উনবিংশ শতকের শেষের দিকে বাগদাদ থেকে মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি কলকাতায় এলেন ব্যবসা করার তাগিদে। তখনকার ব্রিটিশ ভারত ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু, আর আমাদের কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হওয়ার সুবাদে বিদেশিদের কাছে যথেষ্ট পরিচিতিও লাভ করেছিল। এই ভদ্রলোক নিজের দেশে খাবারের ব্যবসা করতেন, তেমন বড় কিছু নয়, ছোটখাটো ব্যবসা। সেই স্বাদে ব্রিটিশদের কলকাতাকে মুগ্ধ করাই ছিল তাঁর এদেশে পাড়ি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য। প্রথমে অবশ্য সেরকম কোনও দোকান-পাট গড়ে তুলতে পারেননি কলকাতায় এসে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে নিজের তৈরি জিনিস বিক্রি করতেন।

এই ভদ্রলোকের নাম নাহুম ইজরায়েল মোরদেকাই। পুরো নাম বলার দরকার নেই, প্রথম নামটা শুনেই নিশ্চই বুঝতে পারছেন, প্রায় দেড়শো বছর আগে ভাগ্য সন্ধানে সুদূর বাগদাদ থেকে কলকাতায় আসা এই ব্যক্তি কীভাবে মিশে গিয়েছেন এরাজ্যের সংস্কৃতি, সমাজ, জীবনযাত্রার সঙ্গে। তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার হগ সাহেবের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নিউ মার্কেট চত্বরে ১৯০২ সালে একটা ছোট্ট দোকান খুলে ফেললেন তিনি, নাম দিলেন নাহুম অ্যান্ড সন্স। আর এখন যেখানে দোকানটি রয়েছে সেটিতে আসা হয়েছিল ১৯১৬ সাল নাগাদ এবং পাকাপাকিভাবে তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই এফ–২০ নম্বর জায়গাটিতেই রয়েছে নাহুমদের দোকান। এখনও এই ঝাঁ চকচকে শপিং কমপ্লেক্সের যুগে নিউ মার্কেটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর ‘নাহুম অ্যান্ড সন্স’। সারা বছরই ভিড় লেগে আছে দোকানে, আর বড়দিন এলে তো কিচ্ছু বলার নেই। আপনাকে হাতে সময় নিয়ে যেতে হবে অনেকটা, লম্বা লাইন পড়বে যে কেক কেনার!

নিউ মার্কেটে দোকান খোলার এক দশকের মধ্যেই নাহুম সাড়া ফেলে দিল শহরজুড়ে। তখন অবশ্য ক্রেতা বলতে ছিলেন মূলত ইংরেজরা। সময়ের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আম-বাঙালির মনেও জায়গা করে নিতে শুরু করলেন এই বাগদাদি ভদ্রলোক। আর কখন যে নাহুম আর বাঙালি মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেল, সেটা বুঝে ওঠা আসলে সম্ভব নয় ।
এই শতাব্দী প্রাচীন দোকানটি আজও অবিকলভাবে বাঙালির স্বাদপূরণ করে আসছে। পরিবর্তন? না! পরিবর্তন হয়নি। এককালে বেলজিয়াম থেকে কাঠ আর কাচ নিয়ে আসা হয়েছিল, দোকানের সিলিংয়ের জন্য জিঙ্কের নকশা আনা হয়েছিল ইতালি থেকে, আর চিনা কারিগর দিয়ে বানানো হয়েছিল কাচের শো-কেস। ৮০ বছরের একটা পুরনো রেজিস্টারও ছিল, যেটা অবশ্য কয়েক বছর আগে পরিবর্তন করা হয়। বাকি সব আজও অবিকল এক। নাহুম সাহেব যেভাবে দোকান সাজিয়ে গিয়েছিলেন, আজও সেই চেহারা ধরে রেখেছেন তাঁর উত্তরাধিকারীরা। ইজরায়েল নাহুমের মৃত্যুর পর দোকান সামলান ইলিয়াস নাহুম। তারপর বংশ পরম্পরায় দোকান সামলেছেন তাঁর ছেলে ডেভিড ইলিয়াস নাহুম। ডেভিড আসলে পেশায় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, মার্টিন বার্ন কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দোকান সামলাতে চাননি প্রথমে। কিন্তু বাবা মারা গেলে নিজের কাঁধেই দায়িত্ব তুলে নিলেন। আর কেই বা জানত, তাঁর সময়েই নাহুম পৌঁছে যাবে স্বাদের শিখরে। কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। বছর কয়েক আগে মারা যান অবিবাহিত ডেভিড, রেখে গিয়েছেন কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারী আর রেসিপি। কিন্তু ছিল না কোন উত্তরাধিকারী। একটা সময় এসেছিল যখন নাহুম চালানোই সমস্যার মুখে এসে দাঁড়ায়। তখন দোকানের হাল ধরলেন তাঁর ভাইপো আইজ্যাক নাহুম। মাঝে কয়েক বছর স্তিমিত থাকলেও, আবার জেগে উঠল নাহুম।

