আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছিল: ৩ জানুয়ারি হঠাৎ উত্তপ্ত হল নন্দীগ্রাম, সেদিন মাঝরাতে গিয়ে পৌঁছালাম সেখানে। পরদিন ভোরে নন্দীগ্রাম থানার সামনে থেকে সাইকেলে রওনা দিলাম গড়চক্রবেড়িয়ার উদ্দেশে

 

গড়চক্রবেড়িয়া মোড় থেকে সাইকেলে শ’পাঁচেক মিটার এগোতেই উল্টোদিক থেকে আসা মিছিলটা দেখে হাত-পা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। কয়েক’শো মানুষ, হাজারও হতে পারে। শুধু দেখা যাচ্ছে, ঢেউয়ের মতো মানুষ ছুটে আসছে। রীতিমতো উন্মত্ত চেহারা। অধিকাংশেরই হাতে লাঠি বা গাছের মোটা ডাল। কয়েকজনের হাতে বড়ো বড়ো তলোয়ার। ভয়ে ততক্ষণেআমরা সাইকেল থেমে গিয়েছি। সাইকেল থেকে নেমে রাস্তার ধারে দাঁড়ালাম। শুধু ভাবছি কেউ যেন মিছিল থেকে চিনে না ফেলে। জানুয়ারির গোড়ায় সকালের ঠান্ডাতেও আমরা ঘেমে গিয়েছি। সিপিআইএম এবং সরকার বিরোধী স্লোগান দিতে দিতে ভয়ঙ্কর চেহারার মিছিলটা পাশ দিয়ে যাচ্ছে। মিছিল থেকেই কয়েকজন গালিগালাজ করলেন আমাদের। পাশ দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে মিছিলটা চলে গেল। পুরো মিছিলটা চলে যাওয়ার পর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, কয়েকজনের হাতে বন্দুক, জং ধরা রিভলভার। ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি, রাজ্যের আর পাঁচ-দশটা জায়গার থেকে আলাদা নন্দীগ্রাম। যা পরেও বহুবার বুঝেছি নিজের অভিজ্ঞতায়। মনে পড়ল শুভেন্দুর কথা, ‘নন্দীগ্রাম কিন্ত সিঙ্গুর নয়’। অনেকবার সিঙ্গুর গিয়েছি, এমন হাড় হিম করা ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি কখনও।
মিছিলটা বেরিয়ে যাওয়ার পর আবার সাইকেল চালাতে শুরু করলাম। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ, আগের রাতে গাড়িতে বসে ঠান্ডায় যতটা কষ্ট হয়েছে, এখন তার লেশমাত্র নেই। বরং রোদ উঠেছে। দীর্ঘদিনের অনভ্যেসে সাইকেল চালাতে তখন খানিকটা কষ্ট হচ্ছে। আরামদায়ক ঠান্ডা একটা হাওয়া বইছে, এই যা স্বস্তি। গড়চক্রবেড়িয়া কত দূর, একথা লোককে জিজ্ঞেস করার জন্য মাঝে দু’একবার থেমেছি। দীর্ঘদিন অভ্যেস না থাকায় কয়েকবার সাইকেল আস্তে করেছি। কিন্ত বড়ো কোনও সমস্যা হয়নি। রাস্তার দু’দিকে প্রচুর বয়স্ক পুরুষ, মহিলা এবং বাচ্চা দাঁড়িয়ে। বেশ খানিকক্ষণ সাইকেল চালানোর পর পৌঁছলাম ভূতার মোড়। কোথাও সাইনবোর্ড নেই। কিন্তু ভূতার মোড়ের ল্যান্ডমার্ক, রাস্তার বাঁদিকে একটা ল্যম্পপোস্ট হেলে কোনওভাবে দাঁড়িয়ে আছে । তার পাশে ভাঙাচোরা একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কাৎ হয়ে। এই গাড়িতেই আগের দিন আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, গাড়িতে পোড়ার টাটকা দাগ। বেশিরভাগটাই পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। পুলিশের পোড়া গাড়ির সামনে সাইকেল থামাতেই লোকজন ঘিরে ধরলেন। একটু দূর থেকে ভেসে আসছে বক্তৃতার আওয়াজ। এর মধ্যেই আবার জনসভা শুরু হয়ে গিয়েছে! না, ৫০-৬০ মিটার দূরে একটা গাছে মাইক বাঁধা। বক্তৃতার ক্যাসেট বাজছে।

‘কোনওভাবে সরকার জমি নিতে পারবে না, আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে। জান আর মান থাকতে জমি দেবে না নন্দীগ্রামের কৃষক……,’ উত্তেজিত গলায় বক্তৃতা হচ্ছে। পরে আর একটু এগিয়ে দেখেছিলাম, একটা তিন চাকার সাইকেল ভ্যানে ডিভিডি প্লেয়ার। নানারকম তার গোঁজা। ১৮-২০ বছরের চার-পাঁচটা ছেলে সেই ভ্যানে বসে তাতে সিডি চালাচ্ছে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কার বক্তৃতা?’ ‘সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী’, ছেলেগুলোর উত্তরে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী সম্পর্কে একটা অগাধ বিশ্বাস এবং সম্ভ্রম আছে।
