২০১৬ সালের ৭ ই মার্চ আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত সিপিএম রাজ্য কমিটির বৈঠকে বিধানসভা নির্বাচনের জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। তার মোটামুটি তিন বছরের মাথায় ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ (বৃহস্পতিবার), প্রত্যাশামতোই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের চিত্রনাট্য অনুযায়ী আসন্ন লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রস্তাব কার্যত বিনা বাধায় পাশ হয়ে গেল সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠকে। আসন সমঝোতার বিরুদ্ধে বললেন রাজ্যের ৪ জেলার সম্পাদক। ভোটাভুটির সময় হাত তুলে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করল হরেকৃষ্ণ কোঙার, নিরুপম সেনের জেলা বর্ধমান।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা করা হবে। তা জানিয়েও দেওয়া হয়েছিল শরিক দলগুলিকে। শেষ বামফ্রন্টের বৈঠকে বিমান বসু জানিয়েছিলেন, সিপিএম ২২ টি, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, সিপিআই ৩ টি করে এবং সিপিআইএমএল (লিবারেশন) কে ১ টি আসন ছেড়ে রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা হবে। সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠকে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রস্তাব কার্যত বিনা বাধায় পাশ হয়ে যাওয়ার পর আগামী ৩-৪ মার্চ কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টি তুলবেন দলের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। সেখানেও তা পাশ হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছেন আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতারা।
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার রাজ্য কমিটির মিটিংয়ে রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র জানান, গত লোকসভা ভোটে যে আসনগুলিতে কংগ্রেস এবং সিপিএম জিতেছে (রায়গঞ্জ, মালদহ উত্তর এবং দক্ষিণ, জঙ্গিপুর, বহরমপুর এবং মুর্শিদাবাদ) সেখানে কেউ কারও বিরুদ্ধে প্রার্থী দেবে না। এর পাশাপাশি অন্য আসনগুলিতেও তৃণমূল এবং বিজেপি বিরোধী ভোটকে এক জায়গায় আনতে তারা সচেষ্ট হবেন, যাতে সেই ভোটের ভাগাভাগি না হয়।
সূত্রের খবর, রাজ্য সম্পাদকের এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় উত্তর দিনাজপুর, বর্ধমান, হাওড়া এবং কলকাতা জেলার সম্পাদক কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিরোধিতা করেন। তাঁরা বলেন, অতীতেও দেখা গিয়েছে এতে দলের কোনও লাভ হয়নি। কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা না করে নিজের শক্তিবৃদ্ধিতে নজর দেওয়ার দিকে সওয়াল করেন তাঁরা। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ লোকসভা আসনে যেহেতু দলের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম সাংসদ এবং সেই আসনটি যেহেতু শেষ মুহূর্তে কংগ্রেসও চাইছে, এই অবস্থায় সেই জেলার সম্পাদক অপূর্ব পালের এই জোট বিরোধিতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তর দিনাজপুরের জেলা সম্পাদক ছাড়াও হাওড়ার সম্পাদক বিপ্লব মজুমদার, পূর্ব বর্ধমানের সম্পাদক অচিন্ত্য মল্লিক এবং কলকাতার সম্পাদক কল্লোল মজুমদার কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিরোধিতা করেন। কিন্তু বাকি জেলাগুলি, বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনা, দুই মেদিনীপুর, নদিয়া, দার্জিলিং আসন সমঝোতার পক্ষের জোর সওয়াল করে। শেষে ভোটাভুটি হলে পূর্ব বর্ধমানের দুই রাজ্য কমিটি সদস্য অচিন্ত্য মল্লিক এবং অমল হালদার হাত তুলে জোট প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। আলোচনার সময় বিরোধিতা করলেও উত্তর দিনাজপুর, কলকাতা এবং হাওড়া সূর্যকান্ত মিশ্রর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে হাত তোলেনি।
২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট মুখ থুবড়ে পড়ার পর সেই বছরই ৩০ শে সেপ্টেম্বর সিপিএমের রাজ্য প্লেনাম বসেছিল কলকাতায়। প্লেনাম শেষে ১ লা অক্টোবর প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছিলেন, ‘সাম্প্রতিক নির্বাচনে (২০১৬ বিধানসভা) যৌথ আন্দোলন কর্মসূচি হয়নি, তবে আসন সমঝোতা হয়েছিল। দরকার হচ্ছে আন্দোলন কর্মসূচি, আসন সমঝোতা নয়।’
মাঝের আড়াই বছরে কংগ্রেসের সঙ্গে রাজ্যে কী ধরনের যৌথ আন্দোলন কর্মসূচি হয়েছে, তা নিয়েও এদিন রাজ্য কমিটির বৈঠকের পর প্রশ্ন তুলছেন সিপিএমের অনেকে!

You may also like