বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ভয়ঙ্কর সংকট আসতে চলেছে, কিছুদিন আগেই তার আভাস দিয়েছিলেন ব্রিটিশ বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যালান উডস। মার্ক্সবাদী সংগঠন ‘সোশ্যালিস্ট অ্যাপিল’ এর মুখপত্রের এক প্রতিবেদনে অ্যলান উডস আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এবছরই ইউরোপের দেশগুলিতে আর্থিক মন্দা আসতে চলেছে। তিনি লিখেছিলেন, সেই আর্থিক মন্দার আশঙ্কা এখন থেকেই দেখা যাচ্ছে ব্রিটেনের ব্রেক্সিট জট থেকে শুরু করে ফ্রান্সের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনে।
সেই কথার সূত্র ধরেই যেন এদেশের ইংরেজি পত্রিকা, ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি’ (ইপিডব্লু) র এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলা হল, গোটা দুনিয়া কি ফের সামগ্রিকভাবে আর্থিক মন্দার দিকে এগোচ্ছে?
ইপিডব্লু’র সাম্প্রতিক (৯ ই ফেব্রুয়ারি) সংখ্যায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ টি সাবরি অংকু ‘আর উই হেডিং টুওয়ার্ডস আ সিঙ্ক্রোনাইজড গ্লোবাল স্লোডাউন?’ শীর্ষক প্রতিবেদনে লিখেছেন, বিশ্বজুড়ে আর্থিক মন্দার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ সাবরি অংকু লিখেছেন, সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল মানিটরি ফান্ড (IMF) একটি তথ্য দিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে বিশ্বের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই বৃদ্ধির হার ৩.৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের (World Bank)পর্যালোচনা, ২০১৮ সালে বিশ্বে জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, আর ২০১৯ সালে ২.৯ শতাংশ ছুঁতে পারে এই বৃদ্ধির হার। এই অর্থনীতিবিদের কথায়, আইএমএফ হোক বা ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, যারই তথ্যে বিশ্বাস করুন না কেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাই যে ক্রমশ ধেয়ে আসছে তা দুই সংস্থার রিপোর্টেই পরিষ্কার।
ওই প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের আইএমএফ-এর একটি রিপোর্ট তুলে ধরেছেন সাবরি অংকু। ‘আ ডিকেড আফটার দ্য গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিস: আর উই সেফার’ শীর্ষক ওই রিপোর্ট জানাচ্ছে, আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতি মোটেই নিরাপদ অবস্থায় থাকবে না। ওই রিপোর্টে অর্থনীতিবিদ টোবিয়াস এড্রিয়ান লিখেছেন, অর্থনৈতিক ব্যাপারে বিভিন্ন সমৃদ্ধশালী দেশের সরকার ও ব্যবস্থাপকদের আরও উদ্যোগী হতে হবে। ফলাফল সম্পর্কে আরও চিন্তাভাবনা করে এগনো উচিত। এবং আগের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রকল্পের সংশোধন জরুরি।
টি সাবরি অংকুর ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ, দ্য ইন্সটিটিউট অব ইন্ট্যারন্যাশনাল ফিনান্সের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০১৬ সালের পর থেকে বিশ্ব ঋণ বেড়েছে ১২ শতাংশ। পাশাপাশি ২০১৯ সালের পর থেকে ডলারের দামও পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, ২০১৮ সাল থেকে বিশ্ব স্টক মার্কেটেও অতিমন্দা দেখা দিয়েছে। ১৯৮৭ সালের পর ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্ব স্টক মার্কেট কিছুটা হলেও উন্নতি করেছে। তবে তাঁর মতে, এই ফল কোনও দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে নয়, বিশ্বের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কগুলির বদান্যতায়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার চিত্র বোঝাতে আইএমএফ-এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডেভিড লিপটনের সাম্প্রতিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন টি সাবরি অংকু। ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি ‘ফিনান্সিয়াল টাইমস’ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিপটন জানিয়েছিলেন, সমৃদ্ধশালী দেশগুলি আগামীর বিশ্বমন্দার প্রভাব সম্পর্কে ভয়ঙ্করভাবে নির্লিপ্ত।
সাবরি অংকু আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যে কোনও সময়ে ইউরোপ মহাদেশে বা চিনে নেমে আসতে পারে অর্থনৈতিক সঙ্কট। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উন্নতশীল দেশগুলির রাজনৈতিক নেতারা তেমন কোনও অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলছেন না।

You may also like