ভূতার মোড়ে সাইকেল থেকে নেমে উজ্জ্বলকে বললাম, পোড়া গাড়ির ছবি নিতে। উজ্জ্বল ছবি তুলছে, আর আমি পাশে দাঁড়িয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলছি। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটা পিটুসি দেব। সবে মাত্র বলেছি, ‘আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি গড়চক্রবেড়িয়ার ভূতার মোড়ে। এখানেই গতকাল গ্রামবাসীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়……..,’ সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন রে-রে করে উঠলেন।
‘কী বলছেন উল্টোপাল্টা, কেউ পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়নি। পুলিশ গুলি চালিয়ে পালাচ্ছিল, সেই সময় গাড়ি ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা মারে। তাতে ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে গাড়ির ওপর পড়ে আগুন ধরে গিয়েছে। এই জন্যেই মিডিয়ার লোককে আসতে দিতে নেই। ইচ্ছে করে উল্টোপাল্টা খবর করে।’
বাধ্য হয়েই পিটুসি বন্ধ করতে হল। আবার ক্যামেরার সামনে রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘পুলিশের অভিযোগ, তাদের গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে গ্রামবাসীদের দাবি, আগুন ধরানো হয়নি। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে আগুন ধরে গিয়েছে।’ অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ দুটোই সমান গুরুত্ব দিয়ে বললাম। এবারও আগের মতোই মন দিয়ে আমার কথা শুনলেন ওঁরা। একশো শতাংশ মনমতো না হলেও, এতে ওঁদের অনুমোদন আছে। তার মধ্যে কয়েকজন বললেন, ‘পুলিশ মিথ্যে কথা বলছে। যা সত্যি ঘটনা তাই খবর করুন।’ এরপর রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেলেন কালীচরণপুর ১০ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে। যেখানে আগের দিন গণ্ডগোলের সূত্রপাত। যেতে যেতে সবারই এক কথা, ‘এখানে কিন্ত সিঙ্গুরের মতো জোর করে জমি নেওয়া যাবে না। আমরা কেউ জমি দেব না। মরে গেলেও না।’
কয়েকজন বললেন, ‘আমরা নন্দীগ্রামে পুলিশকে ঢুকতেই দেব না। আবার পুলিশ এলে একই জিনিস হবে।’ সেখানে কাজ মোটামুটি শেষ করে দুপুর নাগাদ সাইকেলে উঠে রওনা দিলাম চৌরঙ্গির দিকে। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম। ওখানে ওবি ভ্যান রেখে এসেছি। ছবি, খবর পাঠাতে হবে। ৪ তারিখ অনেক রাতে কলকাতায় ফিরে অফিসে এক সহকর্মীকে বলেছিলাম সারাদিনের ছবিগুলো যত্ন করে লাইব্রেরিতে রেখে দিতে। আশঙ্কা ছিল, যে কোনও দিন আবার উত্তপ্ত হবে নন্দীগ্রাম। মানুষের যা চেহারা, এই ঝামেলা সহজে মেটার নয়। পাশাপাশি ছিল সংশয়, এই জায়গাগুলোতে ভবিষ্যতে আর ঢুকতে পারব তো? কারণ, সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ, কলকাতায় সদ্য শেষ হওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা অনশন এবং প্রশাসনের শিল্পায়নের মরিয়া প্রয়াসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ তখন তীব্র আকার নিতে শুরু করেছে রাজ্যে। সংবাদমাধ্যম সম্পর্কেও দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মনোভাব একই রকম একচোখা। রাজ্যজুড়ে তখন সর্বত্র আমরা-ওরা বিভাজন শুরু হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম তার বাইরে তো নয়ই। বরং এই দুই রাজনৈতিক দলের বিদ্বষমূলক লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এর ভূমিকা।
৪ তারিখ সন্ধ্যার মুখে নন্দীগ্রাম থেকে কলকাতার দিকে রওনা দিয়েছি। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে মনে পড়ে গেল মাত্র কয়েক মাস আগের একটা ঘটনা।
