Gold ₹143,800/10g
Silver ₹240.66/g
Petrol ₹113.51/L
Diesel ₹99.82/L
Kolkata 28°C
24 June 2026

কিষেণজি মৃত্যু রহস্য #১৫

সিদু সোরেনের খবর দিলেন এক পিসিপিএ নেতা, যে সূত্র ধরে মাঝরাতে পুলিশ অপারেশন প্ল্যান করল। মৃত্যু হল মাওবাদী নেতা সিদু সোরেনের

কিষেণজি মৃত্যু রহস্য #১৫

আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছিল: লালগড়ে তৈরি হল পুলিশ সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি, যার প্রথম মিটিং কাঁটাপাহাড়িতে। সাংবাদিকদের চলে যেতে বলা হল মিটিংস্থল থেকে…

কাঁটাপাহাড়ি থেকে রামগড় মোটরসাইকেলে মিনিট দশেক। রামগড়ে কিছু দোকানপাট আছে। ঠিক আধা-শহর বলা যায় না, তবে রামগড়ে বাস স্ট্যান্ড আছে। ভাতের হোটেল আছে ছোট। পাকা বাড়ি আছে। ঠেলা গাড়িতে ফলের দোকান, গাড়ির টায়ার মেরামতির দোকান আছে। এসব কিছুই নেই কাঁটাপাহাড়িতে। এক বাক্যে বলা যায়, রামগড়ের বাসিন্দাদের কথায়-কথায় লালগড়ে যেতে হয় না।
আমি, সুরবেক আর প্রণব রামগড়ে পৌঁছে গিয়ে বসলাম একজনের দোকানে। টায়ার মেরামতির দোকান। গল্প করলাম এক-দেড় ঘন্টা। কোন মাওবাদী নেতা আসতে পারে কাঁটাপাহাড়ির মিটিংয়ে তা নিয়ে কথা হল। যিনিই আসুন লালগড়ের মানুষকে আন্দোলন নিয়ে বোঝাতে, তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ কেউ তা সিদুর কথাতেই স্পষ্ট। তা বুঝতেও পারছিলাম আমরা। কিন্তু এটাও ঠিক, লালগড় আন্দোলন যে কতটা ব্যাপকতা নেবে তা সেদিন রামগড়-কাঁটাপাহাড়িতে বসে আমরা কেউই আন্দাজ করতে পারিনি। সেদিন আমার অন্তত মাথাতেও আসেনি সিপিআই (মাওয়িস্টের) পলিটব্যুরো সদস্য কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেণজি এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেবেন। আমাদের আলোচনার দৌড় ছিল মূলত মাওবাদী নেতা শশধর মাহাতো বা আকাশ পর্যন্ত।
আড়াইটে-তিনটে নাগাদ ফিরলাম কাঁটাপাহাড়ি। মিটিংয়ের মাঠের পাঁচ-সাতশো মিটার দূরে থামলাম। অন্য সাংবাদিকরাও সেখানে অপেক্ষা করছে। আরও ঘন্টাখানেক বাদে আমাদের ডাক পড়ল কাঁটাপাহাড়ির মাঠে। প্রায় চারটে বাজে। মাঠে পৌঁছে দেখি কয়েকশো পুরুশ-মহিলা মাটিতে বসে। স্কুলে যেমন লম্বা টেবিল আর বেঞ্চ থাকে তেমন পাতা রয়েছে। সেই বেঞ্চে বসে আছে নেতা স্থানীয় তিন-চারজন। সেই বেঞ্চে বসেই শুরু হল সিদু সোরেনদের সাংবাদিক বৈঠক। সাংবাদিক বৈঠকের মোদ্দা বক্তব্য, ‘গ্রামবাসীরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তল্লাশির নামে মহিলাদের ওপর যে অত্যাচার করা হয়েছে তার জন্য ক্ষমা না চাইলে পুলিশকে লালগড়ে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ওসিকে কান ধরে উঠবোস করতে হবে। এসপিকে ক্ষমা চাইতে হবে। নয়তো রাস্তা বন্ধ করে রাখা হবে। আন্দোলন চলবে।’ সরকারের কাছে পেশ করা ডেপুটেশনে আদায়যোগ্য নয় এমন দুটি দাবির উল্লেখ করে দু’দিন আগেই অবশ্য পিসিপিএ বুঝিয়ে দিয়েছে, আন্দোলনের রশি কোথায় বাঁধা আছে।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ কাঁটাপাহাড়ি ছাড়লাম। ঝাড়গ্রামে পৌঁছতে ঘণ্টা দেড়েক লেগে যাবে প্রায়। সারাদিন যা ঘটেছে তার ছবি, খবর পাঠাতে হবে অফিসে। রাস্তায় ফেলা খেজুর গাছ পেরিয়ে যতটা সম্ভব জোরে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে অমিতাভ। ঠান্ডা একটা হাওয়া দিচ্ছে, সন্ধে নামছে জঙ্গলমহলে। বুঝতে পারছিলাম, লালগড়ের এই আন্দোলন সহজে থামার নয়। পুলিশ সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি নামেই। মাওবাদীরা আন্দোলনটা টেকওভার করে নিয়েছে। নাকি টেকওভার নয়, ২রা নভেম্বর থেকেই এটা ওদের আন্দোলন? আজকে মিটিংয়ের আগে আমাদের যে কাঁটাপাহাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হল, তার পরে মাওবাদীদের অ্যাক্টিভ ইনভলভমেন্ট নিয়ে আর কোনও সংশয় নেই।
কয়েক দিনের মধ্যেই নিশ্চিত বোঝা গেল, মাওবাদীরা টেকওভার করে নেয়নি মোটেও, আন্দোলনটা ওদেরই ছিল। পিসিপিএ একটা বর্ম মাত্র। আন্দোলন সম্পর্কে কলকাতা সহ দেশের মানুষ এবং সিভিল সোসাইটিকে একটা ভিন্ন বার্তা দিতেই তৈরি করা হয়েছিল পিসিপিএ। যাতে মনে হয় পুলিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফুর্তভাবে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। পরে বারবার বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়েছে, ২রা নভেম্বর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং রামবিলাস পাসোয়ানের কনভয়ে অ্যাটাক মাওবাদীরা করেছিল একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই। এই অ্যাটাকের পর গ্রামে পুলিশের অভিযান হবে এবং তাকে কেন্দ্র করে পিসিপিএর মতো কোনও কমিটি তৈরি হবে, এ সবই ছিল প্ল্যান করা। আন্দোলনের উর্বর জমির প্রস্তুতিও করে রেখেছিল তারা। অথচ, ইতিহাসের কী নির্মম পরিণতি, যে পিসিপিএ গড়ে উঠেছিল মাওবাদীদের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে, যা দিনের পর দিন মাওবাদীদের ঢালের কাজ করেছে, পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করেছে শীর্ষ নেতাদের, সেই কমিটিই কিনা এক সময় মৃত্যুবাণ হাতে তুলে নিল তাদেরই বধ করতে! ২০১১ সালের শেষে কিষেণজির তো বটেই, ২০১০ সালের মাঝামাঝি থেকেই যে বিভিন্ন এনকাউন্টারে একের পর এক সাফল্য পেতে শুরু করেছিল পুলিশ এবং সিআরপিএফ, তার প্রায় প্রতিটাতেই ছিল পিসিপিএর কোনও না কোনও নেতার গোপন ভূমিকা। মাওয়িস্ট নেতারা জানতেও পারেননি, তাঁদেরই হাতে গড়ে তোলা পিসিপিএর কোন কোন সদস্য তাঁদের সম্পর্কে ইনফর্মেশন দিচ্ছে পুলিশকে।

