(আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছে: ২০০৯ সালের মাঝামাঝি রামজীবন মুর্মুর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই এলেন তাঁর ভাই নকুল মাহাতো)

ঝাড়খন্ড পার্টি করতেন শুনে চমকে ঘাড় ঘোরালাম নকুল মাহাতোর দিকে। তারপর রামজীবনকে ফের জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু আপনি নিজে রাজনীতি করেননি কখনও? সমর্থন তো করতেন কাউকে।
‘বাবা-মামারা কংগ্রেসকে সমর্থন করত। আমরা দুই ভাইও ছোটবেলায় তাই করতাম। কংগ্রেসকে সমর্থন। তখনও গ্রামে সিপিআইএম আসেনি…’
‘ছোটির কারবারটা বলো,’ খাটিয়ায় বসে ঘাম মুছতে মুছতে দাদার সঙ্গে এই আগন্তুকের কথাবার্তা শুনছিলেন চোখ ছোট করে, কপালে তিন-চারটে রেখা স্পষ্ট, রাজনীতির আলোচনা আসতেই রামজীবনকে থামালেন তাঁর ভাই। তারপর নকুল মাহাতো শুরু করলেন।
‘তখন আমি ছোট। এখানে একটা লোক ছিল ছোটি মাহাতো। কংগ্রেস করত। আমাদের থেকে অনেক বড়লোক। আমি, দাদা, গ্রামের আরও কিছু ছেলে ওর পেছনে পেছনে ঘুরতাম। আমাদের আশপাশের কয়েকটা গ্রাম মিলে ওই ছিল কংগ্রেসের নেতা। ’৭৮-৭৯ সাল থেকে সিপিআইএম আস্তে আস্তে আমাদের গ্রামে ঢুকতে শুরু করে। তার দু’এক বছরের মধ্যেই ছোটি কংগ্রেস ছেড়ে সিপিআইএমে চলে গেল। ওই হয়ে গেল পুরো এরিয়ার সিপিআইএম নেতা। এতে আমরা বেশিরভাগ ছেলে ওর ওপর খেপে গেলাম। ওর দলেই ছিল সহদেব মাহাতো, ছোটির ডানহাত। আমার থেকে কয়েক বছরের বড়। দাদার বয়সী। সহদেব, আমি, আরও কয়েকজন ঠিক করলাম, ছোটি মাহাতোর এই বেইমানি মানা যাবে না। তখনই আমরা ঠিক করলাম ঝাড়খন্ড পার্টি করব। ছোটি সিপিআইএমে চলে যাওয়ার পর সহদেবদা বলল, আর কংগ্রেস করে লাভ নাই। ছোটিকে শায়েস্তা করতে হলে ঝাড়খন্ড পার্টিই করতে হবে।’
‘কেন কংগ্রেস করে লাভ নেই?’ থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম নকুল মাহাতোকে।
‘কারণ, কংগ্রসের তখন দিন দিন অবস্থা খারাপ হচ্ছে। যদ্দিন সরকার ছিল ঠিক ছিল। ভোটে হারার পর কংগ্রসের অনেক ছোটখাট নেতাই সিপিআইএমে চলে গেল। কিন্তু ঝাড়খন্ড পার্টি তখন শক্তিশালী হতে শুরু করেছে আমাদের এলাকায়। নরেন হাঁসদার পেছনে তখন অনেক লোক। আমরা বুঝে গেলাম, সিপিআইএমের সঙ্গে লড়তে পারলে একমাত্র ঝাড়খন্ড পার্টিই পারবে। গ্রামের সব লোক নিয়ে মিটিং হল, ছোটিকে শায়েস্তা করা হবে কিনা জানতে। সবাই হ্যাঁ বলল, গ্রামে ঝাড়খন্ড পার্টির পতাকা তোলা হল।’
আধ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে রামজীবন বলছিলেন এপার বাংলার পশ্চিম প্রান্তের প্রত্যন্ত গ্রামে হতদরিদ্র এক পরিবারের জীবনের একমাত্রিক কাহিনী। পিছিয়ে পড়া এলাকায় আর পাঁচ-দশটা প্রান্তিক পরিবারের জীবনযাত্রা বিশ শতকের সাতের দশকে যেমন ছিল আর কি। কিন্তু দশ মিনিট আগে হঠাৎ এন্ট্রি নিয়ে তাঁর ভাই দু’মিনিটে সেই কাহিনীতে একাধিক মাত্রা যোগ করলেন। শুনছি আর ভাবছি, কী কারণে যে কী হয়? ঠিক কোন রাগ, ক্ষোভ, ভালবাসা কিংবা কোন ব্যক্তিগত কারণে একটা মানুষ, একটা পরিবার কিংবা গোটা একটা গ্রাম সরকার বিরোধী হয়ে যায়, রাজনৈতিক অ্যাফিলিয়েশন চেঞ্জ করে নেয়, তার কি কোনও হদিশ রাখে শাসক দল? ঝাড়গ্রাম মহকুমার এক ছোট্ট নাম না জানা গ্রামে সাতের দশকে কোন একজন ছোটি মাহাতো কংগ্রেস করতেন। