২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক বিন্যাস কী হতে চলেছে তার চূড়ান্ত কাউন্টডাউন শুরু হচ্ছে সোমবার, ১০ ই ডিসেম্বর। ১০ এবং ১১ ডিসেম্বর, মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের পরপর দু’দিন দেশে এমন সব ঘটনা ঘটতে চলেছে, যার ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করবে আগামী লোকসভা ভোটের রসায়ন।
১০ ই ডিসেম্বর, সোমবার চন্দ্রবাবু নাইডুর উদ্যোগে বিজেপি বিরোধী দলগুলির গুরুত্বপূর্ণ মিটিং দিল্লিতে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম, লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি, তামিলনাডুর স্ট্যালিন, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সমাজবাদী পার্টি-সবাইকে এক মঞ্চে হাজির করে বিজেপি বিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের চেহারা দেশের সামনে তুলে ধরতে মরিয়া টিডিপি নেতা এবং অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু।
১১ ই ডিসেম্বর মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়সহ পাঁচ রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের রেজাল্ট। ২০১৪ লোকসভা ভোটের নিরিখে হিন্দি বলয়ের তিন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে বিজেপির বিজয় রথ অশ্বমেধের ঘোড়ার চেহারা নিয়েছিল। সেই ঘোড়াকে এই তিন রাজ্যে কংগ্রেস আদৌ লাগাম পরাতে পারল কিনা তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বিরোধী জোটের সমীকরণ এবং ২০১৯ লোকসভার ভবিষ্যৎ।
আর পরপর দু’দিন জাতীয় রাজনীতিতে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে ছাপিয়ে যেতে পারে তারপরই শুরু হতে চলা সংসদ অধিবেশন। কারণ, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা তো বটেই, দলের ভেতরেও মাত্রাছাড়া চাপের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যিই কি নরেন্দ্র মোদী সরকার অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের অর্ডনান্স আনবেন আসন্ন সংসদ অধিবেশনে, তাই এখন জাতীয় রাজনীতিতে কোটি টাকার প্রশ্ন। পাঁচ বছর বাধাহীন সরকার চালিয়ে বিজেপি কি আগামী সাধারণ নির্বাচনে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগান অনুযায়ী কাজের খতিয়ান নিয়েই আবার ভোটারের সামনে দাঁড়াবে, না ‘মন্দির আভি বনায়েঙ্গে’ এই হাতিয়ার হাতে তুলে নেবে তাও ঠিক হবে এই ডিসেম্বর মাসের সংসদ অধিবেশনেই।
সব মিলে বছর শেষের আগে ডিসেম্বরের এই কয়েকটা দিনই আপাতত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে জাতীয় রাজনীতিতে।
সোনিয়া-রাহুল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিএম থেকে আরজেডি বা আম আদমি পার্টি, দেশের সব বিরোধী দলই একটা লক্ষ্য নির্দিষ্ট করেছে, বিজেপিকে কেন্দ্র থেকে হঠাতে যা করার করতে হবে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর রুট কী হবে তা এখনও চূড়ান্ত নয়। সাম্প্রতিক অতীতে বিহার, উত্তর প্রদেশের একাধিক আসনে উপনির্বাচনের মতো প্রাক নির্বাচনী আসন সমঝোতা, না কর্ণাটক বিধানসভার মডেলে নিজের মতো লড়াই করে রেজাল্টের পর বিজেপিকে ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুদিন আগেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, যে যেখানে শক্তিশালী, সে সেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করুক। আগে থেকে কাউকে প্রধানমন্ত্রী প্রজেক্ট করার দরকার নেই। সেসব ভোটের পর দেখা যাবে। ১০ তারিখের মিটিংয়ে বিরোধীদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, কীভাবে নিজেদের মধ্যে ফারাক যতটা সম্ভব মুছে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের চেহারা তুলে ধরা যায়।
এক্সিট পোলের হিসেব মতো পাঁচ রাজ্যের উপনির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খেতে চলেছে বিজেপি। যদি সত্যি-সত্যিই তা হয়, তবে মোদী-অমিত শাহ যে যথেষ্টই চাপে পড়ে যাবেন তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। যে পাঁচ রাজ্যের ভরসায় ২০১৪ সালে মোদী সরকার গড়েছিলেন, তার মধ্যে তিন রাজ্য মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে বিজেপি ধাক্কা খেয়ে গেলে বিরোধী শিবির যথেষ্টই উজ্জীবিত হবে। যা ডিসেম্বরের সংসদ অধিবেশনে অস্বস্তিতে রাখবে সরকারকে।
আর এখান থেকে যে প্রশ্ন উঠছে জাতীয় রাজনীতিতে, সংসদে কি সত্যি রাম মন্দিরের প্রস্তাব আনবেন মোদী-অমিত শাহ? রাম মন্দির নিয়ে হিন্দু সংগঠনগুলির মামলার শুনানি ইতিমধ্যেই পিছিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিষয়টা শুধু হিন্দু সংগঠগুলির পক্ষে অস্বস্তির তাই নয়, চিন্তায় ফেলেছে খোদ প্রধানন্ত্রীকেও। যে কারণে, সম্প্রতি মোদী পর্যন্ত প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেস আদালতকে ভয় দেখিয়ে অযোধ্যা মামলা পিছিয়ে দিয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, আসলে ভয় পেয়েছে বিজেপি। উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে আর চিঁড়ে ভিজবে না বুঝেই ঝোলা থেকে ফের মন্দির ইস্যু বের করতে হয়েছে মোদী-অমিত শাহদের।
আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কেন্দ্রের ওপর পরিষ্কার চাপ দিচ্ছে, আদালতকে এড়িয়ে দ্রুত মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নিক দেশের সরকার। সম্প্রতি হিন্দু সংগঠনের একাধিক নেতা এমনও জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন এই সংসদ অধিবেশনেই অযোধ্যায় মন্দির গড়ার অর্ডনান্স আনবে কেন্দ্র। ৯ ই ডিসেম্বর রবিবারই দিল্লিতে লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ করেছে আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। সমাবেশ থেকে দাবি উঠেছে মন্দিরের। আগে স্লোগান ছিল, ‘মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে’, যা এখন পালটে হয়েছে, ‘মন্দির আভি বনায়েঙ্গে’। আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো মোদী-অমিত শাহও বুঝছেন, অযোধ্যায় রাম মন্দির বানাতে হবে, এই স্লোগানে বেশি দিন চলবে না। এই স্লোগান আর যথেষ্ট নয়। তাই আমদানি করতে হয়েছে নতুন লাইন, অযোধ্যায় এখনই মন্দির চাই। কারণ, ডিসেম্বর মাস পড়ে গেছে, হাতে সময় নেই বিশেষ। বছর ঘুরলেই শুরু হবে লোকসভার আগে শেষ যুদ্ধ। তাই সব প্রস্তুতি সেরে রাখতে হবে এমাসেই।