‘মৃতের পরিবারকে দুঃসংবাদ জানানোর দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর!’ করোনায় বিধ্বস্ত ইংল্যান্ডে এক বাঙালি চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা

ঈশ্বর যদি চিত্রকর হতেন, তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসের সব রং এভাবে এলোমেলো করে দিতে শুধু তিনিই পারতেন | সেই তুলির নাম করোনা, চিনের উহান শহরের দানে আজ করোনাচ্ছন্ন পৃথিবী | করোনাগ্রস্ত জীবন-জগত-মনন |
করোনা এল, দেখল এবং জয় করল। না তাকে রুখতে পারলো ভৌগোলিক সীমানা, না ধনী দেশের অমিত শক্তি ও সম্পদ, না পারল বিজ্ঞান | জাতি-ধর্ম-বর্ণের বাছবিচার না করে সে অবলীলায় দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে। এর ফলে কোটি কোটি মানুষ গৃহবন্দি, আরও কয়েক কোটি কর্মহারা। লক্ষ-লক্ষ অমূল্য জীবন অকালে ঝরে গেল। ছোট-বড় সব দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। যত মানুষ করোনায় প্রাণ দিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি চলে গেলেন অনাহারে, সুচিকিৎসার অভাবে, লকডাউনের তাণ্ডবে বাড়ি ফেরার অমানুষিক পরিশ্রমে!
এই বিশ্বব্যাপী দুঃখ-বিপর্যয়ের মধ্যে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের হদিস কে রাখে? যদিও আজ সে কথাই বলতে কলম ধরেছি। পেশায় শল্যচিকিৎসক হওয়ার সুবাদে করোনা-চক্রব্যূহে নিয়মিত ঢুকতে হয়েছে আমায়। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে যখন ইংল্যান্ডে দু’চারটে সংক্রমণ পাওয়া গেছে তখনও আমরা অতিরিক্ত সতর্কতা ছাড়াই অনেক রোগীকে পরীক্ষা করেছি, সার্জারিও করেছি। তারপরই মহাপ্লাবনের মতো করোনা এখানেও ধেয়ে এল, বিধিনিষেধ বাড়লো, লকডাউন শুরু হল।
করোনার বিরুদ্ধে এই লড়াই অভিনব এবং অভূতপূর্ব। আমরা জানতাম এটা ম্যারাথন, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ জানা নেই। প্রতিপক্ষ দুর্ধর্ষ, আপাত অদৃশ্য, অথচ বহুরূপীর মত চেহারা পাল্টে ফেলছে। তাকে নির্মূল করার কোনও মোক্ষম দাওয়াই নেই। নিজের খেয়ালখুশিতে চলে, সংক্রমণে কারও হয়তো কোনো উপসর্গই নেই, অন্যদিকে একই রোগে সুস্থ সবল মানুষ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এই কালান্তক শত্রুর বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা লড়াই শুরু করলাম। সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ, জরুরি চিকিৎসা অব্যাহত রাখা, সংক্রমণ থেকে সবাইকে নিরাপদ রাখা, আক্রান্তদের সুচিকিৎসা। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এই সংশয়-ত্রাস-অনিশ্চয়তা মেশানো সময়ে মনোবল অটুট রেখে লক্ষ্যে অবিচল থাকা।
অনেক সময়ে বড় অসহায় লাগে। জানি শত চেষ্টা করেও কোনও রোগীকে হয়ত বাঁচাতে পারবো না। হয়তো উপযুক্ত মাস্ক ও পোশাকের অভাবে রোগীকে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করতেও পারব না। কী দুঃসহ এই দ্বন্দ্ব! চিকিৎসক হিসেবে রোগীর সেবায় আমি অঙ্গীকারবদ্ধ, অথচ উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে আমি শুধু নিজেকে নয়, অন্য করোনামুক্ত রোগী, সহকর্মী, এমনকী নিজের পরিবারকেও সংক্রামিত করতে পারি। এই নৈতিক উভয়সংকটে পরিষেবা ও সুরক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখতে আমরা অবিরত কাজ করে চলেছি।
ছোট-বড় কত সুখ-দুঃখের ঢেউ এসে মনে লাগে। কখনও কোনও সহকর্মীর অকালমৃত্যু, বা সম্পূর্ণ অচেনা কারও মর্মান্তিক মৃত্যুও হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কখনও শুনি প্রিয় বন্ধু রোগে শয্যাশায়ী, মন উতলা হয়। আবার সে সুস্থ হলে যেন হারানো মনোবল ফিরে পাই, নতুন উদ্যমে আবার কাজ শুরু করি। কিন্তু বুঝতে পারি, এই শোভাযাত্রা বিরামহীন। হাসপাতালে গিয়ে দেখি দুদিন আগেও যে রোগী সুস্থ ছিল, সেও আজ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। আমার উপর দায়িত্ব বর্তায় এই দুঃসংবাদ তার পরিবারকে জানানোর, যারা তাকে শেষ দেখা তো দূরের কথা, শেষ বিদায় জানাতে পারেনি! শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাই টেলিফোনের কাছে। শোকস্তব্ধ পরিবারকে কী বলে সান্তনা দেব? নিজেই বুকের মধ্যে হাতড়ে বেড়াই। সংবাদটা জানানোর পরে টেলিফোনের উল্টোদিক থেকে আমাকে সম্ভাষণ জানায় শুধু এক ব্যঞ্জনাময় নৈঃশব্দ্য, যা আমাকে আজও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে।