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস সরকার চলে গেল, দল বদল করে শাসক পার্টি সিপিআইএমে চলে গেলেন তিনি। আর পুরো গ্রামটাই এই ‘বেইমানি’র বদলা নিতে ঝাড়খন্ড পার্টিতে কনভার্ট করে গেল! ছোটি মাহাতোর শ্রেণি অবস্থান যে রাতারাতি সিপিআইএমে যোগ দিয়ে বিরাট পালটে গেল তা হয়তো নয়। কিন্তু গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব মানুষ বুঝে নিলেন, এই দল বদলের পেছনে নিশ্চিতভাবে রয়েছে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ফায়দা তোলার আকাঙ্খা। এই যে এক ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের সামান্য ভালো থাকার, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার স্পৃহা, আর দশটা মানুষকে কত দ্রুত গোঁড়া প্রতিষ্ঠান বিমুখ করে তুলতে পারে তার বুনিয়াদি উদাহরণ ওই গ্রামে সহদেব, নকুলদের ঝাড়খন্ডি পার্টি গড়ে তোলার ঘটনা। আর তার সঙ্গে গ্রামের অধিকাংশ কংগ্রেসি সমর্থক এবং কোনওদিন মিটিং-মিছিল না করা সাধারণ মানুষের দল বেঁধে সেই ঝাড়খন্ড পার্টিকে সমর্থন করা।
সাংবাদিকতার সূত্রে রাজ্যের নানান ব্লকের শয়ে শয়ে গ্রামে ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে বহু সময় দেখেছি, একটা মানুষের প্রত্যক্ষ রাজনীতি করা, শাসক দলের সঙ্গে থাকা কিংবা বিরোধী দল করার পেছনে অধিকাংশ সময়ই কোনও আদর্শগত কারণ থাকে, তা নয়। বরং বেশিরভাগ সময়ই কাজ করে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, এক্কেবারে এলাকাভিত্তিক সামান্য কিছু ইস্যু কিংবা কোনও ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিত্রিয়া। আর থাকে নিখাদ অর্থনৈতিক কারণ। নকুল মাহাতোর ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক এবং অর্থনৈতিক, দুটো কারণই ছিল একসঙ্গে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন আমাকে শিখিয়েছে, জমি নিজের হয়, গরু-ছাগলও নিজের হয়, এমনকী মোরগও, কিন্তু ভোট নিজের হয় না। একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়া কোনও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। তা পাল্টে যায় নানা কারণে। তার মধ্যে একটা বড় কারণ, নকুলের বলা একটি শব্দ, শায়েস্তা। কাকে শায়েস্তা করতে যে গ্রামের কত লোক নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, বা না করে এক মুহূর্তে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তাই বোধয় সংসদীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় রহস্য। হ্যাঁ, কিষেণজি মৃত্যু রহস্যের থেকেও তা জটিল, বহুমাত্রিক!
ডহরেশ্বর সেন একটা বৃহত্তর ছবির হদিশ দিয়েছিলেন। কীভাবে ছ’য়ের দশকে জমি আন্দোলনকে ঘিরে ঝাড়খন্ডিদের সঙ্গে সিপিআইএমের লড়াইয়ের সূত্রপাত। কিন্তু ক্লাস সেভেন অবধি পড়া এই নকুল মাহাতোর সঙ্গে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি কথা না বললে জানা তো দূরের কথা, ভাবতেও পারতাম না, আটের দশকে ঝাড়খন্ড পার্টি প্রসারের বহুমাত্রিক কারণ।
আপনি যে ঘটনাটা বলছেন, সেটা মোটামুটি কোন সময়ের? জিজ্ঞেস করলাম নকুল মাহাতোকে।
