করোনার চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেটের কার্যকারিতা এখনও পরীক্ষামূলক স্তরেই রয়েছে। তবু কিছু ক্ষেত্রে তা কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরিতে সাহায্য করছে দেখে এখন ম্যালেরিয়ার এই ওষুধের চাহিদা এক লাফে বেড়ে গিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে অবহিত করেছেন সেই হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তৈরিতে বিশ্বে প্রথমের সারিতে রয়েছে ভারত। এদিকে দ্রুততার সঙ্গে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তৈরিতে কেন্দ্রের আবেদনের ভিত্তিতে গত শুক্রবার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠা করা বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিকল ওয়ার্কসকে ছাড়পত্র দিয়েছে রাজ্যের ড্রাগ কন্ট্রোলারও।
Bengal Chemicals and Pharmaceutical Works এর ইতিহাস

আরও পড়ুন: পোস্ট অফিসের সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখতেই হবে ৫০০ টাকা, না হলে মিলবে না সুদ সঙ্গে জরিমানা
১৯০১ সালে Acharya Prafulla Chandra Roy প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিকল ওয়ার্কস’। যা বাংলায় প্রথম সার্থক রাসায়নিক দ্রব্য এবং ওষুধ তৈরির কারখানাও বটে।
শোনা যায়, মূলধন কম থাকলেও প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে নেমে পড়েছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী। ১৮৯২ সালে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের উদ্যোগে সাধারণ একটি ভেষজ গবেষণাগার হিসাবে পথচলা শুরু Bengal Chemicals যা ১৯০৫ সালে হয়ে ওঠে পুরাদস্তুর রাসায়নিক কারখানা। ১৯৩১ সালে সেখানে শুরু হয় গ্ল্যান্ড প্রোডাক্টের প্রস্তুতি, ১৯৩২ সালে ভিটামিন প্রস্তুতি।
দীর্ঘ চলার পথে বহু বাধার মুখোমুখি হয়েছে প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বারবার উঠে দাঁড়িয়েছে। অ্যান্টি স্নেক ভেনম তৈরি করে প্রথম নজর কাড়ে বেঙ্গল কেমিক্যালস। বর্তমানে গোটা বিশ্বে করোনা হাহাকার। যে প্রাচীন সংস্থাকে লোকসানের কারণ দেখিয়ে বেসরকারিকরণ করার ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার, সেই বেঙ্গল কেমিক্যালসই ১৯২৩ সালে গোটা উত্তরবঙ্গে প্রবল বন্যার সময় লক্ষ লক্ষ ঘরছাড়া মানুষকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিল। Acharya Prafulla Chandra Roy তৈরি করেছিলেন বেঙ্গল রিলিফ কমিটি। তার মধ্যেই বাংলায় নতুন উপদ্রব হিসেবে উঠে আসে কলেরা আর টাইফয়েড। সেখানেও এগিয়ে এসেছিল এই প্রতিষ্ঠান।
আরও পড়ুন: ব্যবসায়িক গোলমালকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার অভিযোগে আইনী রক্ষাকবচ হারাল ট্যুইটার
প্লেগের হাত থেকে বাঁচার অন্যতম শর্ত হল বাড়ি পরিষ্কার ও পোকামাকড় মুক্ত রাখা। কিন্তু স্যানিটাইজেশনের যে সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি হতো, তার দাম ছিল সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এগিয়ে আসে সেই বেঙ্গল কেমিক্যালস। দেশীয় পদ্ধতিতে প্রস্তুত হয় ফিনাইল আর ন্যাপথালিন বল।
শুধু দেশের মানুষ নয়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারও নির্ভর করেছিল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠানের উপর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের প্রয়োজনীয় অ্যাসিড, রাসায়নিক পদার্থ জার্মানি থেকে আমদানি করা হত। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রধান প্রতিপক্ষই যে জার্মানি! সে সময় বেঙ্গল কেমিক্যালসকে যুদ্ধের যাবতীয় রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও আহত সৈনিকদের ওষুধের ব্যবস্থা করে বেঙ্গল কেমিক্যালস। আবার স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীরাও নানা সাহায্য পেয়েছেন এই সংস্থা থেকে।
হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন প্রস্তুতির বরাত
বর্তমানে দেশ তথা বিশ্বজুড়ে Hydroxychloroquine বিপুল চাহিদার মুখে সেই বেঙ্গল কেমিক্যালস এর উপর নির্ভর করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, বেঙ্গল কেমিক্যালস-ই হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের পথপ্রদর্শক, কদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে খবর ছড়িয়ে পড়েছে তা ঠিক নয়। বেঙ্গল কেমিক্যালসে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তৈরি হয় না। তৈরি হয় কুইনাইনের দুটি যৌগ। ক্লোরোকুইন ফসফেট ও ক্লোরোকুইন সালফেটের ট্যাবলেট, যা ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে বহু যুগ ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।
হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন আসলে ক্লোরোকুইনেরই কম টক্সিক ভার্সন। এই ওষুধ লুপাস ও আর্থারাইটিস রোগীদের উপরও ব্যবহার হয়। ইদানীং করোনা চিকিৎসায় এর প্রয়োগে ইতিবাচক ফল মিলেছে বলে দাবি করছেন চিকিৎসকরা।
হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন এবং ক্লোরোকুইন- দুটিই কুইনাইন থেকে তৈরি। প্রথম পেরু থেকে আমদানি করা হত এগুলি। কুইনাইনের সঙ্গেই, সিঙ্কোনা গাছের ছালের গুঁড়ো মিশিয়ে মিষ্টি জল দিয়ে তৈরি হতো এক টনিক। ১৯৩৪ সালে জার্মান গবেষকরা সিন্থেটিক ক্লোরোকুইন তৈরি করেন। ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবেই এর ব্যবহার হত। এরই কম টক্সিক ভার্সন হল হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন।
এখন হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তৈরিতে কী অবস্থা বেঙ্গল কেমিক্যালসের?

রাতারাতি পরিকাঠামো তৈরি এবং সরকারি ছাড়পত্র জোগাড় করেও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন কবে Bengal Chemicals বানাতে পারবে তা নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়েছে। আসলে এই ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালই সংস্থার কাছে নেই। এই পরিস্থিতির কথা জানিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের সাহায্য চেয়েছে বেঙ্গল কেমিক্যালস। সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর পিএম চন্দ্রাইয়া কেন্দ্রীয় সার ও রসায়ন মন্ত্রকের সচিবের কাছে কাঁচামালের পরিস্থিতি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব রাজীবা সিনহা ও স্বাস্থ্য সচিব বিবেক কুমারকেও সমস্যার কথা জানিয়েছেন, বেঙ্গল কেমিক্যালের দাবি, কাঁচামালের ব্যবস্থা করে দিলেই দ্রুত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন বানানো শুরু হয়ে যাবে।
চন্দ্রাইয়া জানান, কাঁচামাল মজুত না থাকায় এই ওষুধ এখনই তাঁদের পক্ষে বানানো সম্ভব নয়। এদিকে কাঁচামাল সরবরাহকারী জানিয়েছে, মাল সরবরাহ করতে জুন মাস গড়িয়ে যেতে পারে।
ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কথায়, ম্যালেরিয়ার ওষুধ ক্লোরোকুইন বানানোর জন্য যে কুইনাইন স্টকে ছিল, তা উত্তরাখণ্ড সরকারের ১২ লক্ষ ট্যাবলেটের একটি বরাতের কাজে লাগানো হয়েছে। আমরা এর আগে কখনও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন তৈরি করিনি। তবে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তা তৈরি করতে বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রস্তুত এবং তার জন্য অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো এবং ফর্মুলা সংক্রান্ত প্রস্তুতি তৈরি হয়ে গিয়েছে। তিনি আরও জানান, কলকাতার মানিকতলার কারখানায় দুই শিফটে কর্মীদের কাজ লাগালে, প্রতিদিন প্রায় ১৫ লক্ষ ট্যাবলেট তৈরি করা যাবে।