আরও পড়ুন: ঐতিহাসিক শিকাগো ভাষণের ১২৫ বছরে ঘুরে দেখা স্বামী বিবেকানন্দের মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমঃ পর্ব# ১

এনকাউন্টার সিদু সোরেন: আইপিএস সুনীল কুমার 

কীভাবে মাওবাদীদের সম্পর্কে পিসিপিএ’র সদস্যরা খবর সরবরাহ করেছেন, তার কয়েকটি ঘটনা আমাকে বলেন আইপিএস সুনীল কুমার। তার মধ্যে অন্যতম সিদু সোরেনের এনকাউণ্টার।
‘সিদু তখন গোয়ালতোড়ের চার্জে। পশ্চিম মেদিনীপুর আর বাঁকুড়া জেলার সীমানায় গোয়ালতোড়, সারেঙ্গা এবং আশপাশের জঙ্গলে সিদু সোরেনের নেতৃত্বে মাওবাদীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটের পর থেকেই লালগড়, গোয়ালতোড়, বিনপুর সহ আশপাশের পুরো এলাকা প্রায় মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছিল মাওবাদীদের। ২০০৯ সালের জুন মাসে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ঝাড়গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় যৌথ অপারেশন হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাতে জঙ্গলে ওদের প্রভাব কমানো যায়নি। বরং, বহু গ্রামে ওদের প্রভাব বাড়ছিল। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জেলা পুলিশ, সিআরপিএফ এবং কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) বহু জায়গায় অপারেশন করেছে। কিষেণজিসহ মাওয়িস্টদের অনেক প্রথম সারির নেতাকে নাগালের মধ্যে পাওয়াও গিয়েছিল কয়েকবার, কিন্তু কিছুতেই সাকসেস আসছিল না। একদিক থেকে এটা ফ্রাসটেটিং। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম, এই যে কাছাকাছি পৌঁছেও তেমন কাউকে ধরতে পারছি না, এতে ওদের কনফিডেন্স বেড়ে যাচ্ছে। ওরা আরও রেকলেস হচ্ছে। আরও বেশি করে আমাদের রেঞ্জের মধ্যে চলে আসছে। জানতাম, ধৈর্য ধরে পড়ে থাকলে যে কোনও দিন বড় সাকসেস পাব। সেই সময় আমরা স্ট্র্যাটেজিতেও কয়েকটা ইমপরটেন্ট বদল আনলাম।
২০০৮ সালের নভেম্বরে চিফ মিনিস্টার এবং সেন্ট্রাল মিনিস্টারের কনভয় অ্যাটাকের পর ডিস্ট্রিক্ট পুলিশ প্রথমেই অনেক লোককে অ্যারেস্ট করে। যে কোনও বড়ো ঘটনাতেই প্রাথমিকভাবে এটা হয়। গভর্নমেন্ট প্রেশার থাকে, মিডিয়া প্রেশারও থাকে। এই ক্ষেত্রেও ইনিশিয়ালি তখন যাদের অ্যারেস্ট করা হয়েছিল, তাদের কারোরই কোনও ইনভলভমেন্ট ছিল না ওই ব্লাস্টে। যারা শালবনি ব্লাস্ট প্যান করেছিল বা এক্সিকিউট করেছিল তারা কোনও সাধারণ গ্রামবাসী ছিল না। কিন্তু আসল লোককে না পেয়ে পুলিশ তখন সাধারণ কিছু লোককে, স্পেশালই যাদের অ্যান্টি সিপিআইএম ব্যাকগ্রাউন্ড আছে তেমন কিছু লোককে অ্যারেস্ট করে। অত্যাচারও করে তাদের বাড়ির লোককে বেছে বেছে। এতে পুলিশের সম্পর্কে মানুষের ধারণা খুব খারাপ হয়। তারপর প্রায় পাঁচ-ছ’মাস পুলিশ ঢুকতে পারেনি লালগড়ে। তাই গ্রামের লোকের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগটা পুরো বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সেন্ট্রাল ফোর্স আসার পর জঙ্গলমহলে অপারেশন শুরু হল। তারপর থেকে আবার পুলিশ লালগড়ে ঢুকতে শুরু করেছিল ঠিকই, কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা আর