নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল #২৪: ‘পুলিশকো হাম দেখ লেঙ্গে’, বললেন সিআরপিএফের ডিআইজি অলোক রাজ

আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছিল: ২০০৮ পঞ্চায়েত ভোটের সাত দিন আগে ভোরে পৌঁছলাম নন্দীগ্রাম, ঘেরাও করল সিপিআইএমের ক্যাডাররা। কিছুক্ষণ বাদে ঘটনাস্থলে এলেন সিপিআইএম নেতা অশোক বেরা……

 

এরপর সিপিআইএম নেতা অশোক বেরার সঙ্গে কথা বললাম আরও কিছুক্ষণ। এরই মাঝে অশোক গুড়িয়া ফোন করে জানতে চাইলেন, কোনও সমস্যা নেই তো? জানিয়ে দিলাম, না। জটলার সিপিআইএম কর্মীরা তখন আমাকে রীতিমতো সম্ভ্রমের নজরে দেখছে। বুঝতে পারছে না, নন্দীগ্রামে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে পার্টির ট্যাকটিকাল লাইনের পরিবর্তনটা কবে, কোন সম্মেলনে হল। বোঝার চেষ্টা করছে, এই ট্যাকটিক্যাল লাইনের পরিবর্তনটা কি সামগ্রিক বা সবার জন্য, নাকি এটা ব্যতিক্রমী ঘটনা। কিন্তু ব্যাপার যাই হোক, সেদিন সকালের পর পঞ্চায়েত ভোট পর্যন্ত নন্দীগ্রামে সিপিআইএম বাহিনীর রাজকীয় অভ্যর্থনায় ডিউটি করেছিলাম। কোথাও কোনও সমস্যা হয়নি।

প্রায় গোটা নন্দীগ্রাম লাল পতাকায় মোড়া। কয়েকদিনের মধ্যেই পঞ্চায়েত ভোট। কিন্তু বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচির চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। সেদিন বিকেলে বা পরদিন নন্দীগ্রামের জনসভা করলেন সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠ। গেলাম মিটিং শুনতে। নন্দীগ্রামের নানা জায়গা থেকে লাইন দিয়ে মানুষ এল মিটিংয়ে। আগের বছর, ২০০৭ এর ১২  নভেম্বর ‘অপারেশন সূর্যোদয়ে’র পর যেমন মিছিল দেখেছিলাম সোনাচূড়া থেকে ভাঙ্গাবেড়া ব্রিজ পর্যন্ত, অনেকটা তেমনই মিছিল করে এসে মাঠ ভরিয়ে দিল মাত্র কয়েক মাস আগে সিপিআইএমবিরোধী আন্দোলনে শামিল হওয়া নন্দীগ্রামের মানুষ। যারা মরণপণ আন্দোলন করেছিল সরকার এবং শাসক দলের বিরুদ্ধে, রাজনীতির এমন বিচিত্র গতি, তারাই আজ পড়ন্ত বিকেলে মাঠে বসে সিপিআইএম নেতার মুখে সেই আন্দোলনের তীব্র সমালোচনা শুনছে। শরীর আছে, মন কোথায় আছে কেউ জানে না। কিন্তু শুনছে, তাদের ভুল বুঝিয়ে কীভাবে বিপথে চালিত করছিল তৃণমূল কংগ্রেস এবং মাওবাদীরা! শুনছে, তাদের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করিয়ে কীভাবে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনে বাধ্য করেছিল বিরোধী দল। একটা ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মণ শেঠের বক্তৃতা শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, সিপিআইএমের মাঝারি থেকে বড়ো, কোনও নেতাই কখনও নন্দীগ্রামের আন্দোলনকে জমি রক্ষার জন্য সেখানকার সাধারণ মানুষের বা গ্রামবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ হিসেবে দেখেননি। সবসময়ই তৃণমূল কংগ্রেস এবং মাওবাদীদের চক্রান্ত বলে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করে নিজেদের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং প্রশাসনিক ত্রুটিকে ঢাকার চেষ্টা করেছেন মাত্র। নন্দীগ্রাম সাধারণ মানুষের আন্দোলন, একথা মেনে নিলে তো নিজের ব্যর্থতা প্রকাশ্যে এসে যাবে। এই ভাবের ঘরে চুরি যে বেশি দিন চলবে না তা সেদিনও লক্ষ্মণ শেঠের বক্তৃতা শুনে দিব্যি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু তা যে এত দ্রুত রাজ্যবাসীর কাছে ধরা পড়ে যাবে তা বোঝা গেল মাত্র কয়েকদিন বাদেই, পঞ্চায়েত ভোটের রেজাল্টর দিন।

 

