প্রণব মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ একবার আমাকে বলেছিলেন, প্রণববাবু হচ্ছেন অনেকটা ধ্রুপদী সঙ্গীতের মতো। যদি আপনি ধ্রুপদী সঙ্গীত না বোঝেন, আপনার কান যদি সেই সঙ্গীতের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হয়, তাহলে আপনার পক্ষে তার মজা পাওয়া কঠিন। প্রণব মুখোপাধ্যায়, তিনি প্রবীণ কংগ্রেস নেতা। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। এহেন এক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জয়রাম রমেশ বলেছিলেন, প্রণববাবুকে আপাতভাবে মনে হয় তিনি বোধহয় বড় নিরস ব্যক্তি। অর্থাৎ, দিল্লির মানুষজন যেভাবে কালারফুল চরিত্র খোঁজে এবং নানান রকমের তথাকথিত আধুনিক গেজেট, আধুনিক জীবনযাত্রা, নৈশপার্টি এসব থেকে সহস্র
যোজন দুরে থাকা মানুষটি চব্বিশ ঘন্টা ধরে রাজনীতি করতেন আর পড়াশোনা করতেন। তাঁর কাছে গেলে যে কোনও মানুষ শুনতে পেত, ইন্দিরা গান্ধীর আগে কংগ্রেস রাজনীতি কী ছিল। এমনও অনেক সময় হতো, ওনার কাছে গেলে হয়তো বলতেন, কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে কী হয়েছিল এবং তার থেকে কংগ্রেসের বিবর্তন কীভাবে হল। তো অনেক সময় ৫৬’ সালের কিংবা ৬২’ সালের সমস্ত রেফারেন্স শুনে অনেকে ভাবতেন প্রণববাবু বোধহয় আপাতভাবে বড় নিরস ব্যক্তিত্ব। কিন্তু জয়রাম রমেশের কথার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত যে, আসলে প্রণববাবুকে বুঝতে গেলে, প্রণববাবুর চরিত্রের চিত্তাকর্ষক ব্যক্তিত্বকে বুঝতে গেলে প্রণববাবুকে বুঝতে হয়।
প্রণববাবু কিন্তু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন অজয় মুখার্জির বাংলা কংগ্রেস থেকে। এবং বাংলা কংগ্রেসেরই প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ এ তিনি রাজ্যসভায় সদস্য হয়ে আসেন। এবং তারপর তিনি ইন্দিরা গান্ধীর চোখে পড়েন। এবং কীভাবে চোখে পড়েন? সেটাও খুব প্রচারিত একটি গল্প। ১৯৬৯ এ ইন্দিরা গান্ধী ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করতে চলেছেন। মোরারজি দেশাইয়ের মতো ব্যক্তিত্বকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরানো হয়েছে এবং এর পিছনে অনেক কারণের মধ্যে একটা কারণ ছিল, তিনি যে শুধু ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী সিন্ডিকেট রাজনীতির একটা অঙ্কুর তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন তা নয়, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শনটাও ছিল দক্ষিণপন্থী একটা দর্শন, যা ব্যাঙ্কের জাতীয়করণের বিরোধিতা করছিল। মোরারজির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সেরকম দক্ষিণপন্থী, যা বেসরকারিকরণ ও খোলাবাজারের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চাইছিল। সেখানে ইন্দিরা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার গুরুত্ব, ব্যাঙ্কের জাতীয়করণ এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতে চাইছিলেন। ঠিক সেরকম একটা সময় সংসদে বিতর্ক চলছে ব্যাঙ্কের জাতীয়করণ নিয়ে। তখন একদিন প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে এবং রাজ্যসভা অনেকটাই খালি, কোরাম হচ্ছিল না বলে ইন্দিরা গান্ধী চলে এসেছিলেন রাজ্যসভায়।
