না হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলনের জেরে। তাঁদের যুক্তি ছিল, সুপ্রিম কোর্ট রায় দিতেই পারে, কিন্তু কীভাবে প্রবহমান প্রাচীন প্রথাকে অস্বীকার করা যায়! এই প্রথা ভাঙা মানে ভক্তদের ভাবাবেগে, তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানা। তাই পিনারাই বিজয়ন সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করতে বহুবার চেষ্টা করলেও, পিছু হঠতে হয়েছে প্রবল আন্দোলনের মুখে পড়ে। অবশেষে ২ রা জানুয়ারির কাকভোরে ইতিহাস সৃষ্টি করেন কান্নুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার বিন্দু আম্মিনি ও সরকারি কর্মী কনকদুর্গা। দু’জনেরই বয়স চল্লিশের কোঠায়।
আয়াপ্পা দর্শনের পরবর্তী অভিজ্ঞতা যে বিশেষ সুখকর হবে না, সেটা ভালোভাবেই জানতেন বিন্দু ও কনকদুর্গা। তা সত্ত্বেও বিজেপি- আরএসএসের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাবরীমালার গর্ভগৃহে পৌঁছে তাঁরা বোঝাতে চেয়েছিলেন, দেবতা দর্শন নিয়ে সমাজে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়, জানিয়েছেন রয়টার্সকে।
যাদের তোয়াক্কা না করে মন্দিরে ঢুকেছিলেন, এখন প্রতিনিয়ত সেই বিক্ষোভকারীদের হুমকিতে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছে দু’জনকে। বিন্দু আম্মিনি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেই তিনি ঠিক করেছিলেন মন্দির দর্শন করবেন। সেই মতো যানও। কিন্তু গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে ২৪ শে ডিসেম্বরের সেই যাত্রা সফল হয়নি তাঁর। এরপর ভয় তো পাননি, উল্টে রোখ চেপে গিয়েছিল। বলেছেন, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন তাঁদের এই ভাবনা সমর্থন করেননি। ভয় পেয়েছিলেন তাঁরা। পাশাপাশি, কনকদুর্গার স্বীকারোক্তি, একবারও ভয় করেনি। আমি একটাই লক্ষ্য স্থির করেছিলাম, সাবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ করব। বিন্দু যোগাযোগ করেছিলেন কনকদুর্গার সঙ্গে। এরপর সেই ঐতিহাসিক যাত্রা সম্পন্ন হয়। সেদিন প্রবল বিক্ষোভের মুখেও পুলিশি নিরাপত্তায় মন্দিরে প্রবেশ করেছিলেন তাঁরা। এজন্য পুলিশ প্রশাসনকে অভিনন্দন জানান তাঁরা। কিন্তু সাবরীমালায় প্রবেশের পরেই শুরু হল আরও বড় সমস্যা। দু’জনের কাছেই আসতে লাগল লাগাতার প্রাণনাশের হুমকি। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে লুকিয়ে দিন কাটছে বিন্দু ও কনকদুর্গার।
বিন্দুর কথায়, বিজেপি নেতৃত্বের কর্তব্য নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা। যদিও, কোচির এক গোপন ঠিকানা থেকে বিন্দু ও কনকদুর্গা জানান, তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে প্রশাসনের ওপর। রয়টার্স’কে দু’জনেই বলেছেন, রাজ্য সরকার ও পুলিশের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা আছে তাঁদের। একদিন তাঁরা ঘরে ফিরবেনই।