(৩ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে কিষেণজি মৃত্যু রহস্য। প্রতি মঙ্গলবার এবং শুক্রবার প্রকাশিত হচ্ছে এই দীর্ঘ ধারাবাহিক। প্রতি পর্বে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে। সেখানে ক্লিক করলে আগের পর্ব পড়তে পারবেন।)

 

চল্লিশ বছর পর: বেলপাহাড়ি, ২০০৬ 

সন্ধে ছ’টা-সাড়ে ছ’টা বাজে। অফিসে বসে আছি। মানে, সেই সময়ের স্টার আনন্দ (পরবর্তীকালে এবিপি আনন্দ) অফিসে। হঠাৎ খবর এল, ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি এলাকায় পুলিশের কনভয়ে হামলা চালিয়েছে মাওবাদীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যে খবরের গুরুত্ব বেড়ে গেল এক ধাক্কায়। প্রাথমিকভাবে জানা গেল, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার অজয় নন্দের কনভয়ে হামলা হয়েছে। পুলিশের উদ্যোগে বেলপাহাড়ির একটা গ্রামে বিনা পয়সার স্বাস্থ্য শিবির চলছিল সকাল থেকে। গ্রামের মানুষের প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা, চোখ পরীক্ষা ইত্যাদি। বিকেলে স্বাস্থ্য কর্মীরা ফিরছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল পুলিশের গাড়ি। বেলপাহাড়ি থানা থেকে সামান্য দূরেই তারাফেনি ব্যারেজ। এই ব্যারেজ পার হয়েই অখ্যাত এক গ্রাম হাতিডোবা। গ্রামে ঢোকার ঠিক আগে বিরাট মাঠ। বিকেল সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ এই মাঠেই মাটির রাস্তায় পুলিশ এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের গাড়ির কনভয়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে মাওবাদীরা।
কিছুক্ষণ পরে জানা গেল, পুলিশ সুপার নিজে ওই কনভয়ে ছিলেন না। তিনি দুপুর স্বাস্থ্য শিবিরে গিয়ে ফিরে এসেছিলেন। শিবির শেষ করে বিকেলে যখন বাকিরা ফিরছিলেন, তখন ল্যান্ডমাইন ফাটায় মাওবাদীরা। পুলিশের একটা বড় ভ্যান ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত পাঁচ-ছ’জন পুলিশ কর্মীর।
সেটা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ। সামনেই বিধানসভা ভোট। অফিস বলল, তখনই বেরিয়ে যেতে। রাত আটটা নাগাদ ক্যামেরাম্যান ভগীরথ শর্মাকে সঙ্গে নিয়ে অফিস থেকে রওনা দিলাম বেলপাহাড়ির উদ্দেশে। সাবালক সাংবাদিক হিসেবে মাওবাদী এলাকায় আমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। ১৯৯৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রিভিউ করতে আজকাল পত্রিকার পক্ষ থেকে মেদিনীপুর জেলা এবং ঝাড়গ্রামে গিয়েছিলেন সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। আমি তখন আমহার্স্ট স্ট্রিটে আজকাল অফিসের নিউজ রুমে বসে থাকি সাংবাদিকতা শেখার সুযোগ পাওয়ার জন্য। একদিন এমনই বসে ছিলাম। চিফ রিপোর্টার শুভাশিস মৈত্র বললেন, ‘শ্যামলদা জেলায় যাচ্ছে। সঙ্গে চলে যা, কাজ শিখতে পারবি।’ শ্যামল জেঠু বলে ডাকতাম। চলে গেলাম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম। একটা নতুন জায়গায় গেলে সেই এলাকার চরিত্র, সেখানকার মানুষ, রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং অর্থনীতি বোঝার মতো বয়স হলেও, অভিজ্ঞতা ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে আমার ছিল না।
