নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল #১০: নিরুপম সেনকে ফোন শুভেন্দু অধিকারীর! পুলিশ পাঠাবেন না, সর্বনাশ হবে

আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছিল:  পার্টির চাপ আর নিতে পারলেন না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, পুলিশকে নির্দেশ দিলেন নন্দীগ্রামে অভিযান চালাতে। তাড়াহুড়ো করে বিনা প্রস্তুতিতে অপারেশন প্ল্যান করল পুলিশ…

 

নন্দীগ্রামে ১৪ মার্চের অভিযান নিয়ে আগের দিন ১৩ তারিখ পূর্ব মেদিনীপুরে কোলাঘাটের একটি অডিটোরিয়ামে পুলিশের মিটিং হয়। ঠিক মিটিং নয়, মূলত ব্রিফিং। সেই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অনিল শ্রীনিবাস, এন রমেশবাবু, অরুণ গুপ্তা এবং জেলার একাধিক পুলিশ অফিসার। এছাড়াও ছিলেন অন্যান্য জেলা থেকে ডিউটি করতে যাওয়া বহু অফিসার। সেই বৈঠকে আলোচনা হয় পরের দিনের প্ল্যানিং নিয়ে। ঠিক হয়, খেজুরির দিক দিয়ে পুলিশ ঢুকবে। মূলত দুটো ভাগে ভাগ করা হবে পুরো বাহিনীকে। মূল বাহিনীকে মোতায়েন করা হবে ভাঙাবেড়া ব্রিজে, যার নেতৃত্বে থাকবেন এসপি অনিল শ্রীনিবাস। তাঁর সঙ্গে থাকবেন হলদিয়ার অতিরিক্ত পুলিশের সুপার তন্ময় রায়চৌধুরি এবং খেজুরি থানার ওসি অমিত হাতি। ভাঙাবেড়া থেকে সোনাচূড়া হয়ে গড়চক্রবেড়িয়া পর্যন্ত গোটা এলাকা তখন ভুমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির দখলে। অন্যদিকে, আর একটা বাহিনী থাকবে তেখালি ব্রিজে। যেখানকার পুলিশ তেখালি ব্রিজ থেকে নেমে পূর্ব দিকে এগোবে। সেই ফোর্সটা গোকুলনগর অধিকারীপাড়া হয়ে পৌঁছবে সোনাচূড়ায়। তেখালি ব্রিজের এই ফোর্সের নেতৃত্বে ছিলেন দুই পুলিশ অফিসার, সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তমলুকের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবাশিস বড়াল। এই তেখালির ফোর্সের সঙ্গে থাকবেন নন্দীগ্রাম থানার ওসি শেখর রায়। অন্য একটা ছোট ফোর্স থাকবে আইপিএস বিশাল গর্গের নেতৃত্বে। আরও ঠিক হয়েছিল, আইজি অরুণ গুপ্তা নিজে থাকবেন খেজুরি থানায় এবং ডিআইজি এন রমেশবাবু থাকবেন তেখালি পুলিশ ফাঁড়িতে।

অরুণ গুপ্তা এবং রমেশ বাবুর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল দিঘার পুলিশ গেস্ট হাউসে। ১৩ মার্চ মিটিংয়ের পর অরুণ গুপ্তা দিঘা রওনা হওয়ার আগে রমেশবাবুকে বললেন একসঙ্গে গেস্ট হাউসে যাওয়া জন্য। রমেশবাবু জানিয়েছিলেন, তাঁর একটু কাজ আছে, তিনি পরে যাবেন। অরুণ গুপ্তা একাই দিঘা চলে যান। ডিআইজি বেশি রাতে দিঘায় পৌঁছেছিলেন। সেদিন পুলিশের ব্রিফিং হয়ে যাওয়ার পর ডিআইজি এন রমেশবাবু, এসপি অনিল শ্রীনিবাস এবং জেলার আর আই দেবাশিস গাঙ্গুলি কী করছিলেন, কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত তদন্ত করা উচিত ছিল সিবিআইয়ের। পাশাপাশি তদন্ত করার দরকার ছিল, সেই সন্ধ্যায় তমলুকের সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠে, খেজুরির সিপিআইএম নেতা হিমাংশু দাস বা বিজন রায়রা কী পরিকল্পনা করছিলেন পরদিনের অভিযান নিয়ে। বিশেষ করে ১৪ তারিখ সকালে নন্দীগ্রাম ও খেজুরিতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ঢুকতে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা কোন কোন পুলিশ অফিসার ও সিপিআইএম নেতা জানতেন, সেই তদন্ত হলেই স্পষ্ট হয়ে যেত যৌথ অভিযানের তত্ত্ব। নন্দীগ্রামে পুলিশ নয়, বরং সিপিআইএমের সশস্ত্র বাহিনীকে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার একটা চক্রান্ত হচ্ছিল ১৪ মার্চের কয়েকদিন আগে থেকে। সেই সময় এক সিনিয়র পুলিশ অফিসার সে কথা বলেওছিলেন  আইজি অরুণ গুপ্তাকে। তিনি অরুণ গুপ্তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ‘পুলিশের নন্দীগ্রামে ঢোকার কোনও দরকার নেই, তাতে ঝামেলা হতে পারে। তার থেকে বরং সিপিআইএম ঢুকুক নন্দীগ্রামে। ঘরছাড়া সিপিআইএমের পরিবারগুলোর সঙ্গে থাকুক ক্যাডাররা। সেখানে দু’পক্ষের গণ্ডগোল হলে পুলিশের কোনও দায় থাকবে না।’ সেই পুলিশ অফিসারের এই প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিলেন আইজি। এই ঘটনার কয়েকদিন পর পুলিশ অভিযান হয় নন্দীগ্রামে। তখন কিন্তু অরুণ গুপ্তা আঁচ করতে পারেননি, পুলিশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সিপিআইএমের বেশ কিছু সশস্ত্র ক্যাডার নন্দীগ্রামে ঢুকে পড়বে।

