Take a fresh look at your lifestyle.

জেলে বসেই সেট-এ উত্তীর্ণ মাওবাদী নেতা অর্ণব দাম, উচ্চশিক্ষার স্বার্থে মুক্তির দাবি এপিডিআর-এর

নরেন্দ্রপুরে পড়ার সময় বন্ধুরা তাঁকে ডাকত অঙ্কের জাদুকর নামে। বারাসত গভর্নমেন্ট স্কুলে পড়ার সময়ই মা-বাবা বুঝতে পারেন, ছেলে বইয়ের পোকা। স্কুলের পড়া যত না পড়ে তার চেয়ে ঢের বেশি পড়ে অন্যান্য বিষয়ের বই। দিন কেটে রাত আসে, ফের রাত কেটে দিন, বইয়ের পাতা থেকে মুখ তোলে না ছেলে। তারপর সময়ের সাথে সাথে বারাসত গভর্নমেন্ট স্কুল ছেড়ে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন, সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে খড়গপুর আইআইটি। সেখানে দুবছর পড়ার পর আচমকা বেপাত্তা। সেটা ১৯৯৮ সাল। শৈশব থেকে কৈশোর কেটে যৌবন, বইয়ের সঙ্গে সখ্যে কখনওই ছেদ পড়েনি। তিনি মাওবাদী নেতা অর্ণব দাম ওরফে বিক্রম। জেলে বসে স্টেট লেভেল এলিজিবিলিটি টেস্টে (সেট) সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন শুক্রবারই।

ছেলের সাফল্যের খবরে আনন্দে ভেসেছেন অর্ণবের বাবা-মা। অর্ণব যে ছেলেবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী, জানিয়েছেন বাবা এস কে দাম। সেই সঙ্গে প্রতি পদে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে জেলে বসে ছেলের সেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াকে অর্ণবের ধী শক্তির প্রকাশ হিসেবেই বর্ণনা করছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এস কে দাম। তিনি জানিয়েছেন, ছেলে ছোটবেলা থেকেই ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইত। সেই স্বপ্নপূরণ করেই অর্ণবের খড়গপুর আইআইটিতে পড়তে যাওয়া।

২০১২ সালে আসানসোল থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে মাওবাদী নেতা অর্ণব দাম ওরফে বিক্রমকে। তারপর থেকে জেলেই রয়েছেন মাওবাদীদের এই তরুণ নেতা। সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি জেল থেকে হুগলি জেলা সংশোধনাগারে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অর্ণবকে। প্রেসিডেন্সি জেলে বসেই আইআইটি ড্রপআউট অর্ণব একের পর এক পাস করেছেন বিএ, এমএ এবং সর্বশেষ সেট। রাজ্যের ইতিহাসে এমন নজির নেই, জানাচ্ছেন মানবাধিকার কর্মী রঞ্জিৎ শূর। এর আগে নেট পরীক্ষায় বসার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন অর্ণব দাম। কিন্তু অভিযোগ, জেল কর্তৃপক্ষের একাংশের গাফিলতিতে নেট পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেও পরীক্ষায় বসতে পারেননি তিনি। প্রতিবাদে জেলে ফিরেই শুরু করেছিলেন অনশন। খোদ কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস তাঁকে বুঝিয়ে অনশন ভাঙিয়েছিলেন সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, গবেষণার জন্য সিনপসিস তৈরি হয়ে গেলে তাঁকে জানাতে। তখন অর্ণব দামকে পিএইচডি করার জন্য সরকার সমস্তরকম সাহায্য করবে। মানবাধিকার কর্মী রঞ্জিৎ শূরের অবশ্য অভিযোগ, বাস্তবে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো। মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পরই অর্ণবকে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে হুগলি জেলা সংশোধনাগারে বদলি করে দেওয়া হয়। সেখানকার পরিবেশে অর্ণবের পড়াশোনা তো দূর অস্ত, সুস্থভাবে বেঁচে থাকাই অসম্ভব বলে দাবি মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর রঞ্জিৎ শূরের। এখানেই শেষ নয়, প্রেসিডেন্সি জেলে থাকাকালীন নিয়মিত জেলের অন্যান্য কয়েদিদের পড়াশোনা শেখাতেন এই মাওবাদী নেতা। তার বদলে দৈনিক ৮০ টাকা করে মিলত। যে টাকায় নিজের মামলা ও আইনজীবীদের ফি মেটাতেন অর্ণব। কিন্তু হুগলি জেলে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকে সেই শ্রম দেওয়ার সুযোগও বন্ধ। সম্প্রতি মেদিনীপুর আদালতে হাজিরার সময় অর্ণব দাম তাঁর আইনজীবীকে সওয়াল করতে বারণ করে দেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, জেলে শ্রমের বিনিময়ে টাকা উপার্জনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়াকে। অর্থাভাবে নিজের সওয়াল এখন নিজেই করছেন বিক্রম। এমনকী আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও জেলে অর্ণব দামকে রাজনৈতিক বন্দির মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর।

রাজ্য সরকারের কাছে অবিলম্বে অর্ণবকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন রঞ্জিৎ শূর। অর্ণবের বিরুদ্ধে মোট ৩১ টি মামলা রুজু হয়েছিল। এই ৮ বছরে এক এক করে ৩০ টি মামলায় জামিন পেয়েছেন বিক্রম কিন্তু শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে হামলার মামলায় এখনও জামিন পাননি তিনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য অর্ণব দামকে মুক্তি দিক আদালত।

এর আগে গবেষণার বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আপোস করতে বাধ্য হয়েছিলেন অর্ণব দাম। জেলে বসে গবেষণা করা যায় এমন বিষয়ই বাছতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু থামানো যায়নি বিক্রমকে। প্রতি পদে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অর্ণবের এই নজিরবিহীন সাফল্য অনুপ্রাণিত করবে তাদের, যাঁরা সমস্ত বাধা টপকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, মনে করেন অর্ণবের বন্ধুরা।

Comments are closed.