গত ২ বছরে দেশের ২৩ টি আইআইটিতে ড্রপ আউট ২৪০০ পড়ুয়া, তার মধ্যে অর্ধেকই এসসি, এসটি, ওবিসি সম্প্রদায়ভুক্ত

আইআইটি বা আইআইএমের মতো দেশের উৎকর্ষ শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হয়েও মাঝপথেই পড়া ছেড়ে দেওয়ার নজির দেশে নতুন নয়। কিন্তু সম্প্রতি এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে বলে অনেকদিন ধরেই দাবি করে আসছিলেন শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষরা। এবার সামনে এল এক সরকারি তথ্য, যেখানে দেখা যাচ্ছে গত ২ বছরে ২৪০০ র বেশি পড়ুয়া মাঝপথেই ছেড়ে দিয়েছে আইআইটির পাঠ। ড্রপ আউট পড়ুয়াদের মধ্যে অর্ধেকই সংরক্ষিত ক্যাটেগরি, অর্থাৎ এসসি, এসটি এবং ওবিসি ভুক্ত।
গত সপ্তাহে সংসদে এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট পেশ করেছে কেন্দ্র। তাতে দেখা যাচ্ছে ২,৪৬১ জন পড়ুয়া দেশের ২৩ টি আইআইটি থেকে ড্রপ আউট হয়েছেন। তার মধ্যে ১২৯০ জন জেনারেল এবং বাকি ১,১৭১ জন পড়ুয়া এসসি, এসটি এবং ওবিসি ক্যাটেগরির।
ড্রপ আউটের হারে সবচেয়ে এগিয়ে দেশের পুরনো আইআইটিগুলো। এই তালিকায় শীর্ষে দিল্লি আইআইটি। সেখান থেকে ৭৮২ জন ড্রপ আউট হয়েছে। দিল্লির ঠিক পিছনে দেশের প্রাচীনতম খড়গপুর। সেখানে পড়া ছেড়েছে ৬২২ জন। তারপর বম্বে আইআইটির ২৬৩ জন এবং ১৯০ জন পড়ুয়া মাঝপথে কানপুর আইআইটি ছেড়েছেন। মাদ্রাজ আইআইটি থেকে ড্রপ আউটের সংখ্যা ১২৮ জন। সারা দেশে ২৩ টি আইআইটিতে প্রতি বছর মোট ৯ হাজার ছাত্র নেওয়া হয় স্নাতক স্তরে এবং ৮ হাজার পড়ুয়া নেওয়া হয় স্নাতকোত্তর কোর্সে।
কেন্দ্রের তরফে সংসদে জানানো হয়েছে, তারা ড্রপ আউট সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। আইআইটিগুলোকেও এই মর্মে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়ারা পড়াশোনায় কেমন করছেন, কোনও বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে অতিরিক্ত ক্লাসের মাধ্যমে তাঁদের সাহায্য করা সহ নানা পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই নিয়েছে সংশ্লিষ্ট আইআইটিগুলো। পাশাপাশি, তুলনামূলকভাবে পড়াশোনায় দুর্বল পড়ুয়াদের কাউন্সেলিং এবং পরিবারের সদস্যদেরও নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের কাজও চলছে বলে মন্ত্রক সূত্রে খবর।
কিন্তু দেশের সবচেয়ে ভালো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাপক হারে ড্রপ আউটের কারণ কী? কারণ খুঁজতে গিয়েই বেরিয়ে পড়ছে দেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসা জাতপাতের ভেদাভেদের কঙ্কাল। সংসদে পেশ করা হিসেব থেকেই বোঝা যাচ্ছে, সংরক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে ড্রপ আউটের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তাহলে কি দেশের প্রিমিয়ার ইন্সস্টিটিউশনের রন্ধ্রে রন্ধ্রেও ঢুকে পড়েছে জাতি ভেদের অন্ধকার? সরাসরি এই অভিযোগ মেনে না নিলেও দেশের আইআইটি, বিশেষ করে পুরনো আইআইটিগুলোতে যে জাতি এবং শ্রেণি সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, তা প্রকারান্তরে মেনে নিয়েছেন একাধিক আইআইটির অধ্যাপক।
বি টেক স্তরে পড়ুয়াদের ড্রপ আউটের মূল কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পড়ার চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা। এই সমস্ত ক্ষেত্রে দেখা যায় বেশিরভাগ ছাত্র, ছাত্রীই আসছেন হিন্দি মিডিয়াম থেকে। ফলে তাঁদের ইংরেজিতে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লি আইআইটির এক শিক্ষক বলছেন, যাঁরা স্নাতক স্তরেই আইআইটি ছেড়ে দিচ্ছেন, তাঁদের বেশিরভাগই সংরক্ষিত ক্যাটেগরির। পিছিয়ে পড়া শ্রেণির পড়ুয়ারা আইআইটির দ্রুত তালের সঙ্গে শুরুতেই মানিয়ে নিতে পারেন না। সেই সঙ্গে এসসি, এসটি কিংবা ওবিসিদের জন্য আইআইটি ক্যাম্পাসের মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে আইআইটি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন অনেকেই।

Comments
Loading...