তৈরি করা যাচ্ছিল না। তাছাড়া মাওয়িস্ট প্রবলেম সলভ করার জন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ থাকা খুব ইমপরটেন্ট। মাওয়িস্টরা গ্রামবাসীদের মধ্যে মিশে থাকে। যে দিনেরবেলা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিছিল করছে, সেই হয়তো রাতে অস্ত্র নিয়ে পুলিশ ক্যাম্প অ্যাটাক করেছে। সাধারণ মানুষের থেকে হার্ডকোর মাওয়িস্টকে আলাদা করে তাদের আইডন্টিফাই করতে গেলে গ্রামবাসীদের কনফিডেন্সে নিতে হবেই। ২০০৯ এর মাঝামাঝি থেকে আমরা বুঝতে পারছিলাম, লালগড় এবং আশপাশের এলাকায় ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, সাধারণ মানুষের ওপর মাওয়িস্টদের হান্ড্রেড পারসেন্ট কন্ট্রোল আছে। মিডিয়াও একটা জেনারেল পারসেপশন তৈরি করেছিল গ্রামবাসীদের ওপর মাওয়িস্টদের প্রভাব নিয়ে। একটা ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল, গ্রামের সমস্ত মানুষ মাওয়িস্টদের অ্যাক্টিভিটিকে পুরোপুরি সাপোর্ট করছে। কিন্তু রিয়েলিটি তা ছিল না। আন্দোলনের একদম শুরুতে লালগড়ে অনেক মানুষই পুলিশ এবং সরকার বিরোধী বিভিন্ন ডিমান্ড নিয়ে মাওয়িস্টদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, এটা ঠিক। কিন্তু এটা মাওবাদীদের প্রতি আইডোলজিকাল সাপোর্ট নয়। ওয়েস্ট বেঙ্গলে পলিটিকাল পোলারাইজেশন এত বেশি, প্রতি গ্রামেই যথেষ্ট পরিমাণে সিপিআইএম কর্মী-সমর্থক ছিল। তারা ভয়ে এই আন্দোলনকে প্রকাশ্যে সাপোর্ট করলেও, কখনও তা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। আর ২০০৯ এর মাঝামাঝি থেকে, বিশেষ করে লোকসভা ভোটের সময় থেকে মাওয়িস্টরা যেভাবে ইনডিসক্রিমিনেট কিলিং শুরু করল, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করে। যারা সিপিএম নয়, কিন্তু ওদের আন্দোলনকে প্রথমে সাপোর্ট করেছিল, এই লাগাতার ব্যক্তি হত্যার জন্য তারাও মাওয়িস্টদের বিরোধী হয়ে যায়। এসব আমরা বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু কিছুতেই গ্রামে বিশ্বাসযোগ্য সোর্স নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারছিলাম না।
আর পুলিশের একটা ন্যাচারাল ইন্সটিঙ্কট হচ্ছে, কিছু একটা ঘটলেই যত বেশি সংখ্যক লোককে গ্রেফতার করা। এটা সেই সময় লালগড়ে বেশি করে হচ্ছিল। কেউ হয়তো সক্রিয়ভাবে পিসিপিএ করছে, তাকে কখনও শহরে একা পেয়ে কিংবা টেলিফোন ইন্টারসেপ্ট করে তাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। পুলিশ ভেবেছে, তাকে ইন্টেরোগেট করে হার্ডকোর মাওয়িস্টদের হদিশ পাবে। কিন্তু পরে আমরা দেখেছি, সে মাওয়িস্ট লিডারদের মুভমেন্টের কোনও খবরই রাখে না। অধিকাংশ সময় দেখেছি, জেনুইন মাওয়িস্ট লিডাররা বেশিরভাগ পিসিপিএ নেতা বা সদস্যকে হয়তো সেভাবে চিনতোও না। এমনও হয়েছে, জেনুইন মাওয়িস্ট অভিযোগে কাউকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে, মিডিয়াও তাকে নিয়ে বড় নিউজ করেছে। পরে জেরা করে দেখা গেছে সে গান পয়েন্টে মুভমেন্ট করছে।