২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক বিকেলে বেলপাহাড়ি থানার তারাফেনি ব্যারেজের কাছে পুলিশ কনভয়ে মাওবাদীদের ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাই সেদিক থেকে বললে আমাকে সাংবাদিক হিসেবে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে প্রবেশের প্রথম ভিসা এনে দিল। তারপর থেকে বারে বারে অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েছি এই তিন জেলায়। সবচেয়ে বেশি পশ্চিম মেদিনীপুর। বেলপাহাড়ি, জামবনি, বিনপুর, লালগড় থেকে বারিকুল, বান্দোয়ান, সারেঙ্গা, গোয়ালতোড়, বিভিন্ন এলাকার নাম না জানা হাজারো ছোট ছোট গ্রাম এবং সেখানকার মানুষ, তাঁদের বেঁচে থাকা, লড়াই, রাজনৈতিক এবং আইন-শৃঙ্খলার পালাবদল, সব কিছুই আমার সাংবাদিক এবং ব্যক্তি জীবনকে প্রভাবিত করেছে। জঙ্গলমহলে বারবার খবর করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই শিখিয়েছে, শক্তিশালী এবং দুর্বলের লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকার মানে হল, শক্তিশালীকেই সমর্থন জানানো।
রাত ১২টা-সাড়ে ১২টা হবে। ঝাড়গ্রাম শহরে পৌঁছলাম আমি আর ভগীরথ। প্রথমেই ঢুকলাম হাসপাতালে। মৃত এবং জখম পুলিশ কর্মীদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল আগেই। মফস্বল শহরের হাসপাতাল, তায় মাঝরাত। নিরাপত্তা রক্ষীর কোনও বালাই নেই। আর পুলিশই তো আক্রান্ত, কে কার নিরাপত্তা দেবে। হাসপাতালে ঢুকে জখম কয়েকজন পুলিশ কর্মীর ছবি এবং বাইট নিয়ে দ্রুত অফিসে পাঠালাম। তারপর রওনা দিলাম বেলপাহাড়ির দিকে। রাত দেড়টা-দুটো হবে, অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছে গাড়ি। কিছুই চিনি না, জানি না। জানি না কখন পেরোলাম দহিজুড়ি মোড়, কখন শিলদা। অন্ধকারে বুঝতে পারছি না কোথায় রাস্তার ধারে গ্রাম আর কোথায় জঙ্গল। মনে নেই ঠিক কতক্ষণ, এক ঘন্টার কাছাকাছি হবে, পৌঁছলাম বেলপাহাড়ি থানার সামনে। গোটা রাস্তায় একটা জনপ্রাণী নেই, আলোও নেই। গা ছমছমে পরিবেশ। থানার সামনে পৌঁছে দেখি রাস্তায় টিমটিমে দুটো হলুদ বাল্ব জ্বলছে। গাড়ি থেকে নামলাম। সেই মাঝরাতে বেলপাহাড়ি থানার সামনের রাস্তা এবং পাশের মাঠে যেন সাংবাদিকদের মেলা বসেছে। ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুরের প্রায় সব সাংবাদিক হাজির। আমার চেনা এক সাংবাদিকের দেখা পেলাম, ই-টিভির বুদ্ধদেব সেনগুপ্ত। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক তখনও বাকি ছিল। থানার লোহার দরজা বন্ধ। যেমন তেমন বন্ধ নয়, একেবারে দেড় কিলো ওজনের বড় তালা মারা! পুলিশ তালা মেরে থানায় বসে আছে, মাওবাদী এলাকায় অ্যাসাইনমেন্টে আমার, যাকে বলে কিনা প্রথম মেন্টাল শক। পরে এই জিনিস মাওবাদী প্রভাবিত এলাকার আরও বহু থানায় দেখেছি। এমনকী দিনের বেলাতেও।
