পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল বেরলো। এর আগের লেখাটিতে আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, এই ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে জনমতের আঁচ পাওয়ার এটাই শেষ সুযোগ। একই সাথে গোবলয়ের তিনটি রাজ্যে মোদী ম্যাজিক কতটা অব্যাহত আছে তাও বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। ফলাফলের নিরিখে এটা স্পষ্ট যে, প্রতিটি রাজ্যেই বিজেপি পরাজিত হয়েছে। আমার আগের বক্তব্য আরও এই ছিল যে, একদিকে বিজেপির যেমন গ্রামীণ ভোট কমছে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গৃহীত হচ্ছে না, তাই আগামী লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীকে সুকঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
অবশ্যই গোবলয়ের তিনটি রাজ্যের মধ্যে যতটা স্পষ্টভাবে ছত্তিশগড়ে বিজেপির পরাজয় হয়েছে লাগোয়া মধ্যপ্রদেশে তা হয়নি। রাজস্থানেও কংগ্রেস সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এর মূল কারণ, বহুজন সমাজ পার্টির সাথে নির্বাচনী সমঝোতা না হওয়া, এবং রাজস্থানে বিজেপির একটা অংশের ভাঙন, বেশ কিছু আসনে বামেদের মরিয়া লড়াই। তবে একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বামপন্থী কৃষক ক্ষেতমজুরদের লাগাতার সংগ্রাম দেশজুড়ে হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় রাজনীতির একটি প্রতিস্পর্ধী ভাষ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে । ‘মন্দির ওয়াহেঁই বনায়েঙ্গে’ নয়, বরঞ্চ ‘রোটি, কাপড়া আউর মকান’ অনেক বেশি গ্রামীণ জনতাকে আকর্ষণ করছে। সঙ্গে আছে যুব সম্প্রদায়ের কাজের দাবি, ২০১৪ র নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের যন্ত্রণা। দেশজুড়ে চলছে সংখ্যালঘু ও দলিতদের উপর লাগাতার আক্রমণ। গোরক্ষার নামে মানুষ খুন। ২০১৪ থেকে অদ্যাবধি প্রায় ২৮ জন সরাসরি খুন হয়েছেন, আহতের সংখ্যা দেড়শতাধিক। রাজস্থানের সেই ভয়াবহ খুনের ভিডিওটি আজও আমাদের মনে ত্রাসের সঞ্চার করে। ভোলা যায় না আক্রান্তের ওই অসহায় চিৎকার। মোদী এত কথা বলেন, কিন্তু প্রতিটি ঘটনার যে প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল, তার ধারকাছ মাড়াননি। নিদেনপক্ষে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে ‘রাজধর্ম’ পালনের জন্য সচেতনও করেননি।
কেন্দ্রীয় স্তরে বিমুদ্রাকরণের প্রভাব এখনও অব্যাহত। শুধু জিডিপির উপর প্রভাব বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের শোচনীয় অবস্থা বা জিএসটি নিয়ে নানা জটিলতাই নয়, সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে একটি জোরালো ধাক্কা লেগেছে। নতুন করে বিগত পাঁচ বছরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সারা দেশেই সেভাবে হয়নি। ফলে সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ বাড়েনি। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে বহু ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পড়ুয়ার অভাবে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ফলে আইটি সেক্টরে এমনিতেই নাভিশ্বাস ওঠার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। বিকল্প ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। এর ফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী। শহুরে শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের কাজের সুযোগ বাড়ানো যায়নি। ফলে মোদীকে সরাসরি ভোটের জন্য সরকারি প্রকল্পগুলির উপরেই জোর দিতে হয়েছে। এটা এক ধরনের অচলাবস্থা, যেখানে সরকারি সাহায্য কিছু পাওয়া সত্ত্বেও প্রকৃত পক্ষে বেঁচে থাকার জন্য জরুরি যে কর্মসংস্থান তা নেই।
