এই পুজোর কথা জানলে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেতে পারে আপনার। মাত্র ২৫০ বছর আগেও পুজোতে নরবলির প্রচলন ছিল। এখনও দেবীকে তুষ্ট করতে প্রয়োজন হয় মানুষের রক্তের। হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন। কোচবিহারের ‘বড় দেবীর’ পুজোর আচার অনুষ্ঠানের পরতে পরতে রয়েছে রহস্য। যা অন্য পুজোগুলোর থেকে অনেকটাই আলাদা এবং আকর্ষণীয়।
স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে কোচবিহার রাজবংশের ‘বড় দেবীর’ পুজোর সূচনা আনুমানিক ৫০০ বছর আগে। জনশ্রুত, বিশু এবং শিশু দুই ভাই এই পুজো শুরু করেছিলেন। বিশু অর্থাৎ কোচবিহার রাজবংশের তৎকালীন রাজা বিশ্বসিংহ স্বপ্নদেশ পেয়ে বড় দেবীর পুজো শুরু করেছিলেন বলে কথিত আছে। ইতিহাস বলছে, ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে রাজবাড়ীর মদনমোহন মন্দিরে ময়না গাছের ডাল পুঁতে দেবী আরাধনা শুরু হয়।
ঐতিহ্য মেনে এখনও শ্রাবণমাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে ময়না গাছের ডাল দিয়ে মূর্তি গড়ার কাজ শুরু হয়। বড় দেবীর মূর্তি অন্যান্য মূর্তির থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে উমা ভয়ঙ্করী। বড় দেবীর মূর্তির গঠনশৈলীর সঙ্গে রাজবংশী গোষ্ঠীর জনজাতির দৈহিক গঠনের মিলও লক্ষ্য করা যায়। দেবীর গাত্রবর্ন লাল, অসুরের গাত্রবর্ন সবুজ। এখানে দেবী সপরিবারে আসেন না। তাঁর সঙ্গী হিসেবে থাকে দুই সখী জয়া, বিজিয়া। সিংহ এবং বাঘ।
আরও পড়ুন: Kanyashree: বিধানসভায় মমতার ব্রহ্মাস্ত্র?
পুজোর সবথেকে আকর্ষণীয় আচার ‘গুপ্ত পূজা’। জানা যায়, ২৫০ বছর আগেও এই গুপ্ত পুজোয় নরবলি দিয়ে দেবীকে তুষ্ট করা হত। ১৯ তম মহারাজ নরেন্দ্র নারায়ণ ভূপের আমলে নরবলি বন্ধ হয়। তৎকালীন মহারাজ মহিষ বলি প্রথা শুরু করেন। যা এখনও চলে আসছে। বর্তমানে নরবলি বন্ধ হলেও ‘গুপ্ত পূজা’র দিন মানুষের রক্ত লাগে। শোনা যায়, কামসানাইট উপাধি পাওয়া কোনও ব্যক্তি দেবীকে তুষ্ট করতে তাঁর আঙুল কেটে রক্ত দেন। অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে এই ‘গুপ্ত পূজা’ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় কোনও সাধারণ দর্শনার্থীর মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন না। শুধুমাত্র রাজ পরিবারের পুরহিতরা এবং সদস্যরাই ওই পুজোতে উপস্থিত থাকেন।

পুজোর প্রসাদেও রয়েছে অভিনবত্ব। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত মায়ের ভোগে থাকে শুধুই পায়েস। তবে নবমীর দিন বলির মাংস চাল, ডাল, সব্জি, একত্রে করে এক ধরণের আমিষ খিচুড়ি প্রস্তুত করা হয়। অঞ্জলির পরে ভক্তদের মধ্যে সেই ভোগ বিতরণ করা হয়।
আরও পড়ুন: পলাশীর যুদ্ধে কম্পানি শাসকদের জয়ের স্মারক উৎসব আজকের শরৎকালীন দূর্গাপুজো
সময়ের পথে চলে গিয়েছে সেই রাজা, রাজত্ব। তবে ইতিহাসের প্রতিনিধি হয়ে থেকে গিয়েছে ‘বড় দেবী’র পুজো। বর্তমানে কোচবিহারের দেবত্ৰ ট্রাস্ট বোর্ড পুজো করে থাকে। কোচবিহারের জেলা শাসক বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বে থাকেন। মাঝে কোভিডের কারণে অনাড়ম্বরে পুজো হলেও এবছর আবার আগের মতোই দেবীর আরাধনা করবে কোচবিহার রাজ পরিবার। ৫০০ বছরের ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে সেই সঙ্গে নরবলির মতো হারহিম করা অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে যাবেন নাকি কোচবিহার?