১৪ মার্চ ঘটনার পর তদন্তে নেমে পরে সিআইডি জানতে পেরছিল, অভিযানের কয়েকদিন আগে সিপিআইএমের এক সাংসদ ফোন করেছিলেন শিশির অধিকারীকে। সেই সময় এগরার তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক শিশির অধিকারীকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, ‘তাঁরা নন্দীগ্রামে যে আন্দোলন করছেন, করুন। কিন্তু পুলিশকে যেতে দেওয়া হোক। এভাবে একটা বিস্তীর্ণ এলাকায় রাস্তা কাটা, কোনও প্রশাসন নেই, এটা বেশি দিন চলতে পারে না। পুলিশ গিয়ে রাস্তা সারাবে, পঞ্চায়েতগুলো কাজ শুরু করবে।’ সিপিআইএম সাংসদের এই প্রস্তাব নিয়ে শিশির অধিকারী কথা বললেন ছেলে শুভেন্দুর সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে এই প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দু বুঝেছিলেন, রাস্তা সরানোর নাম করে পুলিশ একবার নন্দীগ্রামে ঢুকে গেলে সেখানকার আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ পুরোদস্তুর হাতে রাখা অনেকটা কঠিন হয়ে যাবে।

কারণ, মূলত দুটো। প্রথমত, নন্দীগ্রামে আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক হয়ে গেলে সিপিআইএম সেখানে ঢুকে পড়বে। ২০০৪ সালে তমলুক লোকসভা ভোটে লক্ষ্মণ শেঠের কাছে পরাজিত শুভেন্দু অধিকারী জানতেন, আর একটা লোকসভা নির্বাচন মাত্র দু’বছর দূরে। নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের রাশ নিজের হাতে থাকলে তমলুক আসন জেতা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। শুভেন্দু জানতেন, বিধানসভায় বামফ্রন্ট যতই ২৩৫ হোক না কেন, পূর্ব মেদিনীপুর ঐতিহাসিকভাবে সিপিআইএম বিরোধী জেলা। কাঁথি, এগরা, রামনগর তো বটেই, তমলুক, মহিষাদল, কোলাঘাট বিধানসভাগুলোতে তৃণমূলের প্রভাব যথেষ্টই। শুভেন্দু অধিকারী বুঝেছিলেন, সিঙ্গুরে গাড়ি কারখানার জন্য চিহ্নিত জমিতে যতই পাঁচিল তোলার কাজ হোক না কেন, গ্রাম বাংলায় জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের রাশ নিজের হাতে রাখা জরুরি ছিল তাঁর কাছে। এই পরিস্থিতিতে সিপিআইএম নন্দীগ্রামে ঢুকে গেলে আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

অন্যদিকে, সিপিআইএমের থেকেও তখন শুভেন্দু অধিকারীর কাছে বড়ো রাজনৈতিক বিপদ হয়ে উঠছিল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি নামক বহুদলীয় জোট। নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের রাশ তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে থাকবে, না ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি যৌথ নেতৃত্ব দেবে তা নিয়ে নীরবে টানাপোড়েন শুরু হয়ে গিয়েছিল। শুভেন্দু জানতেন, নন্দীগ্রামে পুলিশ ঢুকে গেলে এবং জমির সমস্যা মিটে গেলে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি টিকিয়ে রাখায় মুশকিল হয়ে যাবে। আর তা ভেঙে গেলে শক্তিহীন হয়ে পড়বে তৃণমূল কংগ্রেস। তিনি চাইছিলেন ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি থাকুক এবং তার চালিকাশক্তি থাক তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে। এই আন্দোলনের রাশ কার হাতে থাকবে, কে নেতৃত্ব দেবে নন্দীগ্রামের মানুষকে তা নিয়ে ১৪ মার্চের পরে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে মাওবাদীদের টানাপোড়েন আরও বেড়েছিল। যা ব্যাপক চেহারা নিয়েছিল ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের সময় প্রার্থী দেওয়াকে কেন্দ্র করে। তাই ১৪ মার্চের পুলিশি অভিযান প্রায় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও শুভেন্দু অধিকারী চাইছিলেন তা যে করে হোক বন্ধ করতে।

 