প্রাক নির্বাচন পর্ব

 

ভোটের আর ৩-৪ দিন বাকি। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সিপিআইএম নেতারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নন্দীগ্রাম। তমলুকের পার্টি অফিসে বসে ব্যান্ড মাস্টারের মত সমস্ত কিছু পরিচালনা করছেন সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠ। তাঁর মুখ্য পরামর্শদাতা তখন নন্দীগ্রাম থানার এবং জেলার কিছু পুলিশ অফিসার। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস সহ  বিরোধীরা তখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রধান সমস্যাটা শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। নন্দীগ্রামে পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে। ১৪ মার্চ পুলিশের গুলি চালানোর পর নন্দীগ্রামে সিপিএমের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে রাশ অনেকটাই চলে গিয়েছিল তেলেগু দীপক, মধুসূদন মন্ডলদের  হাতে। স্রেফ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে সিপিআইএমের গড়বেতা-কেশপুর বাহিনীকে ঠেকানো সম্ভব হবে না বুঝে গিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারীও। প্রায় ৬-৭ মাস লড়ে তেলেগু দীপক এবং তাঁর সহযোগীরা ১০ নভেম্বর বিকেলে নন্দীগ্রাম ছেড়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেখানকার মানুষের একটা বড়ো অংশের মধ্যেই মাওবাদীদের যথেষ্টই প্রভাব তৈরি হয়েছিল। তাছাড়া তেলেগু দীপক এলাকা ছাড়লেও মধুসূদন মন্ডল কিন্তু থেকে গিয়েছিলেন নন্দীগ্রামে। পঞ্চায়েত ভোট কাছাকাছি আসতেই মধুসূদন মন্ডলের  সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর বিরোধ শুরু হয় প্রার্থী দেওয়া নিয়ে। তাঁর যৌথ আন্দোলনের মানসিকতা থেকে মধুসূদন মন্ডল চেয়েছিলেন, ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির ব্যানারে প্রার্থী দেওয়া হোক সিপিআইএমের বিরুদ্ধে। কোনও দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। কিন্তু শুরুতেই মধুসূদন মন্ডলের এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর প্রখর রাজনৈতিক বাস্তববোধ এক নিমেষে বুঝতে পেরেছিল, এমনটা হলে সর্বনাশ হবে। আন্দোলনের ইঞ্জিনটাই চলে যাবে অতি বাম নেতৃত্বের হাতে, আর তাতে সামান্য কয়েকটা বগির ভূমিকা পালন করতে হবে তৃণমূল কংগ্রেসকে। এক বছর বাদেই লোকসভা ভোট। সেখানে বাইরের লড়াইটা হবে সিপিআইএমের সঙ্গে, যা লোকে দেখতে পাবে। কিন্তু ভেতরে অদৃশ্য লড়াই করতে হবে অতি বাম মানসিকতার সঙ্গে, যা যে কোনও সময় হয়ে উঠবে আরও কঠিন। জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ে নন্দীগ্রামে নকশালদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে তাঁকে। তাই মধুসূদন মন্ডল মডেল খারিজ করে নন্দীগ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দেন তিনি। শেষমেশ প্রবল মতবিরোধের মধ্যে শুভেন্দুরই জয় হয়। তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তি এবং তাদের সঙ্গে থাকলে সিপিআইএম বিরোধী লড়াই জোরদার হবে এমনটাই ভেবেছিলেন নন্দীগ্রামের অধিকাংশ মানুষ। এবং তারা ঠিকই ভেবেছিলেন। এরপর নন্দীগ্রামের ১৭ টি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন আসনে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধ বাধে কংগ্রেসের। তখন আন্দোলনের স্টিয়ারিং অনেকাংশেই ছিল  শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে। যার পরিপ্রেক্ষিতে নন্দীগ্রামের ১৭ টি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় সব আসনেই প্রার্থী দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। বাড়তি আসন দাবি করে কংগ্রেসও। এই অন্তর্দলীয় বিরোধ ঠেকানোর জন্যই মধুসূদন মন্ডল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নামে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন। যদিও তা একেবারেই ফলপ্রসূ হয়নি। শুধু তাই নয়, ২০০৭ সালের ১৪ মার্চের পর সিপিআইএমকে মোকাবিলার পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে একাধিকবার নন্দীগ্রামের তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধ হয়েছিল মধুসূদন মন্ডল, তেলেগু, দীপক বা মাওবাদীদের। আন্দোলন এবং ক্ষমতার রাশ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে বারবারই স্নায়ুর লড়াই হয়েছে শুভেন্দু অধিকারী এবং মাওবাদীদের মধ্যে। ১০ নভেম্বর তেলেগু দীপক তার দলবল নিয়ে নন্দীগ্রাম ছেড়ে পালানোর পর থেকেই একাধিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে নন্দীগ্রামে প্রভাব বৃদ্ধি করতে শুরু করে করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর। তাঁর সেই প্রভাব এবং কর্তৃত্ব অবশেষে সুপ্রতিষ্ঠিত হল পঞ্চায়েত ভোটে।

