বেআইনি কসাইখানা ও গো-হত্যার গুজবকে ঘিরে সোমবার হিংসা ছড়িয়েছিল উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহরে। দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছেন পুলিশ ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমার সিংহ ও সুমিত নামে ১৯ বছরের এক পড়ুয়া। ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে ইউ পি পুলিশ। দু’দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, পুলিশকে আক্রমণ এবং খুনের ঘটনা নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠকে, লুকিয়েচুরিয়ে কারা বেআইনি কসাইখানার কারবার চালাচ্ছে তা খুঁজে বার করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।পাশাপাশি অবশ্য গুজব ছড়ানো রুখতেও তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, এ নিয়ে জোরালো প্রচার চালাতে। ঘটনার প্রায় দু’দিন পর এখনও বুলন্দশহরে জারি রয়েছে ১৪৪ ধারা। এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনী ও র‍্যাফ মোতায়েন রয়েছে।
এদিকে, পুলিশ ইন্সপেক্টর খুনের প্রায় দু’দিন পরও মুখ্য অভিযুক্ত যোগেশ রাজকে গ্রেফতার করতে পারেনি উত্তর প্রদেশ সরকার। যোগেশ রাজ বজরং দলের স্থানীয় নেতা বলে খবর।

রাজ্য পুলিশের এডিজি আনন্দ কুমার জানিয়েছেন, ওই হিংসার ঘটনায় মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪ জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। এফআইআরে নাম রয়েছে ২৭ জনের। বাকি আরও প্রায় ৬০ জনের কথা এফআইআরে বলা হলেও তাদের নাম জানা যায়নি। এডিজি জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে এই ঘটনার পেছনে কোনও সংগঠন জড়িত নয়। অন্তত প্রাথমিক তদন্তে কোনও সংগঠনের নাম আসেনি। তবে মূল অভিযুক্ত যোগেশ রাজ কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কিনা তা গ্রেফতারির পরই পরিষ্কার হবে বলে পুলিশের মত।
তবে স্থানীয় সূত্রে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। যেমন, বুলন্দশহরের কাছে যে এলাকার চাষ জমি থেকে গরুর দেহাবশেষ উদ্ধার হয় বলে খবর মেলে, সেখানকার চাষিরা এক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টিকে প্রথমে গুরুত্ব দেননি, পুলিশকেও জানাননি। কিন্তু বজরং দলের কিছু নেতা এলাকায় এসে তাঁদের নানা কথা বলতে থাকেন। এলাকায় বেআইনি কসাইখানা চলছে বলে জানান। ওই সংগঠনের নেতারাই প্রথমে রাস্তা অবরোধ শুরু করেন। তাঁদের বেশিরভাগই বাইরের লোক। কোথা থেকে বজরং দলের নেতারা ওই গোমাংস চাষ জমিতে পড়ে রয়েছে বলে খবর পেলেন তাও স্পষ্ট নয়। আরও একটি অবাক করা তথ্য উঠে এসেছে সামনে, জানা গেছে, ওই গো-মাংস পড়ে থাকা নিয়ে পুলিশে এফআইআর করেছিলেন যোগেশ রাজ, যিনি পুলিশ কর্মী সুবোধ কুমার খুনে মূল অভিযুক্ত। এলাকায় বজরং দলের সমর্থক বলেই তিনি পরিচিত। কিন্তু যে চাষ জমি থেকে ওই গো-মাংস উদ্ধার হয় সেই জমির মালিক যোগেশ নন, এমনকী তাঁর বাড়িও ওখান থেকে প্রায় ৪ কিমি দূরে। তাই তিনি কেন এফআইআর করলেন সেই প্রশ্ন থাকছেই।
ঘটনার প্রশ্ন উঠেছে যোগী সরকারের সংবেদনশীলতা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েও। সোমবার ঘটনা ঘটলেও, নিজের পুলিশের এক কর্মী হিংসায় মারা গেলেও, মঙ্গলবার দিনভর একাধিক আনন্দ অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকেন যোগী। রাজস্থানে ভোট প্রচার সেরে এসে তিনি নিজের শহর গোরক্ষপুরে এক ধর্মীয় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড ইভেন্টে যোগ দেন, যান কবাডি খেলা দেখতে।

ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। মঙ্গলবার যোগী ঘোষণা করেছেন অলিম্পিকে মেডেলজয়ী খেলোয়াড়দের তাঁর সরকার যথাক্রমে ৬, ৪ ও ২ কোটি টাকা করে পুরস্কার দেবে। অথচ মৃত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমারের পরিবারকে মাত্র ৫০ লক্ষ টাকা সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবারের একজনকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার। তাতে অবশ্য খুশি নন মৃতের পরিবার। মৃতের দিদির অভিযোগ, ‘দাদরি কাণ্ডের তদন্ত করেছিলেন বলে তাঁর ভাইকে এইভাবে খুন করা হল।’ পুলিশের ভূমিকাতেও প্রশ্ন থাকছে, হিংসার আর এক বলি ১৯ বছরের পড়ুয়া সুমিতের নাম প্রথমে এফআইআর তালিকায় রেখেছিল পুলিশ। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সুমিতের পরিবার, ছেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করবেন না বলে তাঁরা জানান, পরে অবশ্য চাপে পড়ে তালিকা থেকে সুমিতের নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস মিলেছে।
ঘটনায় ঘরে বাইরেও প্রবল চাপে যোগী প্রশাসন। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য সঠিক তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির আশ্বাস দিলেও যোগী মন্ত্রিসভার এক সদস্য বলেছেন, এর পেছনে বজরং দল ও ভিএইচপির হাত আছে, পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা ছড়াতে এই কাণ্ড ঘটানো হয়। এটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ। ঘটনায় উস্মা প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উমা ভারতী। তিনি ঘটনার উচিত তদন্তের কথা বলে জানিয়েছেন, রাজ্যে যে সরকার আছে, তা প্রতিফলিত হওয়া উচিত। বিষয়টি নিয়ে দলের অন্দরেও উচিত জায়গায় তিনি তাঁর বক্তব্য জানাবেন বলে জানিয়েছেন উমা। বিএসপি নেত্রী মায়াবতীর দাবি, এটা বিজেপির বিভেদের রাজনীতির ফল। তাদের একটাই অ্যাজেন্ডা, ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভুল পথে চালনা করা ও অশান্তি সৃষ্টি করা।