টেলর শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ থেকে। ল্যাটিন শব্দ ‘tailler’ থেকে আজকের tailor শব্দের উৎপত্তি। তবে উৎপত্তি যাই হোক না কেন, আমরা একে বাংলায় দরজি বলেই বেশি সাবলীল। সাহেবদের, মানে ইংরেজদের কিন্তু টেলারিং নামক বিষয়টি নিয়ে মাতামাতি কম ছিল না। সে এদেশের বুকে হোক বা ইংল্যান্ডে। টেলারিং নিয়ে সাহেবদের দরকার পড়ল নির্দিষ্ট ম্যানুয়ালের, যেমনই বলা তেমনি কাজ। ১৭৯৬ সালে ব্রিটিনে লিখে ফেলা হল ‘The Taylor’s complete Guide’। না, অবশ্য এনারা এখানেই থেমে থাকলেন না। একের পর একের টেলারিং সম্পর্কিত গাইড বুক বের করতে থাকলেন ব্রিটিশরা। ১৮৫৫ সালের ‘Tailor’s Guide’ বা ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত E.B. Giles এর ‘History of the Art of Cutting’। আর লন্ডনের সেই বিখ্যাত Savile Row, অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক থেকে যেখানে গড়ে উঠতে থাকল টেলারিংয়ের বিভিন্ন দোকান। একে টেলারিংয়ের মক্কা নামেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে!

তবে লন্ডনে সাহেবদের ইতিহাস যাই বলুক না কেন, আমাদের দেশও খুব একটা পিছিয়ে নেই। আর কলকাতা? হ্যাঁ, অবশ্য এক্ষেত্রে কিছুটা ব্রিটিশ ছোঁয়া থাকলেও এদেশীয় শিল্প সত্তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠবে না। শিল্পী বলতে অবশ্য এখানে মাস্টারকে বোঝানো হচ্ছে, মাস্টার হলেন দোকানের চিফ দরজি, আর তাঁর হাতের জাদুই তো মুগ্ধ করতো ক্রেতাদের।

শতরঞ্জ কি খিলাড়ি সিনেমাটি মনে পড়ে? হ্যাঁ, সত্যজিৎ রায় পরিচালিত সেই বিখ্যাত সিনেমা। আর আউট্রাম সাহেবের রানির উদ্দেশ্য সেই উক্তি, যেখানে তিনি বললেন, ‘such a course will be extremely unwise’। তবে আউট্রাম সাহেবের কোটটা কে বানিয়েছিলেন জানেন? মানে আউট্রাম সাহেবের, যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রিচার্ড অ্যাটেনবরো। বানিয়েছিলেন সেভিল রো, না ইংল্যন্ডের সেভিল রো নয়, এই খাস কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের সেভিল রো। ‘আমি তখন খুব ছোট, যত দূর মনে পড়ছে, তখন জোর কদমে শতরঞ্জ কি খিলাড়ি সিনেমার শুটিং চলছে। হঠাৎই প্রয়োজন হয়েছিল একটা কোট বানানোর। খুব তাড়াতাড়ি বানাতে হবে সেই কোট। ডাক পড়ল আমার বাবার, অ্যাটেনবরো সাহেবের মাপ নিয়ে এসে মাত্র দিন দুয়েকের মধ্যে কোট বানিয়ে দিলেন বাবা। আসলে বাবা টের পেয়েছিলেন, সত্যজিৎবাবু খুব পারফেক্ট জিনিস পছন্দ করেন, একটা ভুল হলে সর্বনাশ। না, ভুল কিছু হয়নি। আর সব থেকে বড় ব্যাপার হল, শুটিং এর পর সত্যজিৎ রায় এবং অ্যাটেনবরো সাহেব দু’জনে এসে বাবাকে বাহবা দিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, দিয়ে গিয়েছিলেন দুটি ফলকও। যা আজও আমার কাছে গর্বের,’ জানালেন শেখ আনিসুর রহমান। অবশ্য খোকন নামে ইনি বেশি পরিচিত। খোকনবাবুই এখন সেভিল রো দোকানের মালিক। আর যিনি সেই বিখ্যাত কোট প্রস্তুত করেছিলেন তাঁর নাম শেখ আবদুল হালিম।