৯ মে বিকেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে জনসভা শেষ করে নন্দীগ্রাম ছাড়লেন, আর সেই দিন সন্ধ্যার পর থেকে নন্দীগ্রামে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক নেতা এবং কর্মী। সেদিন রাতে তমলুকে হোটেলে ফেরার পর নন্দীগ্রাম থেকে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির এক নেতা ফোন করে আমাকে জানান, সিপিআইএমের লোকজন তাঁদের হুমকি দিচ্ছে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে বললাম, এত রাত্তিরে কিছু করা যাবে না, পরদিন আমি বিষয়টা দেখব।

পরদিন ১০ মে, দীর্ঘ তিন দশকের বাম সরকারের বিদায়ের সূত্রপাত হওয়া পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটের আগের দিন। সকাল ১০টা নাগাদ নন্দীগ্রামে পৌঁছলাম। থানার সামনে গিয়েছি। থানার সামনে একটা বিরাট পুকুর। থানার উল্টোদিকে পুকুরের একদম পাশে বিডিও অফিস। তার পাশে একটা ছোট্ট মাঠ, মাঠের পাশে হাসপাতাল। থানায় পৌঁছে দেখি, বিডিও অফিসের পাশে মাঠে বহু মানুষের জটলা। পুরুষ, মহিলা, বাচ্চা মিলে কয়েক’শো মানুষ। রীতিমতো সংসার পেতে বসেছে। কী ব্যাপার? আগের দিনও তো প্রায় সন্ধে পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ছিলাম। বিডিও অফিস এবং হাসপাতালের মাঝের মাঠে এমন কোনও জমায়েত দেখিনি। থানা থেকে জায়গাটা দূরত্ব একশো মিটারও নয়। কেন এত মানুষ ভিড় করে আছে খোঁজ নেওয়ার জন্য থানার পাশের পুকুরের ধারে সরু রাস্তা দিয়ে এগোলাম। দেখি উল্টোদিক থেকে আন্দোলনের দুই নেতা তৃণমূল কংগ্রেস সুফিয়ান এবং আবু তাহের হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছেন।

‘কী ব্যাপার, ওখানে এত ভিড় কেন?’

‘কাল রাতে আমাদের লোকেদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অত্যাচার করেছে সিপিআইএম বাহিনী। আমাদের অনেকের ভোটের কার্ড কেড়ে নিয়েছে, যাতে কাল ভোট দিতে না পারে। অনেকে ঘরছাড়া হয়েছে। তাই বিডিও অফিস ঘেরাও করেছি।’ সুফিয়ান এবং তাহের প্রায় একসঙ্গে জবাব দিলেন। সেই সঙ্গে দু’জনেরই গলায় একই আর্তি, ‘আপনি নিজে এসে দেখুন। কিছু একটা করুন আমাদের জন্য।’ পরের দিনের ভোটে নিশ্চিত পরাজয় এবং তারপরে তাঁদের জীবনে কী অনিশ্চিত বিপর্যয় নেমে আসবে তার আগাম আশঙ্কা দু’জনের গলায়।

ক্যামেরাম্যান শ্যামল সঙ্গেই ছিল।  ‘চলো তো গিয়ে দেখি, কী ব্যাপার।’ দু’জনে এগোলাম। সুফিয়ান আর তাহের আগে আগে যাচ্ছেন। যেতে যেতে ভাবছি, এই হাসপাতালের সামনেই মাত্র একবছর দু’মাস আগে ১৫ মার্চ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এসে কীভাবে সুফিয়ান এবং তাহের বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার হাতের মাইক কেড়ে নিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের লোকজন। তিন-চারটে ঘুষিও পরেছিল মাথার পেছনে, পিঠে। সঙ্গে চলছিল গালিগালাজ। এই সরু রাস্তা দিয়েই দৌড়ে থানায় এসে বেঁচেছিলাম সেদিন। নন্দীগ্রাম নামক এই রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে জীবন কত উঁচু-নিচু। কত ওঠাপড়া। যারা আজ শক্তিশালী, তারাই কাল আক্রান্ত, ঘরছাড়া। যারা আজ ঘরছাড়া, কাল তাদেরই হাতে ক্ষমতার ব্যাটন। শাসক আর শাসিত কীভাবে বারবার পাল্টে যাচ্ছে রাজ্যের এই দুই ব্লকে। এক বছরের সামান্য আগে যারা গালিগালাজ করে, মেরে আমাকে বের করে দিয়েছিল, তারাই আজ সেই একই জায়গায় আমাকে লাল কার্পেট বিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নিজেদের ঘরছাড়া হওয়ার অভিজ্ঞতা শোনাতে।