আগের বছর ১৮ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর ছোট গাড়ি প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তার কিছুদিন বাদেই টাটা মোটরসের কয়েকজন অফিসার সিঙ্গুরে গিয়ে স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভের মুখে পড়েন।
তার কিছুদিন পর ২১ জুন, নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে সরকারের বিজয় সমাবেশ। অনুষ্ঠান শুরুর আগে এক মিনিটের ব্যবধানে মঞ্চে এলেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং জ্যোতি বসু। পাশাপাশি বসলেন। ছিমছাম অনুষ্ঠান শেষ হল ঘন্টা দেড়েক বাদে। আস্তে আস্তে সবাই মঞ্চ থেকে নামছেন। কিন্তু তখনও চেয়ারে বসে জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। জ্যোতি বসু  মুখটা একটু এগিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কিছু একটা বললেন। আমি সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখছি। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ঘাড় ঝুঁকিয়ে জ্যোতি বসুর কথা শুনলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই হাতের ইশারায় মঞ্চের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে ডেকে কিছু একটা বললেন। আমি এত দূরে, শুধু দেখা ছাড়া কিছু শোনা বা বোঝা অসম্ভব। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ইশারায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মঞ্চে উঠে এলেন জ্যোতি বসুর প্রাক্তন আপ্ত সহায়ক জয়কৃষ্ণ ঘোষ। এসে দাঁড়ালেন জ্যোতি বসুর সামনে। ঘাড় একটু ঝোঁকাতেই জ্যোতি বসু এবার কিছু বললেন জয়কৃষ্ণ ঘোষকে। কয়েক সেকেন্ড শুনেই জয়কৃষ্ণ ঘোষ মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন। ততক্ষণে বিশাল মঞ্চ ফাঁকা। পাশাপাশি শুধু বসে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং জ্যোতি বসু। ২-৩ মিনিট বাদে জয়কৃষ্ণ ঘোষ হুগলির নেতা এবং সিপিআইএম সাংসদ রূপচাঁদ পালকে মঞ্চে নিয়ে এলেন। রূপচাঁদ পাল মঞ্চে উঠে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং জ্যোতি বসুর মাঝখানে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়ালেন। দূর থেকে দেখছি, জ্যোতি বসু কিছু জিজ্ঞেস করছেন, রূপচাঁদ পাল জবাব  দিচ্ছেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শুনছেন। দু-তিন মিনিট চললো। তারপর রূপচাঁদ পাল সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। চেয়ার থেকে একসঙ্গে উঠে পড়লেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং জ্যোতি বসু। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে পুরো ঘটনাটা দেখলাম এবং কিছুই বুঝতে পারলাম না।
কেন সেদিন মঞ্চে  রূপচাঁদ পালকে ডেকেছিলেন জ্যোতি বসু? বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতে কী কথা হয়েছিল? সেদিন অফিসে ফিরে ফোন করি জ্যোতি বসুকে। জেনেছিলাম, হুগলির সাংসদের কাছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জানতে চেয়েছিলেন, সিঙ্গুর টাটার অফিসারদের, সরকারি লোকেদের ঘিরে গ্রামবাসীরা কেন বিক্ষোভ দেখাল? জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত বড় ঘটনা। তোমরা জানতে না? কৃষকসভার লোকেরা সব কী করছিল?  জবাবে রূপচাঁদ পাল বলেন, টাটা মোটরস এবং সরকারি অফিসাররা সেদিন সিঙ্গুরে যাবেন, তা তাঁরা জানতেন না। কৃষকসভা প্রস্তুত ছিল না। এরপর জ্যোতি বসু জানতে চান, সিঙ্গুরে আর কোনও সমস্যা আছে কিনা। রূপচাঁদ পাল প্রাক্তন এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে বলেন, সব মিটে গেছে। আর কোনও সমস্যা নেই।
এই যে রূপচাঁদ পাল বলেছিলেন, কৃষকসভা কিছুই জানত না, এটা একেবারেই নাপসন্দ ছিল জ্যোতি বসুর। তিনি সেকথা জানিয়েছিলেন পার্টিকেও, এবং প্রকাশ্যেই। প্রশ্ন তুলেছিলেন, সিঙ্গুরের ঘটনা কৃষকসভা জানতো না কেন?
