Take a fresh look at your lifestyle.

‘আওয়ামী লিগের একচেটিয়া আধিপত্য গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক’, বাংলাদেশ নির্বাচন নিয়ে মূল্যায়ন বদলাতে বাধ্য হল রাজ্য সিপিএম

সিপিএমের মুখপত্র ‘পিপলস ডেমোক্রেসি’র খবরের চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সাধারণ নির্বাচনের ফল নিয়ে মূল্যায়ন পাল্টাতে বাধ্য হল আলিমুদ্দিন স্ট্রিট নিয়ন্ত্রিত ‘গণশক্তি’!
গত ৩০ শে ডিসেম্বর, রবিবার বাংলাদেশে নির্বাচনের পর সোমবার পশ্চিমবঙ্গ সিপিএমের মুখপত্র ‘গণশক্তি পত্রিকায় এই নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রথম পৃষ্ঠায় একটি খবর প্রকাশিত হয়। যার হেডলাইন, ছিল ‘অপ্রতিহত হাসিনা, জামাতের জামানতই বাজেয়াপ্ত’।
খবরের প্রথম লাইন ছিল, ‘জামাতের জামানত বাজেয়াপ্ত করে জিতল বাংলাদেশ। বিধ্বস্ত বিরোধীরা। বাংলাদেশ শেখ হাসিনার। টানা তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হাসিনা’…।
বাংলাদেশের নির্বাচনে যে ব্যাপক সন্ত্রাস, ছাপ্পা ভোট, এবং কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল বিরোধীরা, সেদিন ‘গণশক্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে কার্যত তাকে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। বরং সেদিনই ত্রিপুরা সিপিমের মুখপত্র ‘ডেইলি দেশের কথা’ পত্রিকায় এই নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত খবরে বিরোধীদের অভিযোগকে যথেষ্টই গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ‘বাংলাদেশে ব্যাপক জয় আওয়ামী লিগের, এক কথায় ভোট ডাকাতিঃ বিরোধী ঐক্যফ্রন্ট’, শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত ওই খবরে, ৩০০ র মধ্যে আওয়ামী লিগ এবং তাদের সহযোগীরা যেভাবে ২৮৮ টি আসন এবং যেভাবে অধিকাংশ আসনে ৯২-৯৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে, তাও উল্লেখ করে ‘ডেইলি দেশের কথা’। তখনই পার্টি নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল, পাশের দেশের নির্বাচনী ফল নিয়ে দুই রাজ্য সিপিএমের মুখপত্রে এমন পরস্পর বিরোধী খবর কেন?
এই অবস্থায় ‘পিপলস ডেমোক্রেসি’র সাম্প্রতিক সংখ্যায় বাংলাদেশ নির্বাচন নিয়ে একটি বড় বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশিত হয়। লেখার শিরোনাম, ‘বাংলাদেশ ইলেকশনসঃ ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি ফর শেখ হাসিনা, অপোজিশন অ্যালেজ ফাউল প্লে’। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ত্রিপুরা সিপিএমের মুখপত্রের সুরেই হেডলাইন করেছে ‘পিপলস ডেমোক্রেসি’।
‘পিপলস ডেমোক্রেসি’র খবরে ছত্রে ছত্রে বাংলাদেশের নির্বাচনে কারচুপি, ছাপ্পা ভোট, অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে সে দেশের শাসক দলকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। লেখা হয়েছে, বহু জেনুইন ভোটার ভোট দিতে পারেননি, মানুষ বুথে গেলে হাতে কালি লাগিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। লেখা হয়েছে, বহু বুথেই প্রথম দু’ঘন্টায় ১০ শতাংশের থেকেও কম ভোট পড়ে, কিন্তু পরের ছ’ঘন্টায় ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে যায়, যেখানে কখনই ভোটারদের বিরাট ভিড় চোখে দেখা যায়নি।
‘পিপলস ডেমোক্রেসি’তে এই লেখা প্রকাশিত হওয়ার পরই ৬ ই জানুয়ারি, রবিবার ‘গণশক্তি’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে, যার হেডলাইন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন দিক’। এই সম্পাদকীয়র প্রথম লাইনে লেখা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লিগের জয় প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এমন বিপুল জয়ে অবাক আওয়ামী লিগ নেতৃত্বও’। আরও লেখা হয়েছে, ‘সন্দেহ নেই এত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শাসক দল আওয়ামী লিগ এখন থেকে রাজনীতিতে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েমের সুযোগ অর্জন করল। যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক অশনি সঙ্কেতও বলা যেতে পারে’।
৬ ই জানুয়ারির সম্পাদকীয়তে আরও অনেক কথাই লিখেছে ‘গণশক্তি’। লিখেছে, এই নির্বাচন নিয়ে সে দেশের বিরোধীদের (যার মধ্যে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিও আছে ) নানা অভিযোগের কথা। কীভাবে ভোট লুট হয়েছে সেই কথা, যা নির্বাচনের পরদিন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, যে কথা নির্বাচনের আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, যা নির্বাচনের দিন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা ফল বেরনোর পর আওয়ামী লিগ নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে যে কোনও মানুষকেও লজ্জিত করে, তা লিখতে ‘গণশক্তি’র পাক্কা এক সপ্তাহ লাগলো কেন? নির্বাচনের পরদিন তো তারাই লিখেছিল, ‘জামাতের জামানত বাজেয়াপ্ত করে জিতল বাংলাদেশ’। লিখেছিল, সন্ত্রাস নিয়ে বিরোধীরা ‘যথারীতি’ কিছু অভিযোগ করেছে। তারাই আবার এক সপ্তাহের মধ্যে উলটো সুরে লিখল, এই ফল গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে।
রাজ্য সিপিএমের এক নেতার কথায়, আসলে এটা এক সপ্তাহ বাদে বোধোদয়, না ‘পিপলস ডেমোক্রেসি’তে প্রকাশিত লেখা দেখে নিজেদের ভুল শুধরে পার্টি লাইনে থাকার চেষ্টা, তা বলা মুশকিল। তবে একথা ঠিক, বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল দেখে অনেকেই যতটা অবাক হয়েছিলেন, রাজ্য সিপিএমের মুখপত্র ‘গণশক্তি’তে এই নির্বাচনের মূল্যায়ন দেখে তার থেকে কম অবাক হননি তাঁরা।
তবে সূত্রের খবর, বাংলাদেশ নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সিপিএমের মূল্যায়নে খুশি নয় এ কে গোপালন ভবন। সেই কারণেই, এক সপ্তাহের মধ্যে পাশের দেশের নির্বাচনী মূল্যায়ন নিয়ে অবস্থান ‘সংশোধন’ করা হয়েছে।

Comments are closed.