যখন পরিষ্কার হয়ে গেল, সরকার নন্দীগ্রামে পুলিশ পাঠাবেই তখন তা ঠেকানোর একটা শেষ চেষ্টা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ১২ মার্চ যখন নন্দীগ্রামে অভিযান নিয়ে মহাকরণে পুলিশ অফিসারদের মিটিং চলছিল, সেই দিন প্রায় একই সময়ে বিধানসভায় আলোচনা হচ্ছিল রাজ্যপালের বক্তৃতা নিয়ে। বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে। সেই আলোচনায় অংশ নিয়ে দক্ষিণ কাঁথির বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী সেদিন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘ভুল করেও নন্দীগ্রামে পুলিশ ঢোকানোর চেষ্টা করবেন না। তাতে সর্বনাশ হবে। নন্দীগ্রামের মানুষের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভাঙতে সিপিআইএম আক্রমণ চালাচ্ছে। এর মধ্যে পুলিশ অভিযান মানুষ মেনে নেবে না।’ প্রায় একই সুরে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক সৌগত রায়ও সেদিন বিধানসভায় বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা থাকলে মুখ্যমন্ত্রী নন্দীগ্রামে ঢুকে শিল্পের কথা বলুন।’ বিরোধী দলের দুই বিধায়কের বক্তব্যে কর্ণপাত করেননি ২৩৫ জন বিধায়কের নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বিধানসভায় বলেও কোনও কাজ না হওয়ায় ১৩ মার্চ শুভেন্দু অধিকারী তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেনকে মহাকরণে ফোন করেন। নিরুপম সেনের কাছে নন্দীগ্রামে পুলিশ না পাঠানোর আর্জি জানান শুভেন্দু। বলেন, পুলিশ নন্দীগ্রামে ঢুকলে সর্বনাশ হবে। কিন্তু তা নাকচ করে দেন সিপিআইএম পলিটব্যুরো সদস্য এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার দু’নম্বর নিরুপম সেন। পুলিশ অভিযান অনিবার্য বুঝে তা মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন  দক্ষিণ কাঁথির বিধায়ক।

তৃণমূল কংগ্রেসর পরিকল্পনা ছিল, পুলিশ বাহিনীকে ঠেকানোর জন্য মানব প্রাচীর গড়ে তোলা হবে। আয়জন করা হবে পুজো-আর্চার। কাঁসর, ঘন্টা, শাঁখ বাজিয়ে হিন্দু মহিলাদের সকাল থেকেই পুজা শুরু করার পরামর্শ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে সেদিন মাঠেই নামাজ পড়ার কথাও বলেন তিনি। সেই মতো কয়েক হাজার পুরুষ মহিলা এবং বাচ্চা ১৪ তারিখ ভোররাতে জড়ো হলেন ভাঙাবেড়া ব্রিজের কাছে। মহিলা এবং বাচ্চারা থাকলেন প্রথম সারিতে। আয়োজন করা হয়েছিল পুজোর। পিছনে পুরুষরা। শুভেন্দুর ধারণা ছিল, পুজো-আর্চা দেখে পুলিশ আর এগোবে না। কিন্ত পুলিশ মোকাবিলার ১৪ তারিখ ভোর থেকে ভাঙাবেড়া ব্রিজ এবং তেখালি ব্রিজ সংলগ্ন গোকুলনগর, অধিকারীপাড়ায় পুজো-আর্চার যে পরিকল্পনা শুভেন্দু অধিকারী নিয়েছিলেন, তার বিরোধিতা করেন মধুসূদন মন্ডল এবং আরও কয়েকজন। মধুসূদন মন্ডল এবং ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির কয়েকজনের বক্তব্য ছিল, পুজোর আয়োজন করে পুলিশ ঠেকানো যাবে না। পুলিশ সাধারণ মানুষকে লাঠিপেটা করে নন্দীগ্রামে ঢুকে পড়বে, তখন আর কিছু করার থাকবে না। তার থেকে বরং সিপিআইএমের মতো পুলিশকে প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নেওয়া হোক। দু’পক্ষের মতবিরোধের জেরে ১৩ তারিখ সাময়িক বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছিল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের একটা বড়ো অংশের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছিল শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যই। কিন্তু মধুসূদন মন্ডলদের বক্তব্যও পুরোপুরি খারিজ হয়নি। পুলিশ ঠেকানোর জন্য ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে দুটো পরিকল্পনারই কিছু কিছু অংশ গৃহিত হয় ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আলোচনায়। সরাসরি পুলিশকে সশস্ত্র আক্রমণের পরিকল্পনা প্রথমে বাতিল হয়। ঠিক হয় ব্যাপক আকারে পুজো-আজানের ব্যবস্থা করা হবে মহিলা এবং বাচ্চাদের সামনে রেখে। তার সঙ্গে থাকবেন শ’য়ে শ’য়ে  সাধারণ গ্রামবাসী। অন্যদিকে, আগের দিন থেকেই ভাঙাবেড়া ব্রিজের কাছে কয়েক জায়গায় ইট, পাথর জড়ো করতে শুরু করেছিল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সশস্ত্র বাহিনী। প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় রাস্তার কাজের জন্য সেখানে এমনিতেই ইট, পাথর জমা করা ছিল। তাতে আন্দোলনকারীদের সুবিধেই হয়ে যায়। কৌশল ছিল, পুলিশ যদি পুজো দেখে ফিরে যায়, ভাল। কিন্তু যদি পুজো ভাঙতে এগোয়, তবে প্রাথমিকভাবে ইট, পাথর ছুড়ে প্রতিরোধ করা হবে। পুরুষদের অধিকাংশের হাতে ছিল লাঠি, বাঁশ। সেই সঙ্গে মজুত রাখা ছিল হাতে তৈরি প্রচুর বোমা। ইট, পাথরে কাজ না হলে বোমা। মূলত ত্রিস্তরীয় প্রতিরোধ। একদম সামনের সারিতে মহিলা, বাচ্চা, বয়স্কদের পুজো, নামাজ পাঠ। সেই ব্যারিকেডের পিছনে ইট, পাথর। পুলিশ এগোলে দরকারে বোমা। মোট কথা, যেভাবেই হোক, ঠেকাতে হবে পুলিশ বাহিনীকে। কোনও মূল্যেই পুলিশ ঢুকতে দেওয়া যাবে না নন্দীগ্রামে। কারণ, সিঙ্গুরের অভিজ্ঞতা তখনও টাটকা, পুলিশই সরকারের জমি অধিগ্রহণের প্রধান হাতিয়ার।

