হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্য মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়ের নির্বাচনী প্রচারে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তথা হিন্দুত্ববাদী পোস্টার বয় যোগী আদিত্যনাথ। এই তিন রাজ্য এবং তেলেঙ্গানায় প্রায় ৭৫টি সভা করে এবার ‘রেকর্ড’ গড়েছেন যোগী। আর নির্বাচনী প্রচারে তাঁর মুখ্য অস্ত্রই ছিল হিন্দুত্ব। এমনকী, যেদিন নিজের রাজ্যের বুলন্দশহরে গো-রক্ষকবাহিনীর হাতে পুলিশ ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমার সিংহ খুন হয়েছেন, থানা জ্বলছে, সেদিনও ছত্তিশগড়ে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন যোগী।
বিজেপিও ভেবেছিল যোগী আদিত্যনাথকে দিয়ে হিন্দি বলয়ে হিন্দুত্ববাদী প্রচারেই ভোট বাক্স ভরবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের সঙ্গে যোগী লাগাতার প্রচার চালিয়েছেন, সভা করেছেন এই তিন রাজ্যে। তবে নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহের চেয়েও যোগীর সভার সংখ্যা ছিল ঢের বেশি। ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহ নিজের চেয়েও তাঁর রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে বেশি আস্থা রেখেছিলেন যোগীর ওপরই। শুধু উন্নয়ন, বিকাশের স্লোগান দিয়ে জেতা সহজ হবে বুঝে তিন রাজ্যেরই বিজেপি নেতারা নির্বাচনের ঠিক আগে যোগী আদিত্যনাথের হাত ধরে চলে গিয়েছিলেন হিন্দুত্বের প্রচারে। কিন্তু ভোটের পর দেখা গেল উলটো ছবি। মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং রাজস্থান, তিন রাজ্যেই বিজেপিকে কোণঠাসা করেছে কংগ্রেস।
যোগীর হিন্দুত্ববাদী ইমেজে চোখ বুজে ভরসা করেছিল বিজেপি নেতৃত্ব। গোরক্ষনাথ মন্দিরের পুরোহিত, গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত যোগীকে দিয়ে পুরো ‘হিন্দু ভোট’ ব্যালট বাক্সে ভরতে চেয়েছিল গেরুয়া শিবির। অন্যদিকে, লাগাতার তাঁর সভায় জনতার আধিক্য দেখে পুলকিত হয়েছিলেন বিজেপি নেতৃত্বও। যোগীও কোনও জনসভায় বলেছেন, ‘হনুমান দলিত ছিলেন’, আবার কোথাও বলেছেন, ‘তোমাদের আলি আছে তো আমাদের বজরংবলী আছে’। কিন্তু তাতেও যে হিন্দি বলয়ের হিন্দু অধ্যুষিত এই তিন রাজ্যে চিড়ে ভেজেনি তা ভোটের ফলেই পরিষ্কার হয়েছে। আর এখানেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি বিজেপির আগ্রাসী হিন্দুত্বের স্লোগানের পরাজয় হল এই তিন রাজ্যে?
যোগীও গেরুয়া শিবিরের আস্থা রক্ষায়, ‘হিন্দুস্বার্থে’ লাগাতার বিতর্কিত মন্তব্য করে এই তিন রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারে হেডলাইনে থেকেছেন। মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, তিন রাজ্যে ভোটের আগে একটি বিভাজন রেখা টেনে হিন্দুদের মন পেতে চেয়েছিল বিজেপি। এমনকী তেলেঙ্গানাতেও যোগীর হিন্দুত্ববাদী বার্তার ‘ডোজ’ মোদীর চেয়েও বেশি কার্যকরী বলে স্বীকার করেছিলেন এক বিজেপি নেতা। তেলেঙ্গানায় যোগী বলেছিলেন, বিজেপি সরকার গড়লে হায়দরাবাদ থেকে করিমনগর সব শহরের নাম বদল করবেন তাঁরা। কিন্তু সেই রাজ্যেও ধরাশায়ী হয়েছে বিজেপি। প্রমাণিত হয়েছে, গোরক্ষনাথ মন্দিরের পুরোহিতের ‘ওষুধে’ কাজ হয়নি কিছুই। যে রাজ্যে যোগী সবচেয়ে বেশি সভা করেছেন, সেই ছত্তিশগড়ে বিজেপির রেজাল্ট হয়েছে সবচেয়ে খারাপ।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে মোদীর ‘আচ্ছে দিন’ বা ‘সবকা সাথ, সব কা বিকাশ’ এর প্রতিশ্রুতি পরিবর্তিত হয়ে ২০১৮ সালে যোগী কণ্ঠে উঠে এসেছে ‘ রামরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার আশ্বাস। ২০১৪ সালে নির্বাচনের ঠিক আগে মুজফফরনগরের জাতি দাঙ্গার ঘটনা উত্তর ভারতে বিজেপির শক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই সঙ্গে যোগী আদিত্যনাথেরও গুরুত্ব বাড়িয়েছিল বিজেপির অন্দরে। এবার এই তিন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ভোট হয়েছে আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রাম মন্দির গড়ার ঘোষণার আবহে। একদিকে রাম মন্দির ইস্যু, অন্যদিকে যোগী আদিত্যনাথের হিন্দুত্ব প্রচার, দুইও বাঁচাতে পারল না বসুন্ধরা রাজে, শিবরাজ সিংহ চৌহান এবং রমণ সিংহের সরকার।
লোকসভার আগে শেষ গুরুত্বপূর্ণ এই বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পরে বিজেপি কয়েকজন নেতা স্বীকারও করছেন, অতি যোগী নির্ভরতার খেসারত দিতে হয়েছে দলকে। এক বিজেপি নেতার স্বীকারোক্তি, ‘হিন্দু-মুসলিম কাম তো করতা হ্যায়, লেকিন মন্দির সে কব তক লোগো কা পেট ভরেগা।’