প্রণববাবু তখন বলছিলেন, কেন জাতীয়করণ দরকার। এবং বিরুদ্ধে যাঁরা ছিলেন তাঁরা তখন বলছিলেন, ব্যাঙ্ক হচ্ছে প্রাইভেট প্রপার্টি। সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পত্তির অধিকার হচ্ছে একটা মৌলিক অধিকার। সুতরাং ব্যাঙ্ক ন্যাশানালাইজেশন করা যাবে না। প্রণববাবু এরকম একটা সময়ে বক্তৃতায় একটা রেফারেন্স দেন লন্ডনে কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী রবার্ট টিলের। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী তখন সেখানে অ্যাবলিশন অফ স্লেভারি, অর্থাৎ দাসপ্রথা অবলুপ্ত করার জন্য
ব্রিটেনে আলাপ আলোচনা চলছে। এবং যাঁরা টিলের বিরোধিতা করছিলেন, তাঁরা এরকমই একটা যুক্তি দিয়েছিলেন, এটা একটা মৌলিক অধিকার। সুতরাং কোনওভাবেই স্লেভারি তোলা
যাবে না। শেষ পর্যন্ত কিন্তু তাঁরা হেরে গিয়েছিলেন। এই যুক্তি প্রাধান্য পেয়েছিল যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু বদলায়। সুতরাং মৌলিক অধিকারও আপেক্ষিক। ভারতেও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে, সুতরাং ব্যক্তিগত সম্পত্তির এই প্রাচীন ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে ব্যাঙ্ক ন্যাশানালাইজেশনের মতো কাজ করতে হবে।
ইন্দিরা গান্ধী নিজেই বিস্মিত হয়েছিলেন। খুশিও হয়েছিলেন। এবং তখন কংগ্রেসের মুখ্যসচেতক ওম মেহেতাকে উনি বলেন, কে এই যুবক? ওম মেহেতাই তখন ভালো করে প্রণববাবুকে চেনেন না। তারপর ওম মেহেতা খোঁজটোজ করে ইন্দিরা গান্ধীকে জানালেন।
কমিউনিস্ট নেতা ভূপেশ গুপ্ত খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর। তিনি বললেন প্রণববাবুর কথা। এবং তারপর থেকে প্রণববাবু নেক নজরে পড়ে গেলেন। ইন্দিরা গান্ধীর প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। ধীরে ধীরে বাংলা কংগ্রেস মার্জার হয়ে গেল কংগ্রেসের সঙ্গে এবং তারপরের ইতিহাস আমাদের সকলেরই সুবিদিত। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর নাম্বার টু হলেন। এবং তারপর নরসিংহ রাও, মনমোহন সিংহের জমানায়ও। রাজীব গান্ধীর সময় কিছুদিনের জন্য তিনি দল ছেড়েছিলেন। এবং তিনি বারবারই বলতেন, জীবনে যদি কোনও ভুল করে থাকি তাহলে সেটা হল কংগ্রেস ছাড়ার সিদ্ধান্তটা।
আমরা যখন সাংবাদিকতায় প্রবেশ করি ১৯৮৪ সালে, ঠিক তখনই তিনি রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস গঠন করেন এবং তখনই প্রণববাবুর সঙ্গে নির্বাচনে ঘুরতাম। খুব খারাপ অবস্থা দেখেছিলাম। কোনও জনসভায় মানুষ হোত না। তবু প্রণববাবু শেষ পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে রাজীব গান্ধীও নিজের ভুল বুঝতে পারেন। তারপরে প্রণববাবুকে আবার ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু রাজীব গান্ধী নিজেই নিহত হলেন। শুনেছি রাজীব গান্ধী তাঁকে অর্থমন্ত্রী করার একটা পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এআইসিসির ইকোনমিক সেলের প্রধান করেছিলেন। তাঁকে দিয়ে ইস্তেহারটাও রাজীব গান্ধী তৈরি করেছিলেন। কিন্তু রাজীব গান্ধী চলে গেলেন। এবং তাঁর মৃত্যুর পর একটা টালমাটাল রাজনীতির মধ্যে প্রণববাবু কিন্তু আরও ক্রাইসিস ম্যানেজার হয়ে উঠলেন।