 

একদিকে যখন ১৩ মার্চ সকাল থেকে নন্দীগ্রামের ভিতরে গ্রামবাসীরা পুলিশ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে সেই দিন বিকেল থেকেই সারি সারি পুলিশের গাড়ি ঢুকতে শুরু করল খেজুরিতে। খেজুরি কলেজে করা হয়েছিল ক্যাম্প। জেলার নানান জায়গা থেকে গাড়ি গাড়ি পুলিশ পৌঁছাতে লাগল খেজুরি কলেজে। যুদ্ধকালীন নোটিশ পেয়ে অন্য কয়েকটি জেলা থেকেও প্রচুর পুলিশ অফিসার বিকেলে গিয়ে সরাসরি যোগ দিলেন খেজুরি কলেজে। থাকার চূড়ান্ত অব্যবস্থা। প্রায় গোয়ালঘরের মতো কয়েকটা জায়গায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল কয়েকজন পুলিশ কর্তার। তাঁরা অনেকেই অবশ্য সেখানে না থেকে কাঁথিতে চলে গিয়েছিলেন। ঠিক হয়েছিল, পরদিন সকাল সাড়ে ছ’টায় অভিযান শুরু হবে। সেই মতো সব অফিসারকে খেজুরি কলেজে জড়ো হতে বলা হয়েছিল।

 

১৪ মার্চ, ২০০৭

 

১৪ই মার্চ ২০০৭। সকাল সকাল অধিকাংশ পুলিশ অফিসার পৌঁছে যান খেজুরি কলেজে। অরুণ গুপ্তার সঙ্গে দিঘা থেকে খেজুরির দিকে রওনা দেন এন রমেশবাবু। যাওয়ার সময় রাস্তায় একের পর এক সাংবাদিকের ফোন পেতে থাকেন দু’জনে। সব ফোনেই এক প্রশ্ন, ‘সিপিআইএমের লোকজন নন্দীগ্রাম এবং খেজুরিতে ঢোকার সমস্ত রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। এর কারণ কী? দু’জনেরই উত্তর ছিল, ‘দেখছি।’ আমি নিজে একাধিকবার ফোন করি দু’জনকে। দু’জনেই জানান, তাঁরা অবরোধের কথা কিছু জানেন না। আগের সন্ধ্যার কথা মনে করে ফোন করলাম লক্ষ্মণ শেঠকে। ফোন বন্ধ। সিপিআইএমের সবচেয়ে বড় অবরোধ নন্দীগ্রামে ঢোকার চন্ডিপুরের মোড়ে এবং খেজুরিতে ঢোকার মোড় হেঁড়িয়াতে। দু’জায়গাতেই  ৮০-১০০ জন করে যুবকের জমায়েত। বাঁশের ব্যারিকেড করা। বেশ কয়েকজনের হাতে লাঠি ও বাঁশ। অধিকাংশের চোখ লাল, বোঝায় যাচ্ছিল আগের রাতে ঘুম হয়নি। সারা রাত ধরে চলছে পাহাড়া। দু’জায়গায়তেই তিন-চারজন করে নেতা গোছের লোক। মোটামুটি ভদ্রভাবে জানিয়ে দিলেন, ‘ভিতরে যাওয়া যাবে না। বারণ আছে’

‘কার বারণ আছে?’

