ক্রিসমাসটা এসেও আসিতেছে না! বাঙালির যে সবুর সইছে না আর। উৎসব প্রেমিক বাঙালি আবার কোলাহল, কলরবে মেতে উঠবে। সুরের রোশনাইতে মুখরিত হবে কল্লোলীনি কলকাতা। আসলে শুরুটা হয়েছিল ওই সাহেবদের আমলে। পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি এবং অতি অবশ্যই ব্রিটিশ, যারা কিনা এই কলকাতায় বড়দিন উদযাপনের নেপথ্যে রয়েছেন, না হলে মাছে-ভাতে বাঙালির বড়দিন উদযাপনে এত মাতামাতি হয়তো থাকত না।
আবার ইতিহাস বলছে, কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে একদল ব্রাহ্ম যুবক ১৮৬৪ সাল নাগাদ ক্রিসমাসের দিন যে ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন, তাতে নাক সিঁটকিয়েছিল রক্ষণশীল সমাজ। জানেন কী করেছিলেন তারা? আসলে সেই বছর ক্রিসমাসের দিনটিতে নিজেদের স্ত্রীদের বাড়ির বাইরে এনে পুরুষ বন্ধুদের সাথে আলাপ করিয়েছিলেন, যেটা সমসাময়িক সময়ে ছিল যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় বাহক। এমনটাই উল্লেখিত রয়েছে পার্থ প্রতিম বসুর  ‘Strangely Beloved: Writings On Calcutta, edited by Nilanjana Gupta’ বইটিতে। আবার বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রবি ঠাকুর খ্রিষ্টো উৎসব’ চালু করেছিলেন সেটা তো আমাদের সবারই জানা।
এবার না হয় আসা যাক আজকের, মানে এই সময়ের বড়দিনের গপ্পোতে। বাড়িতে সসেজ, হ্যাম, ফ্রোজেন ফুড নিয়ে এসে খাওয়া হবে, রীতি মেনে কেক কাটবেন, সন্ধ্যেবেলায় পার্ক স্ট্রিট চত্বরে কোনও রেস্তোরাঁতে কব্জি ডুবিয়ে ভুরিভোজও করবেন, সব প্ল্যানিং সারা, কিন্তু কী যেন একটা বাদ থেকে যাচ্ছে! আরে মশাই বড়দিনে বাড়িতে সান্তা ক্লজকে আনবেন না? সে পুতুলই হোক না কেন, না হয় ক্রিসমাস ট্রি অথবা ক্রিসমাস বেল, ক্রিসমাস বল, ক্রিসমাস লিফ তো আনুন। আচ্ছা পার্ক স্ট্রিট যাবেন, অথচ মাথায় সান্তা টুপি থাকবে না! না না, এটা একেবারে সম্ভব নয়। কিন্তু এসব পাবেন কোথায় ? মানে একসাথে এতগুলো জিনিস কেনা তো আর চাট্টিখানি ব্যাপার না।

আসলে বড়দিনের জন্য নিউ মার্কেটের আনাচে কানাচে বিক্রি হচ্ছে ক্রিসমাসের একাধিক জিনিস। কিন্তু অথেনটিক আর ভ্যারাইটি পেতে চাইলে আপনাকে আসতে হবে নিউ মার্কেটের ভিতরে গোল চক্করটিতে। এখানে আসলে আপনি পেয়ে যাবেন ক্রিসমাস সাজানোর একাধিক সরজ্ঞাম। হাতে গোনা মাত্র ১০-১২ টি দোকান রয়েছে এখানে। এখানকার দোকানগুলো অবশ্য সারা বছর থাকে না, মানে পারমানেন্ট কোনও ব্যাপার নেই, পুরোটাই টেম্পোরারি বেসিস। ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে প্রতিবছর এনারা বসেন এখানে।
‘আমাদের নিউ মার্কেটে কোনও নিজস্ব দোকান নেই। প্রতি বছর ক্রিসমাসের সময় এখানে বসি, মোটামুটিভাবে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত থাকি। কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের কাছে আমাদের আবেদন করতে হয় এবং প্রতিদিন এখানে বসার জন্য ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়।’ জানালেন এখানকার অন্যতম দোকানদার আবদুল ওয়াহিদ। আবদুল ভাইরা এখানে প্রায় ৫০ বছর ধরে বসছেন। বললেন, ‘প্রথমে বাবা এখানে বসতেন, আর এখন আমি বসি।’ আবার মহম্মদ ইদ্রিজের দোকান নয় নয় করে ৫৫ বছর হতে গেল। লাজুক স্বভাবের লোকটি শুধু বললেন, ‘প্রতিদিন যদি ৩ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া গুণতে হয় তাহলে ব্যবসা চালাবো কী করে? লাভই বা কত থাকে বলুন তো?’

কম-বেশি সব দোকানদারের একই অভিমত। আবার লিন দিয়ো নামক ভদ্রমহিলা  স্বপরিবারে ব্যবসা চালান। ভাই, বাবা সবাই মিলে দোকান সামলাচ্ছেন। লিন দিয়ো ম্যাডাম অবশ্য মনে করেন, ব্যবসা আগের মতো নেই ঠিকই, কিন্তু তাই বলে খুব একটা খারাপও নয়। ‘আসলে আমাদের এখানে প্রতিদিন একইরকম বিক্রি বাট্টা চলে না, কোনও দিন এমন অবস্থা হয় আমি আর ভাই মিলেও সামলাতে পারি না। আবার কোনও কোনও দিন দু’একজন ক্রেতা এলেন হয়তো।