১৯৯৩ সালে শেখ আবদুল হালিম মারা যাওয়ার পর খোকনবাবুই দোকান সামলান । খোকনবাবু আরও বললেন, ‘পরে কিছু মানুষ সেই ঘটনার কথা জানতে পেরে আমাদের দোকানে এসেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভিক্টর ব্যানার্জি। আসলে জানেন, বাবার কাছ থেকেই আমার সব কিছু শেখা।’ বলতে বলতে কিছুটা হলেও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন আবদুল ভাই। আসলে এই সেভিল রো যে কত স্মৃতি বহন করে আসছে তা অনেকেরই জানার বাইরে। দোকানে প্রবেশ করলে অনুভব করবেন, এক কালে সত্যজিৎ রায় এখানে এসেছিলেন রিচার্ড অ্যাটেনবরোকে সঙ্গে নিয়ে, একটা নস্টালজিয়া আপনাকে স্পর্শ করে যাবে হয়তো।

সেভিল রো ছাড়াও তো এই শহরে কত টেলারিং শপ আছে যেগুলো শতাব্দী প্রাচীন। বহু কাল ধরে বাঙালির চাহিদা পূরণ করে আসছে তারা। ইতিমধ্যে প্যারিস বন্ধ হয়ে গেছে। তবে কি রেডিমেড পোশাকের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি? অবশ্য এই রেডিমেড পোশাকের সঙ্গে নিজেদের তুলনা টানতে রাজি নন আজিজ ইব্রাহিম কলকাত্তাওয়ালা, যিনি ১১ এ এসপ্লানেড রো’র আকবর আলি ক্লথিয়ার্স-এর মালিক। আজিজ ইব্রাহিম বললেন, ‘১৯৬০ সালে এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আমার বাবা ইব্রাহিম আকবর আলি আর কাকা ইউসুফ আকবর আলি। ‘আসলে আকবর আলি ক্লথিয়ার্স ছয় দশক ধরে কলকাতার লেটেস্ট ফ্যাশনের পরিচয় বহন করে আসছে। আর দরজির প্রশ্নে আজিজ বললেন, ‘আমাদের কলকাতার কোনও দরজি নেই, সবাই উত্তর প্রদেশ থেকে আসেন, আসলে এটা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। আমার বাবা এখানে এসেছিলেন গুজরাত থেকে, আমার জন্মও গুজরাতে।’ এদের ক্রেতার তালিকায়টাও বেশ লম্বা। ‘হেন কোনও জাস্টিস নেই, যিনি আমাদের দোকানে আসেননি। শুধু জাস্টিস না, আগের সরকারের অনেক মন্ত্রীও আমাদের ক্রেতা ছিলেন। আমি নিজে সুভাষ চক্রবর্তীর বাড়ি গিয়ে মাপ নিয়ে আসতাম। আর হ্যাঁ, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও আমার বানানো পোশাক পরতেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল নুরুল সাহেব আমার কাজের খুব সুখ্যাতি করতেন।’ বললেন আজিজ ইব্রাহিম কলকাত্তাওয়ালা। আরও একটা বিষয় জানলে চমকে যেতে পারেন, এক সময় দ্য গালফ নিউজেও খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিল এই আকবর আলি’দের দোকান। এখন টেলারিং ছাড়াও, বানানো জিনিসপত্র বাড়িতে ডেলিভারি করারও ব্যবস্থা করেন আজিজ ভাইরা। এই রেডিমেডের রমরমা বাজারের যুগে দোকানে সব সময় উপচে পড়া ভিড় থাকে। আসলে বাঙালি যে একটু পছন্দসই জামা-কাপড় চায়। সেখানে দামটা অনেক সময় নগণ্য হয়ে পড়ে, আর কাস্টমারদের স্যাটিসফাই করার সুবাদেই এখনও টিকে রয়েছে আকবর আলি ক্লথিয়ার্স। আর সব শেষে আজিজ ভাই বলে উঠলেন, ‘মনে রাখবেন, ‘readymade garments never fits well’।