একটা সময়ের পর আমরা বুঝতে পারলাম, যারাই পিসিপিএ করছে বা যাকেই কিছুটা সন্দেহজনক লাগছে, এমন লোককে হুটহাট অ্যারেস্ট করে কোনও লাভ নেই। প্রথমত, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা ইমপরটেন্ট কোনও ইনফর্মেশন দিতে পারে না। দ্বিতীয়ত, এদের অ্যারেস্ট করে দুমদাম কেস দিয়ে দিলে গ্রামে পুলিশ এবং গভর্নমেন্ট সম্পর্কে ধারণা আরও খারাপ হয়। গ্রামের লোক হয়তো জানে সেই লোকের কোনও খুন বা নাশকতার সঙ্গে ডিরেক্ট লিঙ্ক নেই, কিন্তু পুলিশ সিরিয়াস কেস দিয়ে তাকে অনেক দিন আটকে রাখছে। অনেক সময় সব কিছু বোঝা সত্ত্বেও সিরিয়াস কেস দেওয়া ছাড়া পুলিশের কোনও উপায়ও থাকে না। কারণ, কয়েক দিনের মধ্যে তার জামিন হয়ে গেলে আবার মিডিয়া উলটো খবর করে।
এই দুই কারণেই তখন আমরা একটা স্ট্র্যাটেজিক ডিসিশন নিলাম। ঠিক করা হল, অ্যারেস্ট একেবারে কমিয়ে দিতে হবে। যাকে তাকে ধরে কোনও লাভ হবে না। শুধু তাই নয়, আরও এক ধাপ এগিয়ে আমরা একটা রিভার্স প্ল্যানিং করলাম। ঠিক করলাম, মোটামুটি ঠিকঠাক কাউকেও যদি ধরা যায়, যে অল্প-সল্প কিছু ইনফর্মেশনও রাখে, এমন কাউকে পেয়ে গেলেও তাকে অ্যারেস্ট না করে ছেড়ে দেওয়া হবে। ইন্টেরোগেট করে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, তার মুভমেন্ট কিংবা তার অ্যাক্টিভিটি সম্পর্ক আমরা সব খবর রাখি। কিন্তু তাও তাকে আমরা অ্যারেস্ট করছি না। একটা ইমপ্রেশন তৈরি করতে হবে, যারা জেনুইন মাওয়িস্ট একমাত্র সেরকম লোককেই আমরা ধরব। যারা এই আন্দোলন শুরু করেনি, কাউকে খুন করেনি কিংবা যারা বাধ্য হয়ে আন্দোলনটা করছে, তাদের গভর্নমেন্ট কিছু বলবে না। এরপর এমনও হয়েছে, হয়তো ইমপরটেন্ট কাউকে আমরা পেয়ে গেছি, যে মাওয়িস্টদের শেল্টার দিয়েছে কিংবা অনেক কিছু জানে কিংবা কাউকে খুনের সময় সেই দলে ছিল, তাকেও আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করে দু’চারদিন বাদে ছেড়ে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, সে যে আমাদের হাতে ধরা পড়ে গেছিল, তা যেন কেউ জানতে না পারে, সেই কথাও তাকে বলে দিয়েছি। এই ট্যাকটিক্স আমাদের পরে হিউজ সাকসেস দিয়েছিল। যাকে আমরা ধরে এক-দু’দিন বা চার-পাঁচদিন বাদে অ্যারেস্ট না করে ছেড়ে দিতাম তাদেরও মনে আমাদের ওপর কনফিডেন্স তৈরি হচ্ছিল। ওরাও বুঝতে পারছিল, কিষেণজি, আকাশ, বিকাশ, সুচিত্রা, শশধর, সিদু বা এমন বড় লেভেলের কোনও নেতা ছাড়া আমাদের কাউকে নিয়ে ইন্টারেস্ট নেই। আমাদের এই ট্যাকটিক্স ম্যাজিকের মতো কাজ করতে শুরু করল। এই সব লোকগুলোই কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের রিলায়েবল সোর্স হয়ে উঠল। ওরা জানত, আমরা চাইলে ওদের অ্যারেস্ট করতে পারতাম। তা তো করিইনি, বরং আনঅফিশিয়ালি ওদের অনেক হেল্প করেছি। মেটিরিয়াল হেল্প থেকে টাকা-পয়সা সব কিছু। এই সিক্রেট সোর্সরাই পরে মাওয়িস্টদের সম্পর্কে আমাদের পিন পয়েন্ট ইনফর্মেশন দিয়েছে। মাওয়িস্টরা জানতেও পারেনি, ওদের সঙ্গেই যারা ঘুরছে, থাকছে, আন্দোলন করছে, তার মধ্যেই মিশে রয়েছে এমন লোক, যে আমাদের খবর দিচ্ছে। এই সোর্স নেটওয়ার্ক তৈরি করতে আমাদের লেগেছিল কয়েক মাস। আপনি দেখবেন, ২০১০ সাল থেকে পুলিশ জঙ্গলমহলে পরপর সাকসেস পেতে শুরু করে। সিদু সোরেন, শশধর মাহাতো, উমাকান্ত মাহাতো থেকে কিষেণজি পর্যন্ত প্রতিটা অপারেশন হয়েছে এই সোর্স ইনফর্মেশনের ওপর।
