২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর ২১ শে জুলাই ধর্মতলার শহিদ সমাবেশ থেকে তৃণমূল নেত্রী বার্তা দিয়েছিলেন, যে যেখানে শক্তিশালী সে সেখানে লড়বে বিজেপির বিরুদ্ধে। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই মমতা মডেলকে সামনে রেখেই দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশে জোট ঘোষণা করে ফেলল সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি। সেই হিসেবে বলতে গেলে, আগামী ১৯ শে জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেসের ব্রিগেড সমাবেশের এক সপ্তাহ আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মডেল স্বীকৃতি পেয়ে গেল জাতীয় রাজনীতিতে।
দীর্ঘ দিন ধরে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা সপা এবং বিএসপি যেমন মসৃণভাবে উত্তর প্রদেশে আসন সমঝোতার মতো জটিল একটি ব্যাপার ৩৮-৩৮ ফর্মুলায় সমাধান করেছে, তাতে একটা জিনিস স্পষ্ট, অখিলেশ-মায়াবতী দু’জনেই বুঝছেন, বিজেপিকে ঠেকাতে না পারলে সমূহ বিপদ। তাই নিজেদের মধ্যে বিবাদ ভুলে এককাট্টা হয়েছেন দু’জনে। কিন্তু উত্তর প্রদেশে সপা-বিএসপি’র এই জোট বিজেপিকে কতটা ধাক্কা দিতে পারবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটা এদিনের জোট ঘোষণার পর সারা দেশেই উঠে গেল তা হল, ২০১৯ লোকসভায় বিজেপি বিরোধী দলগুলির মধ্যে সমীকরণটা কী দাঁড়াবে?
গত আড়াই বছরে তৃণমূল নেত্রী বারবারই যে বার্তা দিয়েছেন তা হল, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটা সারা দেশে কোনও ধরাবাঁধা অঙ্কে হবে না। কারণ, গোটা দেশে এই মুহূর্তে এমন কোনও দল নেই যাদের প্রায় সমস্ত রাজ্যে শক্তির মধ্যে একটা ভারসাম্য আছে। তাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই হবে এক এক জায়গায় এক একরকম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফর্মুলা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ৪২ টি আসনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান শক্তি। সুতরাং এরাজ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই তারাই লড়বে। উত্তর প্রদেশে লড়বেন অখিলেশ-মায়াবতী। বিহারে লড়বে লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি। তামিলনাডুতে লড়বেন স্ট্যালিন। দিল্লিতে লড়বেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কেরলে লড়বে সিপিএম। কর্ণাটকে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বে জেডিএস। টিআরএস লড়বে তেলেঙ্গানায় এবং অন্ধ্র প্রদেশে লড়বেন চন্দ্রবাবু নাইডু। মহারাষ্ট্রে এনসিপি-কংগ্রেস লড়বে বিজেপির বিরুদ্ধে। এর বাইরে গুজরাত, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়ের মতো চারটি বড় রাজ্য রয়েছে, যেখানে কোনও আঞ্চলিক দল সেভাবে নেই। এই রাজ্যগুলিতে বিজেপির বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই লড়াই করবে কংগ্রেস।
প্রশ্ন হচ্ছে, তৃণমূল নেত্রীর এই ফর্মুলা কি মানতে চাইবে কংগ্রেস? উত্তর, সহজে চাইবে না, কিন্তু কিছু উপায়ও থাকবে না। অন্তত অখিলেশ-মায়াবতী কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে একতরফাভাবে জোট ঘোষণার পর তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ঠিক যেভাবে কর্ণাটকে বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও জেডিএসের কুমারস্বামীকে মুখ্যমন্ত্রী পদে সমর্থন দেওয়া ছাড়া কংগ্রেসের কিচ্ছু করার ছিল না, একইভাবে উত্তর প্রদেশেও অখিলেশ-মায়াবতীর একতরফা জোট ঘোষণার পরও কিছু করার নেই রাহুল-সোনিয়ার। সিপিএমের নেতৃত্বে বামেদের লাগাতার কৃষক আন্দোলন এবং বিজেপি সরকারের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে পুঁজি করে সম্প্রতি রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস সরকার গড়েছে ঠিকই, কিন্তু নির্বাচনী ফল পর্যালোচনা করে কংগ্রেস নেতারাও বুঝতে পারছেন, রাজস্থান, মধ্য প্রদেশে পরিস্থিতি তত সুবিধের নয়। মধ্য প্রদেশে তো বিধানসভা ভোটে বিজেপি কংগ্রেসের থেকে বেশি ভোট পেয়েছে, রাজস্থানে পেয়েছে সামান্য কম। এদিনও লখনউয়ে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে অখিলেশ-মায়াবতী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করা অর্থহীন। কয়েকদিন আগেই অরবিন্দ কেজরিওয়ালও দিল্লিতে ঘোষণা করেছেন বিজেপি এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের। সব মিলে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের উপস্থিতি আছে এমন অধিকাংশ রাজ্যেই কংগ্রেসের অবস্থা এখন নিছক দুয়ো রাণির মতো।
ঘটনাচক্রে এই অবস্থায় কংগ্রেসের একমাত্র অবলম্বন বলা যেতে পারে এরাজ্যের সিপিএম। সিপিএমের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি এখনও কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে মরিয়া। ঘটনাচক্রে এদিন মায়াবতী এবং অখিলেশ কংগ্রেস সম্পর্কে যা বলেছেন হুবহু তা ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরনো শুরু হওয়ার পর সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম বলেছিলেন। কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে বিরাট আশা জাগিয়ে ২০১৬ বিধানসভা ভোটে লড়েছিল আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। ফল ঘোষণা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ বাদেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে পৌঁছে মহম্মদ সেলিম বলেন, আমাদের ভোটাররা সমস্ত আসনে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু কংগ্রেসের ভোট সিপিএম পায়নি। এদিনও একই সুরে অখিলেশ-মায়াবতী জানিয়েছেন, অতীতে দেখা গিয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করলে লাভ হয় না। আমাদের ভোট ওরা পায়, কিন্তু কংগ্রেসের ভোট আমরা পাই না। ঘটনা হচ্ছে, এদিন সপা-বিএসপি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ১৯ শে জানুয়ারি ব্রিগেড মঞ্চ থেকে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ের যে মডেল ঘোষিত হতে চলেছে, তাতে এরাজ্য ছাড়া কংগ্রেস কোথাও জোটসঙ্গী পাবে তো?

You may also like