হাতে গোনা মাত্র ১০-১২ টি দোকান তো কী হয়েছে। কালেকশান আপনাকে তাক লাগিয়ে দেবে। কী ছেড়ে কী কিনবেন? কী নেই এখানে? যীশুর মূর্তি থেকে ক্রিসমাস ট্রি সবই রয়েছে এক ছাদের তলায়। আর দাম কিন্তু খুব বেশি নয়। এবার না হয় কী কী পাওয়া যায় আর তার দাম কত, সেটা পরখ করে নেওয়া যাক। ছোট ক্রিসমাস বেল ৬ পিসের দাম ৬০ টাকা, মাঝারি সাইজের ক্রিসমাস বেল ৭০ টাকা, আর যদি একটু বড় বেল চান তাহলে সেটাও পেয়ে যাবেন, কিন্তু দামটা একটু বেশি, এক জোড়ার দাম প্রায় ৫০০ টাকা। ছোট্ট সান্তা ক্লজ কিনতে গেলে ৬ জোড়ার দাম পড়বে ১০০ টাকা, মাঝারি সান্তা ক্লজের দাম ২৫০-৩০০ টাকা। ছোট্ট ক্রিসমাস স্টার ৪০ টাকা প্রতি জোড়া, বিভিন্ন রকমের যীশু খ্রিষ্টের মিনিয়েচার মূর্তির পুরো সেটের দাম ৫০০ টাকা। ক্রিসমাস বলের অনেক ভ্যারাইটি পাবেন, যার সেট পিছু দাম শুরু ৩০০ টাকা থেকে, তাছাড়াও এক ধরনের লেটেস্ট ক্রিসমাস বল রয়েছে যার দাম জোড়া ১০০ টাকা। বড়দিনের জন্য বাজারে এসেছে ক্রিসমাস স্পেশাল মোজা, যার দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা। ক্রিসমাস ক্যান্ডেলের দাম প্রায় ৩৫ টাকা। আচ্ছা এবার বাড়িতে একটা ক্রিসমাস ট্রি এনে সবাইকে চমকে দেবেন ভাবছেন তাও পেয়ে যাবেন এখানে। ক্রিসমাস ট্রি-র দাম শুরু ৫০ টাকা থেকে আর ১০ ফুটের ক্রিসমাস ট্রি  কিনতে গেলে আপনাকে দুটো ৫০০ টাকার নোট খরচ করতে হবে। আর হ্যাঁ, মাথায় যে একটা সান্তা টুপি লাগবে, সেটাও এখানে পাবেন, দাম মাত্র ৩০ থেকে ৫০ টাকা।

ভাবছেন, একবার ঢুঁ মেরে যাবেন বড়দিনের আগে। সময় নষ্ট না করে এসে পড়তেই পারেন। এই যেমন প্রতি বছর নিয়ম করে এখানে আসেন মিসেস অ্যাগনেস, সম্প্রীতি চ্যাটার্জিরা। এঁরা দু’জনেই প্রত্যেক দোকানদারকে একনামে চেনেন। আসলে বহু বছরের সম্পর্ক। অ্যাগনেস ম্যাডাম বা সম্প্রীতি দেবী দু’জনেরই আসার মূল উদ্দেশ্যে ক্রিসমাস ডেকরেশনের সরজ্ঞাম কেনা। ‘আসলে এরাই একমাত্র অথেনটিক জিনিস বিক্রি করেন, বাইরেও ক্রিসমাস ডেকরেশনের সরজ্ঞাম পাওয়া যায় কিন্তু এদের কোয়ালিটি বেস্ট,’ জানালেন সম্প্রীতি দেবী।
কিন্তু একটা সমস্যার দিক তুলে ধরলেন মহম্মদ হাবিব। মহম্মদ হাবিবের দোকানের বয়স প্রায় ৭০ বছর। বললেন, ‘এখানে প্রথমদিকে যে দোকানগুলো বসতো তার মধ্যে আমরা অন্যতম। কিন্তু বড়দিনের সরজ্ঞাম কিনতে আমাদের দোকান পর্যন্ত অনেকেই আসছেন না। বাইরে থেকেই নিজেদের পছন্দসই জিনিস কিনে চলে যাচ্ছেন। এতে আমাদের ব্যবসায় বেশ খানিকটা অসুবিধা রয়েছে, প্রতিদিনের ভাড়ার অঙ্কটাও যে অনেক। সেই সঙ্গে রয়েছে অনলাইন দুনিয়ার রমরমা যেখানে কিছুটা হলেও আমরা পিছিয়ে পড়েছি। ব্যবসা চললেও সব মিলিয়ে আমরা একটু অসুবিধার মধ্যে আছি আর কী।’

তবে সে যতই অনলাইন দুনিয়া থাবা বসাক না কেন, ক্রিসমাসে বাড়ি সাজাবেন অথচ নিজের হাতে পরখ করে সরজ্ঞাম কিনবেন না? সেটা তো আর করতে পারে না। বড়দিন দরজায় কড়া নাড়ছে, পাশের ফ্ল্যাটের দাশবাবু এতক্ষণে নিজের বাড়ি সাজিয়েও  নিয়েছেন। আর আপনি এখনও চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবছেন, যাবেন কি যাবেন না? সময় নষ্ট না করে চটপট চলে আসুন নিউ মার্কেটে, আর কিনে নিয়ে যান আপনার পছন্দসই জিনিস। তবে হ্যাঁ, দর দাম করতে কিন্তু ভুলবেন না! অবশ্য বাঙালিকে এটা মনে না করালেও চলে, বার্গেনিং জিনিসটা যে আমাদের মজ্জাগত। কিন্তু বেশি দরদামের আগে একবার ভাববেন মহম্মদ হাবিব, আবদুল ওয়াহিদদের কথাও, যে ভাড়া গুণে ওঁরা দোকান চালাচ্ছেন! বড়দিন তো ওঁদেরও।

You may also like