২০১০ সালের মাঝামাঝি একদিন সোর্স ইনফর্মেশন এল, গোয়ালতোড় এবং সারেঙ্গার বর্ডারে ভালুকচিরা ফরেস্টে গ্রামের কাছাকাছি মাওয়িস্টদের একটা দল কয়েকদিন ধরে থাকছে। পশ্চিম মেদিনীপুর পুলিশ এবং সিআরপিএফ এক সঙ্গে অপারেশন করল। মাওয়িস্ট গ্রুপটার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল ফোর্স। এক্সচেঞ্জ অফ ফায়ারও হল। কিন্তু কাউকে ধরা গেল না। জঙ্গলে পালিয়ে গেল পুরো দলটা। এনকাউণ্টারের পর জঙ্গলে সার্চ অপারেশনের সময় ১৬টা ব্যাগ উদ্ধার করল জয়েন্ট ফোর্স। তাতে অনেক কাগজপত্র এবং মাওয়িস্টদের ব্যবহারের নানা জিনিস পাওয়া গেল। উদ্ধার হওয়া ব্যাগ ঘেঁটে এবং আশপাশের গ্রামে খোঁজখবর করে জানা গেল, ভালুকচিরায় মাওয়িস্টদের ওই দলটার নেতৃত্বে ছিল সিদু সোরেন। পশ্চিম মেদিনীপুর পুলিশ সেদিন অল্পের জন্য সিদুকে মিস করল। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম, সিদুরা বেশি দূর পালাতে পারেনি। হয়তো জঙ্গলের ভেতরে কাছাকাছিই কোথাও আছে। সেই এনকাউন্টারের একদিন পরেই আমরা ফের অপারেশনের প্ল্যান করলাম।
পরদিন সকালে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার মনোজ ভার্মা প্ল্যানিং ফাইনাল করলেন, বিকেলেই সিদু এবং তাঁর দলের খোঁজে গোয়ালতোড়ের জঙ্গলে অপারেশন শুরু হবে। ঠিক কোন পয়েন্টে অপারেশন হবে তাও পশ্চিম মেদিনীপুর পুলিশের সিনিয়র অফিসাররা ঠিক করে ফেলেন। এই ধরনের অপারেশনে গোপনীয়তা একটা বড় ব্যাপার। হাতে গোনা কয়েকজন অফিসার শুধু জানতেন ঠিক কোথায় অপারেশনটা হবে। কিন্তু পুরো ফোর্স মুভমেন্টও শুরু হয়ে যায় সেদিন সকাল থেকে। জঙ্গলে মাওবাদীদের খোঁজে অপারেশন এবং তাতে সাফল্য কখনই ধরাবাঁধা রাস্তায় মেলে না। আসলে কোন রাস্তায় যে মেলে তাও জানা থাকে না সব সময়। তা আরও একবার প্রমাণ হল সেদিন। পশ্চিম মেদিনীপুর পুলিশ সিদু এবং তাঁর দলের খোঁজে ঠিক যে পয়েন্টে অপারেশনের প্ল্যান করেছিল রাত্তিরে, সেখানে তাঁরা দিনে ছিল ঠিকই। কিন্তু রাতে সিদুরা অন্য লোকেশনে শিফট করে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সেদিন মাঝরাত থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছ’ঘন্টার অপারেশন হয়। সাফল্যও মিলেছিল। মূল এনকাউণ্টারটা হয়েছিল পাক্কা পাঁচ-ছয় মিনিটের। মৃত্যু হয়েছিল গোয়ালতোড় কাঁপিয়ে বেড়ানো সিদু সোরেন এবং তার আরও কিছু সঙ্গীর।
সেদিন সকাল সাড়ে আটটা-নটা নাগাদ গোয়ালতোড়ে অপারেশনের ফাইনাল প্ল্যানিং চলছে পশ্চিম মেদিনীপুর পুলিশ সুপারের ঘরে। প্রায় তখনই সোর্স মারফত জেলা পুলিশের এক অফিসারের কাছে খবর এল, পিসিপিএ’র এক নেতা সকালে শালবনির বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। কোনও কাজে কলকাতা যাচ্ছেন। সেই লোকটি শালবনি-লালগড় এলাকায় পিসিপিএ’র প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তাঁর সেদিনের কলকাতা যাওয়ার সঙ্গে সিদুর কোনও সম্পর্কও ছিল না। কিন্তু যে অফিসারের কাছে সোর্স ইনফর্মেশন এসেছিল ওই নেতার কলকাতা যাওয়ার, তিনি তখনই গাড়ি করে