Take a fresh look at your lifestyle.

নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল #২১: একমাত্র সূর্য মিশ্রর সঙ্গে কথা বলবেন, পূর্ব মেদিনীপুরের এসপিকে মহাকরণে ডেকে বললেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

683

আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছিল: ২০০৭ সালের ৫ নভেম্বর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, নন্দীরামের সন্ত্রাস বেশিদিন চলবে না। কিন্তু গণশক্তি পত্রিকায় কেন লেখা হচ্ছিল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আক্রমণের কথা……

 

খোদ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সিপিআইএম নেতা দীপক সরকার কিংবা পূর্ব মেদিনীপুরের একাধিক নেতা যখন নভেম্বর মাসের ৪-৫ তারিখ থেকে বলে চলেছেন, নন্দীগ্রামে সন্ত্রাস বেশি দিন চলবে না, নন্দীগ্রাম অচিরেই মুক্ত হবে, সেখানকার মানুষ জেগে উঠেছেন, তার তো একটা মানে আছে। মুখ্যমন্ত্রী সহ এতজন গুরুত্বপূর্ণ এবং নন্দীগ্রাম নিয়ে খবর রাখা নেতার বক্তব্য নিশ্চয়ই ফেলে দেওয়ার মতো কোনও বিষয় নয়। সেই জানুয়ারি থেকেই ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি রাস্তা কেটে, পুলিশ পিটিয়ে, সিপিআইএমকে মেরে নন্দীগ্রামকে গোটা রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, কিন্তু নভেম্বরের শুরুতে কী এমন ঘটল যে, সরকার এবং পার্টি নিদান দিয়ে দিল নন্দীগ্রাম অচিরেই মুক্ত হবে? এ তথ্যও নন্দীগ্রামের অনেক বিষয়ের মতোই রাজ্যের বহু মানুষের অজানা।

আগের মাসে, মানে অক্টোবরের ২৯ তারিখ নন্দীগ্রামের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় বাহিনী চেয়ে দিল্লিতে চিঠি লিখেছিল রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানতেন, যে কোনও দিন কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে পৌঁছবে। আর কেন্দ্রীয় বাহিনী পৌঁছে গেলে যে ক্যাডার দিয়ে নন্দীগ্রাম দখল করা সম্ভব হবে না তাও জানতেন সিপিআইএম নেতারা। তাই নভেম্বরের গোড়া থেকেই সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এলাকায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মাস্টারদার বাহিনী। অবশেষে, ১১ নভেম্বর সকালে এসে পৌঁছায় ৩ কোম্পানি সিআরপিএফ। কী টাইমিং! ১০ নভেম্বর মহেশপুরে মিছিলে গুলি চালিয়ে নন্দীগ্রামের ‘সূর্যোদয়’ এবং ঠিক পরদিন সকালে রাজ্যে পা রাখল কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী। কিন্তু তখনও মাস্টারদার বাহিনী খেজুরিতে আটকে, অপারেশনের পর নন্দীগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ফাইনাল টাচে ব্যস্ত কালো গেঞ্জি-হাফ প্যান্ট পরা সিপিআইএমের বন্দুক বাহিনী (যাদের আমি দেখেছিলাম ১২ নভেম্বর সোনাচূড়া, গড়চক্রবেড়িয়ায়) এর মধ্যে সিআরপিএফ সেখানে গিয়ে কী করবে? তাই ১১ এবং ১২ নভেম্বর, দু’দিন কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীকে বসিয়ে রাখা হল তমলুকের পুলিশ লাইনে। কিন্তু চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটা ব্যাপার আছে, ১৩ নভেম্বর সিআরপিএফ প্রথম পা রাখল নন্দীগ্রামে। অবশ্য তার আগের রাতেই, ১২ তারিখে খেজুরি ছেড়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের সশস্ত্র বাহিনী।
মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে সিপিআইএমের তাবড় নেতারা যেখানে নভেম্বরের শুরুতেই জানতেন ৫-৭ দিনের মধ্যে নন্দীগ্রাম দখল সম্পূর্ণ হবে, তখন একই সময়ে দলীয় মুখপত্র গণশক্তি পত্রিকা তৃণমূল কংগ্রেস এবং মাওবাদীদের এমন ভয়ঙ্কর আগ্রাসনের খবর প্রকাশ করছিল কেন?