অনেকক্ষণ ভাবলেন নকুল। উত্তরটা দিলেন দাদা রামজীবন, ‘১৯৮১-৮২ হবে। ছোটি মাহাতো সিপিআইএমে যাওয়ার পর ওরই আগের সঙ্গী সহদেবরা অনেকে ঝাড়খন্ড পার্টি শুরু করল। তারপরই শুরু হল আমাদের এলাকায় গণ্ডগোল। মারপিট। তার আগে কিন্ত গ্রামে কোনও অশান্তি ছিল না। বরং ডাকাতি হোত এই গ্রামগুলোতে খুব। এলাকার সব লোক ডাকাতদের সঙ্গে লড়ত। আমরা তো গ্রামের সব কম বয়সী মিলে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ডাকাতি আটকাতে রাত পাহারা দিতাম। বড় বড় চিনির বস্তা দিয়ে ঢোলা জামা বানানো হোত। জামার ওপর ওই চিনির বস্তা দিয়ে বানানো ঢোলা জামা পরতাম, নীচে লুঙ্গি। মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে বেঁধে পাগড়ির মতো করতাম। ডাকাতরা তীর ছুঁড়লে যাতে শরীরে না ঢোকে তাই এই চটের চিনির বস্তা পরার ব্যবস্থা ছিল। ডাকাতরা বেশি দূর থেকে তীর ছুঁড়লে ঢোলা চটের বস্তায় লেগে শরীরে তত জখম হোত না। আমাদের সঙ্গেও থাকত তীর, ধনুক, বল্লম, লাঠি। তখন ডাকাতারা বন্দুক ব্যবহার করত না। তীর, ধনুক থাকত ওদের কাছে। ’৭৪-৭৫ সাল থেকে টানা প্রায় ৭-৮ বছর গ্রামে রাত পাহারা দিয়েছি পালা করে। অনেকবার লড়াই হয়েছে ডাকাত দলের সঙ্গে। কুকুরশোল বলে একটা গ্রাম ছিল। একবার সেখানে ডাকাত পড়ল। পুলিশে কাজ করত এক চৌকিদার, থাকত সেখানে। চৌকিদার, তার ছেলে আর গ্রামের লোক লড়াই করে অনেককটা ডাকাতকে ধরে ফেলে। সাত-আটটা ডাকাত মারা যায় ওই দিন। তারপর ডাকাতি প্রায় বন্ধই হয়ে গেল।’
‘কিন্তু, বলছিলেন যে, গ্রামে বেশিরভাগ লোকই গরিব ছিল। তবে ডাকাতি হত কেন? কী নিতে আসত ডাকাত?’
‘কী আর নেবে? কারও বাড়িতে হয়তো কিছু চাল ছিল, নিয়ে গেল। মুড়ি, গুড়, কাপড়, তেল সব নিয়ে যেত। লন্ঠন, কুপিও ব্যাগে ভরে নিয়ে গেছে। ডাকাতও তো গরিব। এক্কেবারে খেতে পেত না এমন কিছু লোক ডাকাতি করত। কিন্তু কুকুরশোলের ঘটনার পর তা অনেকটাই বন্ধ হল।’
সিপিআইএমের সঙ্গে মারপিটও কি তীর, ধনুক নিয়েই শুরু হল? জিজ্ঞেস করলাম নকুল মাহাতোকে।
‘আমরা আদিবাসীরা সব সময়ই তীর, ধনুক ব্যবহার করতাম। আমরা ঝাড়খন্ড পার্টি শুরু করার পর গ্রামে প্রায় সব আদিবাসী বাড়ি ঝাড়খন্ডি হয়ে গেল। সিপিআইএমের বেশি লোক ছিল না। কিন্তু ভোটের দিন ওরা খুব ঝামেলা করত। আমি অনেকবার ভোট দিতে পারিনি। আমার ভোট পড়ে যেত। দাদাও সিপিআইএমকে সমর্থন করত না। কিন্তু দাদার ভোট পড়ত না। আমার, সহদেব আর কিছু যারা ঝাড়খন্ড পার্টির লিডার ছিল তাদের পুলিশ ভোটের আগে তাড়া দিত। আমাদের নামে পুলিশে অভিযোগ করত সিপিআইএম। ভোটের আগে পুলিশের ভয়ে পালিয়েছি অনেকবার। সিপিআইএম জানত, ঝাড়খন্ডি লিডাররা ভোটের দিন এলাকাছাড়া হলে ওদের মাতব্বরির বিরোধিতা করার কেউ থাকবে না। গ্রামের লোক ভয়ে মুখ খুলবে না।’
পাশে বসে ঘাড় নাড়ছিলেন রামজীবন। আর আমি ভাবছিলাম, এই কথাই তো শুনেছি নয়ের দশকের মাঝামাঝি মেদিনীপুরে কাজ করা প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের মুখে। ‘সিপিআইএম বেছে বেছে ঝাড়খন্ডি লিডারদের বিরুদ্ধে থানায় কেস করত। তারপর তাদের ধরতে গ্রামে ঢুকত পুলিশ। দিনের পর দিন এই জিনিস চলার পর ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রামেই পুলিশের ঢোকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদিবাসীরা।’ একই কথা বলেছিলেন তুষার তালুকদারও। ঝাড়গ্রামের প্রথম এসডিপিও পরে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে থাকার সময় আটের দশকে গিয়েছিলেন ঝাড়গ্রাম। আমাকে বলেছিলেন, গ্রামের গরিব আদিবাসীরা কেন পুলিশকে এত ভয় পায়, তা তাঁকে অবাক করেছিল। তা তিনি ১৯৬৫ সালে এসডিপিও থাকার সময় দেখেননি। সেই ভয়ের কারণ অনেকটাই বুঝতে পারছিলাম নকুল মাহাতোর সঙ্গে কথা বলে।
