লোকসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই তৎপরতা বাড়ছে রাজনৈতিক দলগুলির। একত্রিত হওয়ার চেষ্টায় দেশের বিজেপি বিরোধী সব রাজনৈতিক দল। উত্তর প্রদেশ, বিহার থেকে শুরু করে সম্প্রতি কর্ণাটকের উপনির্বাচনেও বিরোধী দলগুলির জোটবদ্ধ হওয়ার জেরে গত এক বছরে জোর ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুরে (যা মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কেন্দ্র) উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয় এবং সম্প্রতি কর্ণাটকের বেল্লারি কেন্দ্রে কংগ্রেস-জেডিএস জোটের কাছে বিজেপির আড়াই লক্ষ ভোটে পর্যুদস্ত হওয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, হিন্দুত্ব কিংবা খনি মাফিয়া রেড্ডি ভাইদের টাকার প্রভাব দুটোর কোনওটাই বিজেপির জেতার জন্য যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি, বিহারেও উপনির্বাচনে লালু এবং কংগ্রেসের কাছে বিজেপি-জেডিইউয়ের হারও প্রমাণ করছে, রাজ্যে নীতীশ কুমারের ‘উন্নয়ন’ এবং কেন্দ্রে বিজেপির ‘বিকাশ’এর ককটেল মানুষ বিশ্বাস করছে না।
এর পর ২০১৯ সালে সরকার ওল্টানোর জন্য বিরোধীরা যে মরিয়া হবেই, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটা হবে কোন রাস্তায়, কী কৌশলে? নরেন্দ্র মোদী সরকারকে উৎখাতের জন্য বিরোধীদের ডাক দেওয়ার মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। লোকসভা ভোট এলে বিরোধীরা সরকারকে হারানোর ডাক দেবেন এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ডাককে কার্যকর করার জন্য যে কৌশল নিতে হবে তা ঠিক করাই আজ বিরোধী দলগুলোর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যেখানে বিরোধী দলগুলির মধ্যে ফারাক দেশের খাদ্যাভ্যাসের মতোই বৈচিত্র্যপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে পাঁচ রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা ভোটের মধ্যেই ২২ শে নভেম্বর দিল্লিতে হতে চলেছে বিজেপি বিরোধী দলগুলির বৈঠক, আর তাতে যোগ দিতেই তার আগের দিন ফের দিল্লি সফরে যাচ্ছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল নেত্রী। বৈঠকের অন্যতম উদ্যোক্তা অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। বৈঠকে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীরও থাকার কথা। এছাড়াও থাকার কথা কর্ণাটকের শাসক দল জেডিএস, তামিলনাডুর স্ট্যালিন, লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিজেপি বিরোধী দলের। সেখানে অবশ্যই বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ের কৌশল ঠিক করা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। কারণ, শুধু বৈঠক করা এবং তার শেষে হাত তুলে ফটো সেশন করে যে মোদী-অমিত শাহদের ধাক্কা দেওয়া যাবে না তা বিরোধীরা যত দ্রুত বুঝবেন ততই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে।
দশকের দশক দেশ চালানো কংগ্রেস অবশ্যই চায়, তাদের নেতৃত্বেই দিল্লি দখলের লড়াইয়ের রোড ম্যাপ তৈরি হোক। এবং তার জন্য ভোটের আগে থেকে তৈরি করা হোক জোট। কংগ্রেসের এই চাওয়া যে স্রেফ মনের কথা নয়, তা কিছুদিন আগেই বুঝিয়ে দিয়েছেন খোদ কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী, যখন তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হতে তাঁর আপত্তি নেই। আর এই জায়গাটাতেই সবচেয়ে বড় আপত্তি দেশের একাধিক রাজ্যভিত্তিক দলের, যাদের শক্তি নিজ নিজ রাজ্যে কংগ্রেসের থেকে বহুগুণ বেশি।
বহুদিন ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে আসছেন, নির্বাচনের আগে কারও নেতৃত্বে কোনও জোটের দরকার নেই। তৃণমূল নেত্রীর ফর্মুলা, যে যেখানে শক্তিশালী সে সেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করুক। যে যেখানে শক্তিশালী সেখানে সেই দলের ছাতার তলায় আসুক বিজেপি বিরোধী অন্য দলগুলি। এই হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, বিহারে আরজেডি, অন্ধ্রে টিডিপি, দিল্লিতে আম আদমি পার্টি, উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টি, কেরলে সিপিএম, তামিলনাডুতে ডিএমকে প্রধান ভূমিকা নিক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। অন্যদিকে রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যে কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়ুক। এমনকী, গত বছর গুজরাতে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে কিছু আসনে সমঝোতা করলে সেখানেও বিজেপি হেরে যেত বলেই তৃণমূল নেত্রীর বিশ্বাস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ফর্মুলাকে সামনে রেখেই চন্দ্রবাবু নাইডুও বিরোধী ঐক্যের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কুমারস্বামী, স্ট্যালিনের সঙ্গে কথা বলেছেন, রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও বৈঠক করছেন।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট গড়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই, না রাজ্যভিত্তিক আলাদা কৌশলে অমিত শাহদের মোকাবিলা, তাই ২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দিল্লিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা কথা বলতে ১৯ শে নভেম্বর কলকাতা আসছেন চন্দ্রবাবু নাইডু। ২২ তারিখের বৈঠকে বিজেপির বিরুদ্ধে এই রাজ্যভিত্তিক লড়াইয়ের সওয়ালই তাঁরা করবেন বলে সূত্রের খবর।

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা শুরু করেছি সাবস্ক্রিপশন অফার। নিয়মিত আমাদের সমস্ত খবর এসএমএস এবং ই-মেইল এর মাধ্যমে পাওয়ার জন্য দয়া করে সাবস্ক্রাইব করুন। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us