৮ নভেম্বর আবার দেখতে হবে গণশক্তি পত্রিকা। ৫ তারিখ হাওড়ায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং ৬ তারিখ পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় দীপক সরকারের বক্তৃতায় যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, ৮ তারিখের দলীয় মুখপত্রে তা কিছুটা প্রতিফলিত হল। সেদিনের গণশক্তির প্রথম পৃষ্ঠার লিড খবরের শিরোনাম, ‘পিছু হঠেও আক্রমণ চালাচ্ছে তৃণমূল, মাওবাদীরা।’ আগের দিনই গণশক্তি বলেছে, ল্যান্ডমাইন ফাটিয়ে, আড়াই হাজার রাউন্ড গুলি চালিয়ে, অসংখ্য বোমা ছুড়ে সন্ত্রাস করছে তৃণমূল, মাওবাদী যৌথ বাহিনী। সেখানে একদিনের মধ্যেই কেন তাদের পিছু হঠতে হলো সে কথা বুঝতে গেলে ৮ তারিখের খবরটা পড়া জরুরি।
খবরটি এরকম, ‘সশস্ত্র মিছিল করে ঘরছাড়াদের আবার তাড়ানো হচ্ছে, হবে-এই গুজবে বুধবার সারাদিন নন্দীগ্রামে উত্তাপ জিইয়ে রেখেছিল তৃণমূল। আরও তিনটে না ফাটা মাইন বুধবার পাওয়া গেল তেখালি সেতুর উত্তর দিকের চওড়া পিচের রাস্তায়। মাওবাদীদের উপস্থিতি ২৪ ঘন্টার মধ্যে আরও একবার জানিয়ে দিল নন্দীগ্রাম। এদিনই তমলুকের সিপিআইএম এবং তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলা শাসক অনুপ আগারওয়াল। কিন্তু অধিকৃত নন্দীগ্রামে পুলিশ, প্রশাসনকে ঢুকতে দিতে এদিনও রাজি হয়নি তৃণমূল। তাদের একগুঁয়েমির ফলে বৈঠক নিষ্ফল হয়েছে। রাতেও অধিকৃত নন্দীগ্রাম থেকে হামলা চলেছে ওই বৈঠকের পরে।
কিন্তু নন্দীগ্রাম আরও একটি ইঙ্গিত এদিনই দিয়েছে। ইঙ্গিতটুকুই ছিল। পূর্ণরূপ নয়। দীর্ঘদিন ঘরছাড়া, সাতেঙ্গাবাড়ি, গিরির বাজার, কানুনগোচক, বৃন্দাবনচক, শিমুলকুণ্ডের গ্রামবাসীদের একাংশ এদিন ঘরে ফিরলেন। আরও অনেকে এখনও আশ্রয় শিবিরে। তাঁরাও ফিরবেন সন্দেহ নেই….।’