ফেব্রুয়ারির মাঝরাতে শিরশিরানি ঠান্ডায় বেলপাহাড়ি থানার বাইরে রাস্তায় বসে আলোর ফোটার অপেক্ষা করা ছাড়া কিচ্ছু করার নেই। কারণ, মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে কাজ করা অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা বলল, ‘ভোর হলে পুলিশ স্পটে যাবে। তখন পুলিশের সঙ্গে পিও’তে (প্লেস অফ অকারেন্স) যেতে হবে। এটাই মাওবাদী এলাকায় কাজের নিয়ম। মাওবাদীরা আর কোন কোন জায়গায় ল্যান্ডমাইন পেতে রেখেছে কেউ জানে না। তাই রাতে রিস্ক নেওয়া অ্যালাউড নয়।’ কিন্তু আমি আর ভগীরথ যে মাঝরাতে ঝাড়গ্রাম থেকে এতটা রাস্তা গাড়ি করে চলে এলাম, সেখানেও তো ল্যান্ডমাইন পাতা থাকতে পারত। ভাগ্যিস ছিল না, নাকি ছিল? কে জানে! এই হচ্ছে কিচ্ছু না জেনে একটা নতুন জায়গায় যাওয়ার সুবিধে। ল্যান্ডমাইনের ব্যাপারে বেশি জানলেই ভয় করত, তবে কি আর ওই নিঝুম মাঝরাতে যেতে পারতাম বেলপাহাড়ি? সাংবাদিক জীবনে পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার দেখেছি, অভিজ্ঞতা আমাকে ভীত করেছে। অভিজ্ঞতা এবং বয়স বৃদ্ধির এটা এক গুরুতর সমস্যা।
মশা ছাড়া ওই রাতে বেলপাহাড়ি থানার বাইরে অবশ্য আর কোনও সমস্যা আমাদের ছিল না। হঠাৎ গোঁ গোঁ শব্দে তাল কাটল আড্ডায়। দেখি থানার ভেতরে একটা বড়সড় গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে, আর অল্প অল্প নড়ছে। ভোর প্রায় পাঁচটা। ঘন অন্ধকার কেটে হাল্কা আলোর রেখা ফুটতে শুরু করেছে। আবার সেই গোঁ গোঁ শব্দ করে দানবের মতো দেখতে গাড়িটা থানার ভেতর থেকে এগিয়ে এল গেটের কাছে। একজন পুলিশ কর্মী তালা খুললেন থানার লোহার গেটের। গাড়িটা বেরিয়ে এল গেটের বাইরে। বাঁদিকে, মানে যেদিকে তারাফেনি ব্যারেজ যাওয়ার রাস্তা সেদিকে ঘুরে দাঁড়াল। গাড়ির চেহারা দেখেই একটা সম্ভ্রম হয়। কে মনে নেই, এক সাংবাদিক গাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অ্যান্টি ল্যান্ডমাইন ভেহিকেল। এটা আগে আগে যাবে রাস্তার কোথাও ল্যান্ডমাইন পোঁতা আছে কিনা দেখতে।’ অবাক চোখে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়া ছাড়া কিছু করার নেই আমার। এমন গাড়ি দেখিইনি আগে কখনও।
মিনিট দশেকের মধ্যে আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে তখন। থানা থেকে বেরতে শুরু করল একের পর এক পুলিশের গাড়ি। লাইন দিয়ে দাঁড়াল ওই অ্যান্টি ল্যান্ডমাইন ভেহিকেলের পেছনে। প্রতিটা গাড়িতে সশস্ত্র পুলিশ। কিছুক্ষণ আগেই ভোর চারটে নাগাদ থানায় এসে পৌঁছেছেন আইজি (পশ্চিমাঞ্চল) বাণীব্রত বসু এবং রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল রজত মজুমদার। সাড়ে পাঁচটা-পৌনে ছ’টা নাগাদ সেই প্রকাণ্ড গাড়ি এগোতে শুরু করল আওয়াজ করে। পিছন পিছন পুলিশের বেশ কয়েকটা গাড়ি। প্রচুর ফোর্স এবং অফিসাররা এগোতে শুরু করলেন স্পটের দিকে, যেখানে আগের দিন বিকেলে মাওবাদীরা ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পড়িমড়ি আমরা সাংবাদিকরাও যে যার গাড়িতে উঠে বিশাল কনভয়ের পিছু নিলাম। থানা থেকে কয়েকশো মিটার এগিয়ে পিচ রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে মোরামের পথ ধরল লম্বা কনভয়। পেরোলাম তারাফেনি ব্যারেজ। হাল্কা কুয়াশার চাদর সরিয়ে তখন সকাল হচ্ছে রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের এক নাম না জানা গ্রামে। হাল্কা একটা ঠান্ডা আলগোছে জড়িয়ে রয়েছে এলাকায়। কিন্তু এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য তো আর এত গাড়ির কনভয় সাত সকালে যাচ্ছিল না বেলপাহাড়ির হাতিডোবা গ্রামে। কয়েক মিনিটের বাদেই পুরো কনভয় থেমে গেল। পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকার কোনও বড় ঘটনায় আমার প্রথম পিও (প্লেস আফ অকারেন্স) ভিজিট।
