লকডাউনে আমরা কেউ রান্না শিখেছি, কেউ ফের বইকে আঁকড়ে ধরেছি। হঠাৎ পাওয়া একটা দীর্ঘ অবসরে অনেকেই নিজের নিজের ভালোলাগার কাজে ফিরে গিয়েছি। কিন্তু দেশের বহু দিনমজুরের মতো ইসাক মুন্ডাও কাজ হারিয়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন। লকডাউন কাজ কেড়ে নিলেও খিদে কেড়ে নিতে পারেনি। পেশায় দিনমজুর ইসাক খিদে ভুলে থাকতে ইউটিউবে ভিডিও দেখে সময় কাটাতেন। তাও সেটি বন্ধুর ফোনে। আর এই ভিডিও দেখার নেশাই রাতারাতি পাল্টে দিল তাঁর জীবন। ভিডিও দেখার পরিবর্তে নিজেই ইউটিউবে একটি চ্যানেল তৈরি ফেললেন। ইসাকের এই একটি সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

উড়িষ্যার সম্বলপুর জেলার জুজুমুড়া ব্লকের এক অখ্যাত গ্রাম বাবুপালী। এই গ্রামেরই বাসিন্দা ইসাক মুন্ডা। যেকোনও সিনেমার চিত্রনাট্যকেও টেক্কা দেবে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইসাক মুন্ডার গল্প। লোকডাউনে কাজ হারিয়ে বন্ধুর ফোনে ভিডিও দেখেই সময় কাটাতেন তিনি। তারপর ঠিক করেন নিজেই ভিডিও তৈরি করবেন। ৩০০০ টাকা ধার করে একটিও ফোন কিনে ফেলেন। আর সেই ফোনেই বানিয়ে ফেলেন তাঁর প্রথম ভিডিও। ২০২০ মার্চে তিনি তাঁর প্রথম ভিডিও তৈরি করেন। ভিডিওর বিষয় খুবই সাধারণ। আজকাল বেশিরভাগ ফুড ব্লগে যেমনটা দেখা যায়। এক থালা ভাত সঙ্গে ডাল, কিছুটা শাক ভাজা, একটা কাঁচা টোম্যাটো আর একটা কাঁচা লঙ্কা। এই সামান্য পদ, যা পরম তৃপ্তি করে খাচ্ছেন ইসাক। আপামর সারল্যে মোড়া এই ভিডিও নেটিজেনদের মন ছুঁয়ে যায়। এক সাক্ষাৎকারে ইসাক জানান, তাঁর প্রথম ভিডিওটি প্রায় ৪ লক্ষেরও বেশি মানুষ দেখেন। আর তা থেকে যা রোজগার করেন, ইসাকের কথায় তিনি এতটা কল্পনাও করতে পারেননি।
আরও পড়ুন: পিন কোড কলকাতার বাইরেও; ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’… এবার শ্রীরামপুরে
প্রথম ভিডিও দেওয়ার তিন মাস পরে ইউটিউব থেকে ইসাক পেয়েছিলেন ৩৭০০০ টাকা। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ভিডিও বানিয়ে যেতে থাকেন। খাওয়ার ভিডিওর পাশাপাশি ফোনের ক্যামেরায় উঠে আসে তাঁর রোজকার জীবন যাপনের ঘটনাবলী। কোনও ভিডিওতে তিনি মাছ ধরছেন, কোথাও আবার পরিবারকে নিয়ে মেতে উঠেছেন অনাবিল আনন্দে। ইসাকের দারিদ্র সরল জীবন দেখতে ভিউয়ার্সের সংখ্যাও বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আর এখন পেশায় দিনমজুর ইসাক কার্যত একজন ইউটিউব স্টার। তিনি জানান, ইউটিউব থেকে তাঁর দ্বিতীয় রোজগার ছিল ৫ লক্ষ টাকা। ভিডিও থেকে হওয়া রোজগার দিয়ে বর্তমানে ইসাক গ্রামেই পরিবারের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করেছেন। নিজের সামর্থ্য মতো দারিদ্র মানুষের সাহায্যও করছেন। যেই খিদে থেকে বাঁচতে একদিন ইউটিউবের আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই ইউটিউব থেকেই রোজগার করে এখন নিজের পরিবারের পাশাপাশি বহু মানুষের মুখে খাওয়ার তুলে দিচ্ছেন উড়িষ্যার এক অখ্যাত গ্রামের বাসিন্দা ইসাক মুন্ডা।