পলিথিন, মাদুর, গামছা পেতে প্রায় দেড়শো-দুশো পুরুষ, মহিলা বিডিও অফিসের সামনে বসে। সঙ্গে অনেক বাচ্চা। শ্যামল ছবি তুলতে শুরু করেছে। আমি কথা বলছি। ‘আমাকে ভয় দেখিয়েছে, বলেছে ভোট দিতে গেলে বাড়িছাড়া করবে,’ আমাদের বাড়ির সবার ভোটার কার্ড কেড়ে নিয়েছে,’ আমাকে কাল রাতে এসে মেরেছে সিপিআইএম, বলেছে, ভোট দিতে গেলে মেরে ফেলবে,’ এমন নানা অভিযোগ চিৎকার করে বলে চলেছে ভিড়টা। এরই মধ্যে সাদা জামা, বুকের বোতাম খোলা সুফিয়ান চিৎকার করে উঠলেন, ‘কাল আমরা ভোটই হতে দেব না  নন্দীগ্রামে। ব্যালট পেপার যেতেই দেব না ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে। আমাদের লোকেরা ভোট দিতে না পারলে, নন্দীগ্রামে ভোট হবে না।’ সুফিয়ানের এই ঘোষণা আগুনে ঘি ঢালল। যারা দশ মিনিট আগেও ম্রিয়মান হয়ে শরণার্থীর মতো বসেছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, ক্যামেরা, সাংবাদিক দেখে তাদেরই বডি ল্যাঙ্গোয়েজ পাল্টাতে শুরু করেছে। হঠাৎ যেন বেড়ে গেছে তেজ। ততক্ষণে আরও কয়েকজন সাংবাদিক জড়ো হয়েছেন সেখানে। সুফিয়ানের ঘোষণায় তাদের গলার জোর একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই চিৎকার করে বলতে শুরু করেছে, ‘আমরা ব্যালট পেপার বেরতে দেবো না। কাল নন্দীগ্রামে ভোট হবে না।’

পরিষ্কার বুঝতে পারছি, ভোটের আগের দিন নন্দীগ্রামে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিডিও অফিস ঘেরাওয়ের মোটিভটা এতক্ষণে স্পষ্ট হল। সেদিন সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বড়ো বড়ো বাসে পুলিশ আসতে শুরু করেছে নন্দীগ্রামে। সিআরপিএফ তো আগে থেকেই আছে। বিডিও অফিসে পরের দিন ভোটের জন্য ব্যালট পেপার এসে পৌঁছেছে। দুপুর থেকে পুলিশ ব্যালট পেপার এবং ভোট কর্মীদের নিয়ে বুথে বুথে রওনা দিতে শুরু করবে। তার আগে সকাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেস স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে বিডিও অফিস ঘেরাও শুরু করেছে। দাবি একটাই, তাদের ঘরছাড়া লোকজন বাড়ি ফিরতে না পারলে, সবাই ভোটার কার্ড ফেরত না পেলে এবং সবাই ভোটাধিকার সুনিশ্চিত না হলে, বিডিও অফিস থেকে ব্যালট পেপার বেরতে দেওয়া হবে না। তাই এই বিক্ষোভ এবং ঘেরাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই গোটা কর্মকাণ্ড সম্প্রচারিত হতে শুরু করল আমাদের চ্যানেলে এবং অন্যান্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে। বারবার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নন্দীগ্রাম এমন এক অদ্ভুত জায়গা, যেখানে খবর হাওয়ার চেয়ে দ্রুত ছোটে, আর গুজব আরও জোরে। মুহুর্তের মধ্যে নন্দীগ্রাম জেনে গেল, বিডিও অফিস ঘেরাও হয়েছে ভোট বন্ধের দাবিতে। আর মহাকরণসহ গোটা রাজ্যে রটে গেল, ব্যালট পেপার ছিনতাই করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। পঞ্চায়েত ভোট বাতিল। কলকাতা থেকে পরিচিত এক পুলিশ অফিসার ফোন করলেন। জানতে চাইলেন, ঠিক কী হয়েছে, পরিস্থিতি কতটা খারাপ? এমনিতেই যে কোনও বিষয়ে কথায় কথায় উত্তেজিত হতে না পারা  সাংবাদিক হিসেবে আমার সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় জানালাম ঘটনাটা।