কিন্তু মানুষ তো সারা জীবন ভয় পাবে না। একদিন সে রুখে দাঁড়াবেই। তিন বছরে, পাঁচ বছরে একটা ভোট দিতে না পারা তো মামুলি ব্যাপার নয়। জীবন-জীবিকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদাবোধ। আর নিজের ভোট নিজে দেব, এটা তো একটা আত্মমর্যাদাবোধ বটেই।
জমিকে কেন্দ্র করে ছয়ের দশকের শেষে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, সে লড়াইটারই ইস্যু পালটে গেল আটের দশকের শুরু থেকে। প্রতিপক্ষের ভূমিকায় চলে এল ঝাড়খন্ড পার্টি এবং সিপিআইএম। এবার লড়াইটা শুরু হল রাজনৈতিক জমি দখলের। অভিন্ন দুই শ্রেণির মানুষ অস্ত্র হাতে নিল শুধু রাজনৈতিক জমি দখলের জন্য। তীর, ধনুক তো ছিলই, আদিবাসী মানুষের হাতে পৌঁছল বন্দুকও। চূড়ান্ত রাজনৈতিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে কোনও এলাকা বিরোধীশুন্য করে দেওয়ার যে মডেল সিপিআইএম একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল রাজ্যে বাম শাসনের ১০-১২ বছর পর থেকে, তার প্রথম ল্যাবরেটরি হয়ে উঠল রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের ঝাড়গ্রাম মহকুমা। যে মহকুমার লাগোয়া সেই সময় বিহার এবং পরবর্তীকালে ঝাড়খন্ড রাজ্য।
অনেক বছর বাদে ২০০৬ সালের পর যখন বারবার ঝাড়গ্রামে গিয়েছি মাওয়িস্ট আন্দোলনের সময়, দেখেছি এমন হতদরিদ্র মানুষকে মাওবাদীরা খুন করেছে স্রেফ সিপিআইএম করার অপরাধে, যাদের পরিবারের দিকে তাকানো যেত না। ভেবেছি, এই দিন আনি-দিন খাই গরিবকে খুন করে, কোন শ্রেণি সংগ্রাম সংগঠিত হচ্ছে? আমার এই ভাবনার পালটা জবাব দিয়েছেন জঙ্গলমহলের সিপিআইএম বিরোধী মানুষ। বলেছেন, ‘শ্রেণি আন্দোলনের কোন কর্মসূচি কার্যকর করতে এলাকা দখলের জন্য জন্য অস্ত্র হাতে নেমেছিল বাসুদেব ভকতের বাহিনী? জামবনি, বিনপুরকে কেন্দ্র করে অবিভক্ত মেদিনীপুরের নানা জায়গায় কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার? কেন ভোটের ঠিক আগে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যেত সমস্ত বিরোধী কার্যকলাপের ওপর?’
কিন্তু কে এই বাসুদেব ভকত? কেন তাঁর ওপর এত রাগ জামবনি, বেলপাহাড়ি, বিনপুরের এত মানুষের? জঙ্গলমহলের একটা রহস্যের ওপর আলো পড়েছে কি পড়েনি, নতুন প্রশ্ন এসে হাজির হচ্ছে সমানে। কিন্তু কিছু করার নেই, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাস  থেকে ২০১১ পর্যন্ত লালগড় আন্দোলন, কিষেণজি যার নাম দিয়েছিলেন দ্বিতীয় নকশালবাড়ি, তার প্রেক্ষাপট এবং তাঁর মৃত্যু রহস্যের নাগাল পেতে এই সবকটা প্রশ্নই প্রাসঙ্গিক।
রামজীবন মুর্মু এবং তাঁর ভাই নকুল মাহাতোর সঙ্গে কথা হচ্ছিল তাঁদের পরিবার, স্ট্রাগল এবং সব মিলে তাঁদের বেঁচে থাকা নিয়ে। রাজনীতি নিয়ে কথা উঠতেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট হওয়ার আগে চলে এল সিপিআইএম, নির্বাচন এবং বাসুদেব ভকতের কথা। আর এই বিষয়গুলোকে এড়িয়ে গিয়ে রামজীবন মুর্মু কিংবা নকুল মাহাতোর সাক্ষ্য নেওয়ার মানেও হয় না। তাই এবার আলোচনা সিপিআইএম নিয়ে।