গাড়ি থেকে নামলাম। আর গাড়ি করে এগনো যাবে না। সামনে ১৫-২০টা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ভগীরথের হাতে ক্যামেরা, আমার হাতে মাইক, মোরামের রাস্তা ধরে হেঁটে কয়েক পা এগোতে প্রথমেই চোখে পড়ল, মাঠে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে কালো রঙের বড় একটা পুলিশ ভ্যান। মোরামের রাস্তায় পাঁচ-ছ’ফুট গর্ত। রাস্তার ঠিক পাশে মাঠে উলটে পড়ে আছে ভ্যানটা। মানে এখানেই ফেটেছে ল্যান্ডমাইন। ভগীরথ তাড়াতাড়ি ছবি তুলতে শুরু করেছে। কিন্তু পরের দৃশ্য দেখে মাথা ঘুরে গেল। ফুট বিশেক দূরে মাঠে পড়ে রয়েছে একটা কাটা হাত। কনুই থেকে আঙুল পর্যন্ত একটা হাত মাটিতে পড়ে। কোনও এক পুলিশ কর্মীর। আরও কিছুটা দূরে গোড়ালি থেকে একটা কাটা পা। পায়ে জুতোটা লেগে রয়েছে আলগাভাবে। কেমন তীব্রতা ছিল বিস্ফোরণের তা বোঝার জন্য রাস্তা থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন হাত-পাগুলোই যথেষ্ট। পুলিশের সিনিয়র অফিসাররা মনোযোগ দিয়ে বিস্ফোরণের স্পট, উলটে থাকা গাড়ি দেখছেন। গায়ে জলপাই রঙের পোশাক, কাঁধে এ কে ৪৭ রাইফেল, জেলার পুলিশ সুপার অজয় নন্দ মাঠে ঘুরে ঘুরে দেখছেন। আমরা সাংবাদিকরাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘুরছি। দেখছি বিস্ফোরণের ভয়াবহতা। মাঠের নানান জায়গায় পড়ে আছে আহত-নিহত পুলিশ কর্মীদের দেহের বিভিন্ন অংশ। আর সেই ছিন্নভিন্ন মাংসের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে মাথায় ফুট পঞ্চাশেক উঁচুতে উড়ছে চিল-শকুনের দল।

 

রামজীবন মুর্মু, ২০০৯ 

রামজীবন মুর্মু। ১৯৬৬ সালের গ্রীষ্মে রামজীবনের বয়স ছিল ছ’বছর। সেই যে ছেলেটা পেটে ক্ষিধে নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল উঠোনে পড়ে থাকা মরা মায়ের দিকে। একবার মাটিতে পড়ে থাকা মাকে দেখছিল, একবার দেখছিল গাড়ি করে তাদের বাড়িতে আসা পুলিশকে। যার বাবা মহাদেব মুর্মু মাঠের কাজ থেকে ফিরে ক্ষিধের জ্বালায় স্ত্রীকে ধাক্কা মেরে তখন থানায় বসে আছে। যে হাড়গিলে বাচ্চা ছেলেটাকে দেখে ঝাড়গ্রামের প্রথম এসডিপিও তুষার তালুকদার উপায় খুঁজছিলেন, কীভাবে স্ত্রী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত সাঁওতাল মানুষটাকে মুক্তি দেওয়া যায়। না হলে যে বাচ্চাটা ভেসে যাবে। সেই বাচ্চা ছেলেটাই রামজীবন মুর্মু।
এই রামজীবনকে যখন আমি প্রথম দেখি, সেটা ২০০৯ সালের এপ্রিল। প্রায় ৫০ বছরের রামজীবনের চেহারায় তখন অলরেডি সিনিয়র সিটিজেনের ছাপ। এক একজনের চেহারা পঞ্চাশেই এমন হয়ে যায়, দেখে বয়স বোঝা যায় না। ৬০ হতে পারে, ৬৫-৬৭ ও হতে পারে। ২০০৯ এর এপ্রিলে আমার তেমনই একটা মানুষ লেগেছিল রামজীবনকে। মাথায় গুড়িগুড়ি করে কাটা সাদা-কালো চুল। গালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। গায়ে ধূসর একটা ফুলহাতা জামা। একটা লাল গামছা পরে বাড়ির উঠোনে বসে বিড়ি খাচ্ছিলেন রামজীবন। দেখে মনে হচ্ছে সবে স্নান করে এসেছেন। গলায় লাল সুতোয় বাঁধা মন্ত্রপূত তাবিজ আর বুকে ঘষঘষে কাশি। কোটরে ঢোকা কালো দুটো চোখ, ওজন মেরেকেটে ৫০ কিলোগ্রাম। বাড়ির এবং রামজীবনের চেহারা জানান দিচ্ছে, তখন তাঁর পার্মানেন্ট সঙ্গী একাকিত্ব আর দারিদ্র্য।