প্রণববাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় ৮৪’ সালে। তখন হাওড়ার জেলা কংগ্রেসের সভাপতি অমিয় দত্ত, তিনি প্রণববাবুর দলে চলে গেলেন। আমরা ডাকতাম পাল্টুদা বলে। পাল্টুদা রামকৃষ্ণপুরে থাকতেন এবং আমাকে একদিন প্রণববাবুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন।
আমি প্রণববাবুর সাদার্ন অ্যাভেনিউয়ের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা করলাম। উনি একটা ডিভানের ওপর বসেছিলেন। ওনার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎকার। এবং তারপর দীর্ঘ সময় আমি প্রণববাবুর সঙ্গে দেশে-বিদেশে গিয়েছি। উনি কিন্তু মনে করতেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। এবং যখন উনি মনমোহন সিংহের সরকারে যোগ দিলেন, তখন খুব এক্সাইটেড ছিলেন না। যেদিন মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী হলেন, তিনিও ভাবছিলেন প্রণববাবুকে কী করা হবে। ওনাকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে। প্রথমে ওনাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দেওয়ার একটা কথা হয়েছিল। পরে আবার পরিবর্তন হল এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী করা হল। উনি সব কিছু বুঝতে পারতেন যে, কোথাও গান্ধী পরিবারের দিক থেকে একটা ট্রাস্ট ডেফিসিট, যেটি একজন কংগ্রেস নেতা আমাকে বলেছিলেন, ট্রাস্ট ডেফিসিটটা বোধহয় শেষ দিন পর্যন্ত ঘোচেনি। প্রণববাবু ইন্দিরা গান্ধীর নাম্বার টু ছিলেন। তাঁর পক্ষে আর অন্য কোনও নেতার অনুগত হওয়া খুব কঠিন ছিল। সীতারাম কেশরী থেকে শুরু করে কংগ্রেসের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন এবং সব সময়ে তিনি আমাকে একটা কথা বলতেন, যে পদে যিনি আছেন, সেই চেয়ারটাকে শ্রদ্ধা করি।
একটা মজার ঘটনা বলি, একদিন প্রণববাবুর ঘরে গেছি। আমি দাঁড়িয়ে আছি, ফাইলে কিছু একটা দেখছেন মনোনিবেশ করে এবং সই-টই করছেন। মাথাটা ওপর দিকে তোলেননি। তো আমি দাঁড়িয়ে আছি। মুখটা তুলে বললেন, কিরে তুই বসলি না? বোস। তখন উনি আমাকে একটা গল্প শোনালেন।
‘তোর দাঁড়িয়ে থাকা দেখে আমার একটা গল্প মনে পড়ল। আমি তখন ডেপুটি মিনিস্টার অর্থমন্ত্রকের। তখন যিনি অর্থসচিব ছিলেন বয়সে প্রণববাবুর থেকে বড়ো এবং তিনি এসে ওই রকম দাঁড়িয়েছিলেন. প্রণববাবু খেয়াল করেননি। তখন প্রণববাবু বললেন, কি হল আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। তখন সেই আমলা বলেছিলেন, বয়সে আমি আপনার থেকে বড়ো হতে পারি, কিন্তু আপনি মন্ত্রী। প্রোটোকল অনুসারে এইটা আমার মানা কর্তব্য। আপনি আমাকে বসতে বললে আমি বসবো, নচেৎ নয়। তারপর উনি ঠাট্টা করে আমাকে বললেন, তুই তো আর আমলা নোস, তুই তো সাংবাদিক তোর এত প্রোটোকল মানার কী আছে?