দেখতে দেখতে কলকাতায় প্রায় দেড়শটা বড়দিন কাটিয়ে ফেলেছে নাহুম। আবার হাজির হয়েছে আরও একটা ক্রিসমাস। বাঙালির বড়দিন নিয়ে যে একটা চূড়ান্ত আবেগ আছে, তা বলার দরকার হয় না। হাড় হিম করা ঠান্ডা কলকাতায় পড়ে না ঠিকই, কিন্তু হাতে কেকটা মাস্ট। সান্তা টুপির সঙ্গে কেক চাই বাঙালির। আর এই বিষয়টা নিয়ে বেশ ওয়াকিবহাল নাহুম কর্তৃপক্ষ। বড়দিন সামনে, হাতে সময়ও কম, প্রতি দিন দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য ক্রেতা। তাঁদের মুখে যে সুস্বাদু কেক তুলে দিতেই হবে। নিউ মার্কেটের ওই সরু গলিটা, যার ঠিকানা ১ নম্বর হার্ডপোর্ট লেন, সেখানে এখন প্রস্তুতি তুঙ্গে। আসলে এখানেই যে নাহুমের কেক তৈরি হয়ে আসছে বহু বছর ধরে।

‘বড়দিনের সময় এমন দিনও আমি দেখেছি, যখন আমাদের দোকানে ১০০ এর বেশি লোক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন কেক কেনার জন্য, আর আমাদের দোকানে কে আসতেন না বলুন তো? আমাদের অনেক পুরনো কাস্টমার আছেন, তারা তো আসবেনই। আর সেলিব্রটির সংখ্যা হাতে গুণে শেষ করা যাবে না। আমাদের কেক খুব ফেবারিট ছিল বিধান চন্দ্র রায়ের, নিয়ম করে তার বাড়িতে কেক যেত। সুচিত্রা সেন, সন্ধ্যা রায়রা তো বহুবারই শুটিং সেরে বাড়ি ফেরার সময় আমাদের দোকানে একবার ঢুঁ মেরে যেতেন। এই তো মাস কয়েক আগে হঠাৎ একদিন সকালে নুসরত এসে হাজির। চোখে সানগ্লাস, আর মুখে ওড়না, যাতে কেউ না চিনতে পারে। আমাদের এক কর্মচারী চিনে ফেলেছিলেন, আমরা তখনই জানতে পারি, নুসরত জাহানের আমাদের কেক খুব পছন্দের। সৌরভ গাঙ্গুলির কাছেও আমাদের কেক বেশ ফেভারিট ছিল। এই বড়দিন এলে আমাদের এখানে আসতেনই। আমরা তো একবার ব্যাটের আদলে একটা কেক দাদাকে গিফট করেছিলাম’, জানালেন জগদীশবাবু। যিনি ৪০ বছর ধরে নাহুমের ম্যানেজার।