অফিসার পাঠিয়ে দিলেন কলকাতায়। পুলিশ অফিসাররা জানতেন, পিসিপিএ’র ওই নেতার সঙ্গে মাওবাদী স্কোয়াড মেম্বারদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ওই নেতা (তাঁর নাম লেখা সম্ভব নয়) ট্রেনে চেপে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে নামা মাত্র পুলিশ তাঁকে প্ল্যাটফর্ম থেকেই আটক করে। মেদিনীপুর থেকে পুলিশ গাড়ি করে রওনা দিয়ে ট্রেন পৌঁছানোর আগেই হাওড়া পৌঁছে গিয়েছিল।
ওই ব্যক্তির মতো পিসিপিএ’র অনেক নেতা ঝাড়গ্রামের নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিলেন, যাঁদের গতিবিধির ওপর পুলিশ সব সময় নজরদারি করত। কিন্তু তাঁদের গ্রেফতার করা হোত না। ওই নেতারা বেশিরভাগ সময় বুঝতেও পারতেন না তাঁরা পুলিশের নিয়মিত নজরদারিতে আছেন। যদিও চাইলেই গ্রেফতার করা যেত পিসিপিএ’র এমন অনেক নেতাকেই। কিন্তু আমরা জানতাম, তাতে কোনও লাভ নেই। সেদিন দুপুরে পিসিপিএ’র ওই নেতাকে নিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে মেদিনীপুরে রওনা দিল পুলিশ। কাক-পক্ষী টের পেল না। পিসিপিএ’র এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা যে পুলিশের হেফাজতে চলে গেছে, না জানল তাদের সংগঠনের কেউ, না খবর পৌঁছল মাওবাদী স্কোয়াডের কাছে। পশ্চিম মেদিনীপুরে পুলিশের এক গোপন ডেরায় নিয়ে যাওয়া হল পিসিপিএ’র ওই নেতাকে। শুরু হল জেরা। সশস্ত্র মাওবাদীদের খোঁজে নাম ধরে ধরে শুরু হল জিজ্ঞাসাবাদ। প্রথমে কিছুই বললেন না। যত সময় যাচ্ছে তত ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে পুলিশের। কিন্তু জেরায় সাফল্যের একমাত্র রেসিপি ধৈর্য। আরও অপেক্ষা। এবং তার সঙ্গে যার যেখানে দুর্বলতা আছে সেই পয়েন্ট টানা জিজ্ঞাসাবাদ করে যাওয়া।
অন্যদিকে তখন, সেদিন রাতেই সিদুর স্কোয়াডের বিরুদ্ধে অপারেশনের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। গোয়ালতোড়ের জঙ্গলে অপারেশনের সব প্রস্তুতি সারা। সন্ধে নামলেই ফোর্স রওনা দেবে। যে দলটা সিদুদের খোঁজে অপারেশনের জন্য রেডি হচ্ছিল তারাও জানত না, জেলা পুলিশের কয়েকজন অফিসার দুপুর থেকেই পিসিপিএ’র এক নেতাকে জেরায় ব্যস্ত।
কিন্তু প্রথম দেড়-দু’ঘন্টার জেরায় কিছুই পজিটিভ মিলল না। পিসিপিএ’র নেতা ততক্ষণে ভেবে ফেলেছেন, তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি ততক্ষণে কিছুটা সহজও হয়েছেন। এক পুলিশ অফিসার বললেন, তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে যদি তিনি সিদুর লোকেশনের হদিশ দিতে পারেন। আর কেউ জানতেও পারবে না, তিনি সিদুর খোঁজ দিয়েছেন। পিসিপিএ’র ওই নেতার সঙ্গে সিদু সোরেনের ভালো যোগাযোগ ছিল। সিদু ওই নেতার কথা শুনতও। যদিও পুলিশ অফিসাররা তা জানতেন না। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পুলিশের যে অফিসারের নেতৃত্বে এই জেরা চলছিল, তিনি জানতেন সেদিন রাতেই সিদুর বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন হবে। জায়গাও ফিক্সড হয়েছে। তিনি ভেবেছিলেন, ওই পিসিপিএ নেতা যদি সিদুর মুভমেন্ট নিয়ে এক্সট্রা কোনও তথ্য দিতে পারেন, তবে সুবিধে হতে পারে।