‘১০০-১৫০ মানুষ বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, খুব বড়ো কিছু নয়।’ কিন্তু জেলার পুলিশ প্রশাসনের ধারণা হয়েছিল, যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে তা চলতে দিলে খারাপ হবে, আরও বেশি মানুষ সেখানে জমায়েত হবে। তখন আর কিছু করা যাবে না। তাই অঙ্কুরেই বিনাশ দরকার আন্দোলনের। কিছুক্ষণের মধ্যেই নন্দীগ্রাম থানার ওসির নেতৃত্বে প্রচুর পুলিশ রওনা দিলেন বিডিও অফিসের দিকে। পাঁচ-সাত মিনিটের ব্যাপক লাঠিচার্জ, অবরোধ উঠে গেল। বিডিও অফিস থেকে ব্যালট পেপার উদ্ধার করল পুলিশ। ব্যালট পেপার ভর্তি গাড়ি রাখা হল থানায়। এইসব ঘটে গেল মোটামুটি দুপুর ১২ টার মধ্যে। কিন্তু এই ব্যালট পেপার উদ্ধারের জন্য পুলিশের লাঠিচার্জের ফল হল হিতে বিপরীত। বিডিও অফিস ঘেরাও মুক্ত হল বটে, কিন্তু সেখানে দু’তিন ঘন্টার মধ্যে মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল। নন্দীগ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু মানুষ বাড়ি-ঘর ছেড়ে দুপুরের মধ্যেই এসে আশ্রয় নিল হাসপাতাল এবং বিডিও অফিস সংলগ্ন মাঠে। ১০০-১৫০ মানুষের জমায়েত দু’ঘণ্টার মধ্যে দু’হাজারে পরিণত হল। পুরুষের থেকে মহিলা বেশি এবং প্রচুর বাচ্চা। সবারই বক্তব্য, ‘সিপিআইএমের অত্যাচারে বাড়িতে থাকতে পারছি না। ভয় দেখাচ্ছে কাল যেন ভোট দিতে না যাই। তবে আর বাড়িতে থেকে লাভ কী? আজ রাতে আবার বাড়ি গিয়ে অত্যাচার করবে। পুলিশকে বারবার জানিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না। পুলিশ কিছু করছে না। তাই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি।’ সকলের একটাই  দাবি, ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে কেউ বাড়ি যাবে না, কেউ ভোট দেবে না। চরম অশ্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে শুরু করল প্রশাসনের কাছে। দুপুরের মধ্যেই নন্দীগ্রাম থানায় চলে এলেন পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার সত্যশঙ্কর পান্ডা।

টানটান থ্রিলারের মতো পরিবেশ থানা এবং সংলগ্ন এলাকায়। থানার একদিকে কলেজ মাঠে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভোটের ডিউটিতে আসা পুলিশের বুথে ডেপ্লয়মেন্ট নিয়ে মিটিং চলছে। অন্যদিকে, যাদের জন্য এত আয়োজন, সেই ভোটারের একটা অংশ, তা যতই ছোট হোক না কেন, বাড়ি ছেড়ে রীতিমতো সংসার পেতে বসেছে সন্ত্রাসের অভিযোগে ভোট বয়কটের দাবি নিয়ে। তার মধ্যে একশোরও বেশি সাংবাদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন নন্দীগ্রামে। ভোটের আগের দিন এমন নাটকীয় পরিবেশ কোথাও কখনও দেখিনি। কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি, নাটক আরও বাকি আছে। জেলার পুলিশ সুপার থানায় পৌঁছনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর এল, সিআরপিএফের  ডিআইজি অলোক রাজ আসছেন নন্দীগ্রামে। যে কোনও সময় চলে আসবেন। তিনি নন্দীগ্রামের ভোট পরিচালনার দায়িত্বে। এই খবরে রাজ্য পুলিশের তৎপরতা মুহূর্তের মধ্যে বেড়ে গেল। যে নন্দীগ্রামে পুলিশের আঠারো মাসে বছর, যেখানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা কাকে বলে এবং তা কত প্রকার, তা নিয়েই এক ডজন সেমিনার করা যায়, সেই নন্দীগ্রামে পুলিশ হঠাৎই ছোটাছুটি শুরু করে দিল। একবার অফিসাররা যাচ্ছেন বিডিও অফিস এবং হাসপাতালের মাঝের মাঠে অবস্থানকারী ঘরছাড়াদের বাড়ি ফেরাতে, তো একবার ১৭ টা পঞ্চায়েতের  বুথের লিস্ট নিয়ে হিসেবে বসছেন, কোথায় কত ফোর্স থাকবে পরদিন। থানার ওসির ঘরে বসে পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের গলদঘর্ম অবস্থা। রাত পেরোলেই হাই-ভোল্টেজ নির্বাচন, সময় যত গড়াচ্ছে ততই  উত্তেজনার পারদ চড়ছে নন্দীগ্রামে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক অভিযোগ এবং পালটা অভিযোগ। বিকেল পাঁচটা নাগাদ আলোক রাজ নন্দীগ্রামে পৌছনোর পর বোঝা গেল, সকাল থেকে যা সব হচ্ছিল, যা যা দেখেছি, সবই  ট্রেলার,  আসল সিনেমা এখনও শুরুই হয়নি!