এই খবরেরই তৃতীয় প্যারাগ্রাফ শুরু হচ্ছে, ‘আর ঠিক ওই সময়েই দুর্দান্ত একটা মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল নন্দীগ্রাম। তৃণমূলের কর্মীরা যারা দুদিন আগেও লাঠি হাতে মিছিল করেছে মহেশপুর, গোকুলনগর, সামসাবাদ, দাউদপুর, যাদের কেউ কেউ সামসাবাদ পঞ্চায়েত অফিসে হামলা করেছে, সিপিআইএম নেতা, কর্মী, সমর্থকদের বাড়ি ভাঙার কাজে প্রবল উৎসাহে হাত লাগিয়েছে, পুলিশকে ধমকে বলেছে বেশি বাড়াবাড়ি করলে পুঁতে দেব এখানেই-তারা এদিন বিকেল ৪টা নাগাদ হাজির হয়েছে থানায়। নেতৃত্বে আবু তাহের। বলেছেন, থানা অবরোধ, আসলে ওসি চম্পক চৌধুরীর কাছে ভিক্ষা করেছে আশ্রয়….।’
আগের দিন যে গণশক্তি পত্রিকা প্রথম পৃষ্ঠায় লিখল, আড়াই হাজার রাউন্ড গুলি চালিয়ে, মাইন-বোমা ফাটিয়ে  তৃণমূলি-মাওবাদী সন্ত্রাসের কথা, দু’জনের মৃত্যু, ইএফআর জাওয়ানের জখম হওয়া কথা, ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল খবর! ৭ তারিখ গণশক্তিতে প্রকাশিত হল, ‘২৫০ টি বাড়িতে লুঠপাট করে দুর্বৃত্তরা, আগুন জ্বালিয়ে দেয় অন্তত ৫৮টি বাড়িতে।’ পরদিন, ৮ তারিখ প্রকাশিত খবরটা মন দিয়ে দেখুন, ‘সাতেঙ্গাবাড়ি, গিরিরবাজার, কানুনগোচক, বৃন্দাবনচক, শিমুলকুণ্ডের গ্রামবাসীদের একাংশ এদিন ঘরে ফিরলেন।’ কোন জাদুবলে তৃণমূল কংগ্রেস এবং মাওবাদীদের প্রবল আক্রমণের মুখে তাঁরা বাড়ি ফিরলেন তার উত্তর সিপিআইএমের মুখপত্র দেয়নি। যদিও যিনি বা যাঁরা এই খবর লিখেছিলেন নিশ্চই এর উত্তর জানতেন। কিন্তু এরপরের  বাক্য আরও অসামান্য, ‘আরও অনেকে এখনও আশ্রয় শিবিরে, তাঁরাও ফিরবেন সন্দেহ নেই।’ কীভাবে জানল গণশক্তি পত্রিকা? আগের দিনই তো তারা লিখল, সন্ত্রস্ত নন্দীগ্রামের কথা। কোথা থেকে তার এই বিশ্বাস তৈরি হল, যাঁরা এতদিন ফিরতে পারছেন না, তাঁরাও ফিরবেন সন্দেহ নেই। খেজুরি, নন্দীগ্রামে সিপিআইএম ক্যাডারদের কোন কার্যকলাপ দেখে পার্টি মুখপত্রের সেদিন একথা মনে হয়েছিল, তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর। এ তো এক্কেবারে ৫ তারিখ হাওড়ার জনসভায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং ৬ তারিখে পিংলায় বলা দীপক সরকারের সুর গণশক্তির গলায়! একদিন আগেও তো পরিস্থিতি এমন ছিল না।
আসলে গণশক্তি সবটাই জানতো। জানতো, সিপিআইএমের সশস্ত্র বাহিনীর নন্দীগ্রাম দখল সময়ের অপেক্ষা। আসলে দীর্ঘদিন ধরে সিপিআইএমের দলীয় মুখপত্রে লাগাতার প্রকাশিত হয়েছে, নন্দীগ্রামে মাওবাদী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সন্ত্রাসের কথা। সেখানকার মানুষকে বন্দুকের সামনে দাঁড় করিয়ে আন্দোলনে বাধ্য করা হচ্ছে, তার কথা। সেখানে আচমকা ভূমিকম্পের মতো, একদিন যদি রাজ্যের মানুষ ঘুম থেকে উঠে জানতে পারে, সিপিআইএম নন্দীগ্রামে ঢুকে পড়েছে, মাওবাদীরা সব পালিয়ে গেছে, আর নন্দীগ্রামে পতপত করে উড়ছে লাল পতাকা, তবে তো এতদিন ধরে প্রকাশিত খবরের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতাই থাকবে না। মানুষ ভাববে, এ কি ম্যাজিক নাকি? আগেরগুলো ঠিক হলে এটা ভুল, আর এটা ঠিক হলে আগেরগুলো ভুল। তাই একটা পরিবেশ, পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার। কাল্পনিক একটা যুদ্ধ যুদ্ধ আবহ তৈরি করে রাজ্যের মানুষকে বার্তা দিতে হবে, নভেম্বরে মাওবাদী এবং তৃণমূল কংগ্রেস লাগামছাড়া সন্ত্রাস করেছে বলেই মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। নিশ্চিত মৃত্যু জেনে বুঝেও নন্দীগ্রামের সাধারণ মানুষ আর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির বোমা, মাইন এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে লাইন দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মুক্তির পথ খুঁজতে। এই নিরস্ত্র মরিয়া প্রতিরোধের সামনেই পিছু হঠেছে মাওবাদী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের যৌথ বাহিনী!