সিপিআইএমের আর দু’জন প্রথম সারির নেতা এবং মন্ত্রীও মুখ খুলেছিলেন জমি নিয়ে। একজন রেজ্জাক মোল্লা। তাড়াহুড়ো করে সরকারের জমি নেওয়ার প্রচেষ্টার প্রতিবাদ করে প্রকাশ্যেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন রেজ্জাক মোল্লা। মহাকরণে দফতরে বসেও প্রকাশ্যে একাধিকবার জমি ইস্যু নিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু সরকারে থাকার সময়ে রেজ্জাক মোল্লাকে অবজ্ঞা এবং বিরোধী আসনে বসে তাঁকে বহিষ্কার করে সিপিআইএম।
অন্যজন অসীম দাশগুপ্ত। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী। কোনওদিন কৃষক আন্দোলন করেননি। কিন্তু বহু দেশের নানান অর্থনৈতিক উত্থান-পতন, পরিবর্তনের খোঁজ রাখা এবং সহজেই কারও কথায় প্রভাবিত না হয়ে পড়ার যোগ্যতাসম্পন্ন অসীম দাশগুপ্ত বুঝেছিলেন, জমি নীতি নিয়ে একটা বড়সড় গোলমালের দিকে এগোচ্ছে পার্টি। প্রকাশ্যে একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না। দু’একবার রাজ্য কমিটির মিটিংয়ে বিরোধিতা করেছিলেন দলের একরোখা জমি অধিগ্রহণ নীতির। বলেছিলেন, তাড়াহুড়ো করে এভাবে জমি নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। সিঙ্গুর সমস্যা তখনও জট পাকিয়ে যায়নি। কিন্তু সেদিন নন্দীগ্রাম থেকে ফেরার পথে রেজ্জাক মোল্লা বা অসীম দাশগুপ্ত নন, আমাকে ভাবাচ্ছিল জ্যোতি বসুর সেই প্রশ্ন। কৃষকসভা কেন জানতো না? ভাবছিলাম, নন্দীগ্রামে কৃষকসভা সব জানে তো? প্রথমদিন নন্দীগ্রামের মানুষের চেহারা, শরীরের ভাষা কিন্তু ঠিক ভালো লাগল না!

 

৬ জানুয়ারি, ২০০৭ 

৩ জানুয়ারি দুপুরের পর থেকে সিপিআইএমের বধ্যভূমি হয়ে উঠতে শুরু করল নন্দীগ্রাম। যা মারাত্মক আকার নেয় ঠিক তিন দিন পর। ৬ জানুয়ারি। নন্দীগ্রামের ঠিক পাশেই দক্ষিণ দিকে খেজুরি। নন্দীগ্রাম আর খেজুরির মাঝে তালপাটি খাল। খেজুরি সিপিআইএমের শক্ত ঘাঁটি। বলা যেতে পারে, পশ্চিম মেদিনীপুরে যেমন কেশপুর-গড়বেতা, হুগলিতে যেমন আরামবাগ-খানাকুল-গোঘাট, পূর্ব মেদিনীপুরে তেমনই খেজুরি। সিপিআইএমের চূড়ান্ত আধিপত্য। জানুয়ারির ৩ তারিখে গণ্ডগোলের পরই একদিকে সিপিআইএম, অন্যদিকে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি, আড়াআড়ি এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন নন্দীগ্রামের মানুষ। নন্দীগ্রামের আন্দোলনকারীরা রাতে পাহারা দিতে শুরু করেন। অন্যদিকে, ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির জমি রক্ষার আন্দোলনকে শুরুতেই বিনাশ করতে খেজুরির দিকে অস্ত্রে শান দেয় সিপিআইএমও।
৪ জানুয়ারি সারাদিন নন্দীগ্রামে ঘুরে যে আশঙ্কা নিয়ে রাতে কলকাতায় ফিরেছিলাম, তা সত্যি হল দু’দিন বাদেই। আবার নন্দীগ্রাম যেতে হল ৭ তারিখ সকালে। সেদিন রবিবার। ভোররাতে কলকাতায় খবর এসে পৌঁছল, গুলি চলেছে নন্দীগ্রামে। জখম বহু। প্রথমে খবর এসেছিল দু’ জনের মৃত্যুর। এবার আমার সঙ্গী ক্যামেরাম্যান ভগীরথ শর্মা। নন্দীগ্রাম পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল সাড়ে ১০ টা-১১টা বাজলো। তিন দিনের মধ্যে লোকের মুখ-চোখ পালটে গিয়েছে। সেই সঙ্গে ঘটেছে আরও একটা জিনিস, বাছাই