নিজস্ব সংবাদদাতা: লোকসভা নির্বাচনের পর এবার দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ভাঙন। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের অবশেষে চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটল। লোকসভার মোট ২৮ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে ২০ জনই একযোগে দল ছাড়ার ঘোষণা করেছেন। তাঁরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে তাঁর বাসভবনে দেখা করে একটি চিঠি জমা দিয়েছেন। চিঠিতে জানানো হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকে ত্রিপুরাভিত্তিক আঞ্চলিক দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই (NCPI)-এর সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত বা মার্জ করছেন। এই নাটকীয় দলবদলের পর তাঁরা সংসদের নিম্নকক্ষে পৃথক ব্লক হিসেবে বসার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
তৃণমূলের এই বিক্ষুব্ধ শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার। স্পিকারের সঙ্গে দেখা করার আগে এই ২০ জন সাংসদ বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দর যাদবের বাসভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। দল ছাড়ার পরেই কাকলি ঘোষ দস্তিদার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ২০ জন সাংসদ এনসিপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং তাঁরা লোকসভায় এনডিএ (NDA) জোটকে সমর্থন করবেন।
আইনের মারপ্যাঁচ এড়াতে নজিরবিহীন কৌশল সুদীপদের কড়া দলত্যাগ বিরোধী আইনের হাত থেকে বাঁচতেই বিক্ষুব্ধ সাংসদরা এই সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতা থেকে বাঁচতে গেলে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১৯ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। এখানে ২০ জন সাংসদ একযোগে দল ছাড়ায় সেই আইনি জটিলতা অনেকটাই কেটে গিয়েছে। তবে সংসদে নিজেদের আলাদা দল হিসেবে ঘোষণার পরিবর্তে একটি নিবন্ধিত আঞ্চলিক দলের সঙ্গে নিজেদের মার্জ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আরও পড়ুন: গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত, রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি বিজয়বর্গীয়র, রাজ্যপালের কাছে দরবার রাহুল-লকেটের
বিদ্রোহী সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, এনসিপিআই একটি আঞ্চলিক দল। আমরা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আসল তৃণমূল কারা, তা পরবর্তীকালে আদালতেই প্রমাণিত হবে। শুধু তাই নয়, এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী এবার নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে তৃণমূলের মূল নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়া ফুল’-এর ওপরেও নিজেদের অধিকার দাবি করতে পারে বলে সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে।
পালটা তোপ অভিষেকের, স্পিকারকে চিঠি লোকসভা নেতৃত্বের দলের এই নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের সংসদীয় দলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে সাফ জানানো হয়েছে, সংবিধান এবং বর্তমান দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী দলের ভেতরে এভাবে কোনও পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করার বা অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোনও একতরফা আইনি বৈধতা নেই। তাই এই বিদ্রোহী সাংসদদের যেন কোনওভাবেই আলাদা ব্লক হিসেবে স্বীকৃতি বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া না হয়।
তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ এবং সাগরিকা ঘোষ স্পিকারের কাছে গিয়ে অভিষেকের এই চিঠিটি সশরীরে জমা দিয়ে এসেছেন। একই সঙ্গে, রাজ্যসভাতেও তৃণমূলের দুই সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় এবং সুস্মিতা দেব ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। ফলে জাতীয় স্তরে তৃণমূলের সংসদীয় কাঠামোয় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১৯-২০ ডিসেম্বর বঙ্গ সফরে অমিত শাহ, ডায়মন্ড হারবারের ঘটনা নিয়ে কী বার্তা দেবেন?
সুদীপ-সায়নী পদচ্যুত, তড়িঘড়ি নতুন কমিটি গড়লেন মমতা সংসদীয় রাজনীতিতে এই বিশাল ধাক্কা খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তৃণমূলের সাংগঠনিক স্তরে বড়সড় রদবদল ঘটিয়েছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহী সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ এবং মালা রায়কে তাঁদের দলীয় পদ থেকে অবিলম্বে অপসারিত করা হয়েছে। উত্তর কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে সেই জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কুনাল ঘোষকে।
একই সঙ্গে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে সায়নী ঘোষকে সরিয়ে নতুন সভাপতি করা হয়েছে অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মালা রায়ের পরিবর্তে তৃণমূলের মহিলা উইং বা মহিলা সংগঠনের প্রধান পদে আনা হয়েছে কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক আলিফা আহমেদকে। লোকসভায় মমতাপন্থী বাকি ৮ জন সাংসদের দেখভালের জন্য বর্ষীয়ান নেতা সৌগত রায়কে দলের লোকসভা উইংয়ের চিফ অ্যাডভাইসার বা মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না হওয়ার পর থেকে দলের অভ্যন্তরে যে ফাটল তৈরি হয়েছিল, তা এবার দিল্লির দরবারে প্রকাশ্য রূপ নিল।