চারদিকে লকডাউন। রাস্তাঘাট প্রায় জনমানব শূন্য। স্বাভাবিক ভাবেই এই পরিস্থিতিতে বাড়ির মধ্যে রয়েছি। সাধারণত সারাদিনের কাজের চাপে বাড়িতে সময় দিতে পারি না। কিন্তু যখন থেকে এই লকডাউন ঘোষণা হয়েছে, সেদিন থেকে পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটছে। বাড়িতে আমার স্ত্রী ও মেয়ে রয়েছে। ও ক্লাস ১১ এ পড়ে।
এই অবস্থায় মেয়ের স্কুল বন্ধ হলেও, স্কুলের তরফ থেকে ই-মেল মারফত যোগাযোগ রয়েছে। ই-মেলেই অ্যাসাইনমেন্ট দিচ্ছে। আর ও বাড়িতে বসেই সেসব করছে। আমার বরাবর একটু ভোরে ওঠার অভ্যেস। কিন্তু এই লকডাউনের জেরে কিছুটা লেটেই উঠছি। তবে খুব বেশিও লেট করছি না তাই বলে। বড়োজোর আধ ঘণ্টা। আমাকে ফিটনেস ফ্রিক বলা যেতে পারে। আমি রেগুলার জিম করি। কিন্তু এখন এই লকডাউনের জেরে সবকটা জিমই বন্ধ। অগত্যা বাড়িতেই এক্সারসাইজ করছি আপাতত। আমার কাছে কিছু পুরনো ডাম্বেল রয়েছে। সেগুলি দিয়েই আপাতত কাজ চালাতে হচ্ছে।
এই লকডাউনের জেরে আরও বেশ কিছু সমস্যায় পড়তে হয়েছে। যেমন আমার সকালে খবরের কাগজ পড়ার পুরনো অভ্যাস। কিন্তু এই লকডাউনের জন্য বাড়িতে খবরের কাগজ আসছে না বেশ কিছুদিন ধরে। আমার বাড়িতে যে ছেলেটি খবরের কাগজ দেয়, সে বলে দিয়েই গেছে, এই মুহূর্তে খবরের কাগজ পাওয়া যাবে না। তাই এখন আপাতত মোবাইল বা ল্যাপটপে ই-পেপারটাই পড়ছি। আর এই সুযোগে টিভিতে খবরের চ্যানেলগুলি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছি। বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে-মিশিয়েই দেখছি। এর আগে কোনদিনও টিভিতে খবর দেখার মত সময়ই পেতাম না। তবে আমার বেশ কিছু বন্ধুর কাছে শুনেছি, তাঁরা গত শনিবার খবরের কাগজ পেয়েছে। আশা করছি হয়ত আমিও খুব তাড়াতাড়ি খবরের কাগজ পাবো।
আমার কিছু চেনাজানা এনজিও আছে, যারা রাস্তার কুকুরদের নিয়ে কাজ করে। তাদের খাওয়ায় ও সেবা শুশ্রূষা করে। এই দুর্দিনে তারাও সেরকম কিছুই জোগাড় করে উঠতে পারেনি। কাজেই তাদেরকে কিছুটা সাহায্য করার চেষ্টা করি। আর তাঁর সঙ্গে কিছু দিন আনি দিন খাই মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য যারা কাজ করছে, তাদেরও কিছু সাহায্য করি।
আমার মেয়ে ক্যালকাটা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ে। ও খুব ভাল পিয়ানো বাজায়। ইচ্ছে আছে ওর সঙ্গে পিয়ানো বাজানোর কিছু ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছাড়ব। তবে আমার মেয়ে সেসব করতে নারাজ। দেখি ওকে রাজি করানো যায় কিনা!
এই সময়ে যেহেতু খুব বেশি বাড়ির বাইরে পা রাখছি না, তাই খাওয়া-দাওয়াটাও একটু কমই করছি। আমি ভাত সাধারণত খুব একটা পছন্দ করি না। কিন্তু এই ক’দিন যেহেতু বাড়ি থেকে একদমই বেরচ্ছি না, তাই ডাল ভাতই খাচ্ছি।
আমার বাবার খুব বাজার করার নেশা। আমি কাজের জন্য খুব বেশি সময় পাই না। আমার স্ত্রীও কিছুটা করেন। কিন্তু আমাদের বাড়ির আশেপাশে কোথাও সেরকম কিছু পাচ্ছি না। আমার এক বন্ধু থাকে হাইল্যান্ড পার্কে। ওদের ওখানে একটা বড় স্টোর রয়েছে, যেখানে প্রায় সব কিছুই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বাইরের লোকজনকে সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না। তাই বাইরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বন্ধুকে হোয়াটসঅ্যাপে লিস্ট পাঠাই। ও জিনিসগুলো কিনে আমাকে গাড়িতে দিয়ে যায়। এইভাবেই আপাতত কিছুদিনের রসদ জোগাড় করেছি।
তবে এই বাড়িতে থাকার জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচুর ওয়েব সিরিজ দেখছি, যেগুলি এতদিন দেখব দেখব করেও সময়ের অভাবে দেখা হয়ে ওঠেনি। আমি একটু থ্রিলার সিরিজ দেখতে বেশি পছন্দ করি। হটস্টার বা নেটফ্লিক্সেই সাধারণত দেখি। ভুটে অসুর দেখা সদ্য শেষ করেছি। এখন নেটফ্লিক্সে ব্লাডলাইন দেখছি।
ফিল্মের কাজ তো এখন বলতে গেলে পুরোপুরি বন্ধ। যে সমস্ত শুটিং আগামী এক-দু’মাসের মধ্যে হওয়ার কথা ছিল, সেগুলি এখন পিছিয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চলে গেছে। ডিস্ট্রিবিউশনের কাজও বন্ধ। তাই আপাতত বাড়ি থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে আড্ডা বা কথাবার্তা চলছে।
তবে হ্যাঁ, বাড়িতে থাকলেও, সবার সঙ্গে অনেক বেশি সময় কাটালেও, আমরা একে অপরকে নিজেদের পার্সোনাল স্পেসটুকু ছেড়েই রেখেছি।
(অনুলিখন: অভিজিৎ দাস)