করা নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে নন্দীগ্রামের ১ নম্বর ব্লকে। ৪ তারিখই কিছু সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী এবং ১ নম্বর ব্লকের বহু মানুষের ক্ষোভ দেখেছিলাম, তা বহু গুণ বেড়ে গিয়েছে এই তিন দিনের মধ্যে। নন্দীগ্রামের আন্দোলনকারীদের ধারণা হয়েছিল, কিছু সংবাদমাধ্যম তাদের বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, কয়েকটি সংবাদপত্র এবং বৈদ্যুতিন চ্যানেল সিঙ্গুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমি আন্দোলন এবং অনশনের বিরোধিতা করছে। এবং শিল্পায়নের পক্ষে সাওয়াল করছে লাগাতার। ঘটনাচক্রে নন্দীগ্রামের আন্দোলনকারীদের নিশানায় এক নম্বরে আনন্দবাজার গোষ্ঠী। এবং আমি স্টার আনন্দর প্রতিনিধি।
৭ জানুয়ারি, ২০০৭ এবং তার পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা শুরু করার আগে নন্দীগ্রামের ভৌগোলিক ছবিটা একটু বলে নেওয়া জরুরি। কলকাতা থেকে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গেলে ৭০-৭২ কিলোমিটার পর কোলাঘাট। কোলাঘাট থেকে এই জাতীয় সড়ক সোজা চলে যাচ্ছে পশ্চিম মেদিনীপুর আর বাঁদিকে ঘুরে গেলে মেচেদা, তমলুক, নন্দকুমার হয়ে সোজা হলদিয়া। এই নন্দকুমার মোড় থেকে দিঘা যাওয়ার রাস্তায় নরঘাট পেরিয়ে মগরাজপুর। তার থেকে আরও একটু এগোলে চণ্ডিপুর মোড়। সেই মোড় থেকে পূর্ব দিকে ঘুরলেই নন্দীগ্রাম শুরু। প্রথমে নন্দীগ্রামর দু’নম্বর ব্লক। ২০-২২ কিলোমিটার গেলে নন্দীগ্রাম বাজার। তারপরেই থানা। এই বাজার থেকেই শুরু হচ্ছে নন্দীগ্রামের ১ নম্বর ব্লক। নন্দীগ্রাম বাজার পর্যন্ত দু’ নম্বর ব্লকের হাঁসচড়া, রেয়াপাড়া সহ একটা বড় এলাকা তখন সিপিআইএমের দখলে। সেখানে আন্দোলন এসে পৌঁছায়নি। অন্যদিকে, থানা পার করে পূর্ব দিকে এগোলেই চৌরঙ্গি। সেখান থেকে আরও পূর্ব দিকে গেলে হাজারাকাটা হয়ে একদিকে কেন্দেমারি ঘাট, অন্যদিকে গড়চক্রবেড়িয়া হয়ে সোনাচূড়া। আন্দোলনের আঁতুরঘর। হাজরাকাটা থেকে আর একটা রাস্তা দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে আমগেছিয়া, মহেশপুর হয়ে তেখালি পর্যন্ত। বাজার এবং থানার পর এই পুরো এলাকাটাই নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লক। এই ১নম্বর ব্লকের পূর্ব দিক বরাবর হলদি নদী এবং দক্ষিণ দিকে তালপাটি খাল, যা পেরোলেই খেজুরি। ৩ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু হয়েছিল গড়চক্রবেড়িয়ার কালীচরণপুর এলাকায়। যা মূহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে কয়েক বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এবং জানুয়ারি মাস শেষ হওয়ার আগেই নন্দীগ্রামের ১ নম্বর ব্লকের প্রায় পুরোটাই ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির কজ্বায় চলে আসে।
