পয়লা মে সকালবেলা দুঃসংবাদটি এল। অশোক মিত্র আর নেই। তাঁর কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়েছিল ‘আরেক রকম’ পত্রিকার সূত্রে। অনেক বিষয়ে তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতুম। রাগারাগি, তর্কাতর্কিও হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয়ে তিনি ছিলেন বিরল ব্যতিক্রম। হাজার প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আপন বিশ্বাসে অটল থাকতেন। তাঁকে সহজে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত না। তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শ্মশানে গিয়েছিলুম। দাহ হয়ে যাওয়ার পরে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে শ্মশানের বাইরে দাঁড়িয়েছিলুম। সন্ধ্যা নেমেছে। একে একে শ্মশান যাত্রীরা সবাই বাড়ি ফিরছিলেন। আমি একটি ট্যাক্সি ধরতে যাব এমন সময়ে অশোকবাবুর এক পুরোনো কমরেড এসে বললেন, ‘চলুন আমার গাড়িতে করে আপনাকে এগিয়ে দিই’। সাধারণত অপরিচিত ব্যক্তির আতিথেয়তা আমি গ্রহণ করি না। কিন্তু তাঁর কন্ঠস্বরে যে আন্তরিকতার ছাপ ছিল তাতে প্রভাবিত হয়ে তাঁর গাড়িতে উঠলুম। একথা সে কথার মাঝে জানা গেল যে তিনি সিপিএমের এক প্রাক্তন কর্মী। রাসবিহারী কেন্দ্রে সাতের দশকে যখন পার্টির পতাকা তুলতে লোকে ভয় পেত, তিনি জনাকয়েক সঙ্গীসাথী নিয়ে সাহস করে এগিয়ে এসেছিলেন বলেই ১৯৭৭ সালে অশোকবাবু জয়লাভ করেন।
ভদ্রলোক হিন্দু এবং মার্কসবাদী। এটা বলার কারণ ওনার পরের মন্তব্যগুলি। আমার কাছে জানতে চাইলেন, বিজেপি কি পারবে সাতাত্তরের সিপিএম হতে? চমকে গিয়ে বললুম, তৃণমূলের অনেক ভুল আছে। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হোক। কিন্তু বিজেপি তো অন্য বিপদ ডেকে আনবে। রোজই সাম্প্রদায়িক অশান্তি হবে। সে দিকে আমাদের রাজ্যকে ঠেলে দেওয়া যায় না।
ভদ্রলোক আমার প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। বললেন, আপনি মশাই বিচিত্র লোক। একটি ভালো ছেলে গেরুয়া পাঞ্জাবী পরে এলে তাকে সমর্থন করবেন না?
আমি আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলুম। এক ঝলক চুল্লিতে ঢোকানোর আগে অশোকবাবুর মুখটা মনে পড়ে গেল।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এক খ্যাতনামা সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক তিনি। পঞ্চাশ বছর ধরে পত্রিকাটি চালাচ্ছেন। নিতান্ত অমায়িক সাহিত্য পাগল মানুষটি একবার আড্ডায় জমে গেলে কোথা দিয়ে সময় কেটে যায় বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের বাড়িতে এসেছেন। আমিও গিয়েছি তাঁর পত্রিকার অনুষ্ঠানে। ভদ্রলোক প্রাক্তন সিপিএম সমর্থক এবং কর্মী। ধর্ম পরিচয়ে মুসলিম। সেদিন মহেশতলা উপনির্বাচনের ফল বেরোনোর পরে ফোন করে বললেন, এখানকার প্রাক্তন বিধায়ক মোরসালিন মোল্লা আমার বিশেষ বন্ধু ছিল। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে আমাদের তৃণমূলকে ভোট দেওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই। সিপিএম যে একবগ্গার মতো তৃণমূলকে আক্রমণ করে যাচ্ছে তাতে বিজেপির ভোট বাড়ছে এবং আমাদের তৃণমূলের দিকে আরও সরে যেতে হচ্ছে।
কী উত্তর দেব তাঁকে? অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিশেষ স্নেহভাজন ওই পত্রিকা সম্পাদক আজ আর তাঁর পুরোনো পার্টিকে ভোট দিতে চান না, যেমন অশোকবাবুর সুহৃদ চান বিজেপি হতে। উভয়ের কাছেই নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক মতামত পাল্টাতেই পারে। সব সময়ে তা অনৈতিক নয়। বিশেষ সুবিধা লাভের জন্য যাঁরা এদিক ওদিক করেন তাঁদের কথা আলাদা। তবে তাঁদেরও আমি বেশি দোষ দিই না। আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যদি দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পুরস্কার মেলার ব্যবস্থা থাকে তবে গলদটা সিস্টেমে। যাঁরা সুযোগসন্ধানী তাঁরাই এটা ভাল বোঝেন। উপরে যে দুই জনের কথা লিখেছি এঁদের কেউই সেই অর্থে সুযোগসন্ধানী নন। তাঁদের বিশ্বাসটা সত্যিই পাল্টেছে।
পশ্চিমবঙ্গে আজ এটা দিনের আলোর মতো সত্য যে, হিন্দু বামপন্থী ভোটের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকে চলে যাচ্ছে, ঠিক যেমন মুসলিম বাম ভোট তৃণমূলের দিকে। একে কমরেডরা নাম দিয়েছেন, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা। বিষয়টা খায় না মাথায় দেয়, নাকি পেতে শোয় সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। এটা ঠিকই যে, তৃণমূল কিছু মুসলিম নেতা তৈরি করেছে, যাঁরা দল ও সরকারের হয়ে কথাবার্তা বলছেন। মুসলিমদের উৎসবগুলি এখন অনেক সমারোহে পালন করা হচ্ছে। দুর্গাপুজোর মণ্ডপের পাশে মার্কসবাদী সাহিত্য বিক্রি করা যদি সাম্প্রদায়িকতা না হয় তবে এটাও নয়। রাজ্যে যথেষ্ট পরিমাণ কর্মসংস্থান, শিল্প স্থাপনের যে অঙ্গীকার ছিল তা অধরা। ফলত হিন্দু, মুসলিম শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এখানে তোষণ কে কাকে করলো, বোঝা যাচ্ছে না। মুসলিম মুখগুলো একটু বেশি দেখা গেলেই বলতে হবে, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে? মার্ক্সবাদী বিশ্বচেতনা তেমন শেখায় বুঝি?