৮ তারিখ গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম পৃষ্ঠার খবরের তৃতীয় প্যারাগ্রাফে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। কী তা? ‘তৃণমূল কর্মীরা যারা দুদিন আগেও আক্রমণ করেছে সিপিআইএমকে, ধমকেছে পুলিশকে তারাই নন্দীগ্রাম থানার ওসি চম্পক চৌধুরীর কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করছে।’ কোন ভৌতিক কারণে নন্দীগ্রামের তৃণমূল কংগ্রেস নেতা, কর্মীদের থানায় আশ্রয় ভিক্ষা করতে যেতে হয়েছিল? নন্দীগ্রামের তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি থানা ভাঙতে গেছে, থানায় আগুন ধরাতে গেছে, থানা অবরোধ করতে গেছে, থানা লুঠ করতে গেছে বা পুলিশকে মারতে থানায় গেছে, সবই বিশ্বাসযোগ্য। এর কোনও একটাও যদি গণশক্তি লিখত, অবাক হতাম না। নন্দীগ্রামের আন্দোলন নিয়ে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি সম্পর্কে এমনই নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করেছিল সিপিআইএম। সেই নন্দীগ্রামে তৃণমূল দুর্বৃত্তরা হঠাৎই কথা নেই, বার্তা নেই থানায় আশ্রয় ভিক্ষা করতে গেল কেন? নিশ্চয়ই সিপিআইএমের ঘরছাড়ারা গোলাপ ফুল হাতে তাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল বলে নয়? আসলে ঝুলি থেকে বেরাল শেষমেশ বেরিয়েই পড়ল। বেরিয়ে পড়ারই ছিল।
৮ নভেম্বর গণশক্তি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার খবরের তৃতীয় প্যারাগ্রাফের শেষ বাক্যটাই একমাত্র ঠিক। নন্দীগ্রামে তৃণমূল থানায় গিয়েছিল আশ্রয় ভিক্ষা করতে, একই কারণে তারা থানায় গিয়েছিল দুদিন বাদে  ১০ নভেম্বরও, গিয়েছিল সিপিআইএমের সশস্ত্র বাহিনীর হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে। কিন্তু পুলিশ থানার গেট খোলেনি। রাজ্য সরকার এবং সিপিআইএমের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাশুল হিসেবে কয়েক হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে সেদিন পুলিশের, রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয়েছিল, প্রাণে বাঁচতে।
১০ নভেম্বর নন্দীগ্রামে দখলদারি অভিযান শেষ করেছিল গড়বেতা, কেশপুর বাহিনী। সকালে সোনাচূড়া থেকে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির মিছিল এবং মহেশপুর হাইস্কুল থেকে সিপিআইএমের গুলি, সেদিনের সব বিবরণ ইতিমধ্যেই লিখেছি সিপিআইএম কমান্ডার মাস্টারদা এবং ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতা মিলন প্রধানের মুখে। কিন্তু ১০ নভেম্বর সকালে মহেশপুরের ঘটনা থেকে শুরু করে সেদিন রাত পর্যন্ত নন্দীগ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা এবং গোটা রাজ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে কী বলল সিপিআইএমের মুখপত্র?
১১ নভেম্বর ২০০৭, গণশক্তি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় দুটো পৃথক খবর প্রকাশিত হয়। একটির শিরোনাম, ‘ঘরে ফেরাদের লক্ষ্য করে দফায় দফায় গুলি, বোমা।’ খবরটা শুরু হচ্ছে এভাবে, ‘বেআইনি “পুনর্দখলে”র প্রচেষ্টা আসলে কেমন, তা শনিবার সকাল থেকে দেখিয়ে দিল তৃণমূল-মাওবাদীরা। শান্তিকামী নন্দীগ্রামের মানুষ যখন বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজনের ভরসা পেয়ে গেছেন, তখনই আবারো রক্তাক্ত হল নন্দীগ্রামের মাটি। যৌথ বাহিনীর বেপরোয়া গুলিতে এক মহিলাসহ দু’জনের মৃত্যু হয়। আহত ১৩ জন। মৃত দু’জন হলেন বেঁচাবাড়ির শেখ রেজাউল  (৪০) এবং গোকুলনগর শ্যামলী মান্না (৩৫)…..।’
শিরোনাম এবং প্রথম প্যারাগ্রাফ পড়ে নন্দীগ্রামে সেদিনের ঘটনার বিন্দুবিসর্গ না জানা মানুষও নিশ্চয়ই বুঝবেন, ঘরে ফেরা সিপিআইএম কর্মী, সমর্থকদের লক্ষ্য করে গুলি চলেছে। কারণ, তিন দিন ধরেই পার্টি মুখপত্রে প্রকাশিত হচ্ছিল, সিপিআইএমের ঘরছাড়া সব বাড়ি ফিরছে, এবং তারা নিরস্ত্র, নিরীহ। গুলি চালিয়েছে যৌথ বাহিনী, মানে তৃণমূল কংগ্রেস এবং মাওবাদী। তাতে  দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।