৭ তারিখ পুরো নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লক দিয়ে যখন যাচ্ছি তখনও বুঝতে পারিনি পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। প্রথম বু্ঝলাম নন্দীগ্রাম বাজারের বেশ খানিকটা আগে, টেঙ্গুয়ার মোড়ে। একদল ছেলে গাড়ি থামালো। আমদের চ্যানেল তখন আন্দোলনকারীদের নিষিদ্ধ তালিকায় এক নম্বরে। গাড়িতে শুরু হল চড় থাপ্পড়। গাড়ি থেকে নামলেই বিপদ। কিছুক্ষণ চলল এই অবস্থা। গালিগালাজ, গাড়ি আটকে রাখা। গাড়িতে বসেই কোনওক্রমে বোঝালাম, সিপিআইএম যে আক্রমণ করেছে তারই খবর করতে এসেছি। তারপর ছাড়া পেয়ে এগোলাম। যত এগোচ্ছি, তত পরিস্থিতি খারপ হচ্ছে। জায়গায় জায়গায় ক্ষুব্ধ মানুষের জটলা। নন্দীগ্রাম বাজার থেকে থানা পর্যন্ত রাস্তা খুব সরু। গিজ গিজ করছে লোকজন। আবার গাড়ি থামিয়ে দিলেন কিছু লোক। আবার গাড়িতে চড়-ঘুষি। সেই সঙ্গে সিপিআইএমকে গালিগালাজ। অশ্রাব্য গালিগালাজ নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যমেকে। এভাবে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে এগোতে থাকলাম। থানা পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে বুঝতে পারলাম, গড়চক্রবেড়িয়া, সোনাচূড়া, ভাঙাবেড়া ব্রিজে যাওয়া অসম্ভব। প্রথমত রাস্তা কাটা। আগের দিনের মতো সাইকেল করে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া লোকজন আমাদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। সেইদিনও সকালে নন্দীগ্রাম যাওয়ার সময় শুভেন্দু অধিকারী ফোনে সাবধান করেছেন, ‘যাচ্ছ যাও, বুঝেসুঝে ঘোরাঘুরি কোরও। কাল রাতের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আমি কিন্তু দায়িত্ব নিতে পারব না।’

 

কী হয়েছে আগের পর্বে? পড়ুন: নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল #২ কাল নন্দীগ্রাম গিয়ে কী করবেন? জিজ্ঞেস করলেন লক্ষ্মণ শেঠ

 

ইতিমধ্যে গাড়িতে যেতে যেতে পরিচিত পুলিশ অফিসারকে ফোন করে খবর পেয়েছি, আগের রাতে খেজুরির দিক থেকে সিপিআইএম আক্রমণ করেছে। এই আক্রমণে ভোররাতে মৃত্যু হয়েছে তিন আন্দোলনকারীর। সকালে ১০টা-১১ টা নাগাদ আবার সেই অফিসারের থেকেই ফোনে খবর পেলাম, ভোরেই এই তিনজনের মৃত্যুর বীভৎস বদলা নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। ভাঙাবেড়া ব্রিজের কাছে নন্দীগ্রামের বাসিন্দা এবং সিপিআইএম সমর্থিত নির্দল পঞ্চায়েত সদস্য শঙ্কর সামন্তকে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে প্রকাশ্যে। আন্দোলনকারীরা শঙ্কর সামন্তকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে প্রথমে তরোয়াল দিয়ে নৃশংসভাবে কাটে। তারপর তাঁকে খড় দিয়ে বেঁধে তাতে কেরসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফোনে এক পুলিশ অফিসার জানান, ‘শঙ্কর সামন্তের পোড়া মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে রয়েছে, কিন্তু তা তখনও উদ্ধার করা যায়নি।’
সিপিআইএম নেতার নৃশংস হত্যার খবর পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিই, এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় যাওয়া ঠিক হবে না। ওই অফিসার পরামর্শ দেন, ‘ওদিকে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না, পরিস্থিতির পুরো হাতের বাইরে। আন্দোলনকারীরা যা ইচ্ছে করে ফেলতে পারে।’ গাড়ি ঘুরিয়ে ঢুকে পড়লাম নন্দীগ্রাম থানায়। থানায় প্রচুর পুলিশ কর্মী এবং অফিসার এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছেন। ডিআইজি, আইজি এসেছেন। তখন ডিআইজি মেদিনীপুর রেঞ্জ এন রমেশবাবু, আইজি পশ্চিমাঞ্চল অরুণ গুপ্তা।