আজ প্রণববাবুর হঠাৎই চলে যাওয়ার পর অনেক কথা মনে পড়ছে। ব্যক্তি প্রণববাবু এক অসাধারণ চরিত্র। প্রণববাবু খাদ্যরসিক সেটা তো অনেকেই জানেন। প্রণববাবু কিন্তু উপোসও যেমন করতেন, খেতেও তেমন ভালবাসতেন। ওনার অনেক রকমের উপোস থাকত। প্রত্যেকদিন চন্ডীপাঠ করতেন। চন্ডীপাঠ করাটা তো এমন হয়েছিল যে, সোনিয়া গান্ধীও জেনে গিয়েছিলেন, সকালবেলা দশটার আগে প্রণবকে পাওয়া যায় না চন্ডীপাঠ করেন বলে।
প্রণববাবু সম্পর্কে আমি একটা জিনিস বলতাম, তা হচ্ছে, প্রণববাবুর মূল চরিত্রটি হচ্ছে একটা ঐক্যমত রচনার। তিনি কিন্তু কোনও দিনই কনফ্রনটেশনে যেতেন না। একবার রাজীব গান্ধীর সময় তিনি আহত হয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং আঘাত হানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। উনি কিন্তু হচ্ছেন গ্ৰেট নেগোশিয়েটর। ম্যানুপুলেট করা, রাজনীতিতে যা প্রয়োজন হয়, তার জন্য তাঁকে চাণক্য বলা হোত দেশের রাজনীতিতে। আমার বেশ মনে পড়ে, মনমোহন সিংহ যখন আর্থিক উদারবাদের রথ চালিয়ে দিয়েছেন, নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী। তিনি চাইছেন আর্থিক সংস্কার আর ঠিক সেই সময় অন্ধ্রপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন হল। দু’টাকা কিলোতে চাল দেওয়া হবে বলে একটা পপুলিস্ট মেজার নিলেন এনটি রামা রাও। এবং নরসিমা রাও নিজের রাজ্যেই পরাস্ত হলেন এনটি আর এর কাছে। তখন সবাই গেল গেল রব তুলল। মনমোহন সিংহকে দায়ী করতে লাগল সংস্কারের জন্য। সেরকম একটা সময়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক এবং প্রণববাবু তখন যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যান। উনি বললেন, এর মাঝামাঝি একটা জায়গা বার করতে হবে। অর্থাৎ, আর্থিক সংস্কার হবে, কিন্তু ”with human face”। প্রণববাবু বললেন, এমন একটা জিনিস করতে হবে যাতে
লাঠিও না ভাঙে সাপও মরে। প্রণববাবুর চরিত্রের এটাই একটা বড় বৈশিষ্ট, উনি সবসময় ক্রাইসিস ম্যানেজার। সঙ্কটমোচন করেন। এবং তিনি সবসময় একটা মাঝামাঝি জায়গা বের করতে পারেন।
প্রণববাবু কিন্তু সোনার চামচ নিয়ে তো জন্মাননি। বাবা স্বাধীনতা সংগ্ৰামী কংগ্রেস নেতা ছিলেন। কিন্তু প্রণববাবু ভারতীয় রাজনীতিতে কোনও এলিটিস্ট অভিজাত তেলা মাথায় তেল দেওয়া একটা পরিবার থেকে উঠে আসেননি। তবু তিনি পেরেছেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন, সাংবিধানিক প্রধান হয়েছেন। এবং আরেকটা মানুষ সহজে কিন্তু পাওয়া যাবে না, যিনি পারিবারিকভাবে রাজনীতির ক্ষেত্রে খুব কুলীন ছিলেন না। কিন্তু অনেক কম বয়েসে তিনি আস্তে আস্তে নিজেকে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে ঋদ্ধ করেন।
সুভাষ চন্দ্র বোস থেকে শুরু করে চিত্তরঞ্জন দাশ, বিভিন্ন সময়ে দিল্লি বিরোধী একটা রাজনীতি করেছেন। প্রণববাবু কিন্তু একজন বিরল বাঙালি যিনি দিল্লি বিরোধী রাজনীতি না করে জাতীয় মূল স্রোতের একজন হয়ে উঠলেন।
