সোমবার দুপুরের পর থেকেই কলকাতার সোশ্যাল মিডিয়ায় নিকোলাস মাদুরো। পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএমের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরোর ছবি। কিংবদন্তী হুগো শাভেজের মৃত্যর পর ২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মাদুরো। রবিবার ফের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিতলেন তিনি। ভারতসহ গোটা দুনিয়ায় যেখানে অতি দক্ষিণ পন্থার উত্থান, সেখানে মাদুরোর এই জয় স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহিত করছে বামপন্থীদের। বিশেষ করে এরাজ্যের বামপন্থীদের কাছে ভেনেজুয়ালায় মাদুরোর জয় বাড়তি তাৎপর্যের। কারণ, পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা দেশেই বামপন্থীদের কোণঠাসা অবস্থা।

এ’বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ভোট হওয়ার কথা ছিল ভেনেজুয়েলায়। মাদুরো প্রশাসন তা এগিয়ে নিয়ে আসে মে মাসে। আর এই নির্বাচন এগিয়ে আসা এবং তা যেভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে তা নিয়ে সোমবার সকাল থেকে সমালোচনার ঝড় বিশ্বজুড়ে। ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশও তীব্র নিন্দায় সরব হয়েছে মাদুরো প্রশাসনের বিরুদ্ধে। কিন্তু, কেন এই সমালোচনা? কেন মাদুরোর এই জয়ে নিন্দায় মুখর বহু দেশ?
রবিবার ভেনেজুয়েলার নির্বাচনে মাদুরো পেয়েছেন ৫৮ লক্ষ ভোট (৬৭.৭০ শতাংশ)। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দী হেনরি ফ্যালকন পেয়েছেন ১৮ লক্ষ ভোট। এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন অন্যত্র। হুগো শাভেজের দেশে রবিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট পড়েছে মাত্র ৪৬.১০ শতাংশ। অথচ ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮০ শতাংশ। গত ২০ বছরে ভেনেজুয়েলায় ভোট পড়েছে গড়ে ৭৮-৮০ শতাংশ। তবে এবার কেন এত কম ভোট? কেন ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ এবার বুথমুখো হলেন না? কীসের জন্য তাঁদের এই ভোটদানে অনীহা? এই প্রশ্ন তুলেই মাদুরোকে বিঁধছেন পরাজিত প্রার্থী ফ্যালকন থেকে চিলির রাষ্ট্রপতি, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ইউরোপিও ইউনিয়ন। মাদুরো প্রশাসন নির্বাচনকে এগিয়ে এনে তাকে প্রহসনে পরিণত করেছে বলে অভিযোগ তুলে ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মহাজোট ‘দ্য ডেমোক্রাটিক ইউনিটি রাউন্ড টেবল’ আগেই এই নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছিল। ভোটের দিন ভেনেজুয়েলার প্রায় অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম দেখিয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বুথের পর বুথ ফাঁকা। অধিকাংশ সময় কোথাও কোনও ভোটার নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সরকারি কর্মচারী, সরকারি কাজে যুক্ত মানুষ-জনই বেশি ভোট দিয়েছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, এটাও তাঁরা বাধ্য হয়েই করেছেন, প্রশাসনের চাপে।
রেজাল্ট বেরনোর পর মাদুরো বলেছেন, ‘এই জয় ঐতিহাসিক, সাধারণ মানুষের মতের জয়। এই রেজাল্ট ভেনেজুয়েলার সাফল্য, গণতন্ত্রের সাফল্য’।
ফ্যালকন পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন। বলেছেন, ‘যা হয়েছে তা প্রহসন মাত্র’। ২০১৩ সালে মাদুরোর কাছে অল্প ভোটে হেরে যাওয়া হেনরিক ক্যাপ্রিলাসও অভিযোগ করেছেন, ‘নির্বাচনের নামে যা হয়েছে তা ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে কলঙ্কজনক’।
২০১৪ সালে ভারতবর্ষে মাত্র ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গড়া বিজেপি কিংবা পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩৪ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের পর যাঁরা নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁরা অবশ্য ভেনেজুয়েলায় কেন মাত্র ৪৬ শতাংশ ভোট পড়ল, বা কেন সেখানকার নির্বচনকে প্রহসনে পরিণত করার অভিযোগ উঠল বামপন্থী মাদুরোর বিরুদ্ধে, তা নিয়ে এখনও চুপ।
অথচ চুপ করে তো থাকার কথা ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কিংবা ইউরোপিয় ইউনিয়নের। ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফেসবুকের তথ্য পাচার করে জনমতকে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার বিরুদ্ধে। ব্রেক্সিটের সময়ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর প্রচারের অভিযোগ উঠেছে।
দিনের পর দিন এই সব দেখেশুনে কী ভাবেন আমার, আপনার মতো সাধারণ ভোটার? নিজেদের কি প্রতারিত মনে হয় কখনও?
কোনও দিন কি দুনিয়ার কোটি কোটি ভোটার ভেবে দেখবেন, কোনও ভৌগলিক সীমানা না মেনে রাজ্য থেকে দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলা, কেন বারবার নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে? কেন বারবার আক্রান্ত হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যবস্থা? নির্বাচন ব্যবস্থাই যদি বারবার আক্রমণের মুখে পড়ে, তবে দুনিয়াজোড়া ভোটার আর কতদিন এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা দেবেন, তা নিয়েও এবার ভাবার সময় হয়েছে শাসক গোষ্ঠীর।