বউ মারা গেছে তিন বছর আগে। তাঁর মায়ের মতো যক্ষা রোগে নয়, চারদিনের জ্বরে। একমাত্র ছেলে শিবরাম। শিবরাম মুর্মু। শিবরামের বয়স কুড়ি পেরিয়েছে, কখন যে কোথায় থাকে রামজীবন খোঁজ রাখেন না তেমন। ২০০৯ সালের এপ্রিল, সকাল আর দুপুরের মাঝামাঝি একটা সময় তখন, একে-তাকে জিজ্ঞেস করে জামবনির এক অখ্যাত গ্রামে রামজীবনের বাড়ির সামনে গিয়ে থামল আমার কলকাতার নম্বর প্লেটওয়ালা গাড়ি। প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট রামজীবনের শিড়া বেরনো পাকানো শরীরটা উঠে দাঁড়াল বাড়ির সামনে এসে থামা গাড়ি দেখে। একটু ছোট হল কোটরে ঢোকা দুটো চোখ, ভ্রু কুচকে উঠল সামান্য। তারপর উঠোন পেরিয়ে আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে এলেন কয়েক পা। হয়তো ভাবলেন, ‘এত বড় গাড়ি চেপে কেন একজন এসেছে আমার খোঁজে?’ তবে বড় গাড়ি তাঁর এই বাড়ির সামনে এই প্রথম এল না, আগেও এসেছে। সেই ঘটনা পরে।
‘আচ্ছা, আপনিই রামজীবন মুর্মু?’ চার-পাঁচ জায়গায় গাড়ি থামিয়ে রাস্তার লোককে জিজ্ঞেস করতে করতে এসে পৌঁছেছি অবশেষে। গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা হেঁটে এগোলাম তাঁর বাড়ির দিকে। তখনও ভ্রু কুঁচকে একবার আমার দিকে, একবার আমার গাড়ির দিকে তাকাচ্ছেন মাঝবয়সী লোকটা। গত ছ’মাসে তাঁর বাড়ির উঠোনে পুলিশ এসেছে বহুবার। কিন্তু একা একজন লোক কেন আসবে তাঁর কাছে? বোধয় এমনই ভাবছেন অবাক চোখে। আবার বললাম, ‘রামজীবন মুর্মুর খোঁজে এসেছি।’
‘আমিই রামজীবন মুর্মু।’
মাটির বাড়ি, সামনে ছোট উঠোনে পাতা একটা খাটিয়া। খাটিয়ার পাশে রাখা বিনা হাতলের একটা লাল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার। বাড়িটার পাশেই কয়েকটা বাঁশ গাছ। তাতে চেন দিয়ে বাঁধা একটা পুরনো সাইকেল।
‘আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছি।’
‘আমার সঙ্গে?’ চোখের বিস্ময় আর শূন্যতা কাটতেই চায় না লোকটার।
বসলাম খাটিয়ায়। যেমন খাটিয়া পাতা থাকে জাতীয় সড়কের ধারের ছোটখাট ধাবায়। রামজীবন বসলেন চেয়ারে।
ঠিক কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। তাকিয়ে আছি তাঁর দিকে। রামজীবনও কিছুটা অবাক চোখে দেখছেন আমাকে। খানিকটা ইতস্তত করে তবে শুরু করলাম। ‘আসলে আমি এসেছি কলকাতা থেকে। আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল। আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসব বলে অনেক দিন ধরে ভাবছি।’
‘কেন? কী কথা?’
‘আপনার কথা, মানে একটা ঘটনার কথা আমি পড়েছি বইয়ে। একদম ছোটবেলার  কথা আপনার মনে আছে?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘হ্যাঁ, কেন? কী পড়েছেন?’ কৌতুহল রামজীবন মুর্মুর গলায়।
ভাবছি কখন একটু স্বাভাবিক হবে লোকটার চেহারা। বুঝতে পারছি, একটা অচেনা লোক তাঁর খোঁজে এসেছে জেনে রামজীবন যতটা না অবাক হয়েছে, তার চেয়েও বেশি বুঝে নিতে চাইছে, এই মানুষটার আসার উদ্দেশ্যটা কী?
‘একটা বইয়ে আমি আপনার কথা পড়েছি। এক পুলিশ অফিসার লিখেছিলেন। প্রায় ৪৩-৪৪ বছর আগের একটা ঘটনা। আপনার মা মারা গিয়েছিলেন।’
‘বইয়ে লিখেছে এ’কথা? কেন, কে লিখেছে?’