‘তা বলতে পারব না, দরকার হলে আপনারা ওপরে কথা বলে নিন। আজ যাওয়া যাবে না।’

সাংবাদিকদের পর পর ফোন পেয়ে অরুণ গুপ্তা গাড়িতেই ডিআইজির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ব্যাপারটা কী, সিপিআইএম কেন রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। রমেশবাবু তাঁকে জানান, সিপিআইএমের নেতারা কেউ ফোন ধরছেন না, তাই তিনি বলতে পারবেন না কেন রাস্তা বন্ধ। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে প্রায় তিন-সাড়ে তিন ঘন্টা চন্ডিপুর, হেঁড়িয়ার মোড়ে ঘোরাঘুরি করে ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি, পুলিশ যে অভিযান করতে চলেছে তাতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে সিপিআইএমও। কিন্তু সিপিআইএমের প্ল্যানটা কী, কেন তারা সংবাদমাধ্যমকে ঢুকতে দিতে চাইছে না, তা তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়েছিল পরদিন, ১৫ মার্চ নন্দীগ্রামে ঢুকে। হাসপাতালে গিয়ে লোকের সঙ্গে কথা বলে।

ডিআইজি, আইজি তো অভিযান শুরু হওয়ার দু-আড়াই ঘন্টা আগে জেনে গিয়েছিলেন সিপিআইএমের এই নন্দীগ্রামকে অবরুদ্ধ করার ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই দিন সকাল থেকে কলকাতায় কী করছিলেন মহাকরণের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্তারা এবং ৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের শীর্ষ নেতৃত্ব? ১৩ তারিখ রাতেই কলকাতায় ফিরেছিলেন রাজ্য পুলিশের ডিজি অনুপভূষণ ভোরা। তাঁরা তো সকাল আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যেই টেলিভিশনে খবর দেখে জেনে গিয়েছিলেন, তিনদিক থেকে নন্দীগ্রাম অবরুদ্ধ করে ফেলেছে সিপিআইএম। সমস্ত টেলিভিশন চ্যানেলে তখন চন্ডিপুর এবং হেঁড়িয়াতে সিপিআইএম বাহিনীর অবরোধের খবর দেখানো হচ্ছে। কেন এই অবরোধ, কী চক্রান্ত করছে সিপিআইএম? শাসক দলের এই চক্রান্তের সঙ্গে পুলিশ যুক্ত কিনা, কেন তাঁরা ঢুকতে বাধা দিচ্ছেন সংবাদমাধ্যমকে, এই প্রশ্ন ডিজি অনুপভূষণ ভোরা, আইজি (আইন-শৃঙ্খলা) রাজ কানোজিয়া বা বিমান বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কারওর মাথায় এল না? এই শক্তিশালী টেলিভিশনের যুগে এও সম্ভব?

কেন ডিজি এবং আইজি (আইন-শৃঙ্খলা) কলকাতা থেকে অরুণ গুপ্তা কিংবা এন রমেশবাবুর কাছে ফোন করে জানতে চাইলেন না, টেলিভিশনে যা দেখানো হচ্ছে তা আদৌ সত্যি কিনা? কেনই বা অরুণ গুপ্তা বা এন রমেশবাবুও মহাকরণের কর্তাদের একথা জানাননি? আমি এখনও দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, কেউ কিছু জানতেন না, বা কেউ কিছু বুঝতে পারেননি, এটা হওয়া অসম্ভব। এই চার পুলিশ কর্তার পাশাপাশি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু সহ সিপিআইএম শীর্ষ নেতৃত্বই বা কেন সব খবর পেয়েও চুপ করে থাকলেন? হঠাৎ করে কোনও জায়গার একটা আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হলে একরকম। কিন্তু নন্দীগ্রামের মতো একটা জায়গা। আড়াই মাস আন্দোলনকারীদের হাতে অবরূদ্ধ। আগে পুলিশ আক্রান্ত হয়েছ, খুন পালটা-খুন হয়েছে একাধিক। তার সঙ্গে, সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজ্য তখন উত্তাল, এই পরিস্থিতিতে পুলিশ অভিযান হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে অফিসাররা যাচ্ছেন। সেখানে শাসক বাহিনীর ক্যাডাররা রাস্তা অবরোধ করে কেন পুলিশি অভিযান আড়াল করতে চাইছে, কী তাদের উদ্দেশ্য তা নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ হল না, এটা অসম্ভব এবং অবাস্তব।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সব জেনে বুঝেও কেউ তৎপর হলেন না এই চক্রান্ত ঠেকাতে? আসলে, নন্দীগ্রামের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একটা প্রতিশোধস্পৃহা কাজ করছিল সিপিআইএম নেতৃত্বের একটা বড়ো অংশের মধ্যে। তাই পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা পুলিশ ও সিপিআইএমের শীর্ষ স্তরের যোগসাজশে হওয়া এই চক্রান্ত আঁচ করা বা বুঝে যাওয়া সত্বেও তা ঠেকানোর কোনও উদ্যোগ ৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রিট এবং মহাকরণ নেয়নি। যার মারাত্মক মাশুল দিতে হল সিপিআইএম সরকারকে। আর নন্দীগ্রামের আন্দোলন দমন করতে রাজ্য সিপিআইএম তো আগেই পার্টি ক্যাডারদের সংসদ বহির্ভূত কার্যকলাপের অনুমোদন দিয়েছে। সেই দিন নন্দীগ্রাম শুধু মাত্র ১৪ জন মানুষের নয়, কার্যত বামফ্রন্ট সরকারেরই ডেথ সার্টিফিকেটে যৌথভাবে  সই করেছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের  প্রশাসন এবং বিমান বসুর পার্টি।