১০ মে ২০০৮ বিকেলে সিআরপিএফের ডিআইজি অলোক রাজ পৌঁছানোর পর থেকে ১১ মে, মানে ভোটের দিন সন্ধে পর্যন্ত নন্দীগ্রামে  যা ঘটলো তা যে কোনও টানটান সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে। এই ২৪ ঘন্টায় যা ঘটেছিল তা নিজের চোখে না দেখলে এবং অন্য কারও মুখে শুনলে হয়তো আমি নিজেও বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু যাঁরা এই লেখা পড়ার মত ধৈর্য দেখিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চিত জানবেন, এই বর্ণনায় একটা শব্দও বাড়তি নেই। বরং কিছু শব্দ কমই আছে। কারণ, যা দেখেছি তার পুরোটা হয়তো হুবহু মনে নেই। যখন ঘটনাগুলো চোখের সামনে ঘটছিল তখন তো আর ভাবিনি সাত বছর পর তা লিখতে বসব। তবে হয়তো নোট করে রাখতাম। তবুও মূল ঘটনাগুলোর প্রতিটা মিনিট চোখ বুজলেই দেখতে পাওয়ার একমাত্র কারণ, ট্রুথ ইজ সত্যিই স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন।

অলোক রাজ নন্দীগ্রামে এসে পৌঁছলেন এবং সোজা চলে গেলেন হাসপাতাল চত্বরে। সিআরপিএফের কয়েক গাড়ি কনভয় ধুলো উড়িয়ে সিনেমায় দেখা দৃশ্যের মতো প্রায় সামরিক বাহিনীর কায়দায় নন্দীগ্রাম হাসপাতালের পাশে গিয়ে থামল। সেখানে তখন দেড়-দু’হাজার মানুষের ভিড়। সকাল থেকে সবাই বাড়ি ছেড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সঙ্গে রয়েছেন কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, এসইউসিআই সহ একাধিক দলের স্থানীয় নেতা। গায়ে সিআরপিএফ জলপাই পোশাক, চোখে অ্যাভিয়েটর সানগ্লাস,পায়ে ভারি বুট। তার সঙ্গে দুষ্টের যম, শিষ্টের রক্ষাকর্তা সুলভ একটা কঠোর আত্মবিশ্বাসী অথচ বিনয়ী শারীরিক ভাষা নিয়ে যেভাবে সেই ভিড়ের মধ্যে অলোক রাজ গাড়ি থেকে নামলেন, তার বার্তা পরিষ্কার, আমি এসে গিয়েছি, আর কোনও চিন্তা নেই। এক্কেবারে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার হিরো পুলিশ অফিসারের মতো নাটকীয়ভাবে গাড়ি থেকে নামলেন অলোক রাজ। ভাবখানা এমন, সিপিআইএমের সঙ্গে পুলিশ আছে! তাতে ভয় কী, তোমাদের সঙ্গে আমি আছি। নিপীড়িত, অত্যাচারিতের ত্রাতা আমি। মুহুর্তের মধ্যে পুরো ভিড়টা হুমড়ি খেয়ে পড়ল তাঁর ওপর। শুরু হল সিপিআইএম এবং স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। তার সঙ্গে চিৎকার, প্রায় কোনও কথাই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। অথচ অলোক রাজ যেভাবে সমস্ত অভিযোগ মন দিয়ে শুনলেন, তা দেখে মনে হচ্ছিল, এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি। যেন জানতেন এমনটাই হবে। খানিকক্ষণ শুনেই হাত তুলে থামিয়ে দিলেন জনতার সম্মিলিত স্বর। অসংগঠিত, এলোমেলো, বিশৃঙ্খল চিৎকার ম্যাজিকের মতো থেমে গেল। তারপর ভারী গলায় মিনিট দশেকের একটা বক্তৃতা করলেন হিন্দিতে, যা তাঁর ওখানে পৌঁছানোর থেকেও চমকপ্রদ এবং নাটকীয়।