অথচ শেখ রেজাউল কিংবা শ্যামলী মান্না সেদিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েই সোনাচূড়া থেকে মিছিল করে মহেশপুর গিয়েছিলেন, আরও কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে। ঘরছাড়া তাঁরা ছিলেন না, তাই ঘরে ফেরার প্রশ্নও ছিল না। গুলি মাওবাদী, তৃণমূলের যৌথবাহিনীও চালায়নি, মহেশপুর হাইস্কুলের ছাদ থেকে গুলি চালিয়েছিল সিপিআইএমের সশস্ত্র বাহিনী। কিন্তু আমার এই ব্যাখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা কী? সিপিআইএম অনুগত কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন, এ তো মিলন প্রধান, তৃণমূল কংগ্রেস এবং মাওবাদীদের অভিযোগ। যা ভিত্তিহীন।
শুধু এক বাক্যেই এর জবাব দেওয়া আছে। সেই ১১ নভেম্বরই গণশক্তি পত্রিকার সপ্তম পৃষ্ঠায় একটা নামের তালিকা প্রকাশিত হয়। বক্স করে। সেই তালিকার শিরোনাম ছিল, ‘নন্দীগ্রামে তৃণমূল হামলায় নিহত যাঁরা।’ সেই তালিকায় ২৭ জনের নাম রয়েছে। এঁদের পরিবারের হাতেই সাহায্য তুলে দিতে সেই বছর শেষ দিকে প্রথমবার নন্দীগ্রামে গিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এই তালিকায় প্রথম নাম শঙ্কর সামন্ত, মৃত্যুর তারিখ ০৭-০১-২০০৭। এই তালিকা অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে সিপিআইএম কর্মী বা সমর্থকের নন্দীগ্রামের শেষ মৃত্যু হয়েছে ৬ নভেম্বর ২০০৭। তিনজনের। নিরাপদ ঘাটা, তুষার  সাউ এবং শঙ্কর মাইতি। ১০ নভেম্বর কোনও মৃতের নাম পার্টি পত্রিকার তালিকায় নেই। নেই শেখ রেজাউল কিংবা শ্যামলী মান্নার নাম। তার মানে শেখ রেজাউল, শ্যামলী মান্না  অন্তত সিপিআইএম নন। যে নন্দীগ্রামে গুলি যুদ্ধে দু’জনের মৃত্যু হল ‘অপারেশন সূর্যোদয়ে’র শেষ দিন, চারদিকে সন্ত্রস্ত ভয়ার্ত পরিবেশ, তাঁরা নিশ্চয়ই মর্নিং ওয়াক করতে সেদিন সোনাচূড়া থেকে মহেশপুরে যাননি। আসলে সেদিন মহেশপুর হাইস্কুল থেকে সিপিআইএম বাহিনীর চালানো গুলিতে জখম হয়েছিলেন অন্তত ২০-২৫ জন। কয়েকজনকে তুলে খেজুরি নিয়ে গিয়েছিল সিপিআইএম, যাঁদের খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। তিনজনের দেহ মাঠে পড়েছিল, যাঁদের সেই মুহূর্তে তাড়াহুড়োয় সিপিআইএম ক্যাডাররা খুঁজে পায়নি। তার মধ্যে দু’জন শেখ রেজাউল এবং শ্যামলী মান্না। অন্যজন হরেন প্রামানিক, যাঁর মৃতদেহ চার-পাঁচদিন দিন পর উদ্ধার হয়েছিল।
২০০৭,নভেম্বর মাসের ৪-৫ থেকে ১০-১১ তারিখ পর্যন্ত যে ভয়াবহ কর্মকাণ্ড সিপিআইএম বাহিনী চালিয়েছিল নন্দীগ্রামে, তার তুলনা স্বাধীন বাংলার ইতিহাস আর কোথাও আছে কিনা, গবেষণার বিষয়। শাসক দলের এই নজিরবিহীন আক্রমণের সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা কীভাবে পালন করতে হয়, তার তুলনাহীন নজির রেখেছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রশাসন। তাই তো মুখ্যমন্ত্রী গোটা সশস্ত্র অভিযান শেষ হয়ে যাওয়ার পর ১৩ তারিখ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘দে হ্যাভ বিন পেইড ব্যাক বাই দেয়ার ওন কয়েন।’
সেই যে ৩ জানুয়ারি, নন্দীগ্রামে পুলিশ ঠেকাতে জমায়েত হল নন্দীগ্রামের মানুষ, শুরু হল রাস্তা কাটা, সেদিনই নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে এক সভা ছিল। গণশক্তি পত্রিকার ৪১ তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে সভা। তার দু’দিন আগে, ১ জানুয়ারি সিপিআইএমের পলিটব্যুরো বৈঠক ছিল কলকাতায়। তারপর শুরু হয়েছিল সিপিআইএমের কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং। দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট থেকে শুরু করে সমস্ত শীর্ষ নেতা কলকাতায়। ৩ তারিখ যখন জমি অধিগ্রহণ ঠেকাতে নন্দীগ্রামের মানুষ রাস্তা কাটা শুরু করেছে পুরোদমে, তখন নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বক্তৃতা দিচ্ছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, প্রকাশ কারাটরা। নন্দীগ্রাম নিয়ে তাঁরা একটা কথাও বলেননি সেদিন। সেদিন থেকে শুরু করে ১৩ নভেম্বর, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বারবারই প্রমাণ করেছেন, রাজ্যে দুটো প্রশাসন। একটা নন্দীগ্রামের জন্য, অন্যটা বাকি রাজ্যের জন্য।
কিন্তু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য গোটা নন্দীগ্রাম পর্বে কখনই দলীয় আনুগত্যের ওপর উঠে প্রশাসক হওয়ার চেষ্টা করেননি, এ কথা বললেও সত্য থেকে খানিকটা বিচ্যুত হওয়া হবে। ইতিহাসও বিকৃত হবে খানিকটা। পক্ষপাতহীন প্রশাসক হওয়ার একটা মরিয়া চেষ্টা তিনি শেষবেলায় যে করেননি তা নয়, তবে তাতে কাজ হয়নি বিশেষ। কারণ, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ততদিনে তরোয়াল পড়ে গিয়েছে তাঁর হাত থেকে, তাই প্রশাসন আর শুনছে না তাঁর কথা। ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারি, ৭ জানুয়ারি কিংবা নভেম্বর মাসে তিনি নন্দীগ্রাম নিয়ে নিরপেক্ষ প্রশাসকের ভূমিকা পালন করলে, হয়তো তাঁর দলের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হোত। কিন্তু তিনি তা করেননি। অনেক পরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পক্ষপাতহীন প্রশাসক হয়ে ওঠার একটা শেষ চেষ্টা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তখন প্রশাসনেও তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই, নন্দীগ্রামের মানুষের কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এমনই একটা ঘটনা ঘটেছিল ২০০৯ সালের গোড়ায়।
২০০৮ পঞ্চায়েত ভোটে পর্যুদস্ত হওয়ার পর নন্দীগ্রামের সিপিআইএম কর্মীদের মনোবল তখন তলানিতে। অনেকেই আবার নতুন করে ঘর ছাড়ছেন। অন্যদিকে ২০০৭ এর নভেম্বরে এলাকা হাতছাড়া হওয়ার পর ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির যে নেতা, কর্মীরা নন্দীগ্রামে মাথা নীচু করে হাঁটা-চলা করতেন, গোবেচারা মুখ করে বাজার-হাট করতেন, তাঁরাই ২০০৮ সালের মে মাসে পঞ্চায়েত ভোটের পর আবার বাঘ-সিংহে পরিণত হলেন। নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি ২০০৭ সালের মতো অতটা খারাপ হল না ঠিকই, কিন্তু লোকসভা ভোট যত এগিয়ে এল, ততই নতুন নতুন টেনশন শুরু হল। শুরু হয়ে গেল রাজনৈতিক সংঘর্ষের কাউন্টডাউন। নন্দীগ্রামে আস্তে আস্তে আবার অনেকটাই শক্তিবৃদ্ধি করল তৃণমূল কংগ্রেস। সাধারণ মানুষের অনুচ্চারিত সমর্থন তাদের সঙ্গে ছিলই। কিন্তু নভেম্বরে সিপিআইএমের অভিযানের হ্যাংওভার তখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি সাধারণ মানুষ। পঞ্চায়েত ভোটের রেজাল্ট এক ঝটকায় পালটে দিয়েছিল গোটা পরিস্থিতি। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বও বুঝে নিলেন, মানুষ অসলে চুপচাপ ছিল ভয়ে, ভক্তিতে নয়। ফলে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির এলাকায় প্রভাব বৃদ্ধিতে খুব একটা  সময় লাগেনি। অন্যদিকে তখনও পর্যন্ত খেজুরি সিপিআইএমের দখলে। তাদের গড়বেতা, কেশপুরের বাহিনী  ফিরে  গিয়েছে  ঠিকই। কিন্তু তাদের দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ এবং প্র্যাকটিকাল অভিজ্ঞতায় নন্দীগ্রামেরও সিপিআইএমের বহু ছেলে ততদিনে বন্দুকযুদ্ধে রীতিমতো ওস্তাদ বনে গিয়েছে। লড়াই করা তখন তাদের কাছে জলভাত।

