সিরাজদ্দৌলার ‘প্রাপ্য সম্মান’ ফিরিয়ে দিতে চান, হীরাঝিল প্রাসাদ বাঁচাতে মুর্শিদাবাদের মাটি কামড়ে লড়াই করছেন সমর্পিতা 

১৭৫০ সালে প্রিয় নাতি সিরাজের আবদার রাখতে নবাব আলীবর্দী খাঁ তৈরি করেছিলেন মনসুরগঞ্জ প্যালেস। যা লোকমুখে হীরাঝিল প্রাসাদ নামে পরিচিত। সিরাজ নিজের পছন্দের মতো করে সাজিয়েছিলেন হীরাঝিল। পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৭৫৭ সালে ২৪ জুন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে হীরাঝিল প্রসাদ ছেড়েছিলেন। এমনকী এই প্রাসাদেই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হিসেবে মীরজাফরের অভিষেক হয়েছিল। হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যরীতিতে তৈরি হীরাঝিল প্রাসাদের একটি বড় অংশই তলিয়ে গিয়েছে ভাগীরথীতে। তবে এখনও বিস্তীর্ন অঞ্চলে হীরাঝিলের এই ধ্বংসাবিশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। আর ‘নবাবের’ এই শেষ স্মৃতিচিন্হ টুকু বাঁচতেই কলকাতা ছেড়ে প্রায় ৩ বছর মুর্শিবাদে গিয়ে ‘পড়ে’ রয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী পেশায় অভিনেতা সমর্পিতা দত্ত। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রাপথ নিয়ে কথা বললেন TheBengalStory-এর সঙ্গে।  

ভাঙনের মুখে হীরাঝিল প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ

ছোটবেলা থেকেই ‘সিরাজদ্দৌলা’ নামটির প্রতি অদ্ভুদ একটা আকর্ষন বোধ করতেন। সমর্পিতা জানালেন, সবাই মুর্শিদাবাদে এসে হাজারদুয়ারী দেখতে যেতে চান, আমি মুর্শিদিবাদ পা রেখেই খোশবাগে নবাবের সমাধিস্থলে যেতে চেয়েছিলাম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে মাস্টার্স করার সময় মুশির্দাবাদে প্রথম আসেন। তারপরে দু’একবার মুর্শিদাবাদে এলেও খোশবাগে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ২০১৮ সালে প্রথম সিরাজের সমাধিস্থলে যান তিনি। তাঁর কথায়, জায়গাটা পা রেখেই মনে হয়েছিল একটা মৃত্যপুরীতে এসে দাঁড়িয়েছি। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। যে মানুষটার নাম ভাঙিয়ে গোটা মুর্শিদাবাদ চলছে। সেই সিরাজদ্দৌলাকে নিয়ে এত অবহেলা!  

সিরাজদ্দৌলা, খোশবাগ, হীরাঝিল নিয়ে প্রথমে পরিকল্পনা করেছিলেন সিনেমা তৈরির। চিত্রনাট্য লেখার কাজও সেরে ফেলেছিলেন। ছবি তৈরি না হলেও বারবার খোশবাগ আসার সূত্রে স্থানীয় কিছু ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়। সিরাজের সমাধিস্থলে তাদের নিয়েই ‘সিরাজদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয়, খোশবাগ’  তৈরি করেন সমর্পিতা। প্রথমে একা পড়ালেও বর্তমানে এই অবতৈনিক স্কুলে ৫ জন পড়ান। বাচ্চাদের পোড়ানোর পাশাপাশি খোশবাগের উন্নতি নিয়েও একাধিক জায়গায় চিঠিপত্র লিখতে শুরু করেন সমর্পিতা। বর্তমানে তাঁর উদ্যোগেই রাস্তা তৈরি, পর্যাপ্ত আলো, খোশবাগের রক্ষানাবেক্ষন শুরু হয়েছে। 

 

খোশবাগ নিয়ে কাজের মধ্যেই হীরাঝিলে যাওয়া আসা শুরু করেন সমর্পিতা। তাঁর দাবি, ভাগিরথীতে তলিয়ে গেলেও এখনও প্রাসাদের অনেকটাই বর্তমান রয়েছে। ভাগিরথীর পাড় বাঁধিয়ে হীরাঝিল বাঁচাতে কোমর বেঁধে নেমেছেন তিনি। সমর্পিতার উদোগ্যে স্থানীয় মানুষদের নিয়ে তৈরি হয়েছে হীরাঝিল বাঁচাও কমিটি। সম্প্রতি ডিসেম্বরের পাঁচ তারিখ কমিটির তরফে একটি বিরাট মিছিলও করা হয়। স্থানীয় কিছু যুবক প্রাসাদের ধ্বংস স্তুপের উপরের ঝোঁপ জঙ্গল পরিষ্কার করেছেন। সমর্পিতা জানালেন ২৫ ডিসেম্বরের পর থেকে পর্যটকেদের জন্য হীরাঝিল খুলে দেওয়া হচ্ছে। 

সমর্পিতা বললেন, ইতিমধ্যেই কমিটির তরফে সংশ্লিষ্ঠ সব জায়গায় ভাগীরথীর পাড় বাঁধানোর আবেদন জানিয়ে চিঠি লেখা হয়েছে। পাশাপাশি আমরাও হীরাঝিল বাঁচাও কমিটির তরফে একাধিক অনুষ্ঠান, সভা করবো। যাতে কেন্দ্র রাজ্য এটা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। তাঁর আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য, হীরাঝিল বাঁচবেই। বললেন, দেখুন এটা তো শুধু আমার দাবি নয়, হীরাঝিল বাঁচলে বাংলার ইতিহাস বাঁচবে সেই সঙ্গে ভাগিরথীর পশ্চিম পড়ে গ্রামগুলির মানুষও নদীর ভাঙনের হাত থেকে বাঁচবে। দেখুন এটা তো বুঝতে হবে সিরাজদ্দৌলা নামটি ছাড়া মুর্শিবাদের আর কিচ্ছু নেই। অথচ মুর্শিদাবাদে নবাবের কবর, আর হাজারদুয়ারীতে একটা তরোয়াল ছাড়া সিরাজরের কোনও নির্দর্শন নেই। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাবের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেবই, আপাতত এটাই আমার জীবনের লক্ষ্য, মৃদু হেসে বললেন সমর্পিতা।           

Comments are closed.