সাইকেলের কেরিয়ারে একজনকে বসিয়ে ১,২০০ কিমি রাস্তা পার হওয়া কোনও অ্যাথলিটের পক্ষেও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের। কিন্তু বাবার জন্য সেই কঠিন কাজটিই কিনা হাসিমুখে সেরে ফেললেন ১৫ বছরের কিশোরী!

লকডাউনে আটকে থাকা অসুস্থ বাবাকে হরিয়ানার গুরুগ্রাম থেকে বিহারের দ্বারভাঙ্গার বাড়িতে সাইকেলে করে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন মেয়ে জ্যোতি কুমারী। এখন বাবা-মেয়ে আছেন দ্বারভাঙ্গার সিরহুল্লি গ্রামের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে।

কাজের জন্য বড় মেয়েকে নিয়ে ঘর ছেড়ে ভিনরাজ্যে থাকতেন মোহন পাসওয়ান। আর বিহারের বাড়িতে থাকেন তাঁর অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী স্ত্রী ও অন্য সন্তানরা। গুরুগ্রামে ই-রিকশা চালিয়ে কোনওরকমে পরিবার চলত মোহনের। কিন্তু মাস কয়েক আগে এক দুর্ঘটনায় পড়ে রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। তারপর কিছু জমা টাকার উপর নির্ভর করে দিন চলছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণ এড়াতে লকডাউন যেন গোদের উপর বিষ ফোঁড়া হয়ে দাঁড়াল বাবা-মেয়ের কাছে। দরকারি ওষুধ কেনার টাকা দূরে থাক, দু’বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে শুরু করেন এই ই-রিকশাচালক। এদিকে কয়েক মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি থাকায় ঘর মালিক সাফ জানিয়ে দেন, ভাড়া না দিলে ঘর খালি করুন। এই অবস্থায় জ্যোতি বাবাকে পরামর্শ দেয় আপাতত বাড়ি ফিরে চলো। কিন্তু মোহন মেয়েকে বোঝান, গণপরিহণ বন্ধ, তার উপর অসুস্থ শরীর। কীভাবে এতটা রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি ফিরবেন তাঁরা? মেয়ে অবশ্য এসব শুনতে নারাজ। চোখের সামনে বিনা ওষুধপত্রে, নিরন্ন অবস্থায় অসহায় বাবাকে দেখতে চায় না সে। তাই বাবাকে বলে একটা সাইকেল জোগাড় করে দিতে। মেয়েকে ফের একপ্রস্ত বোঝাতে বসেন মোহন, এটা ৩০-৪০ কিলোমিটার রাস্তা নয়, ১,২০০ কিলোমিটার! কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে একপ্রকার বাধ্য হয়ে শেষ জমানো টাকায় সাইকেল কিনে ফেলেন মোহন।

তারপর টানা আটদিন ধরে সাইকেল চালিয়ে বাবাকে নিয়ে হরিয়ানা থেকে বিহারের ঘরে পৌঁছন ১৫ বছরের কিশোরী।

কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পর কাহিল হলে বিশ্রাম করেছেন বাবা-মেয়ে। তারপর ফের বাবাকে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে প্যাডেলে পা রেখেছে জ্যোতি। রাস্তায় মাঝেমধ্যে লরি ড্রাইভারদের চোখে পড়েছে এই ছোট্ট মেয়ের যাত্রা। কেউ কেউ তাদের তুলে নিয়ে কয়েকটা স্টপেজ এগিয়ে দিয়েছেন। তারপর আবার সেই দু চাকাই ভরসা। তাঁর দৃঢ় সংকল্প, বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবই। ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফেরা হয়েছে। কিন্তু হরিয়ানা থেকে বিহারের উদ্দেশে কবে যাত্রা করেছিল তা ভুলে গিয়েছে জ্যোতি। শুধু বিড়বিড় করে জানায়, দিন আষ্টেক তো হবেই।

রামায়ণে শ্রবণ কুমার অন্ধ বাবা-মাকে ঝোলায় চাপিয়ে তীর্থদর্শন করাতেন। সংবাদমাধ্যমগুলি জ্যোতি কুমারীকে বিহারের শ্রবণ কুমার বলে অবহিত করেছে। আর তাই শুনে হাসি ফোটে অসুস্থ মোহনের মুখে। জলে ভরা চোখ নিয়ে গর্বিত বাবা জানান, তীর্থযাত্রার চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না এই লকডাউন যাত্রা।

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us