দ্য বেঙ্গল স্টোরি ব্যুরো: শেয়ার বাজারের ইতিহাসে সবথেকে বড় ধামাকা করতে চলেছে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ। বহুল প্রতীক্ষিত জিও প্ল্যাটফর্মস-এর ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং বা আইআইপিও (Jio IPO) আনার প্রক্রিয়া অফিশিয়ালি শুরু হয়ে গেল। রিলায়েন্সের ৪৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (RIL AGM 2026) চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি বড় ঘোষণা করে জানিয়েছেন, জিও-র আইপিও আনার জন্য খসড়া প্রস্তাব বা ডিআরএইচপি (DRHP) অনুমোদন করেছে বোর্ড এবং আজই তা বাজার নিয়ামক সংস্থা সেবি-র (SEBI) কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে। দেশের বৃহত্তম টেলিকম সংস্থার এই মেগা লিস্টিংয়ের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এবং ক্লিন এনার্জি নিয়ে একাধিক যুগান্তকারী প্রকল্পের রোডম্যাপ পেশ করেছে রিলায়েন্স।
জিও আইপিও নিয়ে মুকেশ আম্বানির আবেগঘন ঘোষণা শেয়ার হোল্ডারদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুকেশ আম্বানি বলেন, জিও-র আইপিও আনার খসড়া প্রস্তাব আজই সেবি-র কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে। এটি আমার এবং সমগ্র রিলায়েন্স পরিবারের কাছে একটি অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত। তিনি আরও জানান, মুকেশ আম্বানির তিন সন্তান- ইশা আম্বানি, আকাশ আম্বানি এবং অনন্ত আম্বানি যৌথভাবে এই মেগা আইপিও প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের মূল্য তৈরিতে দিশা দেখাবেন।
বিএসই (BSE) ফাইলিং অনুযায়ী, জিও প্ল্যাটফর্মসের এই আইপিও-র অধীনে ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর মোট ২৭ কোটি ফ্রেশ ইকুইটি শেয়ার বাজারে ছাড়া হবে। বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শেয়ারের দাম নির্ধারিত হবে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লিস্টিংয়ের মাধ্যমে ভারতীয় পুঁজিবাজারে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় তৈরি হতে চলেছে, যা রিলায়েন্সের শেয়ার হোল্ডারদের জন্য বিপুল সম্পদ তৈরির সুযোগ এনে দেবে।
আরও পড়ুন: Gujarat Industrial Policy: টেক্সটাইল ও জুতো শিল্পে বড় বিনিয়োগ টানতে নতুন নীতির পথে গুজরাত
জামনগরে ভারতের নিজস্ব ‘সোভেরেন এআই ব্যাকবোন’ টেলিকমের পর এবার এআই প্রযুক্তিতে ভারতকে স্বাবলম্বী করতে কোমর বাঁধছে রিলায়েন্স। জিও ইনফোকম-এর চেয়ারম্যান আকাশ আম্বানি বার্ষিক সভায় ঘোষণা করেন, গুজরাটের জামনগরে ভারতের নিজস্ব ‘সোভেরেন এআই ব্যাকবোন’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিকাঠামো তৈরি করছে রিলায়েন্স ইন্টেলিজেন্স। সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতে চালিত এই পরিকাঠামোর প্রথম ১২০ মেগাওয়াটের ফেজ ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালু হয়ে যাবে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্ল্যাটফর্ম হতে চলেছে, যা মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার (NVIDIA) উন্নত জিবি৩০০ জিপিইউ (GB300 GPU) দ্বারা পরিচালিত হবে।
সবথেকে বড় বিষয় হল, রিলায়েন্স সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ২২টি ভারতীয় ভাষায় এআই পরিষেবা চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিওভারতআইকিউ (JioBharatIQ), এআই ব্যাপার (AI Vyapar), জিওহেলথআইকিউ (JioHealthIQ), জিওলার্নআইকিউ (JioLearnIQ) এবং জিওকৃষিআইকিউ (JioKrishiIQ)। আকাশ আম্বানি স্পষ্ট জানান, বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলির মতো ইংরেজিতে তৈরি করে পরে অনুবাদ নয়, বরং জিও শুরু থেকেই ভারতীয় ভাষায় এআই তৈরি করছে। এমনকি বহুল ব্যবহৃত মাইজিও (MyJio) অ্যাপটিকেও একটি ব্যক্তিগত এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা উপদেষ্টায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
ফোনের কল ধরবে এআই এজেন্ট, ঘরে আসছে জিওটেলিফ্রেম প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য দুটি চমকপ্রদ এআই প্রোডাক্টের ঘোষণা করা হয়েছে এই সভায়:
- জিও কল এজেন্ট (Jio Call Agent): রিলায়েন্স তাদের নেটওয়ার্কের ভেতরেই এআই যুক্ত করছে। এর ফলে আপনার ফোনের সাধারণ কলও হয়ে উঠবে বুদ্ধিমান। এই এআই এজেন্ট ফোনে কথোপকথন রেকর্ড ও ট্রান্সক্রাইব করতে পারবে, ১০ জন আলাদা বক্তাকে চিনতে পারবে, কলের মূল তথ্য সামারি করতে পারবে এবং কথোপকথনের ভিত্তিতে খাবার অর্ডার করা বা মিটিং শিডিউল করার মতো কাজও করে দেবে।
- জিওটেলিফ্রেম (JioTeleframe): হোম অটোমেশনের জন্য এটি একটি এআই চালিত সিস্টেম। কোনো অ্যাপ না খুলেই বা বারবার কমান্ড না দিয়েই এই সিস্টেম ঘরের পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝে নিজে থেকেই প্রয়োজনীয় সাহায্য বা পরিষেবা সচল করে দেবে।
আকাশ থেকে স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড এবং গ্রিন এনার্জিতে বড় বাজি টেলিকম নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করতে আকাশ আম্বানি বলেন, জিও এবার আকাশ থেকে সংযোগ স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুর্গম গ্রাম, দ্বীপ অঞ্চল এবং ভারতের সীমান্ত চৌকিগুলিতে হাই-স্পিড ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে লো আর্থ অরবিট বা এলইও (LEO) স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন তৈরির মূল্যায়ন করছে জিও। এর জন্য ভারতে নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশন পরিকাঠামোও তৈরি করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জিও-র সমস্ত গ্রাহককে ৫জি-তে মাইগ্রেট করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
New Energy বা নবীকরণযোগ্য শক্তি নিয়ে অনন্ত আম্বানি জানান, ২০২৭ অর্থবর্ষ থেকে এই ক্ষেত্রটি রিলায়েন্সের আর্থিক পারফরম্যান্সে বড় অবদান রাখতে শুরু করবে। রিলায়েন্স তাদের গিগাফ্যাক্টরির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১২০ গিগাওয়াট আওয়ার (GWh) পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি প্রস্তুতকারক করে তুলবে। ও২সি (অয়েল-টু-কেমিকাল) ব্যবসাকে ২০৭০ সালের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার অন্তত দুই দশক আগেই কার্বন-মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি। আর্থিক ফলাফলের দিক থেকেও ২০২৬ অর্থবর্ষে রিলায়েন্সের কনসোলিডেটেড নিট মুনাফা ১৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৫,৭৫৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।