‘হ্যাঁ, একজন পুলিশ অফিসার, তিনি সেই সময় ঝাড়গ্রামে চাকরি করতেন। যখন আপনার মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তিনি তখন এসেছিলেন আপনাদের এই বাড়িতে। তদন্তের কাজে। অনেক পরে তিনি একটা বই লেখেন। সেখানে এই ঘটনাটা আছে। বইটা পড়ার পর থেকে অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম, আপনার বাড়ি যাব। দেখব আপনি কেমন আছেন এখন। কী করছেন? পরশু ঝাড়গ্রামে এসেছি অফিসের কাজে। তাই এলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’
মন দিয়ে শুনলেন। কী ভাবছেন বুঝতে পারলাম না। তবে আমার প্রতি যে একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি ছিল, তা মনে হল অল্প অল্প কাটছে রামজীবনের। ‘একটু বসুন। আসছি।’ উঠে দাঁড়ালেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মানুষটা। বাড়ির বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছিলাম কিছুক্ষণ যাবৎ। এবার দেখলাম, বাড়ির বারান্দার একদিকে একটা কাঠের আড়াল। সেটা ঠেলে ভেতরে গেলেন রামজীবন। হয়তো কিছু রান্না বসানো আছে। দেখতে গেলেন। একা বসে আছি। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছি এদিক-ওদিক। বাড়িতে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট।। উঠোনে বাঁশ গাছ থেকে অন্য গাছে একটা দড়ি টাঙানো। দড়িতে একটা লুঙ্গি আর তিনটে গেঞ্জি ঝুলছে। বারান্দার এক পাশে জড়ো করে রাখা অনেক কাঠ। উনোন জ্বালানোর। গোটা দুয়েক ঝুড়ি উলটে রাখা। চোখে পড়ার মতো জিনিস বলতে সাকুল্যে এই। আর একটা ছোট্ট শিশি উঠোনের এক কোনায় রাখা। বোধয় সর্ষের তেল, স্নানের আগে গায়ে মাখার। শিশিটার পাশেই একটা গা ঘষার ঝামা। উঠোনের দড়িতে একটা ভেজা গামছাও ঝুলছে।
এক, দুই, তিন…মিনিট, অপেক্ষা করছি। মোবাইল ফোনে ফুল টাওয়ার। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন বেলপাহাড়ির হাতিডোবা গ্রামে এসেছিলাম পুলিশ কনভয়ে বিস্ফোরণের ঘটনায়, সব জায়গায় মোবাইল সিগনাল ছিল না। যেখানে বিস্ফোরণটা ঘটেছিল, সেখানে সিগনাল এত খারাপ ছিল, মনে আছে অফিসে কথা বলতে বলতে বারবার মোবাইল ফোন কেটে যাচ্ছিল। তিন বছরে এই একটা বড় চেঞ্জ হয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। গ্রামের রাস্তার দেওয়াল, ল্যাম্প পোস্টে এখন শুধু আর দাদ-হাজা সারানোর ওষুধ, গুপ্ত রোগের চিকিৎসা, মদ ছাড়ানোর পোস্টার কিংবা সার, কীটনাশকের বিজ্ঞাপন নেই। যোগ হয়েছে মোবাইল ফোন, সিম কার্ডের বিজ্ঞাপনও। বহুজাতিক সংস্থা পা ফেলেছে মাওবাদী সভ্যতাতেও। সাত-পাঁচ ভাবছি বসে বসে। ভাবছি, কতটা পাল্টেছে রামজীবন মুর্মুর জীবন। উদার অর্থনীতি কতটা প্রভাব ফেলেছে তাঁর ব্যবহারিক জীবনে? হঠাৎ ভাতের গন্ধ এল। আর তার এক মুহূর্ত পরেই বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন রামজীবন। এতক্ষণে বোঝা গেল তাঁর বাড়ির ভেতরে যাওয়ার কারণ। ভাত বসানো ছিল, নামিয়ে এলেন। এই সময়টা লাগল ভাতের ফ্যান গালতে।
‘সব কথা তো মনে নেই। অত পুরনো কথা! কিন্তু আমাদের কথা কেন লিখেছে বইয়ে?’ চেয়ারে এসে বসে আবার একটা বিড়ি ধরালেন রামজীবন। এখনও বিস্ময় কাটছে না তাঁর।