সেদিন সকালে জেলার বাইরের কয়েকজন অফিসার সাড়ে ছ’টা-পৌনে সাতটার মধ্যে খেজুরি কলেজে পৌঁছে গিয়েছিলেন। খেজুরি কলেজে তখন চূড়ান্ত অগোছালো অবস্থা। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অপেক্ষার পর তাঁরা রওনা দেন ভাঙাবেড়া ব্রিজের দিকে। তাঁদের সঙ্গে রওনা দিতে শুরু করে বিশাল ফোর্স। ভাঙাবেড়া ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছে তাঁরা অপেক্ষা করতে থাকেন সিনিয়র অফিসারদের জন্য। আটটা নাগাদ খেজুরি কলেছে পৌঁছলেন অরুণ গুপ্তা এবং এন রমেশ বাবু। তার খানিক পরে পৌঁছন এসপি অনিল শ্রীনিবাস। আগের দিনই ঠিক হয়েছিল, সকালে খেজুরি কলেজ থেকে ফোর্সকে মূলত দু’ভাগে ভাগ করে পাঠানো হবে ভাঙাবেড়া এবং তেখালি ব্রিজে। ভাঙাবেড়া ব্রিজে বড়ো ফোর্স নিয়ে যাবেন অনিল শ্রীনিবাস এবং হলদিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরি। তেখালির ফোর্স নিয়ে যাবেন তমলুকের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবাশিস বড়াল এবং সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফোর্স মুভমেন্টের পর খেজুরি থানায় চলে যাবেন অরুণ গুপ্তা এবং তেখালি ফাঁড়িতে যাবেন এন রমেশবাবু। কিন্তু খেজুরি কলেজে পৌঁছে আইজি, ডিআইজি জানতে পারলেন, বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কয়েকজন অফিসার ভাঙাবেড়ার দিকে রওনা দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে কিছু আরজি পার্টি এবং প্রচুর ফোর্স। এই খবর শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন আইজি অরুণ গুপ্তা। তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাওয়া সত্বেও কেন জেলার পুলিশ সুপার তখনও পৌঁছোননি তা অন্য অফিসারদের কাছে জানতে চান উত্তেজিত আইজি। তারপর এসপি পৌঁছানোর পর কেন তাঁকে ছাড়া ফোর্স রওনা দিল ভাঙাবেড়ার দিকে, তা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যেই চিৎকার করেন শ্রীনিবাস এবং তন্ময় রায়চৌধুরির ওপর। সেদিন সকালে খেজুরি কলেজ থেকে ফোর্স মুভমেন্ট যে কতটা অপরিকল্পিত এবং অগোছালোভাবে হয়েছিল তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ পরে তদন্তে গিয়ে পেয়েছিল সিআইডি। তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, ১৪ মার্চ নন্দীগ্রাম অপারেশনের যে ফোর্স গিয়েছিল, তাদের কারও কমান্ডিং সার্টিফিকেট কাটা হয়নি। কোনও পুলিশ কর্মী যখন কোনও ডিউটিতে যান তখন তাঁদের কমান্ডিং সার্টিফিকেট কাটা বাধ্যতামূলক। এতে লেখা থাকে সেই পুলিশ কর্মী বা অফিসার কোথায় যাচ্ছেন, কোন সময়ে যাচ্ছেন, কী ডিউটিতে যাচ্ছেন, ইত্যাদি। পুলিশ কোনও ডিউটিতে গেলে এই কমান্ডিং সার্টিফিকেট না কাটা পুলিশি ভাষায় অমার্জনীয় অপরাধ।