২০০৯  সালের শুরুতে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ফের পুলিশ সুপার বদল করল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকার। ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে এই জেলার পুলিশ সুপারের চেয়ার একেবারের গনগনে কড়াইয়ের মতো। কেউই বেশি দিন  স্থায়ী হতে পারছিলেন না এই চেয়ারে। যিনিই পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন, কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে হয়  তৃণমূল কংগ্রেস, নয় সিপিআইএম।  ২০০৯ সালের শুরুতে অশোক প্রসাদের জায়গায় পুলিশ সুপার হলেন পল্লবকান্তি ঘোষ। অশোক প্রসাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটা অভিযোগ পেয়ে  খবর করেছিলাম। তার জেরে তাঁকে জেলার পুলিশ সুপারের পদ থেকে সরিয়ে দেয় সরকার। অশোক প্রসাদের বিরুদ্ধে তখন জেলা সিপিএম নেতাদের প্রচণ্ড ক্ষোভ। কিন্তু তাঁর বদলির পর, কাজে যোগ দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পল্লবকান্তি ঘোষও জেলা সিপিআইএমের বিশেষ অপ্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।
কোনও জেলায় নতুন পুলিশ সুপার কাজে যোগ দিলে স্থানীয় প্রভাবশালী সিপিআইএম নেতাদের সেই অফিসারের সঙ্গে অফিসে দেখা করতে যাওয়া অনেক বছরের দস্তুর। ওই সৌজন্যে বৈঠকেই নতুন পুলিশ সুপার বুঝে যেতেন, জেলায় শাসক দলের কোন নেতার সঙ্গে কোন বিষয়ে কথা বলতে হবে। ওই বৈঠকেই সিপিআইএম নেতারা নতুন পুলিশ সুপারকে বুঝিয়ে দিতেন, বিরোধী দলের কোন নেতার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কার সঙ্গে কোনওরকম সম্পর্ক রাখা চলবে না।
পল্লবকান্তি ঘোষ পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পদে জয়েন করার চার-পাঁচ দিনের মাথায় পূর্ব মেদিনীপুরের সিপিআইএম জেলা সম্পাদক কানু সাহু, সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠ এবং আরও কয়েকজন নেতা যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন তখন সেই রামও নেই, অযোধ্যাযও নেই। একথা-ওকথার পর কানু সাহু এদিক ওদিক তাকিয়ে পল্লবকান্তি ঘোষকে  বললেন, ‘এসপি সাহেব, নন্দীগ্রামটা আপনি একটু মুক্ত করে দিন। কয়েক মাসের মধ্যেই তো লোকসভা ভোট।’ চমকে উঠলেন নতুন পুলিশ সুপার। বলে কী লোকটা? মুক্ত করে দিন মানে? পল্লবকান্তি ঘোষ কলকাতায় থাকার সময় যখন জানতে পেরেছিলেন তাঁকে পূর্ব মেদিনীপুরে যেতে হবে, তারপর একাধিক লোকের সঙ্গে তাঁর কথা হয় নন্দীগ্রাম নিয়ে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক খবর অনেক কিছুই তিনি জানতেন। জানতেন, পুলিশ সুপারের চেয়ারে বসতে নয়, পূর্ব মেদিনীপুরে তিনি যাচ্ছেন সরু সুতোর উপর দিয়ে হাঁটতে। কিন্তু এতটাও তিনি ভাবতে পারেননি। তাঁর সুদূর কল্পনাতেও ছিল না, জেলার সিপিআইএম সম্পাদকের কাছে শুনতে হবে, ‘নন্দীগ্রামটা আপনি মুক্ত করে দিন।’