‘তবুও, যতটা মনে আছে! লিখেছে, আপনার বাবার ধাক্কায় পড়ে গিয়ে মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। পুলিশ প্রথমে আপনার বাবাকে ধরে, পরে ছেড়ে দিয়েছিল।’
‘বাড়িতে খুব অভাব ছিল। দু’বেলা খাবার ছিল না। প্রায় রোজই আমরা একবেলা খেতাম। অনেকদিন ভাতও হোত না। আমাদের জমি-জায়গা ছিল না একটুও। বাবা একজনের জমিতে চাষের কাজ করতো। তখন তো চাষও হোত না ভাল। জল কোথায়? মার কথা খুব অল্প মনে আছে। বাবা-মা’র ঝগড়া হোত খুব। খাবার নিয়ে। অন্য কিছু নিয়েও। সব মনে নেই। বড় হয়ে আশপাশের বাড়ির লোকের মুখে শুনেছি। যেদিন মা মারা গেল, সেদিনও হয়েছিল। তবে এটা মনে আছে, বাড়িতে সেদিন বিরাট ভিড় হয়েছিল। ঝগড়া, ঝামেলা তো প্রায়ই হোত। কিন্তু সেদিন যে কিছু একটা হয়েছে বুঝেছিলাম বাড়ির সামনে ভিড় দেখে। মা ওখানে পড়ে যাওয়ার পর (হাত দিয়ে উঠোনের জায়গাটা দেখালেন রামজীবন) বাবা স্নান করতে চলে গেল দাসদের পুকুরে। আমি মাকে ডাকলাম। অনেকবার ধাক্কা দিতে মা চোখ খুলল। কী একটা বলল আমায়। মনে নেই। রোগা হাতটা তুলে আমার মাথায় দিল। তারপর আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল মা। বুঝলাম না। কিছুক্ষণ বাদে বাবা ফিরে এল। তখনও মা শুয়ে আছে মাটিতে। গামছাটা দড়িতে মেলে বাবা ডাকল মাকে। কোনও শব্দ নেই। আবার ডাকল বাবা। তারপর নীচু হয়ে ধাক্কা দিল। তাও সাড়া দিল না মা। পাশের মাহাতোদের বাড়ির ছোট বউ আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে এল। মায়ের গায়ে, নাকে হাত দিয়ে দেখল, তারপর বলল, ‘‘মাসি তো বেঁচে নাই গো।’’ শুনেই দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল বাবা। আমি তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আস্তে আস্তে গ্রামের লোকজন সব আসতে শুরু করল বাড়িতে। ভিড় হয়ে গেল। ভিড় দেখে মনে হয়েছিল, কিছু একটা হয়েছে। অনেকক্ষণ বাদে পুলিশ এসেছিল গাড়িতে চেপে। কিন্তু বাবা এল না। থানার লোক তো তখন গ্রামে যেত না। গ্রামে ঘুরত চৌকিদার। সবাই বলল, বাবা পালিয়েছে। কিন্তু বাবা পালাবে কেন? বাবা তো কিছু করে নাই। শুধু একটা ধাক্কা দিয়েছিল মাকে। সে তো ধাক্কাধাক্কি দু’দিন আগেও হয়েছিল। এ তো এখানে সব বাড়িতেই হয় রোজ। বাবা নিজেই থানায় চলে গেছিল মা মরার সঙ্গে সঙ্গে। বাবা কিন্তু মাকে মারতে চায়নি।’
যেভাবে লিখলাম, ঠিক সেভাবে নয়। মাঝে মধ্যে ভেবে, কখনও থেমে থেমে বলে থামলেন রামজীবন। শূন্য দৃষ্টি। কী যেন ভাবছেন, আবার বলছেন। কথা বলতে বলেতে বিড়ি নিভে গেল দুবার। এই শূন্য দৃষ্টিটাই কি সেই ’৬৬র বিকেলে দেখেছিলেন ঝাড়গ্রামের প্রথম এসডিপিও তুষার তালুকদারও? আজ রামজীবনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন গল্পের বইয়ের জাতিস্মর। আগের জন্মের কথা স্মৃতির সিন্দুক থেকে বের করছেন ধুলো ঝেড়ে! একটু হয়তো অগোছালো, অবিন্যস্ত।

কী হয়েছিল আগের পর্বে? পড়ুন: কিষেণজি মৃত্যু রহস্য #তিন

