মেট্রোয় আলিঙ্গনরত যুবক-যুবতীকে গণপ্রহার আসলে হেরে যাওয়া কিছু মানুষের পুঞ্জীভূত অসহায়তা

দমদম মেট্রোয় যুগলকে আলিঙ্গনরত দেখে যে সব ভীমরতিপ্রাপ্ত সংস্কৃতি গোল্লায় গেল রব তুলে মার-মার করে গুলি ফুলিয়ে এগিয়ে গেসলেন, সেই সিনিয়র সিটিজেনদের, আমি অন্তত কোনও দোষ দেখি না।

মারধর করার সময় মুখে অন্তত যা যা বলা হয়, ক্যালানি দেওয়ার আসল কারণটা সেটা নাও হতে পারে। এই যেমন ধরুন নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘অটো’ উপন্যাসের চন্দন। হেডব্যান্ড আর লম্বা চুলের ভিকি, যে কিনা আবার চন্দনের বউ মালাকে ফুসলিয়ে নিয়ে পালায়, তাকে ঢিট করতে, চন্দন ছক কষেনি? কিন্তু পারেনি। অথচ, এক রাতে অটো মোছার ন্যাকড়া বের করতে গিয়ে নন্দর লুকিয়ে রাখা দিশি পিস্তলে হাতটা ছোঁয়ানো মাত্রই চিত্রপটটা বদলে যায়। বন্দুকের নল চন্দনের পুরুষত্ব ফেরাতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু পালটা রদ্দা ঝাড়ার তাগতটা এনে দিয়েছিল শরীরে।
এবার চন্দনের জায়গায় সেদিনের দমদমের ভীমরতিপ্রাপ্তদের বসান, দেখবেন ইতর বিশেষ তফাত নাই। এখন প্রশ্ন, সিনিয়র সিটিজেনকূলের এমনকী অসহায়তা যে ভিড় মেট্রোয় স্রেফ শারীরিকভাবে অন্তরঙ্গ হয়ে দাঁড়ানোর জন্য যুগলকে গণধোলাই দিতে হয়? এ কি কেবলই প্রতিবাদ, নাকি ‘আমার হয় না, আর এরা শালা ওপেন জাপ্টাজাপ্টি লাগিয়ে দিয়েছে!’- র বেদনা, নাকি অন্যকিছু?
আসলে সামাজিক পরিসরে প্রতিবাদ কথাটার ব্যঞ্জনা সাধারণত টু-ডি। মানুষভেদে প্রতিবাদের ধরণ যেমন বদলায়, ট্যাঁকের জোর ভেদে তেমনই পালটে যায় প্রতিবাদযোগ্য বিষয়টিও। একে নিম্নবিত্ত, তায় বউ পালানো, চন্দনকে যখন ‘ধ্বজ’ নামে ডেকে ডেকে ব্যতিব্যস্ত করে দেয় তাঁর বন্ধুমহল, মনে মনে গুমড়ে গেলেও চন্দন প্রতিবাদ করতে পারে না। দাঁত কিড়মিড় করতে করতেই হজম হতে থাকে হাজারো টিটকিরি। সমাজ ও সংস্কৃতি সচেতন মেট্রোর ভীমবাবুরাও আসলে নীরবে সহ্য করে যাওয়া, আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলা খরচের সাথে বাড়ন্ত মাইনের ব্যস্তানুপাতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে হিমশিম, স্রেফ অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতায় রাগটাকে কোত করে গিলে ফেলা এক একজন চন্দন। প্রতিবাদ তো কত সময় করতে প্রাণ চায়, পারি কি? পাড়ার স্বপনবাবু সেদিন পার্টি দেখিয়ে দু’হাজার নিয়ে গেলেন, পারলাম টাকাটা না দিয়ে? দুখানা রদ্দা ঝেড়ে, ‘ইয়ার এন্ডিংয়ে মাইনে থেকে ইনকাম ট্যাক্স যে থোক টাকাটা কেটে নেয় জানেন না’, বলতে? গেল হপ্তায়, এই মেট্রোতেই বাবিনের বয়সী এক ছোকরা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আগে ঢুকে গেল, ঢাউস ব্যাগে দ্বিতীয়বার ঠ্যালা খেয়ে বাবিনের বাবা তখন লাইনের বাইরে। মেট্রোটা মিস। পারলাম ছোকরাকে দু’ঘা দিতে? ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরে বাবিনকেই দু’কথা শুনিয়ে ঝাল মেটাবো… সে গুড়েও বালি। গোটাটা শুনে বাবিন বললে, বাপি পরের দিন থেকে এরকম ভাবনা মনেও এনো না। দিনকাল বদলে গেছে। মব লিঞ্চিংয়ের নাম শুনেছো?
পিটিয়ে মারা। ব্যাপারটার মধ্যে যে বেশ একটা পরমবীরচক্রমার্কা ব্যাপার আছে, অস্বীকার করতে পারেন? দলে ভিড়ে মারলে আবার নিজের বেঁচে যাওয়ার ম্যাক্সিমাম চান্স। স্বপনবাবুকে রদ্দা ঝাড়তে না পারার আপশোষ, বাবিনের বয়সীটাকে দু’ঘা দিতে না পারার ব্যর্থতা, সর্বোপরি, নিজের দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থানের অমোঘ অসহায়তাগুলো, সব খোলসবন্দি হয়ে কচ্ছপের মত ঘাপটি মেরে ছিল। গরগরে রাগ আর বুক পোড়ানো অসন্তোষটা কিছু একটা দিয়ে বেরোনোর ছুতো খুঁজছিল। চন্দনের হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছিল অটো মোছার ন্যাঁকড়া খোঁজার তাড়ণা। ভীমবাবুদের মুঠো পাকাতে শুরু করেছিল আলিঙ্গন দেখে। বাস্তবের আকলাখ, পেহলু খানরাও আর সুযোগ পেল কই? নবারুণের ‘অটো’ও আসলে এমনই বাস্তব শোঁকা বিস্ফোরণের ইতিবৃত্ত। মব যে একটা বিচারবোধহীন কুৎসিত ক্ষমতার দ্যোতক, দমদমের আলিঙ্গনরতরা তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন অভিজ্ঞতা দিয়ে। আর কয়েনের অন্য পারের বাসিন্দা, ভীমবাবুরা? একটা হেরে যাওয়া জীবনের অক্ষম দৈনন্দিনতার উপরে একটা আগমার্কা বীরপুঙ্গব টপিং দিয়েছেন সমবেত লিঞ্চিং দিয়ে। যদিও দিনের শেষে অর্থনীতির দাড়িপাল্লায় পার্টির দমে দমদার স্বপনবাবু কিংবা উর্ধ্বশ্বাসে সামনের দিকে ছুটে চলা বাবিনদের কাছে ভীমবাবুরাও যে আলিঙ্গনরত দুটি ছেলে-মেয়ের মতই অসহায়! অতএব, সাবধান, পুঞ্জিভূত অসহায়তা থেকে বিস্ফোরণের ঝুঁকি কিন্তু সর্বদা বিদ্যমান। দমদম তার সর্বশেষ নিদর্শন।।

Comments
Loading...