কেরালার কমরেডরা লড়ে চলেছেন আরএসএসের অগ্রগতি রুখতে। কন্নুড় জেলায় কিছু না কিছু সংঘর্ষ হচ্ছেই। পারস্পরিক এই শত্রুতাজনিত রক্তপাত বন্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয়। গণতন্ত্রে মতামতের লড়াই হবে। কিন্তু সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি অতি অস্থির এবং হিংসাত্মক।
আজ উত্তর প্রদেশের যোগী সরকার (পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা যাকে যোগীরাজ্য বলেন) এনকাউন্টার করছে বলে অভিযোগ। মূল টার্গেট দলিত এবং মুসলিম। এক বছরে শতাধিক খুন। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা লাফাচ্ছেন। ক্ষমতায় এলে তাঁরাও নাকি ওই রকম এনকাউন্টার করবেন। এখন বলছেন লক্ষ্য হবে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা।
বেআইনি রাষ্ট্রীয় হত্যার এই সব সমর্থকদের বিরুদ্ধে রা কাড়ছেন না কমরেডরা। ভুল করছেন। বন্দুকের নল কখন কোন দিকে ঘুরে যায় বোঝা মুশকিল। বিপুল কর্পোরেট পুঁজির কুশীলবদের যদি এখন খুশি করে চলেন, প্রশ্ন না করেন, ভবিষ্যৎ আপনাদের জন্য নয়। ভাবছেন তৃণমূলকে বিজেপি হারাতে পারলে আবার আপনারা প্রাসঙ্গিক হবেন? ভুল ভাবছেন। আপনাদের মূল শক্তি শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য। সেখানেই তো বিভাজন ঘটাতে চায় হিন্দুত্ববাদীরা। বা যে কোনও আত্মপরিচয়ভিত্তিক ধর্মীয় রাজনৈতিক দর্শন। হিন্দু, মুসলিম সবাই। সেখানে দাঁড়িয়ে বৃহত্তর মানুষের জোট গড়ে তোলার কাজটিই তো করা প্রয়োজন। বিজেপির হাত ধরে ক্ষমতার স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা ছাড়তে হবে। সে কাজ আলিমুদ্দিন করছে  এমন বলবো না। কিন্তু সর্বস্তরে বার্তা পৌঁছচ্ছে কই? সম্প্রতি দক্ষিণ দিনাজপুরে এক কমরেডকে বহিষ্কার করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য। ভাল উদ্যোগ।
মহারাষ্ট্রে এককালে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলি খুবই শক্তিশালী ছিল। কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ আইএনটিইউসি নেতা দত্ত সামন্ত পেশায় চিকিৎসক হলেও ছিলেন মুম্বইয়ের বস্ত্র শ্রমিকদের অবিসংবাদী নেতা। তিনি ১৯৮২ তে বস্ত্র শিল্পে যে জঙ্গি আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাতে চটে যান স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী। কংগ্রেসের সাথে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯৮৪ সালের যে লোকসভা নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, সেখানে দত্ত সামন্ত নির্দল প্রার্থী হিসেবেই জিতে যান দক্ষিণ মুম্বই কেন্দ্র থেকে। এরপর তিনি ক্রমশই বাম ঘনিষ্ঠ হয়ে যান। ১৯৯০ এর দশকে তাঁর আওয়াধী কামগর ইউনিয়ন ও লাল নিশান পার্টি প্রবল আলোড়ন তোলে। ১৯৯৫ তে মহারাষ্ট্রে ক্ষমতা দখল করে বিজেপি-শিবসেনা। শুরু হয় এনকাউন্টার রাজ। অমর-আকবর-অ্যান্টনির শহর মুম্বই ১৯৯২ সাল থেকেই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কবলে। দত্ত সামন্ত খেলাটা ঘোরাতে চাইছিলেন। বামপন্থার একটি নতুন ভাষ্য তৈরি করার কাজ করছিলেন। চাইছিলেন সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য। মুম্বইয়ের রাস্তায় তখন এনকাউন্টার চলছিল। ১৯৯৭ সালে একদিন খুন হয়ে গেলেন কমরেড দত্ত সামন্ত। বলা হল, মাফিয়া ডন ছোটা রাজনের লোকজন মেরেছে। আজ অবধি অজানা মূল হত্যাকারীর পরিচয়। যেমন জানা যায় না ছত্তিশগঢের ভিন্ন ধারার শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর হত্যাকারী আসলে কে?
অতএব সাধু সাবধান। সিপিআইএম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি ২৪ মে প্রেস বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে যে, তৃণমূলকে হারানোর জন্য বিজেপিকে সমর্থন করার মোহ ত্যাগ করতে হবে। বেশ। কিন্ত বিজেপিকে হারানোর জন্য কী করতে হবে কমরেড, সেটা তো বললেন না?
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

You may also like