আনোয়ারা খাতুন। ২০১৮ সালে অসমের বঙ্গাইগাঁওয়ের বাসিন্দা আনোয়ারাকে বিদেশি ঘোষণা করেছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু আনোয়ারা ভেবে পাচ্ছেন না, কীভাবে নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করবেন। আনোয়ারা ট্রাইব্যুনালে যে নথি জমা করেছিলেন, সেগুলোর কোনওটির ক্ষেত্রেই  সেই নথি ইস্যু করেছিলেন যে ব্যক্তি, তাঁকে হাজির করাতে পারেননি। ফলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিদেশি তকমা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষিতেই উঠছে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, নাগরিকত্ব প্রমাণ ঠিক কতটা কঠিন?

সম্প্রতি বেঙ্গালুরুর সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন দাকশ (DAKSH) একটি রিপোর্ট তৈরি করেছে। সেই রিপোর্টে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত গুয়াহাটি হাইকোর্টের ৭৮৭ টি নির্দেশ ও রায় খতিয়ে দেখেছেন দাকশের শ্রুতি নায়েক ও লিয়া ভার্গিস। তাতে তাঁরা বলছেন, এর মধ্যে প্রতি দু’জনের মধ্যে একজনকে বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছে স্রেফ দাখিল করা নথি যে সত্য, তা প্রমাণ করতে না পারায়। ঠিক যেমন ঘটেছে বঙ্গাইগাঁওয়ের আনোয়ারার সঙ্গে।

এনপিআরকে কেন পাগলামি বলেছিলেন অমর্ত্য সেন? আরও জানতে ক্লিক করুন

সমস্যা কোথায়?
ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া ব্যক্তিদের দেখাতে হয়, তাঁরা ভারত ভূখণ্ডেই জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন তাঁর মা-বাবা। সেকেন্ডারি এভিডেন্স হিসেবে কেউ এর জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট কিংবা গ্রাম পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেট দাখিল করতে পারেন। আর এখানেই লুকিয়ে আসল বিপত্তি।
এই সেকেন্ডারি এভিডেন্স বা আনুষঙ্গিক প্রমাণ তখনই বৈধ বলে গণ্য হবে, যখন সেই সার্টিফিকেট ইস্যু করেছেন যে ব্যক্তি, তিনি সশরীরে হাজির হয়ে নথির সত্যতা স্বীকার করবেন।

তাহলে যা দাঁড়ালো…
স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল বা প্রধান শিক্ষক অথবা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে হবে। শুধু তাই নয়, ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে তাঁকে বলতে হবে, যে সার্টিফিকেট তাঁর সাক্ষরের ভিত্তিতে আবেদনকারীকে ইস্যু করা হয়েছে, তাতে কোনও ভুল নেই।
আনোয়ারা খাতুনের মামলায় পঞ্চায়েত প্রধান কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, কেউই ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে পারেননি। ফলে বাতিল হয়ে যায় আনোয়ারার নাগরিকত্ব। বিদেশি তকমা দেওয়া তাঁকে।
দাকশের প্রতিনিধিরা যে ৭৮৭ টি রায় পর্যালোচনা করেছেন, তার সবকটিই ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিদেশি ঘোষণার প্রেক্ষিতে দায়ের করা আবেদন। এখানে প্রতি দু’জনের একজন এই লিঙ্ক সার্টিফিকেট ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ, এঁরা প্রত্যেকেই সেই ব্যক্তিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে অসমর্থ হয়েছেন, যিনি বা যাঁরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা সমাপ্তী সার্টিফিকেট বা পঞ্চায়েত সার্টিফিকেটটি জারি করেছেন।

আরও জানতে ক্লিক করুন, কেন নাগরিকপঞ্জিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় মহিলারা?

