নিরুপম সেনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। যে সময়টাতে তিনি রাজ্যের মন্ত্রী, মানে ২০০১ থেকে ২০১১, সেই সময়ে আমি কতবার যে পেশাগত কারণে মহাকরণ বা আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে গিয়েছি তা গুণে বলা অসম্ভব। অথচ কোনও দিনই নিরুপম সেনের সঙ্গে আমার একা কথা বলা হয়ে ওঠেনি। তাঁর প্রেস কনফারেন্স কভার করেছি, বাইটও নিয়েছি, কিন্তু কখনই পরিচয় হয়নি ব্যক্তিগতভাবে। একবারই আমি তাঁর সঙ্গে একা কথা বলি, ২০১২ সালে কোঝিকোড থেকে সিপিএমের পার্টি সম্মেলন কভার করে ফেরার সময় বিমানবন্দরে। বোর্ডিং পাস করে তিনি একা বসেছিলেন, নিজের পরিচয় দিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলি মিনিট দশেক। যেহেতু ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না, তাঁকে নিয়ে ব্যক্তিগত কোনও অভিজ্ঞতাও নেই আমার। তাই রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সাধারণ এক সাংবাদিক হিসেবে নিরুপম সেনকে আমি যেভাবে দেখেছি, তার ভিত্তিতে এই লেখা।
সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম পর্বে ২০০৫ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত সাংবাদিক হিসেবে সিপিএমের ভেতরের, সরকারের ভেতরের এবং বাজেমেলিয়া, খাসেরভেড়ি গ্রাম থেকে শুরু করে নন্দীগ্রাম, খেজুরি, ভাঙর, অণ্ডাল হয়ে রাজ্যের মাঠে-ময়দানের বহু ঘটনা, বহু খবর দেখা এবং শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। যার মধ্যে অনেক খবরের সঙ্গেই প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন নিরুপম সেন। সে সিঙ্গুর পর্বে হোক কিংবা নন্দীগ্রাম বিতর্ক শুরু হওয়ার অনেক আগে সেই জায়গায় শিল্পতালুক গড়া নিয়ে ২০০৬ সালে বিধানসভায় নিজের ঘরে সূর্যকান্ত মিশ্র, লক্ষ্মণ শেঠদের সঙ্গে তাঁর মিটিং করা হোক।
রাজ্যের অনেক সাধারণ মানুষের মতোই নিরুপম সেনের নাম আমি প্রথম শুনি ২০০১ সালে। বিধানসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে। তখন আমি আজকাল পত্রিকায় সাধারণ রিটেইনার। অফিসে সিনিয়রদের আলোচনায় শুনেছিলাম, বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হবেন বর্ধমানের নিরুপম সেন। সেই সময় সিপিএম পার্টির ভেতরে নিরুপম সেন এক প্রতিষ্ঠিত নেতা। সাধারণ কোনও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নন। মানে, এখন সিপিএমের অনেক কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য আছেন, যাঁদের পার্টিতে কী ভূমিকা, তাঁদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষ থেকে বিভিন্ন জেলার সিপিএম নেতা-কর্মীরা কী ভাবেন, তা নিয়ে তা নিয়ে তাঁদের কোনও ধারণাই নেই। এমন নেতা ছিলেন না নিরুপম সেন। তিনি জানতেন, তাঁর কী কাজ।
সেই সময়ই শুনেছিলাম, ২০০১ সালে সরকার গঠন হলে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হবেন নিরুপম সেন। কেন? কারণ, অসীম দাশগুপ্তর নেতৃত্বে অর্থ দফতরের তখন বেসামাল অবস্থা। মাইনে দিতে আর দৈনন্দিন কাজ করতেই রাজ্যের টাকা শেষ। উন্নয়নমূলক কাজকর্ম সব থমকে, জেলায়-জেলায় সিপিএম নেতারা রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ। বিভিন্ন জেলা থেকে সিপিএম নেতারা রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের কাছে রোজই অভিযোগ জানাচ্ছেন, কাজের যা গতি, রাজ্যের ভাঁড়ারের যা অবস্থা, এভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব। বছরের পর বছর ঘাটতি শূন্য বাজেট পেশ করা অসীম দাশগুপ্তকে সরিয়ে নিরুপম সেনকে অর্থমন্ত্রী করা হবে, এমন জল্পনা তখন আলিমুদ্দিনের অন্দরে প্রবলভাবে চর্চায়। সেই নিরুপম সেন ২০০১ সরকার গঠনের পর শিল্প এবং বাণিজ্যমন্ত্রী হলেন। অসীমবাবুকে সরালেন না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, অনিল বিশ্বাস। কিন্তু নিরুপম সেনকে শিল্প বাণিজ্যমন্ত্রী করে দলকে, সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিলেন, ক্যাবিনেটের দু’নম্বর আসলে তিনিই।
তখন থেকে বহুবার নিরুপম সেনকে দেখে আমার বারবারই মনে হয়েছে, আবেগের বহিঃপ্রকাশ তাঁর কম। সহজে উচ্ছ্বসিত হন না, কঠিন পরিস্থিতিতেও বিচলিত হন না। ধীর, স্থির, সংযমী, কঠিন একটা ব্যাপার আছে তাঁর, আর হাসিটা তাঁর বিশ্বাসের মতোই খাঁটি।
নিরুপম সেনকে নিয়ে আমার প্রথম ধাক্কা লাগল, যেদিন শুনলাম টাটা মোটরসের সঙ্গে চুক্তিকে তিনি ‘ট্রেড সিক্রেট’ বলেছেন। তখন সিঙ্গুর অশান্ত, টাটা মোটরস কারখানা বাতিল করে ফিরে যাবে এই অবস্থা তৈরি হয়নি ঠিকই, কিন্তু শিল্প গড়ার সহায়ক অবস্থা সেখানে রয়েছে তাও তো নয়। আমি শুধু ভাবতাম, নিরুপম সেনের মতো একজন মানুষ এটা কী বললেন? তিনি বুঝলেন না, তাঁর এই কথার কী ব্যাখ্যা হবে? তিনি আন্দাজ করতে পারলেন না, কেন টাটা চুক্তি ‘ট্রেড সিক্রেট’ তা নিয়ে বিরোধীরা তাঁর সরকারকে জেরবার করে দেবে? তিনি তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে যা সাফাই-ই দেন না কেন, সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ মনে করবেন, চুক্তিতে নিশ্চিতভাবে কিছু গোলমাল আছে। তখন ভাবতাম, নিরুপম সেনের সঙ্গে কখনও একা কথা হলে জিজ্ঞেস করব, ‘আপনি যা মনে করেন রাজনীতিতে তো তা যথেষ্ট নয়, মানুষ কী মনে করে সেটাও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি বলার আগে একবার ভাবলেন না, চুক্তি ‘ট্রেড সিক্রেট’ সরকারের এই ব্যাখ্যা মানুষ কীভাবে নেবে?’
