লেনিনের মূর্তি ভাঙা দিয়ে শুরু হয়েছিল। মাঝে পার্টি অফিস ভেঙেছে, পার্টির নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন, আক্রান্ত হয়েছেন বহু সমর্থক। দলের পলিটব্যুরো সদস্য এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার কিডনি পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেছে শাসক দল। শেষ পর্যন্ত ত্রিপুরায় দলের মুখপত্রও বন্ধ করে দিল বিজেপি সরকার। ‘শেষ পর্যন্ত’ লিখলাম বটে, কিন্তু আদৌ কি শেষ?
না এটা শুরু?
মাত্র ছ’মাস পেরিয়েছে। এরই মধ্যে ত্রিপুরা সিপিএম প্রতিদিনের, প্রতি মুহূর্তের অভিজ্ঞতায় বুঝছে, শাসক বিজেপিকে।
যেদিন মধ্যরাতে নজিরবিহীনভাবে ত্রিপুরায় বিজেপি সরকার সিপিএম মুখপত্র ‘ডেইলি দেশের কথা’ বন্ধের ফতোয়া জারি করল, ঘটনাচক্রে তার পরদিনই দিল্লিতে মিছিল নিয়ে গেল হাজার-লক্ষ কৃষক। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ দাবি নিয়ে। তারপর সারা দিন ধরে গোটা দেশ দেখল, কৃষক আন্দোলন দমন করার এক বেনজির পুলিশি আক্রমণ। কাঁদানে গ্যাস, জল কামান এবং বন্দুক হাতে কেন্দ্রীয় সরকার ব্যারিকেড গড়ল কৃষক মিছিল ঠেকাতে। শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল কৃষকরাও। কিন্তু কৃষক মিছিল ঠেকাতে পুলিশ নামিয়ে যে দৃষ্টান্ত তৈরি হল রাজধানীর বুকে, হিন্দি বলয়ের সিপিএম এবং বৃহত্তর বাম পরিবারের নেতারাও বুঝছেন, শাসক বিজেপিকে।
ত্রিপুরাসহ গোটা দেশে এই এক নজিরবিহীন, ব্যতিক্রমী পরিবেশ, পরিস্থিতির মধ্যে বাংলা অবশ্য চিরকালই অন্য কিছু ভাবার ট্র্যাডিশন বজায় রেখেছে। বাংলা মানে এখানে, রাজ্য সিপিএম। তারা এখনও তাদের সমদূরত্বের লাইনে অটল। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট এখনও মনে করে, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি দুইই সমান বিপদজনক এবং দুজনের বিরুদ্ধেই তাদের লড়াই জারি রাখতে হবে। দুইই নাকি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
সমদূরত্বের বিষয়টি অবশ্য সিপিএমের অভিধানে নতুন কিছু নয়। ১৯৯৬ সালেও তারা দিল্লিতে একই অবস্থান নিয়েছিল বিজেপি এবং কংগ্রেসের প্রশ্নে। এরপর দু’বছরের মধ্যে শক্তি বৃদ্ধি করে বিজেপি যে দিল্লি দখল করে, তা এখন ইতিহাস। ১৯৯৬ সালে জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক হয় সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে। সেই মিটিংয়ে বক্তাদের যে তালিকা তৈরি হয়েছিল, তাতে বাংলার ডেলিগেট টিমের নেতৃত্বে ছিলেন সূর্যকান্ত মিশ্র। ‘কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে জ্যোতিবাবুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া ঠিক হবে না’, এই বক্তব্যই পেশ করেছিলেন নারায়ণগড়ের তৎকালীন বিধায়ক এবং রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্র। মাঝে দু’দশক পেরিয়েছে, সূর্যকান্ত মিশ্র আজ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সিপিএমের সম্পাদক। সেদিন কংগ্রেস এবং বিজেপির সঙ্গে সমদূরত্বের লাইন নেওয়া সূর্যকান্ত মিশ্র আজ মনে করেন, বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি দুইই এক। দু’জনের বিরুদ্ধেই একযোগে প্রচার, লড়াই চালাতে হবে। বাংলায় সমদূরত্বের লাইন চালু করে ৩১ নম্বর আলিমুদ্দিন স্ট্রিট স্লোগান তুলেছে, তৃণমূল-বিজেপি কারও বিরুদ্ধেই লড়াই এক ইঞ্চিও দুর্বল করা যাবে না।
কিন্তু আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের এই রাজনৈতিক লাইন কি আজ বিশ্বাস করছেন তাদের দলের লক্ষ-লক্ষ কর্মী, সমর্থক? বিশ্বাস যে করছেন না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০১৬ সালের পর থেকে একের পর এক নির্বাচনের রেজাল্ট। সেই রেজাল্ট প্রমাণ করছে স্রেফ একটাই জিনিস, তৃণমূলকে যদি বাংলা থেকে হঠাতে হয়, তবে হাত শক্ত করতে হবে বিজেপির। বিজেপিই তৃণমূলকে হারাবে, এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেঁথে বসেছে জেলায় জেলায় সিপিএম কর্মী তো বটেই বহু নেতাদের মাথাতেও। তাই আলিমুদ্দিন যত স্লোগান দিয়েছে, ‘রাজ্যের গণতন্ত্র উদ্ধারে তৃণমূলকে হারাতে হবে, ততই সিপিএমের ভোটের ঢল নেমেছে বিজেপির দিকে। সিপিএমের বহু নেতা, কর্মী, ভোটার বুঝে নিয়েছেন, তৃণমূলকে হারাতে বিজেপির হাত শক্ত করতে হবে। তৃণমূল হারলেই যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলায়, তবে কে তাকে হারাল তা তো আর মুখ্য ব্যাপার থাকে না!
কিন্তু বিজেপির হাত ধরে কেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে ত্রিপুরায়, ছ’মাসও হয়নি বুঝছে সে রাজ্যের সিপিএম।
বাংলা সিপিএমের হাতে এখনও সময় আছে ত্রিপুরা থেকে শিক্ষা নেওয়ার। এখনও সময় আছে এটা বোঝার যে, একটা দল যেখানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে আসীন, আর অন্য দলটা প্রায় ৩৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ভারতবর্ষের মাত্র একটি অঙ্গ রাজ্যে সরকার পরিচালনা করে। এই দুই দল বিজেপি এবং তৃণমূলের ক্ষমতা, ব্যাপকতা, প্রভাব এবং সরকার পরিচালনা পদ্ধতি দুই কোনওভাবেই এক হতে পারে না।
আর সবচেয়ে বড় কথা, ২০১৯ সালে তো এরাজ্যে সরকার বদলের কোনও নির্বাচন হচ্ছে না। নির্বাচন হচ্ছে, দেশে এই বিজেপি সরকারের টার্ম রিনিউ হবে কিনা তা ঠিক করার। এখনও বাংলার সিপিএম সমদূরত্বের লাইন আঁকড়ে পড়ে থাকলে দেরি হয়ে যাবে না তো? দিল্লিতে আর একটা বিজেপি সরকার তৈরি হলে এবং তার প্রভাবে বলীয়ান হয়ে এরাজ্যেও তারা শক্তিশালী হলে বাংলা সিপিএমকে ত্রিপুরা পার্টির থেকেও খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না তো?

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা শুরু করেছি সাবস্ক্রিপশন অফার। নিয়মিত আমাদের সমস্ত খবর এসএমএস এবং ই-মেইল এর মাধ্যমে পাওয়ার জন্য দয়া করে সাবস্ক্রাইব করুন। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us