‘কাল নন্দীগ্রামে ভোট। আপনাদের সবাইকে ভোট দিতে হবে। নন্দীগ্রামের সমস্ত মানুষ যাতে কাল ঠিকমতো ভোট দিতে পারে তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার আমাকে পাঠিয়েছে। নন্দীগ্রামে গত কয়েক মাসে কী ঘটেছে সব আমার জানা আছে। কিন্তু কাল ভোটের দিন কোথাও যেন কোনও গণ্ডগোল না হয়, সমস্ত মানুষ যেন নির্ভয়ে, নিজের ইচ্ছে মতো ভোট দিতে পারেন, তা দেখার জন্য সিআরপিএফের বিরাট বাহিনী এখানে আছে। আমি এসেছি আপনাদের নিরাপত্তা দিতে। কেন্দ্রীয় সরকার আমাকে পাঠিয়েছে আপনাদের নিরাপত্তার জন্য। আমি কথা দিচ্ছি, কাল নন্দীগ্রামে একটা গণ্ডগোলও আমার বাহিনী হতে দেবে না। আপনারা সব বাড়ি চলে যান। কারওর কোনও সমস্যা হবে না। সারারাত সিআরপিএফ গ্রামে-গ্রামে টহল দেবে। কেউ ভোট দিতে না পারলে সিআরপিএফকে খবর দেবেন। আপনারা যাতে ভোট দিতে পারেন তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আমার।’ এই হল সংক্ষেপে অলোক রাজের বক্তৃতার নির্যাস। দু’একজন ভিড়ের মধ্যে থেকে এরপরও কিছু একটা বলার চেষ্টা করেছিলেন, প্রশ্ন করার চেষ্টা করেছিলেন। মূল অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে। আবার হাত তুলে থামিয়ে দিলেন, বললেন, ‘আমি তো আছি। বিশ্বাস রাখুন আমার ওপরে।’ এর পর তো আর কারও কিছু বলার থাকতে পারে না। সকাল থেকে জমা হাতে থাকা ভিড়টা মন্ত্রমুগ্ধের মতো রওনা দিতে শুরু করল যে যার বাড়ির দিকে। আধ ঘণ্টার মধ্যে নন্দীগ্রাম হাসপাতাল এবং বিডিও অফিসের মাঝের মাঠটা পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। সকালে মানুষগুলো বাড়ি ছেড়েছিল স্থানীয় নেতাদের কথায়, শূন্য হাতে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে এই বিশ্বাসকে সঙ্গী করে বিকেলে বাড়ি ফিরল। নেতাদের কথায় বাড়ি ছাড়ার সময় অনেকেরই মনে আশঙ্কা ছিল, সিপিআইএম এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে বাড়ি ছাড়ছি, আবার ঢুকতে পারবো তো? ফিরে দেখব তো বাড়িটা ঠিকঠাক আছে! ভোটের আগের দিন সন্ধ্যায় তারা বাড়ি ফিরল একরাশ আশা নিয়ে, সিপিআইএম এবং পুলিশের যৌথ বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য আমাদের দলেও একজন উর্দিধারী সেনাপতি আছে। আমাদের কাজ শুধু ভোটটা দেওয়া। এবং সাধারণ মানুষ শুধু নিজের ভোট দিতে পারলে কী ম্যাজিক নন্দীগ্রামে অপেক্ষা করে আছে তা বোঝার মতো বাস্তব বোধ  এবং সাংগঠনিক শক্তি কোনটাই তখন ছিল না জেলা অথবা রাজ্যের সিপিআইএম নেতাদের।

১০ মে অলোক রাজ যে ধৈর্য নিয়ে দেড় হাজার মানুষের অভিযোগ শুনলেন এবং তাদের ঘরে ফেরাতে বিশ্বাসযোগ্য একটা সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিলেন, তা কোনও পুলিশ অফিসারের পক্ষে একমাত্র সিনেমার চিত্রনাট্যই সম্ভব, আর বাস্তবে সম্ভব প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে। কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি, ১০ মে সকাল থেকে যা হচ্ছিল, পুরোটাই ট্রেলার। পর্দা উঠল অলোক রাজ  নন্দীগ্রামে পৌঁছানোর পর। ভিড়টা একটু হালকা হতেই অলোক রাজ গাড়িতে উঠে রওনা দিলেন রাজারামচকে সিআরপিএফের ক্যাম্প অফিসের দিকে। জানিয়ে গেলেন, কিছুক্ষণ পর তিনি নন্দীগ্রাম থানায় যাবেন জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে মিটিং করতে। নন্দীগ্রামে পৌঁছে অবস্থানকারীদের উদ্দেশে সিআরপিএফের ডিআইজির রাজনৈতিক নেতাসুলভ বক্তৃতা এবং তাঁর গতিবিধির সব খবরই মহাকরণের প্রশাসনিক শীর্ষমহলের পৌঁছচ্ছিল নিমেষের মধ্যে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে লাগাতার নন্দীগ্রামের খবর। ভোটের ঠিক আগের দিন অলোক রাজের এই অতি তৎপরতা একেবারেই পছন্দ করেনি শাসক দল। সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেন লক্ষ্মণ শেঠ।