২০১২ সালের ২৫ জুলাই প্রণববাবু দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করেন। তার আগে তিনি দু’বার বিদেশমন্ত্রী হয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী হয়েছেন। যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হয়েছেন। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হয়েছেন। লোকসভায় কংগ্রেসের নেতা হয়েছেন। প্রধানন্ত্রী ছাড়া এমন কোনও শীর্ষপদ নেই তিনি আসীন হননি।
ভারত দু’রকম রাষ্ট্রপতি পেয়েছে। একটা হল জৈল সিংহ, তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে বসে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীল নকশা রচনা করতে চেয়েছিলেন এবং ব্যর্থ হন। আবার অন্যদিকে অনুগত, কখনই কোনও মতপার্থক্যের পরিচয় দেননি প্রতিভা পাটিল। প্রণববাবু এক্ষেত্রে মাঝামাঝি একটা জায়গা নিয়েছিলেন। উনি আমাকে বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি সংবিধানে জাঁকজমকপূর্ণ সাক্ষী গোপাল। ক্যাবিনেট যা বলবে রাষ্ট্রপতি সেটা মেনে চলবেন। রাষ্ট্রপতির যদি কোনও বিল নিয়ে আপত্তি থাকে সেটা পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন। আর সংবিধান অনুসারে ক্যাবিনেট যদি সেটা আবার ফেরত পাঠিয়ে দেয়, রাষ্ট্রপতি সই করতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে আমি সেটা সংবাদমাধ্যমে জানিয়ে দিতে পারি। এবং সংবাদমাধ্যমে খবর হয়ে যাবে রাষ্ট্রপতি ক্ষুদ্ধ। কিন্তু প্রণববাবু সেটা করতে চাননি। উনি একদিকে যেরকম প্রতিভা পাটিলও হননি, আবার জৈল সিংহও হননি। ওনার কিছুতে আপত্তি থাকলে সেটা প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে জানাতেন। প্রধানমন্ত্রী যেতেন, আলোচনা হোত।
যেমন উনি ইজরায়েল যাচ্ছেন। অন্য কোনও রাষ্ট্রপতির আর ওনার যাওয়ার মধ্যে তফাৎ ছিল, উনি দুবার বিদেশমন্ত্রী হয়েছেন। উনি যখন ইজরায়েল গেছেন তখন প্যালেস্তাইনও যেতে চাইলেন। ওনার যে টাইম টেবিল ক্যাবিনেট বানিয়েছিল তাতে প্যালেস্তাইন সফর ছিল না। তখন ইজরায়েলের সাথে মোদী সরকার কথা বলে ও ইজরায়েল সরকার জানায়, তাদের কোনও আপত্তি নেই। কেননা তাদের ক্ষেত্রেও প্যালেস্তাইনের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক বদলে গেছে। এরপর ওনার ইচ্ছে অনুসারে সেইভাবে টাইমটেবিল ও সফরসূচি তৈরি করা হল এবং প্রণববাবু প্যালেস্তাইনে গেলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে উনি কিন্তু একটা সক্রিয় ভুমিকা নিয়েছিলেন কোনও বিদ্রোহ বা অসন্তোষ না করে। এটাই হচ্ছে প্রণববাবু।
প্রণববাবু মানেই হচ্ছে একটা ঐক্যমত্য, প্রণববাবু মানেই হচ্ছে সঙ্কটমোচক, প্রণববাবু মানেই হচ্ছে গণতন্ত্রের বহুবিধ কন্ঠস্বর। সেই কন্ঠস্বরকে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, ১৯৬৯ এ সংসদে আসা থেকে শেষদিন পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

 

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us