১৯৬৯ নভেম্বর, গোপীবল্লভপুর এবং সন্তোষ রাণা

সিপিআইএম এবং বাসুদেব ভকতের কথায় আসব, কিন্তু তার আগে অল্প সময়ের জন্য হলেও একবার ঘুরে আসা দরকার গোপীবল্লভপুর থেকে। গোপীবল্লভপুর এমনিতেও ঝাড়গ্রাম মহকুমায়। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে বেশি দূরও না। তাই সময়ও লাগবে না বিশেষ। তাছাড়া, জামবনির বুড়িশোল জঙ্গলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মাওয়িস্টের পলিটব্যুরো সদস্য কিষেণজির মৃত্যু রহস্যের শুনানি হবে, অথচ সেখানে গোপীবল্লভপুর প্রসঙ্গ আসবে না, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সন্তোষ রাণা হাজির হবেন না, তা কি সম্ভব? আর সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সিপিআইএম নেতা ডহরেশ্বর সেনও তো বলে গিয়েছেন সন্তোষ রাণার নাম।
১৯৭৭ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বাংলাজুড়ে সিপিইএমের জয় জয়কার। কংগ্রেস ধুয়েমুছে সাফ। সিপিআইএমের এই মারকাটারি নির্বাচনী সাফল্যের সময় ঝাড়গ্রাম মহকুমার গোপীবল্লভপুর আসনে জিতল সিপিআইএমএল। বিধায়ক হলেন সন্তোষ রাণা। সন্তোষ রাণার সঙ্গে আমি কথা বললাম ২০১৭ সালে, তাঁর পূর্ব কলকাতার বাড়িতে। এই মামলার পরবর্তী সাক্ষী ছ’য়ের দশকের শেষে নকশাল আন্দোলনের নেতা, ১৯৭৭ সালে গোপীবল্লভপুরের বিধায়ক সন্তোষ রাণা। তাঁর বাড়ি গোপীবল্লভপুরেই।
সন্তোষ রাণাকে আমার প্রথম প্রশ্ন, ‘এই যে ঝাড়গ্রাম মহকুমায় একুশ শতকের শুরুতে টানা কয়েকটা বছর তীব্র মাওবাদী আন্দোলন চলল, এর সঙ্গে ছ’য়ের দশকের শেষের ডেবরা কিংবা গোপীবল্লভপুরে জমি আন্দোলনের যোগ কতটা? অবিভক্ত মেদিনীপুরের ডেবরা, গোপীবল্লভপুরে নকশাল আন্দোলন হয়েছিল বলেই কি ৩৫-৩৮ বছর পরও তার পরম্পরা বহন করেছে বিনপুর, বেলপাহাড়ি, জামবনি কিংবা লালগড়?’
‘দেখুন ১৯৬৯ সালে গোপীবল্লভপুরে যে জমির আন্দোলন হয়েছিল তার পেছনে ছিল নকশালবাড়ির প্রত্যক্ষ প্রভাব এবং অনুপ্রেরণা। ’৬৯ এর নভেম্বরে গরিব মানুষ, মূলত তফশিলি জাতিভুক্ত এবং আদিবাসী মানুষ উৎসবের মেজাজে জোতদার, জমিদারদের বেনামি জমি দখল করতে নেমেছিল। জোতদারের মাঠের ধান কেটে নিয়েছিল। কিন্তু সেই ঐতিহ্য কিংবা পরম্পরা বহন করেই মাওবাদীরা ২০০৬-০৭ সাল থেকে ঝাড়গ্রাম মহকুমাজুড়ে আন্দোলন চালিয়েছে, সেটা এক কথায় বলা ঠিক হবে না। ছ’য়ের দশকের শেষে প্রকৃত অর্থেই শ্রেণি সংগ্রাম হয়েছিল গোপীবল্লভপুরে। অথচ ২০০৬-০৭ এর পরে হাতে বন্দুক নিয়ে মাওবাদীরা সেই শ্রেণি সংগ্রামটাই ভুলে গেল। যেই বিরোধী দল করবে তাকেই নির্মমভাবে হত্যা করতে হবে, এটা কোনও ক্লাস স্ট্রাগল হতে পারে না।’ থামলেন সন্তোষ রাণা।
আবার শুরু করলেন, ‘দেখুন, ২০০৬-০৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ঝাড়গ্রাম মহকুমায় তীব্র মাওবাদী আন্দোলন, লালগড়ের একটা অংশকে মুক্তাঞ্চল করে তোলা, কিংবা সব শেষে ২০১১ সালের নভেম্বরে কিষেণজির মৃত্যু, এই সব কিছুর প্রেক্ষাপট এক কথায় বলা যাবে না। এর একটা ইতিহাস আছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণ আছে।