এই প্রশ্ন আমার নিরুপম সেনকে করা হয়নি। কিন্তু কেন তিনি ওকথা বলেছিলেন তার জবাব আমি পেয়েছিলাম ২০১১ বিধানসভা ভোটের কিছুদিন বাদে।
২০১১ বিধানসভা ভোট চলছে তখন। আমি তখন এবিপি আনন্দ চ্যানেলের সাংবাদিক। কয়েকদিন আগেই এবিপি আনন্দ সমীক্ষায় দেখিয়েছে, বামফ্রন্ট ৭০-৭২ টা আসন পাবে। জেলায় জেলায় সিপিএম নেতাদের সঙ্গে কথা হলে দেখতাম শুধু তা নিয়েই আলোচনা। সেই সময় একদিন নিজের দক্ষিণ বর্ধমান বিধানসভা কেন্দ্রের প্রচার সেরে বর্ধমানের পার্কাস রোডের পার্টি অফিসে ফিরেছেন নিরুপম সেন। তিন-চারদিন বাদেই বর্ধমানে ভোট। জেলার কয়েকজন নেতা ঘিরে বসেছেন নিরুপম সেনকে। নানা বিষয়ে কথা হতে হতে এল এবিপি আনন্দ’র নির্বাচনী সমীক্ষার প্রসঙ্গ। বর্ধমানের এক নেতা বললেন, ‘কীভাবে এমন দেখাল এবিপি আনন্দ? শুধু আমাদের জেলাতেই অন্তত ১৭ টা আসন পাব।’
শুনলেন নিরুপম সেন। তারপর বললেন, ‘এই সমীক্ষার সঙ্গে আমি অনেকটাই একমত। আমাদের ফল ভালো হবে না। তাছাড়া আর কত বছর সরকার চালালে তোমরা খুশি হবে? ৩৪ বছর! আর কত দিন ক্ষমতায় থাকতে চাও তোমরা?’
বিধানসভা রেজাল্টের বেশ কিছুদিন বাদে বর্ধমান জেলা অফিসের এই কথোপকথন জেনেছিলাম আমি। সেদিন জবাব পেয়েছিলাম, কেন টাটা চুক্তিকে ‘ট্রেড সিক্রেট’ বলেছিলেন তিনি। সেদিন বুঝেছিলাম, নিরুপম সেন অন্যদের খুশি করার জন্য কথা বলেন না। যা বিশ্বাস করেন বলেন, যা বলেন তাতে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক কারণেই টাটার চুক্তি ছিল ‘ট্রেড সিক্রেট’, কিন্তু তাতে গোপনীয় কিছু ছিল না। ছিল না বলেই নিরুপম সেন তাকে ‘টেড সিক্রেট’ বলতে পেরেছিলেন, গোপনীয় কিছু থাকলে বলতেন না।
নিরুপম সেনকে নিয়ে আরও অনেক শব্দ লিখতে পারি, কিন্তু যতই লিখি তাঁকে পুরোটা বোঝানো সম্ভব নয়। তাই লেখা আর দীর্ঘ করার মানে হয় না। শুধু একটা বিষয় দিয়ে এই লেখা শেষ করব। নিরুপম সেনের নাম আমি প্রথম জেনেছিলাম তাঁর মন্ত্রী হওয়া নিয়ে আলোচনায়। কিন্তু পরে বারবার শুনেছি, একেবারেই মন্ত্রী হতে চাননি নিরুপমবাবু। ২০০১ সালে তো নয়ই, ২০০৬ সালেও নয়। বিশেষ করে ২০০৬ সালে একেবারে বেঁকে বসেছিলেন মন্ত্রী হতে, চেয়েছিলেন সংগঠনের কাজ করতে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রীতিমতো জোর করে তাঁকে মন্ত্রী করেন। কিন্তু ২০০৬ থেকে ২০১১ বা তার পরেও বহু সিপিএম নেতার কাছে শুনেছি, অনিল বিশ্বাসের পর সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হওয়া উচিত ছিল নিরুপম সেনের। এখনও ব্যক্তিগত আলোচনায় অনেক সিপিএম নেতা আক্ষেপ করেন, ‘নিরুপমদা রাজ্য সম্পাদক হলে দলটার ভালো হোত’।
এখানেই নিরুপম সেনের অপরিহার্যতা। তাঁর প্রশ্নাতীত যোগ্যতা, তাঁর দৃঢ়তাই শুধু নয়, যা বিশ্বাস করেন তা বলার মতো মানসিক শক্তি ছিল নিরুপম সেনের।