ব্যতিক্রম
সম্প্রতি নিউজ পোর্টাল Live Law-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর তথা আইনজীবী মনু সেবাস্টিয়ান একাধিক উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে বিভিন্ন আইনের ক্ষেত্রে এই নীতির খেলাপ হয়েছে। একইসঙ্গে কীভাবে অসমে একের পর এক আবেদন বাতিল হয়েছে এবং আবেদনকারীরা বিদেশি তকমা পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মনু সেবাস্টিয়ান উল্লেখ করেছেন ১৮৯৪ সালের জমি অধিগ্রহণ আইনের সেকশন ৫১ এর এ ধারার কথা। যেখানে জমি বিক্রির দস্তাবেজ লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য করা হয়। আরও একাধিক মামলা ধরে ধরে উদাহরণ দিয়েছেন মনু সেবাস্টিয়ান। কিন্তু নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে এই সুযোগ পান না আনোয়ারারা।
দাকশের প্রতিনিধিদের তৈরি করা রিপোর্টেও উল্লেখ রয়েছে এই বিষয়ের। নিউজ পোর্টালে thewire.in-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁরা সেই তথ্য নথিভুক্ত করেছেন। আর এই গোটা প্রক্রিয়া খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে প্রতিনিধিরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, নাগরিকত্বের মত স্পর্শকাতর ইস্যুতে আইনের মানবিক মুখ অনুপস্থিত। ফলশ্রুতি, নিজেকে এ দেশের নাগরিক প্রমাণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সমস্যার বিষয় হল, সার্টিফিকেট জারি করেছেন যিনি, তাঁকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির করা। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

কতটা জটিল প্রক্রিয়া?
ধরুন আপনাকে ট্রাইব্যুনালে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ডাকা হল। এক্ষেত্রে আপনি নিজের স্কুল পাশ করার সার্টিফিকেট দাখিল করলেন। তাতেই কাজ শেষ নয়। এবার আপনাকে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করতে হবে ওই সার্টিফিকেট যিনি ইস্যু করেছেন তাঁকেও। মনে করুন, আপনি যে ভারতেরই নাগরিক তা প্রমাণের জন্য আপনি আপনার স্কুল পাশের সার্টিফিকেট পেশ করলেন। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক হয়ত সার্টিফিকেটটি ইস্যু করেছিলেন বহু বছর আগে। তারপর হয়ত সেই প্রধান শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে কিংবা আপনার কাছে তাঁর বর্তমান ঠিকানা নেই। তাহলে আপনার পক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আপনি যে স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট দাখিল করেছেন তা সত্য। স্বভাবতই বাতিল নাগরিকত্ব। আপনি বিদেশি।
এই গেঁড়োয় পড়ে অসমে কার্যত পাইকারি হারে বিদেশি তকমা পেয়ে চলেছেন সাধারণ মানুষ। এছাড়া বিভিন্ন সার্টিফিকেটে একেকরকম নামের বানান কিংবা বানানে গরমিলের ঘটনাও অতি স্বাভাবিক। গরিব বা প্রান্তিক স্তরের মানুষের মধ্যে এই ভুলের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি।

কী হবে?
অসমে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ গিয়েছেন ১৯ লক্ষেরও বেশি মানুষ। এবার এই মানুষরা নিজেদের নাগরিকত্ব ফেরাতে আবেদন করবেন ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল এবং তার পরবর্তীতে গুয়াহাটি হাইকোর্টে। এই বিপুল ভার নিতে সক্ষম ট্রাইব্যুনাল বা আদালত?

আরও জানতে ক্লিক করুন, অসম এনআরসিতে ভয়ঙ্কর জেহাদিদের নাম?

কী বলছে পরিসংখ্যান?
১৯৮৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অসমে মোট ৪ লক্ষ ৬৮ হাজার ৯০৫ টি মামলা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। গুয়াহাটি হাইকোর্টের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আদালত ১৪,৫৫২ টি মামলার নিষ্পত্তি করেছে। এই সংখ্যাকে বার্ষিক হিসেব ধরলে বুঝতে সমস্যা হয় না, অতিরিক্ত ১৯ লক্ষ আবেদন এলে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us