সেটা ছ’য়ের দশকের একদম শুরুর দিক। আমি ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে ভর্তি হলাম। সেই সময় আমাদের গোপীবল্লভপুর তো বটেই, পুরো ঝাড়গ্রাম মহকুমাতেই মারাত্মক দারিদ্র ছিল। অধিকাংশ পরিবারে দু’বেলা খাবার ছিল না। সে দারিদ্র আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কল্পনাও করা যায় না। আর তার সঙ্গে ছিল নির্মম শোষন। তফশিলি জাতি,  আদিবাসী এবং গরিব মানুষের ওপর অসহনীয় অত্যাচার ছিল জোতদার, জমিদারদের। আমরা ছিলাম মধ্য-চাষি পরিবার। কিছু জমি-জায়গা ছিল। বাবা, জ্যাঠারা একসঙ্গে থাকত। নিজেরা চাষ-আবাদ করত। আমাদের বাড়ির কেউ বড়লোকের জমিতে মজুর খাটতে যেত না। বরং চাষের সময় দু’চারজন মজুর খাটাতো আমাদের জমিতে। আমাদের মতো বেশ কিছু মধ্যবিত্ত শ্রেণিভূক্ত পরিবার ছিল গোপীবল্লভপুরে। এই মধ্য-চাষি, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ছিল মূলত সদগোপ, তেলি।
কিন্তু সেই সময় গোপীবল্লভপুরে বেশিরভাগ মানুষ ছিল তফশিলি জাতিভুক্ত এবং আদিবাসী। সেই সংখ্যাটাই মোট জনসংখ্যার ৫৫-৫৮ শতাংশ। তফশিলি জাতিভূক্তরা ছিল মূলত বাগদি, মাল, ডোম, কেওট। এদের প্রায় কারওরই কোনও জমি-জায়গা ছিল না। এরা ছিল মূলত ভূমিহীন। এরা বংশ পরম্পরায় জোতদারের ঘরে বছর বাঁধা মজুর খাটত। অনেকটা ক্রীতদাস প্রথার মতো ছিল ব্যাপারটা। এদের বাড়ির পুরুষ, মহিলা, বাচ্চা সবাই জোতদারের ঘরে কাজ করত প্রায় বিনা মজুরিতে। সামান্য খাবারটুকু পেত। এদের ওপর অত্যাচার হোত সবচেয়ে বেশি। আর আদিবাসীরা ছিল মূলত সাঁওতাল, মুন্ডা, মাহালি। জঙ্গলে থাকত। এদের হাতে বরং অল্প কিছু জমি ছিল। কিন্তু সেই জমি ছিল প্রধাণত জঙ্গলে। খুব একটা চাষযোগ্য ছিল না সেই জমি। তাতেই চাষ করতে গিয়ে মহাজনী দেনার দায়ে এই আদিবাসী পরিবারগুলো আটকা থাকত সারা বছর। বেশিরভাগের তো সারা জীবনেও জোতদারের ঋণ শোধ হোত না। গরিব মানুষ একবার ঋণের ফাঁদে আটকা পড়লে আর বেরতে পারে না।
এই মধ্য-চাষি এবং গরিব তফশিলী জাতি, আদিবাসীর বাইরে ছিল বড় জোতদার, জমিদাররা। বিপুল জমির মালিক এই জোতদার পরিবারগুলোই ছিল সেই ছ’য়ের দশকে গ্রামে গ্রামে শোষনের ভরকেন্দ্র। এই জোতদার, জমিদাররা ছিল মূলত কর, হোতা, মিশ্র। বেশিরভাগই ওড়িয়া ব্রাহ্মণ। আমাদের গোপীবল্লভপুরে সবচেয়ে বড় জোতদার পরিবার ছিল মোহন্ত গোস্বামীরা। প্রায় সাত হাজার বিঘা জমির মালিক ছিল মোহন্ত গোস্বামীরা। গোপীবল্লভপুরের আর এক বড় জোতদার ছিল সাঁকরাইলের রোহিনীর শৈলবালা মহাপাত্ররা। মহাপাত্রদের ছিল প্রায় আড়াই হাজার বিঘা জমি। তাঁর ছেলে হরিশ মহাপাত্র ছিলেন নির্মম অত্যাচারী। ১৯৭২ সালে তিনি গোপীবল্লভপুরের কংগ্রেসের বিধায়ক হয়েছিলেন। আমার এক বন্ধু জিতেন ছোটবেলায় হরিশ মহাপাত্রদের পুকুরে স্নান করতে গেছিল। স্নান করে উঠে পুকুরের ধারের টগর গাছ থেকে দুটো ফুল ছিঁড়েছিল। তার জন্য মহাপাত্ররা জিতেনকে সারা দিন মোষ বাঁধার গোয়ালে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। তখন জিতেনের ১২-১৩ বছর বয়েস। এমন হাজারো অত্যাচারের কাহিনী ছড়িয়ে আছে গোপীবল্লভপুরজুড়ে।
