দ্য বেঙ্গল স্টোরি ব্যুরো: ইরান যুদ্ধের সরাসরি অভিঘাত এ বার স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভারতের অর্থনীতিতে। ফেব্রুয়ারির শেষে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম, ধস নামছে টাকার দরে, আর প্রতিটি মাসেই ফুলছে কেন্দ্রের ব্যয়ের বহর। সরকারি সূত্র এবং একাধিক রেটিং সংস্থার তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে দেশের তেল ও গ্যাস আমদানি বিল মার্চের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৫৩ শতাংশ – যা চলতি অর্থবছরে রাজকোষ পরিস্থিতিকে রীতিমতো নাড়িয়ে দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা ও ভারতের ঝুঁকি
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ ভারত। চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ তেলই বাইরে থেকে আনতে হয় বলে যে কোনও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে ভারতের ঝুঁকি সব থেকে বেশি। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে, সেখানে ইরান কার্যত অবরোধ জারি রেখেছে। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত, আর তার মাশুল গুনতে হচ্ছে দিল্লিকে।
রাজকোষ ঘাটতি ৫ শতাংশ ছোঁয়ার আশঙ্কা
কেন্দ্রের লক্ষ্য ছিল চলতি অর্থবছরে রাজকোষ ঘাটতি GDP-র ৪.৩ শতাংশে বেঁধে রাখা। কিন্তু রয়টার্সের এক সমীক্ষায় অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস, ঘাটতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪.৭ শতাংশে; কেউ কেউ ৫ শতাংশের আশঙ্কাও করছেন। দেশীয় রেটিং সংস্থা ক্রিসিল তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানিয়েছে, খুচরো বাজারে তেলের দাম আরও কিছুটা বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে পরিবহণ ব্যয়, খাদ্যপণ্য ও মূল মূল্যস্ফীতি – সবেতেই।
আরও পড়ুন: বড়ো ঘোষণা RBI-এর! মিলে যেতে চলেছে এই দুটি ব্যাঙ্ক, এখনই জেনে নিন
পেট্রল-ডিজেলে কর ছাড়, ভর্তুকিতেও বরাদ্দ বৃদ্ধি
জ্বালানি মূল্যের ধাক্কা সামাল দিতে পেট্রল ও ডিজেলের উপর কর ছাঁটাই করেছে কেন্দ্র। এতে প্রতি মাসে রাজস্ব বাবদ প্রায় ১৪০ কোটি টাকা – সরকারি হিসেবে ১৪০ বিলিয়ন রুপি – হারাচ্ছে কোষাগার। এক সরকারি আধিকারিকের বক্তব্য, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সার ভর্তুকির বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ বাড়াতে হতে পারে। এল নিনোর কারণে এ বছর খরার আশঙ্কা থাকায় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির স্বার্থে এই বাড়তি ব্যয় কার্যত অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
‘বিরল গোল্ডিলক্স’ পর্বের অবসান
গত বছরের শেষে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছিলেন এক ‘বিরল গোল্ডিলক্স’ পর্ব হিসেবে – যেখানে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী, আর বৃদ্ধির হার তুলনামূলক ভাবে শক্তিশালী। ইরান যুদ্ধ সেই হিসেব উলটে দিয়েছে। অ্যাবার্ডিন ইনভেস্টমেন্টস-এর অর্থনীতিবিদ মাইকেল ল্যাংহ্যামের পর্যবেক্ষণ, একাধিক সরবরাহজনিত ধাক্কা একসঙ্গে আছড়ে পড়ায় চড়া জ্বালানি ব্যয়কে এড়িয়ে যাওয়া RBI-র পক্ষে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
টাকার দর ও বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারে চাপ
ফেব্রুয়ারির পর থেকে ডলারের সাপেক্ষে টাকার দর একাধিকবার রেকর্ড তলানিতে নেমেছে। মুদ্রার পতন ঠেকাতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক একাধিক পদক্ষেপ করেছে – ফরোয়ার্ড লেনদেনে নিয়ন্ত্রণ, ব্যাঙ্কগুলির ফরেক্স পজিশনে কড়াকড়ি, এবং গত শুক্রবার ঘোষিত নতুন একগুচ্ছ ব্যবস্থা। বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক HSBC-র মূল্যায়ন, এই নতুন পদক্ষেপের ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের পেমেন্ট ব্যালান্স ঘাটতি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার কমতে পারে; আগে যা ৬৫ বিলিয়ন ডলার ছোঁবে বলে আশঙ্কা ছিল। তুলনায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের পেমেন্ট ব্যালান্স ঘাটতি ছিল ২৫.২ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ GDP-র ০.৬ শতাংশ।
বাজারের মূল প্রশ্ন এখন একটাই – মার্কিন-ইরান অচলাবস্থা কত দিন চলবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ভারতের অর্থনীতিতে ক্ষত তত গভীর হবে। অপরিশোধিত তেলের দাম, টাকার দর এবং রাজকোষ ঘাটতি – এই তিন ফ্রন্টে সরকারের সামনে এখন এক জটিল ভারসাম্যের পরীক্ষা।