ভাবছেন, একবার এখান থেকে বানাবেন জামা-কাপড়! মজুরিটা পরখ করুন না হয়–শেরওয়ানির মজুরি ৫ হাজার টাকা, স্যুট টু পিস ৪ হাজার টাকা, আর থ্রি পিস সাড়ে ৪ হাজার টাকা। তাছাড়াও জামা তৈরির মজুরি ৩০০ টাকা আর ট্রাউজার তৈরি করতে গেলে আপনার পকেট থেকে খসবে মাত্র ৪৫০ টাকা।
কলকাতার ধর্মতলা নিউ মার্কেট চত্বরে এরকম অনেক পুরনো দোকান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেমন, জে এস মহম্মদ আলি কিংবা কোহিনুর টেলার্স। পারেখ আর সিংহের নাম জানা আছে? মানে, পারেখ আর জীবেশ সিংহ, এখনকার পপ মিউজিকের ডুয়ো। যাঁদের মিউজিক ভিডিও’র ফ্যান লক্ষাধিক। এঁদের কস্টিউমের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং ওয়েস অ্যান্ডারসন। আর এই কস্টিউম ডিজাইনারের নাম শুনলে আরও চমকে যাবেন। আমাদের খাস কলকাতার একশো বছরের পুরনো টেলারিং শপ, যার নাম বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদারস। যারা এঁদের কস্টিউম ডিজাইন করে দিয়েছিলেন। ‘আমার দাদু, মানে স্বয়ং বরকত আলি জন্মেছিলেন শিয়ালকোটে। কলকাতায় আসার পর দাদু প্রথমে ব্রিটিশ সেনাদের পোশাক তৈরি করতেন, পরে ১৯১০ সাল নাগাদ গ্র্যান্ডের পাশে এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন।’ জানালেন সরফরাজ আলি। সরফরাজ আলি আর তাঁর দাদা সিরাজ আলি এখন দোকান সামলাচ্ছেন। উত্তম কুমার, সত্যজিৎ রায় ছিলেন এক সময় এই দোকানের নিয়মিত ক্রেতা। ফারুক শেখ মহাশয়ও এখানে ঢুঁ মেরেছেন, বর্তমানে অবশ্য প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এখানে নিয়মিত আসেন ।

কলকাতা শহরের এই সমস্ত প্রাচীন টেলারিং শপ সেলিব্রটি হ্যান্ডেল করতে করতে নিজেরাই যেন কবে সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছে। কিন্তু রেডিমেড পোশাকের রমরমা কি কোনওভাবে সমস্যায় ফেলেছে কলকাতার এই পুরনো ঐতিহ্যকে? এব্যাপারে অবশ্য প্রত্যেকেরই এক জবাব, যাঁরা পোশাক বানিয়ে কেনার কাস্টমার, তাঁরা নিয়মিত আসবেনই। আসলে ফিটিংসটা একটা ব্যাপার আর কী। যতই রেডিমেড পোশাক আসুক না কেন! আর তাই এই সমস্ত টেলারিং শপ কখনই নিজেদের সঙ্গে রেডিমেড পোশাকের রেষারেষি অনুভব করেন না।
আরে মশাই, এত কী ভাবছেন? ঘুরেই আসুন এই টেলারিং শপগুলোতে একবার। আপনার পছন্দসই আর ফিটিং পোশাকের জন্য। কেই বা বলতে পারে, এই সব জায়গায় শার্ট, প্যান্ট, কোট বানানোর পর আপনিও হয়ত রেডিমেড থেকে মুখ ফেরাবেন। আসলে এই সব টেলারিং শপ এই শহরের একটা ঐতিহ্য, যা ইতিহাস, নস্টালজিয়া আর স্যাটিসফেকশানের এক পারফেক্ট ডেস্টিনেশন।

You may also like