এই জোতদার পরিবারগুলোর জমি চাষের ব্যবস্থাও ছিল শোষনের এক নির্মম উদাহারণ। মোহন্ত গোস্বামীদের প্রায় ৫০০ বিঘা ভালো জমি ছিল। এই জমি ছিল একদম শহরে। সেই সময় যে জমিতে আষাঢ় মাসে জল দাঁড়িয়ে যেত তাকেই বলা হোত ভালো জমি। তখন তো সেচের ব্যবস্থা ছিল না বিশেষ। বর্ষার শুরুতেই যে জমি চাষের জন্য তৈরি করা যেত, সেটাই ভালো জমি। এই জমিতে মোহন্ত গোস্বামীরা নিজ-চাষ করত। নিজ-চাষ মানে নিজের জন্য চাষ। কিন্তু জোতদারদের এই নিজ-চাষ ব্যপারটাও ছিল এক অদ্ভুত শোষন। জোতদারদের বাড়িতে লাঙল, হাল ছিল না কিছু। গোস্বামীদেরও বাড়িতে হাল, লাঙল ছিল না। আষাঢ় মাসে এই ভালো জমিতে জল দাঁড়ালেই গোস্বামীদের বাড়ি থেকে দূর-দূর গ্রামের লোকদের ডাকা হোত। মানে, এই ভাল জমিতে চাষের জন্য লোক ডাকা হোত। বিভিন্ন গ্রামের গরিব লোক, তফশিলি, আদিবাসী মানুষ নিজেদের হাল, লাঙল নিয়ে চলে আসত গোস্বামীদের বাড়িতে। তারপর তারাই নিজেদের হাল, লাঙল দিয়ে সেই ভালো জমি কুপিয়ে চাষযোগ্য করে দিত। জমি তৈরি করার পর সেখানে চাষ করত। সেই ভালো জমির ফসল পুরোটাই চলে যেত মোহন্ত গোস্বামীদের ঘরে। যারা দূরের গ্রাম থেকে এসে ভালো জমিতে চাষ করে যেত তারা এই ফসলের এক কণাও পেত না। শুধু তাই নয়, এর জন্য মজুরিও পেত না এক টাকা। এমনই ছিল তখন সিস্টেম। এর বাইরে গোস্বামীদের যে জমি ছিল, সেখানে চাষ শুরু হত কিছুদিন পরে। সেই বাদবাকি জমিতেও চাষের জন্য লোক ভাড়া করত গোস্বামীরা। সেই জমির ফসলের অর্ধেক চলে যেত জমিদার বাড়িতে। বাকি অর্ধেক পেত কৃষক। এমনই ছিল সেই সময়, মানে ছ’য়ের দশকে জঙ্গলমহলের চাষের ব্যবস্থা।’ টানা বলে থামলেন সন্তোষ রাণা।
‘তো যে লোকগুলো মোহন্ত গোস্বামী কিংবা অন্য জোতদারদের এই ভালো জমিতে চাষ করে দিয়ে যেত তারা মজুরিও পেত না? তবে এই কাজ করত কেন তারা?’ বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না সন্তোষ রাণার কথা।

কী হয়েছে আগের পর্বে? পড়ুন: কিষেণজি মৃত্যু রহস্য #আট

‘দেখুন জোতদারদের ভালো জমিতে, মানে নিজ-চাষ জমিতে চাষ করার জন্য কারও না বলার উপায় ছিল না। এই জমিতে চাষ করার বদলে গরিব, তফশিলি জাতি কিংবা আদিবাসী মানুষগুলো গোস্বামীদের মন্দিরের প্রসাদ পেত রোজ। কোনও দিন হয়তো সামান্য কিছু খাবারও পেত জমিদার বাড়ি থেকে। এই যে নিজ-চাষ জমিতে তারা বিনা মজুরি, বিনা ফসলে কাজ করে দিত তার বদলে জোতদারদের অন্য জমিতে চাষের সুযোগ পেত তারা। সেই চাষের জন্য যে ফসল জুটত তাতেই বছরে ছ’মাস একবেলা করে খেতে পেত কোনওভাবে। সেই সময় গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে এই চরম সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা মেনে নেওয়া ছাড়া গরিব মানুষগুলোর আর কিছু উপায়ও ছিল না। তাছাড়া অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি আরও একটা সামাজিক বিষয়ও ছিল সেই সময়। সেটা হচ্ছে সামাজিক বৈষম্যের এক চূড়ান্ত রূপ। বলা যেতে পারে জাতি বৈষম্য। গোপীবল্লভপুর সদরে মোহন্ত গোস্বামীদের মন্দির ছিল। সেই সময় তফশিলি জাতি, আদিবাসী এবং নিম্নবর্গের মানুষের কাছে ব্রাহ্মণের সেবা করা ছিল একটা বড় ব্যাপার। এই যে মজুরি ছাড়া, ফসল ছাড়া তারা গোস্বামীদের জমিতে নিজ-চাষ করে দিত, এটা ছিল তাদের কাছে ব্রাহ্মণের সেবা। এই সেবার বদলে তারা গোস্বামীদের মন্দিরের যে প্রসাদ পেত সেটাই ছিল সেই সময় তাদের কাছে বিরাট ব্যাপার। এমনই ছিল তখন সামাজিক অবস্থা।
