দ্য বেঙ্গল স্টোরি ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধিকারী মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ দফতর বণ্টন প্রকাশ্যে এল। বুধবার, ১০ জুন নবান্নের হোম অ্যান্ড হিল অ্যাফেয়ার্স দফতরের কো-অর্ডিনেশন শাখা থেকে জারি হওয়া বিজ্ঞপ্তি নম্বর ১০২০-Home(Cons.)/R13A-02/2026 অনুযায়ী মোট ১৯ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রী, ৩ জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দফতর ভাগ করা হয়েছে। ১৩ মে-র পূর্ববর্তী বিজ্ঞপ্তি (নম্বর ৮৬৯-Home (Cons.)) বাতিল করে এই নতুন বণ্টন কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তিটি জারি হয়েছে রাজ্যপালের অনুমোদনক্রমে, ভারতীয় সংবিধানের ১৬৬ অনুচ্ছেদের (৩) ধারার আওতায়। শেষে স্বাক্ষর রয়েছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালের।
মুখ্যমন্ত্রীর হাতে যে পাঁচ দফতর
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজের কাছে রেখেছেন স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতর (Home and Hill Affairs), ভূমি ও ভূমি সংস্কার এবং উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন, বিদ্যুৎ, তথ্য ও সংস্কৃতি, এবং কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতর। পাশাপাশি, যে দফতরগুলি কোনও নির্দিষ্ট মন্ত্রীকে বরাদ্দ করা হয়নি, সেগুলিও থাকছে তাঁর তত্ত্বাবধানে। প্রশাসনিক মহলের পর্যবেক্ষণ, ‘good governance and transparency’-র যে অগ্রাধিকার মুখ্যমন্ত্রী শপথের পরই ঘোষণা করেছিলেন, তার বাস্তবায়নের নিয়ন্ত্রণ তিনি নিজের কাছেই রাখলেন।
ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা – কে পেলেন কোন দফতর
বিজ্ঞপ্তিতে ১৯ জন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর দফতর বণ্টন ঘোষণা করা হয়েছে।
- স্বপন দাশগুপ্ত: অর্থ দফতর
- নিশীথ প্রামাণিক: উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন, জলসম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন
- অশোক কীর্তনিয়া: খাদ্য ও সরবরাহ, সমবায়
- দিলীপ ঘোষ: পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন, কৃষি বিপণন
- ক্ষুদিরাম টুডু: আদিবাসী উন্নয়ন, সংখ্যালঘু বিষয়ক, মাদ্রাসা শিক্ষা
- অগ্নিমিত্রা পাল: নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক
- দীপক বর্মণ: স্কুল শিক্ষা, আবাসন, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং বস্ত্র
- তাপস রায়: শিল্প, বাণিজ্য ও উদ্যোগ; রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও শিল্প পুনর্গঠন; অপ্রচলিত ও নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস
- ডঃ শঙ্কর ঘোষ: সংসদীয় বিষয়ক, পর্যটন
- মনোজ কুমার ওরাওঁ: বন, পরিবেশ
- অর্জুন সিং: শ্রম, পরিবহণ
- গৌরী শঙ্কর ঘোষ: অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ; গণশিক্ষা সম্প্রসারণ ও গ্রন্থাগার পরিষেবা
- জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়: উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা; প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন
- ডাঃ কল্যাণ চক্রবর্তী: তথ্য প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বায়োটেকনোলজি; খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প ও উদ্যানপালন
- ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ
- অরূপ কুমার দাস: সেচ ও জলপথ
- ডাঃ অজয় কুমার পোদ্দার: জনস্বাস্থ্য কারিগরি, পূর্ত
- দুধকুমার মণ্ডল: কৃষি
স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী
- মালতী রাভা রায়: নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ; স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্ব-নিয়োজন; কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ
- রাজেশ মাহাত: প্রাণী সম্পদ উন্নয়ন, মৎস্য
- ডাঃ ইন্দ্রনীল খান: যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া; ক্রেতা সুরক্ষা
প্রতিমন্ত্রী (Ministers of State)
মোট ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন তালিকায়, যাঁদের প্রত্যেককে একাধিক দফতরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে – জোয়েল মুর্মু (আদিবাসী উন্নয়ন, সেচ ও জলপথ), আনন্দময় বর্মণ (পরিবহণ, অর্থ), প্রাক্তন ক্রিকেটার অশোক ডিন্ডা (কৃষি বিপণন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও বস্ত্র), ডাঃ হরে কৃষ্ণ বেরা (উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন), বিশাল লামা (স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য, সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা শিক্ষা), আইনজীবী বিরাজ বিশ্বাস (আইন, বিচার বিভাগ, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন), দীপঙ্কর জানা (ভূমি ও পুনর্বাসন, সুন্দরবন বিষয়ক), সুমনা সরকার (স্বাস্থ্য)।
বাকিরা হলেন – সন্তনু প্রামাণিক, মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র, উমেশ রাই, পূর্ণিমা চক্রবর্তী, কৌশিক চৌধুরী, ভাস্কর ভট্টাচার্য, দিবাকর ঘরামি, অমিয়া কিস্কু, কলিতা মাজি, গার্গী দাস ঘোষ, নাদিয়ার চাঁদ বৌরি, অশোকে ডিন্ডা।
আরও পড়ুন: এবার বাংলার পথে দিল্লি, মহিলাদের বিশেষ আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি কেজরিওয়ালের
চমক, ভারসাম্য ও তাৎপর্য
এ বারের বণ্টনের সবচেয়ে আলোচিত নিয়োগ অবশ্যই স্বপন দাশগুপ্তর হাতে অর্থ দফতর। প্রবীণ সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত প্রথম বার কোনও মন্ত্রিত্বের নির্বাহী দায়িত্ব পেলেন – এবং সরাসরি রাজ্যের অর্থনীতির রাশ তাঁর হাতে। ৪ মে-র বিধানসভা ভোটে বিজেপি ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৮টিতে জয়ী হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা – বিশেষত আয়ুষ্মান ভারত-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাংলায় চালু হওয়ার প্রেক্ষাপটে – স্বপন দাশগুপ্তর কেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘ পরিচয় কাজে আসবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
দ্বিতীয় বড় সিদ্ধান্ত হল স্বাস্থ্য দফতরে অঙ্কোলজিস্ট ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে আনা – পেশাদার চিকিৎসকের হাতে রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তুলে দেওয়ার বার্তা স্পষ্ট। তেমনই শ্রম ও পরিবহণ গেল প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ অর্জুন সিংয়ের হাতে, শিল্প ও বাণিজ্য পেলেন তাপস রায় – দু’জনই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি-তে যোগ দেওয়া হাই-প্রোফাইল মুখ। এই দু’টি দফতরই রাজ্যের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক।
প্রতিমন্ত্রীদের তালিকায় প্রাক্তন ভারতীয় ফাস্ট বোলার অশোক ডিন্ডার নাম থাকা আলাদা ভাবে নজর কেড়েছে। আদিবাসী, মতুয়া ও সংখ্যালঘু – বিজেপি-র জয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা নেওয়া সম্প্রদায়গুলিকে যথাযথ প্রতিনিধিত্বে রাখার কৌশলও স্পষ্ট: ক্ষুদিরাম টুডু, জোয়েল মুর্মু, অমিয়া কিস্কু, রাজেশ মাহাত, বিশাল লামা, অশোক কীর্তনিয়া-সহ একাধিক মুখকে পৃথক পৃথক বিভাগে রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্বের শপথের ঠিক ১০ দিনের মাথায় পূর্ণাঙ্গ বণ্টন প্রকাশ্যে আসায় প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত গতি আনার বার্তাই দিল নবান্ন।