পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা বা জোটের দরজা খোলা রেখেই ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের কৌশলগত অবস্থান ঘোষণা করল সিপিএম। সেই সঙ্গে বলা যেতে পারে ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে যে রাজনৈতিক এবং কৌশলগত লাইন সিপিএম ঘোষণা করেছিল, ১৫ বছর বাদে হুবহু সেই একই অবস্থানই নিল এ কে গোপালন ভবন। ২০০৪ সালের মতোই সিপিএম তিনটি কেন্দ্রীয় স্লোগান সামনে রেখে আগামী লোকসভা নির্বাচনে নামতে চলেছে। তিন দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং শেষে সোমবার সিপিএম যে তিনটি স্লোগান চূড়ান্ত করেছে তা হল, বিজেপি এবং তার সহযোগীদের পরাস্ত করো, সিপিএমসহ বামপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি করো এবং কেন্দ্রে বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠন করো।
এর আগে বাজপেয়ীর সরকারের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালেও এই স্লোগান তুলেছিল সিপিএম। সেই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, ত্রিপুরা তো বটেই গোটা দেশেই বামপন্থীদের শক্তি ব্যাপক বৃদ্ধি পায় এবং বামেদের সমর্থনে প্রথম ইউপিএ সরকার গঠিত হয়। সিপিএম নেতৃত্বের মতে, এই মুহূর্তের পরিস্থিতি ২০০৪ সালের থেকেও খারাপ, তাই বিজেপিকে হঠানোই এখন প্রথম কর্তব্য। কিন্তু এই জায়গাতে দাঁড়িয়েই পার্টির মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, বিজেপির বিরুদ্ধে মূল লড়াই হলেও কংগ্রেস সম্পর্কে দলের অবস্থান কী হবে? কারণ, সিপিএমের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য জায়গার পরিস্থিতিতে বিরাট বদল না হলেও, সেই সময়ের তুলনায় এখন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা অনেক পালটে গিয়েছে। বলা যেতে পারে তফাতটা প্রায় দুই মেরুর।
২০০৪ সালে সিপিএম ছিল রাজ্যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতায়। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস ছিল বিজেপির জোটসঙ্গী। বাংলায় লড়াই হয়েছিল মূলত ত্রিমুখী। সেখানে তৃণমূল মাত্র একটি আসনে নেমে আসে। আর এবার, ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার পরও রাজ্যে সিপিএম প্রায় ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত। রাজ্যে লড়াইটা মূলত শাসক দল তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আলিমুদ্দিন চায়, কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার রাস্তা খোলা রেখেই রাজনৈতিক অবস্থান চূড়ান্ত করতে। গত অগাস্ট মাসের শেষে রাজ্য কমিটির মিটিংয়েও সিপিএমের অধিকাংশ নেতাই বাংলায় কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা বা জোটের পক্ষেই সওয়াল করেছেন। কিন্তু বঙ্গ সিপিএমের এই অবস্থানে বাধ সাধছে কেরল শিবির। কারণ, সেখানে শাসক সিপিএমের সঙ্গে এখনও মূল লড়াই কংগ্রেসের। আর লোকসভা নির্বাচনে বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা আলাদা নীতি নেওয়া সিপিএমের মতো জাতীয় দলের ক্ষেত্রে খুবই কঠিন। বাংলার সিপিএম নেতাদের বক্তব্য, রাজ্যে যেহেতু তৃণমূল ক্ষমতায়, তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই দর্বল করলে শাসক বিরোধী ভোট পুরোটাই বিজেপির বাক্সে চলে যেতে পারে। পাশাপাশি তারা চাইছেন না, তৃণমূল বিরোধী ভোট যেন ভাগ হয়েও না যায়। তাই পলিটব্যুরো এবং কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে মূল লড়াইয়ের কথা ঘোষণা করলেও, কংগ্রেস সম্পর্কে নরম নীতি নেওয়ার পক্ষেই সওয়াল করেন রাজ্যের সিপিএম নেতারা। বলা যেতে পারে, বাংলার সিপিএম নেতাদের চাপেই একপ্রকার কংগ্রেস নিয়ে কোনও কথাই উচ্চারণ করা হয়নি দলের কৌশলগত অবস্থানে।
কিন্তু বাংলায় এবং গোটা দেশে কংগ্রেস সম্পর্কে সিপিএম নরম মনোভাব নিলেও, কেরলে যে তারা কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই লড়াই চালাবে তাও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে দলের তিন দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে। সম্প্রতি কেরলের সবরীমালা মন্দিরে সব বয়সী মহিলার প্রবেশাধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছে, সেই ইস্যুতে সমালোচনা করা হয়েছে সেই রাজ্যের কংগ্রেসের। বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে সিপিএম স্বাগত জানালেও কেরলে বিজেপির মতোই রাজ্য কংগ্রেসও এই রায়ের বিরোধিতায় নেমেছে, যা আসলে কেন্দ্রের শাসক দলের হাতকেই শক্ত করবে। জাতীয় স্তরে কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে সমর্থন জানালেও, কেরল কংগ্রেস তার বিরোধিতা করছে বলে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা করেছেন সিপিএম নেতারা। সিপিএমের নেতৃত্বের একটা অংশের বক্তব্য, এর ফলে একই সঙ্গে তিনটি বার্তা দেওয়া গিয়েছে কংগ্রেসের উদ্দেশে। প্রথমত, জাতীয় স্তরে এবং বাংলাসহ সমস্ত রাজ্যে কংগ্রেস সম্পর্কে স্পষ্ট নরম অবস্থান নেওয়া হলেও, কেরলের রাজনৈতিক বিন্যাসের কথা মাথায় রেখেই সেই রাজ্যের কংগ্রেসের বিরোধিতা করা হয়েছে। সিপিএম স্পষ্ট করেছে, অন্য রাজ্যগুলিতে তারা কিছু আসনে লড়লেও, যারা যেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করবে, সেখানে তাকেই সমর্থন করা হবে।
সব মিলে ২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে ১৫ বছর আগের অবস্থান নিয়ে সিপিএম কি আসলে কংগ্রেসের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ল, সেই প্রশ্নই উঠছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেওয়া দলের রাজনৈতিক এবং কৌশলগত অবস্থান দেখে। কিন্তু সিপিএম নিয়ে তাদের কী অবস্থান হবে? বল এখন রাহুল গান্ধীর কোর্টে।