এই যে তীব্র শোষন, গরিব নিম্নবর্গের মানুষের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন, একে এক কথায় শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দূরাবস্থা কিংবা দারিদ্র বলা যাবে না। আমি একে বলি কাস্ট ফিউডালইজম। জাতিভিত্তিক সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা। আর এই জাতিভিত্তিক সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাটা যখন একটা চরম চেহারা নিচ্ছে, তখনই ঘটে গেল নকশালবাড়ি। ১৯৬৭, আমি তখন কলকাতায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ছি। এই নকশালবাড়ির প্রভাবেই বলা যায় পিএইচডি শেষ না করেই ’৬৭র শেষে গ্রামে ফিরে গেলাম। গোপীবল্লভপুরে। নকশালবাড়ির প্রভাব তখনও তেমন পড়েনি ঠিকই, তবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই যে জোতদার, জমিদারদের বঞ্চনা, শোষনের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি নামক এক জায়গায় গরিব মানুষ জাগছে, জমি দখল করছে, মাঠের ধান কেটে নিচ্ছে, সেই কথাবার্তা তখন গোপনে শুরু হয়ে গেছে গোপীবল্লভপুরের তফশিলি জাতি এবং আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পর পরই এই গ্রামগুলোতে আমরা যেতে শুরু করলাম। প্রথমেই যেতে শুরু করলাম তফশিলি জাতি এবং আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। সেখানকার মানুষেরই অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ। গ্রামগুলোতে যাওয়া শুরু করা মাত্রই বুঝতে পারলাম, মানুষ প্রস্তুত হয়েই আছে। দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা, শোষন আর চরম দারিদ্র মানুষগুলোকে এমন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিল, কিছু করার জন্য তারা যেন রেডি হয়েই ছিল। জোতদারের এই বিঘার পর বিঘা জমি কেড়ে নিতে হবে, সেখানে নিজেদের চাষ করতে হবে। সরকারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে, কারণ জোতদারের পাশে দাঁড়াবে পুলিশ-প্রশাসন। এই ছিল আমাদের সহজ-সরল রাজনীতি। সবার প্রথম রেসপন্ড করল মাল গ্রামগুলো। তারপর আস্তে আস্তে মুন্ডা, বাগদি, কেওট, সাঁওতাল সমস্ত গ্রামের মানুষ জাগতে শুরু করল। দেড়-দু’বছরের মধ্যে গোপীবল্লভপুর জুড়ে আন্দোলনের ঢেউ উঠে গেল।
১৯৬৯ এর নভেম্বর। গোপীবল্লভপুরের মাঠে-মাঠে ধান পেকে রয়েছে। চাষিরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করল, ‘আমাদের মেহনতে ধান হয়েছে। আমরাই তা কেটে নেব।’ মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিছু মানুষও এসে দাঁড়াল এই গরিব, হতদরিদ্র মাল, মুন্ডা, বাগদি, সাঁওতাল চাষির পাশে। একসঙ্গে ৩০-৩৫ হাজার মানুষ সেই নভেম্বরে একজোট হয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। উৎসবের পরিবেশ তখন গোপীবল্লভপুরজুড়ে। ধামসা-মাদল বাজিয়ে হাজার হাজার পুরুষ-মহিলা নিজেদের পরিশ্রমের চাষ করা ধান কাটতে শুরু করল জোতদারদের জমি থেকে। প্রথমেই কাটা হল মোহন্ত গোস্বামীদের জমির ফসল। গোপীবল্লভপুরের সবচেয়ে বড় জোতদার গোস্বামীদের জমিতে হাত পড়তেই, গ্রামে গ্রামে পরিবেশ পালটে গেল।’

চলবে

(৩ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে কিষেণজি মৃত্যু রহস্য। প্রতি মঙ্গলবার এবং শুক্রবার প্রকাশিত হচ্ছে এই দীর্ঘ ধারাবাহিক। প্রতি পর্বে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে। সেখানে ক্লিক করলে আগের পর্ব পড়তে পারবেন।)

 

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us

You may also like

Kishenji Mrittyu Rahasya Part 11
Kishenji Mrittyu Rahasya Part 11