প্রতিবারেই মতো এবারেও বড়দিন উপলক্ষ্যে নাহুমের কিছু স্পেশাল আকর্ষণ থাকছে। জগদীশ হালদার বললেন, আসলে আমাদের ফ্রুট কেক, প্লাম কেক তো রয়েছেই। সেগুলোর চাহিদাও অনেক। বড়দিনের জন্য আমরা ক্রিসমাস রিচ ফ্রুট কেক বানাই। সেটার জন্যই যথেষ্ট পরিমাণ ক্রেতা ভিড় করেন আমাদের দোকানে। আমাদের উদ্দেশ্য, ক্রেতাদের চাহিদা সঠিকভাবে পূরণ করা। তাই তাঁদের কথা মাথায় রেখেই আমরা ক্রিসমাসে এই ফ্রুট কেক তৈরি করি। সারা বছর আর বড়দিনের মধ্যে একটু হলেও তফাত আছে মশাই। বড়দিনে বাঙালির হাতে একটা নতুন কেক তুলে দেবো না, তা কি হতে পারে?’
ক্রিসমাসের ফ্রুট কেক ছাড়াও জিভে জল আনা কেকের লম্বা তালিকা রয়েছে নাহুমের। লম্বা মেনু দেখলে হকচকিয়ে যেতে পারেন। তাই যাওয়ার আগে না হয় একবার মেনুটা পরখ করে নিন। নাহুমের রিচ ফ্রুট কেক খেতে চাইলে আপনাকে ৪০০ গ্রামের জন্য খরচ করতে হবে ৩০০ টাকা আর স্পেশাল রিচ ফ্রুট কেক ৫০০ গ্রামের দাম ৪৫০ টাকা। চকোলেট ব্রাউনির দাম পড়বে ৪০ টাকা, লাইট প্লাম কেক ৪০০ গ্রামের দাম মাত্র ২৫০ টাকা। প্লেন কেক ৪০০ গ্রামের দাম ২০০ টাকা, ২০০ গ্রাম মার্জিপ্যান ১২০ টাকা, স্পেশাল অ্যামানাইজিং কেক বা যেটি ওয়েডিং কেক নামে পরিচিত, সেটার দাম ৭৪০ টাকা প্রতি কিলো, আর এক কিলো ব্ল্যাক ফরেস্টের জন্য আপনার পকেট থেকে খসবে মাত্র ৬৫০ টাকা।

এত রকমারি কেক, এত আভিজাত্য, দোকানের কোনায় কোনায় যে ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। তবুও কলকাতাজুড়ে নাহুমের একটাও ফ্র্যাঞ্চাইজি নেই। যদি নাহুম ফ্র্যাঞ্চাইজি দেওয়া শুরু করত, তাহলে হয়ত আজ অন্য কনেফেকশানরিগুলোকে বেশ প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দিতো। কিন্তু কেন নাহুম ফ্র্যাঞ্চাইজি দিলো না? জগদীশবাবু বললেন, ‘আসলে নাহুম চায় না নিজেদের রেসিপি অন্য কারোর হাতে তুলে দিতে, তাই আমরা আজ পর্যন্ত কোন ফ্র্যাঞ্চাইজি দিইনি, আর ভবিষতেও হয়তো দেবো না।’ এখানেও নাহুমের নিজেদের রেসিপি নিয়ে আভিজাত্য আর অহংকার নিঃসন্দেহে লক্ষণীয়, আর এই অহংকারটাই স্বাভাবিক, কেননা এরাই তো একটা গোটা শতাব্দী ধরে মানুষের চাহিদা মিটিয়ে আসছে।
একটা সকাল বা পড়ন্ত দুপুরে গুটি-গুটি পায়ে এসে নাহুমের কেক খাওয়া, অথবা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় নাহুমের কেক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া, এ তো বাঙালির এক শতাব্দী প্রাচীণ ট্র্যাডিশন। আর এই ট্র্যাডিশনটা বজায় রাখতে আর একটা বড়দিনের জন্য তৈরি হচ্ছে প্রায় দেড়শো বছর আগে কলকাতায় পা রাখা মাঝ বয়সী নাহুম ইজরায়েল মোরদেকাইয়ের পরিবার।

You may also like