অথচ ১৪ মার্চ এত বিপুল পুলিশ অভিযান চললো, কোনও কমান্ডিং সার্টিফিকেট কাটা হল না! এটা কি শুধুমাত্র তাড়াহুড়োর জন্য ভুল, নাকি এর পিছনেও অন্য কোনও কারণ ছিল, তা নিয়েও সিরিয়াস তদন্ত করা দরকার ছিল। যা শুধু করা হয়নি তাই নয়, সিআইডি তদন্ত করার সময় পুলিশকে বাঁচাতে পরে ভুয়ো কমান্ডিং সার্টিফিকেট তৈরি করা হয়েছিল। নন্দীগ্রামের তদন্তে রাজ্যের গোয়েন্দা দফতর বা সিআইডি সরকারকে বাঁচাতে এরকম আরও একাধিক দায়িত্ব পালন করেছিল। তাতে ১৪ মার্চ ডিউটিতে থাকা পুলিশ অফিসাররা হয়তো রেহাই পেয়েছিলেন, কিন্তু সরকার বাঁচেনি। খেজুরি কলেজে পৌঁছে চূড়ান্ত অব্যবস্থা দেখে অরুণ গুপ্তা ঠিক করেন এসপি’র ওপর ভরসা না করে তিনি নিজেই যাবেন ভাঙাবেড়া ব্রিজে। তাঁর আশঙ্কা হয়েছিল, যে ফোর্স সেখানে পৌঁছে গিয়েছে তারা যদি নিজে থেকে কিছু করে ফেলে তবে গোলমালের হয়ে যেতে পারে। সেই সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ অফিসারদের আইজি’কে এই অভিযান নিয়ে যতটা উত্তেজিত লেগেছিল, ততটাই শান্ত লেগেছিল ডিআইজি এন রমেশবাবুকে। এই যে ছড়ানো, ছেটানো ফোর্স, কে কী করবে কোনও ঠিক নেই, চারদিকে সিপিআইএমের ব্যারিকেড, কোনও কিছু নিয়েই কোনওরকম হেলদোল ছিল না রমেশবাবুর। তিনি কিছুক্ষণ পরেই সেখান থেকে তেখালি পুলিশ ফাঁড়িতে চলে যান। কেন তিনি এত শান্ত ছিলেন, কোনও কিছুতেই নিজেকে জড়াননি তা রীতিমতো অবাক করেছিল খেজুরিতে এই সময়ে ডিউটিতে থাকা অনেক অফিসারকেই। আইজি অরুণ গুপ্তা, এসপি শ্রীনিবাসকে নির্দেশ দেন দ্রুত ভাঙাবেড়া ব্রিজে যেতে। শ্রীনিবাস এবং তন্ময় রায়চৌধুরি রওনা দেওয়ার পর অরুণ গুপ্তা নিজেও রওনা দেন সেই দিকে। সেদিন খেজুরিতে আইজি, ডিআইজি পৌঁছে যাওয়ার পর সেখানে গিয়েছিলেন জেলার পুলিশ সুপার, যা রীতিমতো নজিরবিহীন এবং আশ্চর্যজনক ঘটনা।

তালপাটি খালের ওপরে ছোট্ট ভাঙাবেড়া ব্রিজের দু’ধারে তখন দু’রকম পরিস্থিতি। ছোট্ট ২৫-৩০ মিটার লম্বা এই ব্রিজের উত্তর দিকে নন্দীগ্রাম। যেখানে মাঠে, রাস্তায়, খালের পাশে জড়ো হয়ে রয়েছেন চার-পাঁচ হাজার পুরুষ, মহিলা এবং বাচ্চা। মহিলারা বেশিরভাগই পুজো করছেন। অন্যদিকে, ব্রিজের দক্ষিণে খেজুরি। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েক’শো পুলিশ অফিসার এবং কর্মী। বেশ কয়েকজন ডিএসপি, এসডিপিও, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার অফিসার, যাঁদের অন্য জেলা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সওয়া ন’টা-সাড়ে ন’টা নাগাদ কয়েক মিনিটের আগে-পরে সেখানে পৌঁছন এসপি শ্রীনিবাস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরি এবং আইজি অরুণ গুপ্তা। পৌঁছেই সব কিছু এমন অগোছালো থাকার জন্য জেলার আর আই দেবাশিস গাঙ্গুলিকে প্রচণ্ড বকাঝকা করেন আইজি। এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, অপারেশন নন্দীগ্রাম।

 

পড়ুন আগের পর্ব: নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল#৯: কৃষকসভার ব্রিগেড ১১ মার্চ, সেদিনই নন্দীগ্রামে পুলিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের 

 

এরপর ঠিক কী ঘটল, তা লিখব দু’জন পুলিশ অফিসার আমাকে পরে যা বলেছিলেন হুবহু তাই। তাঁদের মুখে। শুধু তাঁদের পরিচয় গোপন করে। দু’জনেই ১৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরে পৌঁছেছিলেন দক্ষিণবঙ্গের অন্য দুই জেলা থেকে। ১৪ই মার্চ একজন ডিউটিতে ছিলেন ভাঙাবেড়া ব্রিজে, অন্যজন গোকুলনগর অধিকারীপাড়ায়।

 

এক অফিসারের অভিজ্ঞতা: ভাঙাবেড়া ব্রিজ

 