 

পড়ুন আগের পর্ব: নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল #২০: নন্দীগ্রামের সমস্ত মানুষের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে উঠতে পারেননি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

 

এই ঘটনার ঠিক তিন-চারদিন বাদে পল্লবকান্তি ঘোষ রাজ্য পুলিশের ডিজি অনুপভূষণ ভোরার ফোন পেলেন মহাকরণ থেকে। ‘আপনি কলকাতায় আসুন, মুখ্যমন্ত্রী আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’ পূর্ব মেদিনীপুরের নতুন পুলিশ সুপার কলকাতায় এলেন। মহাকরণে পৌঁছে প্রথমেই  গেলেন ডিজির ঘরে। তারপর মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে গেলেন ডিজির সঙ্গে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ঘরে তখন বসে রয়েছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব অশোকমোহন চক্রবর্তী, স্বরাষ্ট্রসচিব অর্ধেন্দু সেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব সুবেশ দাস। ডিজি এবং পুলিশ সুপার পৌঁছানোর পরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেই বলতে শুরু করলেন নন্দীগ্রাম নিয়ে। টানা বললেন মিনিট কুড়ি। যার মোদ্দা কথা, ‘নন্দীগ্রামে রোজ গোলমাল হচ্ছে। রাজ্যের, পুলিশের, সবার বদনাম হচ্ছে। আপনাকে পাঠানো হয়েছে। নিজের যেমন মনে হয় সেভাবে কাজ করবেন। যা ঠিক মনে হয়, তাই করবেন। কোনও সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাবেন না। কারও কথা, পরামর্শ শোনার দরকার নেই। যদি কোনো রাজনৈতিক সমস্যা হয়, কোনও প্রয়োজন হয়, সূর্যবাবুর সঙ্গে কথা বলে নেবেন।’ সূর্যবাবু মানে, সিপিআইএমের সেই সময়ের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং রাজ্যের পঞ্চায়েত এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্র।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বলা শেষ। ঘরে কেউ কিছু বলছে না। ধরেই নেওয়া যায় মিটিং এখানেই শেষ। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী মহাকরণে পুলিশ সুপারকে ডেকেছেন। যা বলার ছিল, বলে দিয়েছেন। আর এই ধরনের মিটিংয়ে প্রচলিত রেওয়াজ, যে যাই বলুন না কেন, শেষ বক্তা সাধারণত মুখ্যমন্ত্রী থাকেন। সুতরাং তাঁর বলা হয়ে গিয়েছে মানে মিটিং শেষ। এবার ঘাড় নেড়ে পুলিশ সুপার এবং ডিজি উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবেন, এটাই নিয়ম। তারপর আস্তে আস্তে বেরোবেন মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিব। এমনটাই হয়ে এসেছে বছরের পর বছর। কিন্তু এবার তা হল না। মুখ্যমন্ত্রীর বলা হয়ে যাওয়ার পর কেউ কিছু বলছে না দেখে, এদিক ওদিক তাকিয়ে পুলিশ সুপার বললেন, ‘স্যর আমি কিছু বলবো?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন।’

এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যে নন্দীগ্রাম, খেজুরি এবং সামগ্রিকভাবে পূর্ব মেদিনীপুরের পরিস্থিতি ব্রিফ করেন পল্লবকান্তি ঘোষ। বলেন, পঞ্চায়েত ভোটের পর থেকে দিন দিন তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তিবৃদ্ধি করার কথা। বিশেষ করে লোকসভা ভোট আসছে, নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে আরও উত্তপ্ত হচ্ছে জেলা। যে কোনও সময় বড়ো রাজনৈতিক গণ্ডগোল হতে পারে। এমন কিছু নিরীহ ব্রিফিংয়ের পর তিনি বললেন, ‘স্যর আর একটা বিষয় ছিল। বলব?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, বলুন।’
‘স্যর, দু-তিন দিন আগেই আপনার দলের নেতারা অফিসে এসেছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে কানু সাহু বললেন, নন্দীগ্রাম মুক্ত করে দিতে হবে।’
হাই প্রোফাইল গম্ভীর কোন শোকসভায় মৃত ব্যক্তি দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে এলেও অতিথি অভ্যাগতরা এতটা অবাক হতেন না, যতটা বিস্মিত হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে উপস্থিত অন্য অফিসাররা। কারও মুখে কোনও কথা নেই, কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেনও না। নন্দীগ্রাম নিয়ে প্রথমবার নিরপেক্ষ প্রশাসক হয়ে উঠতে চাওয়া বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অবস্থা তখন ভয়াবহ। প্রায় ৩০-৪০ সেকেন্ড ঘরে পিন পড়লেও শব্দ শোনা যাবে, এমন অবস্থা। কেউ মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাকাতে পারছেন না। হতভম্ভ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যই বরং তাকাচ্ছেন এদিক-ওদিক। আমার দলের নেতারা আমারই পাঠানো অফিসারকে বলছে, নন্দীগ্রাম মুক্ত করে দিতে হবে। আর আমি মহাকরণে বসে প্রশাসন চালাচ্ছি! এসপিকে ডেকে বলছি, আপনি নিরপেক্ষভাবে কাজ করুন! একদিকে আমার দল, আমাকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে। একদিকে আমার সরকার, কে আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? আমি কার লোক? আমার লোকই বা কে? কার কথা শুনব আমি? তার চেয়েও বড় কথা, কে আমার কথা শুনবে? ঘরভর্তি সব অফিসার। মুখে কেউ কিছু বলছে না, কিন্তু মনে মনে কী ভাবছে? কী ভাবছে আমাকে? নিশ্চয়ই ভাবছে, দলীয় আনুগত্যে বন্দি অসহায় এক প্রশাসক এই লোকটা! নয়তো ভাবছে, মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে নিরপেক্ষ প্রশাসকের ভূমিকায় অভিনয় করছি আমি। লক্ষ্মণ শেঠ, কানু সাহুদের কথাই ঠিক। ভাবছে নিশ্চয়ই, আমি পার্টির সব কার্যকলাপ জেনেশুনে এসপি’কে কলকাতায় ডেকে পাঠিয়েছি নিজের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি গড়তে!
পল্লবকান্তি ঘোষের বক্তব্যে শেষের স্রেফ দু’লাইন নিয়ে কী ভাবছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, কারও জানা নেই, কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দিতে তড়িঘড়ি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘কী? মানে? কারওর কথা শুনবেন না। নির্ভয় কাজ করুন। দরকার হলে একমাত্র সূর্যবাবুর সঙ্গেই কথা বলবেন।’
কিন্তু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের এই কথার তখন আর কোনও গুরুত্বই ছিল না। তা সেদিন মিটিংয়ে উপস্থিত সব অফিসারই জানতেন। কারণ, তখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ আর  মহাকরণের হাতে ছিল না। আর তার কয়েকদিন বাদে হওয়া লোকসভা ভোটের পর থেকে তো মহাকরণের অবস্থা তো আরও করুণ হয়ে ওঠে।

চলবে

(১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল। প্রতি পর্বে লাল রং দিয়ে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে)

 

Comments are closed.