মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়। কিন্তু রাজনীতি তো দূরের কথা, আমি মনে করি কেউ যদি আত্মহত্যা করেন, তবে তাঁকে নিয়ে এমন কোনও খবরও করা উচিত নয় যার জন্য তাঁর পরিবারের লোকদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এবং মাত্র দু’দিন আগে আত্মঘাতী আইপিএস অফিসার গৌরব দত্তকে নিয়ে এই খবর করতে হচ্ছে এই কারণে যে, মৃত এই আইপিএস অফিসারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মিথ্যে রাজনীতি শুরু হয়েছে এই রাজ্যে।
১৯৮৬ ব্যাচের আইপিএস অফিসার গৌরব দত্ত ২০১৮ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর চাকরি থেকে অবসর নেন। গত ১৯ শে ফেব্রুয়ারি সল্টলেকের বাড়িতে হাতের শিরা কাটা এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাজ্য সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘প্রাক্তন পুলিশ কর্তার আত্মহত্যা, শেষ চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রীই কাঠগড়ায়’ শীর্ষক একটি খবর প্রকাশিত হয়। এই খবরে গৌরব দত্তের লেখা একটি সুইসাইড নোটকে উল্লেখ করে অভিযোগ আকারে যে খবর করা হয়েছে তার মোদ্দা কথা হল, এই আইপিএস অফিসার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিহিংসার শিকার, তৃণমূলের আমলে দীর্ঘদিন তাঁকে কম্পালসারি ওয়েটিংয়ে রাখা হয়েছে, এমনকী প্রতিহিংসার কারণে তাঁর অবসরকালীন সুবিধেও তাঁকে দেওয়া হয়নি।

আসলে কী ঘটেছে?

রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের ২৮ শে মে ২০০৯ সালের এক সুপারিশের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১০ সালের ২৪ শে মার্চ গৌরব দত্তর বিরুদ্ধে চার্জশিট ইস্যু করে। তারও আগে বিভাগীয় তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার ২০১০ সালের ১১ ই ফেব্রুয়ারি গৌরব দত্তকে সাসপেন্ড করে। আর সেই বছরই ১০ ই অগাস্ট গৌরব দত্তকে কম্পালসারি ওয়েটিংয়ে পাঠিয়েছিল তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকার। কিন্তু গৌরব দত্ত কী এমন করেছিলেন যে সিপিএম সরকার তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছিল, তাঁকে সাসপেন্ড করেছিল এবং তাঁকে কম্পালসারি ওয়েটিংয়ে পাঠিয়েছিল? যাঁরা আজ গৌরব দত্তের আত্মহত্যার পর তৃণমূল সরকারকে নিশানা করছেন, তাঁরা সকলে হয়তো জানেন না, কিন্তু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিশ্চই জানেন, ২০০৩-০৪ সাল থেকে বারবার কী ধরনের অভিযোগ জমা পড়েছিল এই আইপিএস অফিসারের বিরুদ্ধে। যদিও সেই অভিযোগের বিষয় এই লেখার বিষয়বস্তু নয়। কারণ কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে এক সময় ওঠা অভিযোগ নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর আলোচনা করা অনৈতিক।
মৃত গৌরব দত্তর সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে সিপিএমের মুখপত্রে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাঁর টাকা-পয়সা, অবসরকালীন সুবিধে আটকে দিয়েছে প্রতিহিংসাপরায়ণ তৃণমূল সরকার। কিন্তু সত্য ঘটনা কী?
৬০ বছর বয়সে ৩১ শে ডিসেম্বর ২০১৮, অবসর নেন গৌরব দত্ত। তার আগে ২৭ শে অগাস্ট ২০১৮ তিনি অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। তাঁর এই আবেদনের ভিত্তিতে ১০ দিনের মধ্যে আইপিএস সেল ৫ ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ গৌরব দত্তর সমস্ত কাগজপত্র হোম অ্যান্ড হিল অ্যাফেয়ার্স দফতরে পাঠিয়ে দেয় (মেমো নম্বরঃ ১৩৭৭-আইপিএস সেল)। অবসরের সময় গৌরব দত্তর বেসিক পে ছিল ১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৬০০ টাকা (ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত এই বেতনই পেয়েছেন গৌরব দত্ত)। এই বেতনের ভিত্তিতে তার ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকা গৌরব দত্তর পেনশনের জন্য বরাদ্দ হয় এবং ২০১৯ সালের ৯ ই জানুয়ারি সেই অর্ডার বেরোয় (জি ও নম্বরঃ ২০ পিএস সেল/ এইচআর/ও/৪পি-১৬২০১৮)। এবং জানুয়ারি মাসের তাঁর মোট পেনশন ১ লক্ষ ৮ হাজার ৭৮২ টাকা গত মাসের ২৯ তারিখ তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়।
চলতি মাসে অর্থাৎ, ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ ইনসিওরেন্স বাবদ ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৯৩৮ টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা করে সরকার।
তাঁর গ্র্যাচুইটির ২০ লক্ষ টাকা অনুমোদন করা সম্ভব হয়নি, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে যে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছিল তা শেষ হয়নি।
আরও অভিযোগ উঠেছে, গৌরব দত্তকে জিপিএফ (জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড) দেয়নি রাজ্য। আসল ঘটনা কী? জানা গিয়েছে, গৌরব দত্ত তাঁর জিপিএফের ৯০ শতাংশ টাকা, যার পরিমাণ ৪৮ লক্ষ টাকা, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে তুলে নিয়েছিলেন। বাকি যে ১০ শতাংশ টাকা বকেয়া ছিল তাও সরকার তাঁর আবেদনের ভিত্তিতে অবসরের পর এবছর জানুয়ারি মাসে ২৯ তারিখ রিলিজ করে দেয় (১৩৭-পিএসসেল/এইচআর/ও/১এ-০৩/০৯)।
জমা ছুটির বিনিময়ে যে টাকা তিনি পেতেন সেই টাকাও রিলিজ করে দেওয়া হয়েছে এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘ ৪-৫ বছর ধরে বিভাগীয় তদন্ত চলার পর গৌরব দত্তকে সাসপেন্ড করেছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার। তাঁকে কম্পালসারি ওয়েটিংয়েও পাঠায় সিপিএম সরকার। অবসরের সময় পর্যন্ত কম্পালসারি ওয়েটিংয়ে ছিলেন। তিনি যখন পুলিশ ট্রেনিং স্কুলের ডিআইজি ছিলেন সেই সময় তাঁর বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ ওঠে যে সিপিএম সরকার তাঁকে এমন শাস্তি দিয়েছিল, তা আজ আলোচনা করা অপ্রয়োজনীয়, অনৈতিকও বটে। কিন্তু এ প্রশ্নের জবাব নিশ্চই সিপিএম আমলের মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে করা যেতে পারে, আসানসোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাঁকে অ্যাডিশনাল এসপি করা হয়েছিল, যাঁকে অবিভক্ত মেদিনীপুর, বর্ধমানের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এসপি করা হয়েছিল, তাঁকে ২০০১ সালের পর থেকে কেন আর কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল করা হয়নি? ২০১১ সালের মে মাস পর্যন্ত তো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, যাঁর পার্টির মুখপত্র আজ এই আফিসারের মৃত্যুর পর তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাপরায়ণতার অভিযোগ তুলছে!
শুধু শেষে একটিই কথা বলার, সোশ্যাল মিডিয়ায় সিপিএমের কেউ কেউ লোক প্রশ্ন তুলেছেন, অর্থাভাবে প্রায় না খেতে পেয়ে, বিনা চিকিৎসায় গৌরব দত্ত এবং তাঁর পরিবার জর্জরিত ছিলেন। তাঁদের জন্য এটুকুই বলার, এই মুহূর্তে দেশের সামগ্রিক মানুষের সাধারণ মানুষের যে আর্থিক অবস্থা, তাতে হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরী, চিত্তব্রত মজুমদারের পার্টির নেতারা নিশ্চই বোঝেন, মাসে ১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৬০০ টাকা বেতন কিংবা ১ লক্ষ ৮ হাজার ৭৮২ টাকা পেনশনের মানে কী?

You may also like