নাগরিকত্ব আইন, এনপিআর, এনআরসি-এই শব্দগুলোতেই তোলপাড় গোটা দেশ। চলছে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার। কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই চরমে। দেশজোড়া প্রতিবাদের মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন, পিছু হঠার প্রশ্নই নেই। এনআরসি হবে দেশজুড়ে।
নাগরিকত্ব আইন, এনপিআর, এনআরসি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা যখন চরমে, তখন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি প্রস্তুত তো নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে? জানেন কি, অসমে এনআরসি তালিকা থেকে যে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষের নাম বাদ পড়েছে শুধুমাত্র সামান্য কিছু ভুলের জন্য। যদিও সেই বিষয়গুলিকে এত দিন কোনও ভুল বলে মনেই করেননি আপনার-আমার মতো সাধারণ নাগরিক। বলা যেতে পারে, আপনার-আমার যতরকম পরিচয়পত্র (Identity Card) আছে, সেগুলির মধ্যে সামান্য গরমিলের জন্য অসমে এনআরসি তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে প্রায় ১৪-১৫ লক্ষ মানুষের।

কিছু উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে
ব্রহ্মপুত্রের উত্তরে অসমের ধুবরি জেলা। ধুবরির সাত পুরুষের বাসিন্দা তজব আলি পড়েছেন মহা মুশকিলে। এনআরসির সময় উপযুক্ত নথি জমা করেছেন। ১৯৬৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে ভোটার লিস্টও জমা দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হয়েছে ১৯৮৫ সালের ভোটার লিস্টে। সেখানে তজব আলির নাম হয়ে গিয়েছে তজপ আলি। বাবার আসল নাম সুরমান আলি, ভোটার লিস্টে হয়েছে সুরমান আলি মুনশি। বয়সেও রয়েছে অসামঞ্জস্য। এফিডেফিট জমা দিয়েও কিনারা হয়নি। নামে এর জায়গায় হয়ে গিয়ে অসম নাগরিকপঞ্জির খসড়া থেকে বাদ গিয়েছে পেশায় কৃষক তজব আলির নাম।
একই ঘটনা ঘটেছে চেন্নাইয়ের বাসিন্দা ৭৪ বছরের সেলভি রঘুপতির (Raghupaty) সঙ্গে। আধার কার্ডে তাঁর পদবির বানানে একটি এইচ (H) যোগ হয়েছে। রঘুপতি হয়েছেন রঘুপথি (Raghupathy)। ডায়াবেটিসের রোগী সেলভি রঘুপতির একটি পা বাদ গিয়েছে। এই অবস্থায় আধারে নামের বানানে গরমিল দূর করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রৌঢ়। দেশজুড়ে এনআরসি হলে যাতে বানান ভুলের কারণে তালিকা থেকে বাদ যেতে না হয়।
সদ্য কলকাতায় এসেছিলেন পদত্যাগী আইএএস কান্নন গোপীনাথন। বাংলায় আসার আগে তাঁর গন্তব্য ছিল বিহারের পূর্ণিয়া। কলকাতায় এসে কান্নন বলেছিলেন, মানুষের মধ্যে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক দেখলাম। সীমাঞ্চল এলাকায় রাত ২ টো থেকে আধার কেন্দ্রের সামনে লাইন দিচ্ছেন গরিব মানুষ। যাতে সকাল ৯ টায় অফিস খুললেই তাঁর কাজ সারা হয়। প্রত্যেকেরই আধারে নাম কিংবা বায়োমেট্রিক নিয়ে সমস্যা রয়েছে। কাজকর্ম ফেলে, নিজেদের নাগরিক প্রমাণের জন্য তাঁরা হত্যে দিয়ে পড়ে রয়েছেন আধার কেন্দ্রগুলোতে।
স্বল্প শিক্ষিত বা অক্ষর জ্ঞান কম, এমন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এতদিন এই ছোটখাটো গোলমাল নিয়ে মাথা ঘামাননি। অনেকে হয়তো জানতেনই না, তাঁর তিন-চাররকম পরিচয়পত্রে নাম, পদবী, বাবার নাম, বয়স বা ঠিকানায় ছোটখাটো কিছু গরমিল রয়েছে। কিন্তু ফেলে রাখা ছোট ভুলের কারণে যদি তাঁদের নাগরিকত্ব খোয়া যায়, এই আতঙ্কই এখন বিরাজ করছে ভারতের গ্রামাঞ্চলে। শহরেও অন্যথা হয়নি। আর তাই গরমিল দূর করতে আধার কেন্দ্র বা সরকারি অফিসে লাইন দিচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।

কী করা উচিত
অসম এনআরসির শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে খুঁজে বের করুন আপনার সমস্ত পরিচয়পত্র। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাটের কাগজ, পাসপোর্ট-যা যা আছে আপনার কাছে। মিলিয়ে দেখে নিন, সমস্ত পরিচয়পত্রে নাম, ঠিকানা, পদবী, বাবা-মায়ের নাম, সব এক আছে কিনা। শুধু এক থাকলেই হবে না কিন্তু। প্রত্যেকটা বানান এক আছে কিনা তাও দেখে নিন। এক পরিচয়পত্রের সঙ্গে অন্যটির সামান্য কোনও গরমিল থাকলেই কিন্তু এদেশে একশো বছর বসবাস করেও আপনি হারাতে পারেন নাগরিকত্ব।

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us