৬ ই নভেম্বর, কালী পুজোর দিন কর্ণাটকে লোকসভা এবং বিধানসভা মিলে পাঁচটি আসনে উপনির্বাচনের ফল বেরলো। কংগ্রেস-জেডিএস জোট ৪ টি এবং কেন্দ্রের প্রবল পরাক্রান্ত শাসক দল বিজেপি ১ টি আসনে জিতেছে, তাও সবার জানা। দেশজুড়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে এই ফলাফল নিয়ে। বিরোধী জোট মজবুত হলে বিজেপির পক্ষে ভোটে জেতার অঙ্ক যে সহজে মিলছে না, তা গত কয়েক মাসে তাদের শক্ত ঘাঁটি হিন্দি বলয়ের দুই রাজ্য, উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে প্রমাণ হয়ে গেছে। হিন্দি বলয়েই যদি বিজেপির হার শুরু হয়, তবে দক্ষিণ ভারতে কী হতে পারে তা কর্ণাটকের ফলাফলে স্পষ্ট।
কিন্তু এই লেখার বিষয় কর্ণাটকের রেজাল্ট নয়। লেখার বিষয়, এই ফল লোকসভা এবং পাঁচটি রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপির কাছে বড় ধাক্কা, না ‘দীপাবলির মুখে’ বিজেপির বড় ধাক্কা তা নিয়ে। কেউ ভাবতে পারেন, দুইয়ের মধ্যে ফারাক কী? সামনেই তো পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট আসছে, আর কর্ণাটকের রেজাল্ট যেদিন বেরিয়েছে সেদিন তো দীপাবলিই ছিল! কেউ আবার ভাবতে পারেন, এ কী হেঁয়ালি হচ্ছে?
আসলে এই লেখার বিষয়, বাংলায় আগামী দিনে রাজনৈতিক বিন্যাস, ধর্মীয় মেরুকরণের সহায়ক পরিবেশ গড়ে ওঠা, বিজেপির উত্থান এবং সিপিএমের ভবিষ্যৎ।
কর্ণাটকের রেজাল্ট বেরনোর কিছু বাদেই পশ্চিমবঙ্গ সিপিএমের অফিশায়াল ফেসবুক পেজে একটা পোস্ট করা হল। তাতে লেখা হল, ‘দীপাবলির মুখেই বড় ধাক্কা খেল বিজেপি……’ । মোদী-অমিত শাহর ছবি দিয়ে ক্যাপশন করা হল, ‘কর্ণাটক উপর্বাচনে মুখ থুবড়ে পড়ল বিজেপি’। আচ্ছা, একটা রাজ্যে লোকসভা, বিধানসভার মতো আপাদমস্তক রাজনৈতিক ভোট, যাও আবার কিনা ২০১৯ সালে দেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিরোধী জোটের কাছে একটা অ্যাসিড টেস্ট, যা রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়সহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে হচ্ছে, তার ফল ‘দীপাবলির মুখে’ না ‘বড়দিনের পরে’ না ‘রমজান মাসে’ বেরোল, তাতে কীই বা এসে যায়? সিপিএমের ফেসবুক পেজে লেখা গেল না, ‘পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের মুখেই বড় ধাক্কা খেল বিজেপি’? তাতে তো অন্তত একটা রাজনৈতিক বার্তা থাকতো? কিন্তু ‘দীপাবলির মুখেই’ বিজেপির এই ধাক্কায় সিপিএমের কোন রাজনৈতিক স্লোগান কার্যকর হল তা ৩১ নম্বর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতারা নিশ্চই বলতে পারবেন!

আসলে, বাংলায় বিজেপি ঠিক এটাই চায়। বাংলায় তারা এসেছিল একটা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে। যেখানে শাসক এবং বিরোধী দলের মধ্যে অনেক বিষয়ে ফারাক থাকলেও, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাগুলোর মধ্যে মৌলিক তফাত বিশেষ ছিল না। বিজেপি এসে দেখল, বাংলার পিচে, এখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতিতে খেলাটা সুবিধের হবে না খুব একটা। তাই পিচটা নিয়ে আসতে হবে অযোধ্যা বা উজ্জয়িনী থেকে। খেলতে হবে নিজেদের টার্মে, নিজেদের অ্যাজেন্ডায়। পরিবেশটা আনতে হবে নিজেদের অনুকূলে, তবেই জেতার আশা আছে। ধর্ম, ধর্মাচরণ, সংস্কার, খাওয়া-দাওয়া, পোশাকের মতো সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার একটা সামাজিকীকরণ হলেই, তা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন চর্চায় চলে আসবে। তখন রাজনৈতিক আলোচনা, মৌলিক দাবি-দাওয়া, রোজকার সমস্যা চলে যাবে পেছনের সারিতে।
এবং হলও তাই। আর হল বলেই, দিল্লির কেরালা হাউসে আরএসএস-বজরং দল যখন গরুর মাংস বিক্রির বিরুদ্ধে হুজ্জুতি করে, তখন কলকাতার ধর্মতলায় প্রকাশ্যে তা খেয়ে প্রতিবাদ জানান কয়েকজন সিপিএম নেতা। আর বিজেপি নেতারা বলার সুযোগ পেয়ে যান, ‘গরু খেয়েছেন, ভালো কথা। এবার শুয়োরের মাংস খেয়ে দেখান’। এবং হল বলেই, কর্ণাটকে ভোটের রেজাল্টের পর সিপিএমের ফেসবুক পেজে লেখা হয়, ‘দীপাবলির মুখেই বড় ধাক্কা খেল বিজেপি’।
দুর্গা পুজোর ঠিক আগেই, অক্টোবর মাসে দ্বিতীয় সপ্তাহে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের মুজফফর আহমেদ ভবনে বসেছিল সিপিএমের রাজ্য কমিটির মিটিং। সেখানে রাজ্যে লোকসভার ৪২ টি আসনেই জেতার ডাক দিয়েছেন দলের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোট পরবর্তী বাংলায় যত উপনির্বাচন হয়েছে (তমলুক, কোচবিহার, উলুবেড়িয়া লোকসভা কিংবা নন্দীগ্রাম, মন্তেশ্বর, দক্ষিণ কাঁথি, সবং, নোয়াপাড়া বিধানসভা), সর্বত্রই বিজেপির ভোট হু-হু করে বেড়েছে। একই জিনিস ঘটেছে এবছর পঞ্চায়েত ভোটেও। সিপিএমকে পেছনে ফেলে দু’নম্বরে উঠে এসেছে বিজেপি। রাজ্যে যেভাবে বিজেপির ভোট বেড়েছে, সেভাবেই কমেছে সিপিএমের ভোট। বাংলাতেও রাজনৈতিক বিষয়গুলো দিন দিন চলে যাচ্ছে পেছনের সারিতে, সামনে চলে আসছে রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী, রথ যাত্রার ইস্যু। রাজ্য সিপিএমের ফেসবুক পেজেও ভোটের রেজাল্টের পোস্টে চলে আসে ‘দীপাবলি’।
খালি চোখে সহজে দেখা যায় না, এমন ধীর গতির বদল যদি আস্তে-আস্তে চলে আসে ভোটের রেজাল্ট নিয়ে সিপিএমের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায়, তবে এমন দিন আর বেশি দূরে নেই, যেদিন বাংলার ৪২ টি কেন, ৪ টে লোকসভা কেন্দ্রেও হয়তো লড়াইয়ের আগেই ময়দান থেকে ছিটকে যাবে দীর্ঘ বছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য বহন করা মুজফফর আহমেদ ভবন।