সন্ধে সাড়ে ছ’টা নাগাদ কয়েকজন সিআরপিএফ অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে নন্দীগ্রাম থানায় ঢুকলো অলোক রাজের কনভয়। ওসির ঘরে জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে মিটিংয়ে বসলেন সিআরপিএফের ডিআইজি। থানার বাইরে সমস্ত সংবাদমাধ্যমের  ভিড়। আমার এবং আরও কয়েকটা চ্যানেলে লাইভ চলছে। ঠিক সাড়ে সাতটায় মিটিং শেষ করে বেরোলেন অলোক রাজ। লাইভ চলতে চলতেই তাঁর দিকে ইশারা করায় এগিয়ে এলেন আমার দিকে। লাইভেই অলোক রাজের ইন্টারভিউ করে নিলাম। বিকেলে অবস্থানকারীদের উদ্দেশে যা বলেছিলেন, প্রায় একই কথা বললেন আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। ‘আমার দায়িত্ব নির্বিঘ্নে নির্বাচন করানো, যাতে সমস্ত মানুষ ঠিক মতো ভোট দিতে পারে। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার আমাকে পাঠিয়েছে। সারা রাত নন্দীগ্রামে সিআরপিএফের টহলদারি চলবে।’

‘পুলিশের ভূমিকায় আপনি খুশি?’

‘পুলিশ, সিআরপিএফ কাল নন্দীগ্রামে একসঙ্গে কাজ করবে।’

ফের জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে, আর সিআরপিএফ রাজ্য পুলিশের অধীনেই কাজ করবে।’

এবার যেন আঁতে ঘা পড়ল সিআরপিএফের ডিআইজির। ‘কেউ কারও অধীনে নয়, কাল সবাই একসঙ্গে কাজ করবে যাতে কোনও গণ্ডগোল না হয় এবং সমস্ত সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারে।’ ক্যামেরার সামনে যেটা বললেন না, ‘আমি আছি তো, চিন্তা করছেন কেন?’

লাইভ হয়ে যাবার পর তাঁকে বললাম, ‘নন্দীগ্রামে সারারাত রুটমার্চ হবে বললেন। কোথায় হবে? আমি ভিস্যুয়াল নেব।’

 

পড়ুন আগের পর্ব: নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল #২৩: ‘সিপিএম সাপোর্ট করছে বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন’, প্রণব মুখার্জিকে বললেন মমতা

 

সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন সিআরপিএফের ডিআইজি।’ চলিয়ে মেরে সাথ।’

রাত প্রায় আটটা। শ্যামলকে সঙ্গে নিয়ে অলোক রাজের কনভয়ের পিছন পিছন থানা থেকে বেরোলাম। প্রথম ৪০০-৫০০ মিটার রাস্তায় মানুষের জটলা। তারপর পুরো শুনশান নন্দীগ্রাম। রাস্তায় একটাও লোক নেই, কোথাও আলো নেই। সিআরপিএফের ৭-৮ গাড়ির কনভয় রওনা দিল গড়চক্রবেড়িয়া, সোনাচূড়ার দিকে। সোজা গিয়ে থামল রাজারামচক হাই স্কুলের সিআরপিএফের ক্যাম্পে।  আমিও গাড়ি থেকে নেমে অলোক রাজ্যের সঙ্গে গিয়ে বসলাম স্কুলের বারান্দায়। চা, সিঙারা এল। দু’জনে খাচ্ছি। কিছু অফিসার দাঁড়িয়ে আছেন অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে।

‘আপ চিন্তা মাত কিজিয়ে। কাল ইলেকশনকে দিন হাম দেখ লেঙ্গে ইয়ে পুলিশকো। কুছ হোনে নেহি দেঙ্গে হাম ইহা পার। অ্যায়সে পুলিশ হাম বহোত দেখে হ্যায়। আপ দেখ লেনা।’ ঠান্ডা এবং ইস্পাত দৃঢ় গলায় বললেন আলোক রাজ।

চলবে

(১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল। প্রতি পর্বে লাল রং দিয়ে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে)

Comments
Loading...