কৃষি ক্ষেত্রের অবস্থা শোচনীয়। শুধু গ্যাস দিলেই হবে? সাথে রান্নার উপকরণ কোথায়? যে কৃষকেরা ফসলের দাম না পেয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের দিকে যেতেন তাঁরা সেই সুযোগ হারিয়েছেন বিমুদ্রাকরণের জন্য। অথচ অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ ছিল যা গত চার পাঁচ বছরে প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। তদুপরি প্রধানমন্ত্রী মোদী যাবতীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে কুক্ষিগত করতে গিয়ে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলির দফারফা করে ছেড়েছেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনতা নেই। ব্যাঙ্কের গভর্নরকে সারাক্ষণ প্রধানমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। উর্জিত প্যাটেলের পদত্যাগ ব্যক্তিগত কিনা আমরা জানি না। কিন্তু তা যদি প্রধানমন্ত্রীর কোনও হঠকারী দম্ভের পরিণতি হয়, তবে অত্যন্ত দুঃখের ঘটনা, সন্দেহ নেই।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও এক অবস্থা । শুধু গৈরিকীকরণের অভিযোগ নয়, সমগ্র পরিসরটিকেই দখলে নেওয়ার একটি প্রবল চেষ্টা চলছে। উচ্চ শিক্ষায় সিবিসিএস নামক একটি সম্পূর্ণ বাস্তবতা বর্জিত ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে ছাত্ররা কিছুই শিখছে না। শুধুমাত্র নানা ধরনের পরীক্ষা আর রকমারি হিসেব-নিকেশ হচ্ছে। যথার্থ পরিকাঠামো ছাড়াই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বকচ্ছপ মার্কা শিক্ষা ব্যবস্থা চাপানো হয়েছে। ৠণখেলাপী ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে বা তাঁদের কেউ কেউ হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালাচ্ছেন, অথচ কৃষকদের ৠণখেলাপী হলে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে। মোদী বলেছিলেন যে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পঞ্চাশ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। গত পাঁচ বছরে এই বৃদ্ধির হার গড়ে তিন শতাংশ। অবিজেপি রাজ্যগুলিতে বেশি। ফলে কংগ্রেস যখন বলেছে যে ক্ষমতায় এলে কৃষকদের ৠণ সম্পূর্ণ মকুব করা হবে তখন তা কৃষিজীবী মানুষদের কাছে আশার সঞ্চার করেছে, সন্দেহ নেই।
পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে এই নির্বাচনের ফলাফল কতটা গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্যই ২০১৪ র আগে বিজেপির উত্থান নিয়ে এরাজ্যে তেমন হেলদোল ছিল না। কিন্তু ২০১৪ র লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল বিরোধী জনতার একাংশ ভাবলেন যে, কেন্দ্রে যখন মোদী সরকার আছেই, তখন তৃণমূলকে বিপদে ফেলার জন্য বিজেপির হাত ধরাই শ্রেয়। ফলে বিজেপি ১৭ শতাংশ ভোট পেল। কিন্তু ২০১৬ র বিধানসভা নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোটের হাওয়ায় তা আবার ১০ শতাংশে নেমে যায়। বাম-কংগ্রেস জোটের নির্বাচনী ব্যর্থতার পর একের পর এক উপনির্বাচনে বিজেপি ক্রমশই প্রধান বিরোধী দল হয়ে উঠেছে। এতটাই যে তাঁরা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে ক্ষমতায় চলে আসার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। কিন্তু সারা দেশেই সাম্প্রদায়িক তাস আর ডিভিডেন্ড দিচ্ছে না। মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান সর্বত্রই হিন্দু ভোটার নব্বই শতাংশের অধিক। সেখানে যখন ধর্মীয় রাজনীতি চললো না, তখন বাংলাতেও তা দুর্বল হতে বাধ্য। তদুপরি এই ফল জনমানসে এই বার্তা নিয়ে এসেছে যে, আগামী লোকসভা নির্বাচনে মোদী হারতে পারেন। বস্তুত সেই সম্ভাবনাই প্রবল। ফলে এ রাজ্যে ২০১৯ এ যে পুনরায় তৃণমূলের সাথে বামপন্থীদের মূল লড়াই সেকথা আমি আগেরবারই লিখেছি। শুধু একটি সংহত আন্দোলনমুখী যুব নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল বামপন্থার ক্রমশই আরও শক্তিশালী হয়ে আগামীতে তৃণমূলের প্রকৃত বিকল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলো।

You may also like