 

আরও পড়ুন: নভেম্বর ২০১০, দীপক সরকার আমাকে বললেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী এবং পার্টির সঙ্গে কথা হয়েছে, খেজুরি-নন্দীগ্রামের ঘরছাড়াদের এলাকায় ফেরাতে হবে’

কী হয়েছে আগের পর্বে? পড়ুন: কিষেণজি মৃত্যু রহস্য #১৪

টানা চার-পাঁচ ঘন্টা জেরার পর ওই পিসিপিএ নেতা আস্তে আস্তে ব্রেক করলেন। তাঁকে যে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তা কেউ জানতে পারবে না, সেটা তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অবশেষে তিনি সিদুর একটা লোকেশন বললেন। বললেন, আগের দিন তাঁর সঙ্গে সিদুর ফোনে কথা হয়েছে। সিদু যেখানে আছে সেই জায়গার নাম পুলিশকে বললেন তিনি।। এদিকে মুশকিল হল, সিদুর যে লোকেশন ওই পিসিপিএ নেতা আমাদের দিলেন, তার সঙ্গে আমাদের অপারেশনের স্পট মিলছে না। তখন সন্ধে হয়ে গেছে। অপারেশনের জন্য ফোর্স মুভ করতে শুরু করেছে। আমরা পুরো কনফিউজড হয়ে গেলাম। পিসিপিএ নেতার সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, তিনি সত্যি কথাই বলছেন। তখন আমরা একটা প্ল্যান করলাম। ওই পিসিপিএ নেতাকেই বললাম, তাঁর ফোন থেকে সিদুকে ফোন করতে। আমাদের কথা মতো তিনি সিদুকে ফোন করলেন। বললেন, খুব জরুরি দরকার, সিদুর সঙ্গে দেখা করতে চান। সিদু তাঁকে তখনই আসতে বলল। আমাদের শেখানো মতো তিনি বললেন, আর একটু রাত বাড়লে যাবেন, কারণ বাইরে ফোর্সের টহলদারি আছে। সিদু তাঁকে বলল, একটু পরে জানাবে রাতে সে কোথায় থাকছে। আবার শুরু হল আমাদের অপেক্ষা। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, ওই পিসিপিএ নেতা যে আমাদের হেফাজতে আছেন তা কেউ জানে না। তবু এই সব ক্ষেত্রে একটা ভুল মানে সব শেষ। রাত প্রায় ১০টা নাগাদ আবার কথা হল দু’জনের। স্পট ফিক্সড হল। সিদু জানাল, রাতে তারা কোথায় থাকছে। সেখানেই যেতে বলল পিসিপিএ নেতাকে।
এইটুকুই শুধু আমাদের দরকার ছিল। সিদু সোরেনের এক্স্যাক্ট লোকেশন আমরা পেয়ে গেলাম। ওই পিসিপিএ নেতাকে আমাদের ডেরায় রেখে দেওয়া হল। রাত ১১টা নাগাদ ফোর্স মুভমেন্ট শুরু হল। যে পয়েন্টে সিদু ওই পিসিপিএ নেতাকে যেতে বলেছে তার উদ্দেশে। যেখানে সিদুরা ডেরা বেঁধেছিল তার প্রায় ১০ কিলোমিটার আগে গাড়ি থামল। পায়ে হেঁটে এগোতে শুরু করল পুলিশ এবং সিআরপিএফ। রাত প্রায় সাড়ে ১২টা-একটা নাগাদ ফোর্স পৌঁছল সিদুদের ডেরার কাছাকাছি। তারপর শুরু হল অপেক্ষা। যে স্পটের কথা সিদু বলেছিল আমরা প্রায় তার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। কিন্তু ঠিক কোথায় সে সঙ্গীদের নিয়ে টেন্ট ফেলেছে, তা লোকেট করা দরকার ছিল। সেটা করতে কিছুটা সময় চলে গেল। তিন-চার জন জওয়ান নাইট ভিশন ডিভাইস নিয়ে বুকে হেঁটে জঙ্গলে ঢুকল। ক্রল করে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই রাস্তায় অপেক্ষায় থাকা ফোর্সের কাছে খবর এসে গেল, জঙ্গলে একটা টেন্ট দেখতে পাওয়া গেছে। তারপর সেই ডিরেকশনে এগোতে শুরু করল আরও ফোর্স। সেই টেন্টের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে ফের শুরু হল অপেক্ষা। তখন রাত প্রায় আড়াইটে বাজে। এই ধরনের অপারেশনের জন্য আমরা সাধারণত রাত তিনটে-সাড়ে তিনটে পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তখন মাওয়িস্টরা ঘুম থেকেও ওঠে না, আবার সেন্ট্রিও প্রায় সারা রাত জাগার পর একটু রিল্যাক্সড হয়ে পড়ে। টেন্টকে টার্গেট করে ফোর্স মাটিতে শুয়ে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। ঠিক সাড়ে তিনটের সময় টেন্টকে টার্গেট করে শুরু হল ফায়ারিং। সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালিয়ে রিপ্লাই দিল সেন্ট্রিও। কিন্তু তা খুব সময়ের জন্য। সেন্ট্রিও তখন ফোর্সের নাইট ভিশন ডিভাইসের নাগালের মধ্যে এসে গেছে। সে দাঁড়াতেই পারল না বেশিক্ষণ। সেন্ট্রি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর ফোর্স তখন পুরো রেঞ্জের মধ্যে পেয়ে গেছে টেন্টটাকে। মিনিট দশেকের টানা ফায়ারিং চলল টেন্টকে টার্গেট করে। টেন্ট থেকে কেউ কাউন্টারই করতে পারল না।
আমরা বুঝতে পারিনি, কয়েক ফুট দূরত্বে আসলে দুটো টেন্ট ফেলেছিল সিদু সোরেনরা৷ আমরা যে টেন্টটাকে লোকেট করেছিলাম, তাতে সিদু নিজে ছিল৷ সঙ্গে আরও কয়েকজন৷ সিদু সহ সবাই মারা গেল৷ অন্য টেন্টের সবাই পালিয়ে গেল৷’