১৪ মার্চ আমি খেজুরি কলেজে পৌঁছেছিলাম সকাল সাতটা নাগাদ। সেখানে তখন চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থা। তখনও কোনও সিস্টেমেটিক ট্যাগিং শুরু হয়নি। কখন যে শুরু হবে তাও বোঝা যাচ্ছে না। জেলার কোনও সিনিয়র অফিসারও নেই। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি এবং আরও তিন-চারজন অফিসার ভাঙাবেড়া ব্রিজের দিকে রওনা দিলাম। আটটার মধ্যে ব্রিজের কাছে পৌঁছে গেলাম। ব্রিজের এক-দেড় কিলোমিটার আগে রাস্তার ধারে গিয়ে বসলাম। কখন অভিযান শুরু হবে, কী প্ল্যানিং কিছুই জানি না, কেউ কিছু বলেওনি। আমাদের কোনও ব্রিফিংও হয়নি। হয়তো অন্য জেলা থেকে গিয়েছিলাম বলে আমাদের কিছুই ব্রিফ করা হয়নি, কার কী দায়িত্ব। সাড়ে আটটা নাগাদ কিছু ফোর্স এল। ব্রিজের একটু আগে বসে নিজেরাই গল্প করছি। সাড়ে ন’টা থেকে পৌনে দশটার মধ্যে পরপর এলেন শ্রীনিবাস, তন্ময় রায়চৌধুরি এবং অরুণ গুপ্তা। ওঁরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বললেন, তারপর আমরা সবাই আস্তে আস্তে এগোলাম ব্রিজের দিকে। ব্রিজের কাছে পৌঁছে দেখি অন্য পারে বিরাট জমায়েত। কয়েক হাজার পুরুষ, মহিলা। সঙ্গে কিছু বাচ্চাও। আমাদের দেখে শাঁখের আওয়াজ আরও বেড়ে গেল। ব্রিজে দাঁড়িয়ে তন্ময় হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা শুরু করল, ‘আপনারা সব সরে যান, পুলিশ রাস্তা বানাতে এসেছে,’ ইত্যাদি। আমরা তখন ব্রিজে ওঠার ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি, ব্রিজের অন্য দিকে ইট পাঁজা করে রাখা। এক জায়গায় নয়, দু’তিন জায়গায় জড়ো করে রাখা প্রচুর ইট, পাথর। তন্ময় ঘোষণা শুরু করতেই অল্প অল্প করে ফোর্স ব্রিজে উঠতে শুরু করল। আমি ছিলাম মোটামুটি সামনের দিকে। ব্রিজের প্রায় মাঝখানে পৌঁছে গেছি, আর কয়েক পা এগোলেই নন্দীগ্রাম, শুরু হল ইট বৃষ্টি। দেখতে পাচ্ছি, ৪০-৫০ মিটার দূর থেক নাগাড়ে ইট, পাথর উড়ে আসছে আমাদের দিকে। থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। সামান্য থেমে আবার এগোলাম আস্তে আস্তে। এবার পড়ল বোমা। আমাদের একটু আগে ব্রিজের নীচে নন্দীগ্রামেরই রাস্তায় পড়ল প্রথম বোমাটা। তারপর আরও কয়েকটা। নন্দীগ্রামের দিক থেকে বোমা পড়তেই আমার পিছন থেকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ল পুলিশ। তখন কে যে পুলিশকে কী করতে অর্ডার দিচ্ছে বুঝতে পারছি না, কিন্তু এই কাঁদানে গ্যাস ছোড়াটাই সবচেয়ে ভুল হল। শীত চলে গেলেও তখন উত্তরে হাওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আমরা যেখানে ছিলাম তার উত্তর দিকে নন্দীগ্রাম। তাই সেই কাঁদানে গ্যাস তো কোনও কাজ করলই না, বরং হাওয়ায় ধোঁয়া আমাদের দিকেই ফিরে এল। আমাদেরই চোখ জ্বলতে শুরু করল মারাত্মকভাবে। নিজেদেরই ছোড়া কাদানে গ্যাসে তখন আমাদের অবস্থা কাহিল। বুঝলাম শুধু রুমালে কিছু হবে না। দৌড়ে নেমে এলাম ব্রিজ থেকে, কাছেই একটা কল ছিল। ভাল করে জল দিলাম চোখে। অনেকেরই তখন চোখ জ্বলছে। শুধু আমিই না, যারা কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছিল তারাও অনেকেই তখন চোখে জল দিতে ব্রিজ থেকে নেমে এসেছে। চোখে জল দিয়ে আবার গেলাম ব্রিজের ওপরে। তখন উলটো দিক থেকে টানা ইট উড়ে আসছে। ইট উপেক্ষা করেই আমরা কয়েক জন ব্রিজের ওপর দৌড় শুরু করলাম নন্দীগ্রামের দিকে। মাথায় হেলমেট ছিল, ২৫-৩০ মিটার দৌড়ে ব্রিজ পার হয়ে সোজা নন্দীগ্রামে নেমে গেলাম। গ্রামবাসীরাও কিছুটা দিশেহারা হয়ে গিয়েছে। দেখতে পাচ্ছি, তখনও কয়েকজন বেপরোয়াভাবে  ইট ছুড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অল্প অল্প করে পিছু হঠছে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, এভাবে বেশিক্ষণ ইট, পাথর, বোমা দিয়ে ওরা লড়াই করতে পারবে না। ইট বোমার সামনে এমন অভিজ্ঞতা আমার অনেক আছে। একসঙ্গে ৫০-৬০ জন তাড়া করলে সব পালাবে।

এমন সময় হঠাৎই গুলির শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফের পর পর গুলি চলল। আমি তখন ব্রিজ থেকে নেমে গেছি, নন্দীগ্রামের দিকে এগোচ্ছি। আমার সঙ্গে আরও তিন-চারজন। প্রথমে আওয়াজ শুনে বুঝতে পারিনি কোন দিক থেকে গুলি চলছে, কে গুলি চালাচ্ছে!

 

চলবে

(১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল। প্রতি পর্বে লাল রং দিয়ে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে)

Comments
Loading...