নিজস্ব সংবাদদাতা: বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রিক গাড়ির (EV) জনপ্রিয়তা বাড়লেও গতিপ্রেমী বা ‘কার এনথুসিয়াস্ট’-দের মনে একটা খটকা সব সময়ই থেকে গিয়েছে। পেট্রোল বা ডিজেল গাড়ির মতো ইঞ্জিনের সেই পরিচিত গর্জন, গিয়ার বদলানোর মৃদু ধাক্কা বা এক্সিলারেটরে চাপ দিলে গাড়ির কেঁপে ওঠার মতো মেকানিক্যাল অনুভূতি ইভিতে পাওয়া যায় না। শান্ত ও মসৃণ চলাই যেখানে ইলেকট্রিক গাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য, সেখানেই এবার এক বড়সড় বদল আনতে চলেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলি। হুন্ডাই এবং টয়োটার মতো জায়ান্টরা ইভিতে কৃত্রিম উপায়ে ইঞ্জিনের শব্দ, গিয়ার শিফট এবং ভাইব্রেশন তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হচ্ছে।
চলতি বছরে অটোমোবাইল দুনিয়ায় অন্যতম চর্চিত বিষয় হয়ে উঠেছে হুন্ডাই-এর ‘N e-Shift’ এবং ‘Active Sound+’ প্রযুক্তি। সংস্থাটি তাদের হাই-পারফরম্যান্স ইভি মডেল ‘Ioniq 5 N’ এবং ‘Ioniq 6 N’-এ সফলভাবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে। এর মাধ্যমে গাড়িটি আসলে একটি সিঙ্গেল-স্পিড ইলেকট্রিক কার হলেও চালক যখন স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে থাকা প্যাডেল শিফটার ব্যবহার করবেন, তখন গাড়িটি অবিকল একটি ৮-স্পিড ডুয়াল-ক্লচ পেট্রোল গাড়ির মতো প্রতিক্রিয়া দেবে। গিয়ার বদলানোর সময় ইঞ্জিনের শক্তির সামান্য তারতম্য এবং স্পিকারের মাধ্যমে নির্গত এক্সক্লুসিভ সাউন্ড ট্রাক চালককে এক মুহূর্তের জন্যও বুঝতে দেবে না যে তিনি একটি ব্যাটারিচালিত গাড়ি চালাচ্ছেন। গ্রাহকদের বিপুল সাড়া পাওয়ার পর হুন্ডাই এবার এই প্রযুক্তি তাদের সাধারণ থ্রি-রো এসইউভি ‘Ioniq 9’ এবং অন্যান্য মিড-রেঞ্জ ইভিতেও নিয়ে আসার ঘোষণা করেছে।
ম্যানুয়াল গিয়ার ও ক্লাচ প্যাডেলের রোমাঞ্চ আনছে টয়োটা হুন্ডাই যেখানে অটোমেটিক গিয়ারবক্সের নকল তৈরিতে ব্যস্ত, সেখানে জাপানি গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা টয়োটা (Toyota) আরও একধাপ এগিয়ে গিয়েছে। টয়োটা তাদের আগামী প্রজন্মের পারফরম্যান্স ইলেকট্রিক গাড়িগুলির জন্য একটি সম্পূর্ণ ‘সিমুলেটেড ম্যানুয়াল ট্রান্সমিশন’ প্রযুক্তির পেটেন্ট নিয়েছে, যা বাজারে আসার জন্য প্রস্তুত। এই প্রযুক্তির অধীনে ইলেকট্রিক গাড়িতে একটি আসল ম্যানুয়াল গাড়ির মতোই তিনটি প্যাডেল (ক্লাচ সহ) এবং একটি গিয়ার লিভার থাকবে। চালক যদি সঠিকভাবে ক্লাচ না চেপে ভুল গিয়ারে গাড়ি ছোটানোর চেষ্টা করেন, তবে আসল আইসিই (Internal Combustion Engine) গাড়ির মতোই ইভিটি ঝটকা খাবে এবং এর ইঞ্জিন ‘স্টল’ বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। পুরোটাই হবে সফটওয়্যারের কারসাজিতে, যা চালককে দেবে খাঁটি মেকানিক্যাল ড্রাইভের আনন্দ।
আরও পড়ুন: Cheapest Electric Car: ভারতে এল সবচেয়ে সস্তা ইলেকট্রিক গাড়ি, এক চার্জে ২৫০ কিমি রেঞ্জ
সাইলেন্ট ড্রাইভ বনাম মেকানিক্যাল ইমোশন: কেন এই চেষ্টা? মনোবিদ এবং অটো বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়ি চালানো কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত নয়, অনেকের কাছেই এটি একটি আবেগ। ইলেকট্রিক গাড়ির শান্ত পরিবেশ দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য আরামদায়ক হলেও স্পোর্টস কার বা রেসিং ট্র্যাকে সেই রোমাঞ্চ উধাও হয়ে যায়। হুন্ডাই-এর গ্লোবাল আরঅ্যান্ডডি প্রধান ম্যানফ্রেড হারার সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অনেকেই হয়তো একে স্রেফ একটি ‘গিমিক’ বা লোকদেখানো প্রযুক্তি বলতে পারেন, কিন্তু মানুষ এই কৃত্রিম মেকানিক্যাল অনুভূতি পছন্দ করছেন। আগামী দিনে হুন্ডাই তাদের পরবর্তী প্ল্যাটফর্মের ইভিগুলিতে গাড়ির বডিতে এমন ভাইব্রেশন বা কম্পন তৈরি করবে, যা ইঞ্জিনের আইডলিং বা সাইলেন্সার পাইপ থেকে ব্যাকফায়ারের (Exhaust Pops) নিখুঁত অভিজ্ঞতা দেবে। পোর্শে বা বিএমডব্লিউ-এর মতো লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলিও এখন তাদের স্পোর্টস ইভিতে এই কৃত্রিম গিয়ার শিফটিং প্রযুক্তি যুক্ত করার পথেই হাঁটছে।
ইলেকট্রিক গাড়ির এই নতুন রূপান্তর প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির চাকা পরিবেশবান্ধব হলেও চেনা নস্টালজিয়া ও গতি দুনিয়ার আদিম রোমাঞ্চকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দিতে রাজি নন ইঞ্জিনিয়াররা।
আরও পড়ুন: নতুন বছরের উপহার, নতুন পরিষেবা আনছে মেঘবালা ব্রডব্যান্ড