সবচেয়ে বড় আলোড়ন কিন্তু ঘটে চলেছে মনোজগতে। আশা,আবেগ, সংশয়, স্বপ্ন, শঙ্কা, ভালোবাসা সব যেন মূর্তিমান হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মনের মধ্যে-ডাক পড়লেই বেরিয়ে আসবে। হঠাৎ করে যেন এক নতুন দৃষ্টিকোণ খুলে গেছে। আমার চারপাশের জগতটাকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করছি। অনন্ত ছুটোছুটির পথের ধারে একটু থমকে দাঁড়িয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছি যেন। যা বহিরঙ্গের, অপ্রয়োজনীয় তাকে কত সহজে বর্জন করতে পারছি। আর যা অমূল্য, হৃদয় মনের আঁধার মানিক, যাকে সহজলভ্য বলে অবহেলা করে এসেছি, সেই যেন সবচেয়ে বড় সম্পদ এই সার সত্য বুঝতে পারছি। যে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি আমরা প্রতিদিন করে চলেছি, লকডাউনের কল্যাণে সেও যেন আজ প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে, এই কয়েক মাসেই খানিকটা হৃতস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে নবরূপে আমাদের চোখে ধরা দিচ্ছে।
আজকাল চোখ খুললে আরও যেটা দেখতে পাই, তা হল পাশাপাশি দুটি সমান্তরাল বিশ্ব। এদেশে যেমন একদিকে দেখি লকডাউন নিয়মের উপেক্ষা, পথচারীর দিকে থুতু ছেটান। আবার অন্যদিকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবকের করোনা যুদ্ধে অক্লান্ত পরিশ্রম, অশীতিপর ক্যাপ্টেন টম মুরের বাগানে হেঁটে NHS এর ত্রাণ তহবিল-এর জন্য আবেদনে বিপুল সাড়া। স্বদেশেও একই চিত্র, এক দিকে অখণ্ড অবসর, লকডাউন পরাধীনতার ক্ষোভ, কিন্তু অন্য বিশ্বে রয়েছে ক্ষুধা, অনাহার, পুলিশের লাঠি, লাঞ্ছনা আর মৃত্যু! কী Surreal অথচ কী ভয়ঙ্কর রকমের বাস্তব!
তাহলে এই দুই পৃথিবী কি করোনার সৃষ্টি? একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারি আগেও এই দুই পৃথিবী ছিল, করোনা শুধু তফাতটাকে আরও প্রকট করে দিয়েছে। আগেও একদিকে যেমন দেখেছি বঞ্চনা, শোষণ আর দারিদ্র্যের রাজত্ব, অন্যদিকে দেখেছি হিংসা আর ক্ষমতালিপ্সার অশ্লীল সাম্রাজ্য! আজ আমরা যুগের সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়েছি। করোনার মাধ্যমে প্রকৃতি আমাদের চরমপত্র পাঠিয়েছে, অনেক হয়েছে , এবার নিজেদের শুধরে নাও, নইলে বিনাশ অনিবার্য!
আগামী দিনে আমরা কোন পথ বেছে নেব? আমরা কি আবার ফিরে চাই সেই পঙ্কিল অন্ধকূপে, সেখানে নানাবিধ বিষে জর্জরিত মানবিকতার শবদেহ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে? নাকি সেই নতুন পথে পা বাড়াব যার শেষে আছে এক বৈষম্যহীন সমাজ, যেখানে মানুষের চিন্তা, কর্ম এবং দয়াশীলতাই সম্মান পাবে, বৈভব,ক্ষমতা বা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নয়। আমরা কোন পথ বাছব তার ওপরই নির্ভর করবে সমগ্র মানবজাতি, এই পৃথিবী এবং সকল প্রাণীর ভবিষ্যৎ। করোনা যে সুযোগ দিয়েছে তা হয়তো হাজার বছরে একবার আসে।
আসুন সবাই এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শপথ নিই, সমাজে ঘৃণা ও বৈষম্য দূর করব, সাহায্যের হাত বাড়াব, পরিবেশকে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করব,আরও বেশি ভালোবাসবো, আরও দয়াবান ও ক্ষমাশীল হব।
সত্যি তো এই পৃথিবীর বুকেই স্বর্গ গড়তে পারি আমরা। অন্তত আমাদের জীবদ্দশায় না হলেও তার উপযোগী বাতাবরণ আর উপকরণ তো দিয়ে যেতে পারি নবীন প্রজন্মের হাতে, তারাই মানবিকতার প্রজ্জ্বলন্ত শিখা পৌঁছে দেবে যুগ হতে যুগান্তরে!

Comments are closed.