বেলপাহাড়ি স্কোয়াড, নয়ের দশক 

ছ’য়ের দশকের শেষে নকশালবাড়ির প্রভাবে মেদিনীপুরের ডেবরা, গোপীবল্লভপুরে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাকে ধরে রাখা গেল না। সিপিআইএমএল গঠিত হল ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল। আর মোটামুটি জন্মলগ্ন থেকেই একের পর এক মতাদর্শগত দলিল, পাল্টা দলিল এবং কৌশলগত লাইনকে কেন্দ্র করে একাধিক দলে বিভক্ত হতে শুরু করলেন নকশালপন্থীরা। কিন্তু নকশালপন্থীদের এই বিভক্ত হওয়ার ইতিহাস চর্চায় বেশি যাব না, কারণ তা বহু জায়গায় লিপিবদ্ধ। কিষেণজি মৃত্যু রহস্যের সন্ধানে এইটুকুই শুধু প্রাসঙ্গিক যে, ১৯৬৯ সালে কানাই চ্যাটার্জি, অমূল্য সেনদের হাতে গড়ে ওঠা মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসি) আস্তে-আস্তে শক্তিবৃদ্ধি করতে শুরু করে বিহারে। এবং সীমানার জঙ্গল ঘেরা পরিবেশের সহায়তায় বিহার সংলগ্ন অবিভক্ত মেদিনীপুরের বেলপাহাড়িতেই এ রাজ্যে প্রথম মুভমেন্ট শুরু হল এমসিসি স্কোয়াডের। সেটা আটের দশকের একেবারে শেষ, নয়ের দশকের শুরুর ঘটনা।
কয়েক বছরের মধ্যে পাঁচ তরুণ-তরুণীর নাম উঠে এল পুলিশের খাতায়। তিমিরবরণ মণ্ডল ওরফে আকাশ, অরুণ, মদন এবং রিনা দি, অণু দি। পশ্চিমবঙ্গে শুরু হল লালগড় আন্দোলনের সলতে পাকানোর কাজ।

চলবে

(৩ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে কিষেণজি মৃত্যু রহস্য। প্রতি মঙ্গলবার এবং শুক্রবার প্রকাশিত হচ্ছে এই দীর্ঘ ধারাবাহিক। প্রতি পর্বে লাল রং দিয়ে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে। সেখানে ক্লিক করলে আগের পর্ব পড়তে পারবেন।)

Track Latest News Live on TheBengalStory.com and get news updates from West Bengal and around the world.

Long ReadsNON-FICTION