‘আমি তখনও বুঝিনি কী হয়েছে ঠিক। কিছুক্ষণ বাদে মাকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ। জানতাম না কোথায়। তার আগেই আমার মামা-মামি বাড়িতে চলে এসেছিল। পাশের গ্রামে থাকত মামারা। বাবা কোথায় চলে গেছে কেউ জানে না। কেউ বলতেও পারল না। অনেককে জিজ্ঞেস করেছিলাম। পুলিশ মাকে নিয়ে যাওয়ার পর মামারা আমাকে নিয়ে গেল। ঘরে কিচ্ছু ছিল না নিয়ে যাওয়ার মতো, আমি একাই মামার হাত ধরে বাড়ি ছেড়ে গেলাম। শুধু মনে আছে, মোড়ের সহদেবদের দোকান থেকে একটা পাউরুটি কিনে আমার হাতে দিয়েছিল মামা। খেতে খেতে মামা-মামির সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম। কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাবা কোথায়? মা কোথায়? মামা কিছু বলেনি। পরদিন পুলিশের বড় গাড়ি এল গ্রামে। মামা বাড়ির সামনে এসে থামল। মামা মাঠে গেছিল কাজে। পুলিশের লোক মামিকে কী সব বলল।  মামি আমাকে বলল, মামাকে ডেকে আনতে। দৌড়ে গেলাম মামাকে খবর দিতে। তারপর মামা আর আমি আবার দৌড়ে ফিরলাম বাড়ি। ফিরে দেখি সাদা কাপড়ে মোড়া মায়ের বডি বাড়ির সামনে মাটিতে নামিয়ে রেখেছে পুলিশ। আশপাশের কিছু লোকও তার মধ্যে জড়ো হয়ে গেছে মামা বাড়ির উঠোনে। মামা পুলিশকে জিজ্ঞেস করল বাবার কথা। তার বেশ কিছুক্ষণ পরে গ্রামের কয়েকজন মিলে মাকে নদীর ধারে নিয়ে গেল। আমিও গেলাম। মাকে পুড়িয়ে আসার পর মামা বলেছিল, বাবাকে পুলিশ ধরেছে। মা মারা যাওয়ার পর বাবা নিজেই পুলিশকে খবর দিতে চলে গেছিল থানায়। বাবা কবে ফিরবে বলতে পারল না কেউ। কিন্তু আমি জানতাম বাবা তো কিছু করেনি। ভেবেছিলাম বাবা ফিরলে বাড়ি ফিরব। আর বাড়ি ফেরা হল না। মামা বাড়িতে থেকে গেলাম।’ বিড়ি ধরাতে থামলেন রামজীবন।
‘আপনার এই বিড়ি কি খুব কড়া?’
‘হ্যাঁ, কেন?’
‘না, এমনি। তারপর কী হল?’
‘এভাবে দিন কাটতে থাকল। মামা সকালে চাষের কাজে বেরিয়ে যেত। আমি এদিক-ওদিক ঘুরতাম। বাবা নেই, মা নেই। কিন্তু বাবা-মা’র কথা মনে পড়ত। জানতাম মা আর ফিরবে না, কিন্তু বাবা কবে ফিরবে মাঝে-মাঝে জিজ্ঞেস করতাম মামাকে। মামি অবশ্য খুব ভালবাসত আমায়। তারও অনেকদিন পর বাবা ফিরল। বিকেলে বাড়ি গেছিল, সেখানে আমাকে না পেয়ে চলে এল মামা বাড়ি। বলল, পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু মামলা চলবে। বলল, রোগেই মারা গেছে মা। সেদিন অনেক রাত অবধি বাবা, মামা, মামি কথা বলল। আমি সব শুনছিলাম। ঠিক হল, বাবা আর আমি মামা বাড়িতেই থাকব। রাতে মামা-মামি ঘরে চলে গেল শুতে। বারান্দায় মাটিতে মাদুর পেতে বিছানা করল বাবা। আমি বাবার সঙ্গে শুয়ে পড়লাম। এই প্রথম বাবার সঙ্গে শুলাম আমি। আগে শুতাম মায়ের সঙ্গে। মামা বাড়িতে এসে ঘুমিয়েছিলাম মামির পাশে। মাঝরাতে একবার ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে দেখি, বাবার একটা হাত আমার বুকের ওপর। তখনও বাবার চোখ খোলা। ওপর দিকে চেয়ে আছে। ডাকলাম বাবাকে। বাবা বলল ঘুমিয়ে পড়তে।’

চলবে

 

(৩ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে কিষেণজি মৃত্যু রহস্য। প্রতি মঙ্গলবার এবং শুক্রবার প্রকাশিত হচ্ছে এই দীর্ঘ ধারাবাহিক। প্রতি পর্বে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে। সেখানে ক্লিক করলে আগের পর্ব পড়তে পারবেন।)

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us