শঙ্কর সামন্তকে দিনের আলোয় প্রকাশ্যে এমন নৃশংসভাবে কেটে এবং পুড়িয়ে হত্যা প্রচণ্ড আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করল গোটা নন্দীগ্রামের সিপিআইএম নেতা-কর্মীদের মধ্যে। ১ নম্বর ব্লকের সক্রিয় সিপিআইএম নেতারা ঘর ছাড়তে শুরু করলেন। তাঁদের সঙ্গে ঘর ছাড়েন এমন কিছু সিপিআইএম সদস্য এবং কর্মী, যাঁদের কাছে নিজের ও পরিবারের জীবন এবং সম্পত্তি রক্ষার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলীয় আনুগত্য। দলের প্রতি তাঁদের নিষ্ঠা, ভালোবাসা এবং অটল বিশ্বাস কোনওভাবেই খাটো করে দেখার বিষয় নয়। তাঁরাই সিপিআইএমের সেই পদাতিক বাহিনী, যাঁরা সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও দলের পতাকা তুলে ধরেছিলেন। আন্দোলনকারীদের ভয়ে এঁরা সকলেই ঘরছাড়া হয়ে প্রথমে আশ্রয় নিলেন তেখালি ব্রিজের কাছে। অস্থায়ী ক্যাম্প করে থাকতে শুরু করেন। জানুয়ারির গোড়ায় ঠান্ডা, মাথার ওপরে খোলা আকাশ। কয়েক’শো পুরষ, মহিলা বাচ্চা নিয়ে ঘরছাড়া হয়ে গেলেন ৭ তারিখ সকালে।
সেইদিন বিকেলে থানায় বসে আছি, খবর পেলাম, শঙ্কর সামন্তের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। থানার বসে আইজি, ডিআইজি মিটিং করছেন, বারবার খবর দিচ্ছেন কলকাতায়। থানার সামনে একটা বড়ো জায়গা, সেখানে দাঁড়িয়ে আছি। বাইরে লোহার গেট বন্ধ। গেটের বাইরে থেকে কয়েক’শো মানুষ টানা পুলিশ এবং আমার মতো কয়েকজন সাংবাদিককে গালিগালাজ করছে। বুঝতে পারছি, একটা ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে নন্দীগ্রাম। থানা থেকে বেরবো কীভাবে, সন্ধে থেকে শুরু হল সেই চিন্তা। স্থানীয় মানুষজন এবং আন্দোলনকারীরা ততক্ষণে চিহ্নিত করে নিয়েছেন আমি এবং আমার মতো আরও তিন-চার জন সাংবাদিককে, যাঁদের সংবাদমাধ্যমের ওপর তাঁদের প্রচণ্ড রাগ। তার মধ্যে রয়েছেন ২৪ ঘণ্টার বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, গণশক্তির চন্দন দাস এবং আনন্দবাজার পত্রিকার স্বপন সরকার। সন্ধে সাড়ে ৭টা-৮টা নাগাদ ডিআইজি বেরোলেন থানা থেকে। দিঘা ফিরে যাবেন। রমেশবাবুকে বললাম, তাঁর সঙ্গে আমরা বেরবো। গাড়ির প্রেস স্টিকার খুলে ডিআইজির গাড়ির কনভয়ের সঙ্গে আমরাও বেরিয়ে গেলাম। সামনে-পিছনে পুলিশের গাড়ি, এভাবে গেলাম চণ্ডিপুর মোড় পর্যন্ত। সেখান থেকে ডিআইজির কনভয় বাঁদিকে ঘুরে চলে গেল দিঘার দিকে, আমরা ডানদিকে। রাতে থাকলাম তমলুকে।
৮ জানুয়ারি, ২০০৭। সকাল থেকে নন্দীগ্রামে শুরু হল আর এক ভয়ানক পরিস্থিতি। কোনও আন্দোলন কত সর্বাত্মক, একই সঙ্গে হিংস্র এবং কতটা রাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে, যে কোনও মাপকাঠিতেই নজির গড়তে পারে নন্দীগ্রাম। ৮ তারিখ সকালে পুলিশ বয়কটের ডাক দিলেন আন্দোলনকারীরা। স্বাধীনতা আন্দোলনে হয়েছে জানি, কিন্ত কোনও আন্দোলনের শুরুতেই এমন দাবি তার আগে কোনও দিন শুনিনি। পুলিশ বয়কট, মানে সরকার বয়কট। নন্দীগ্রামে তো তখন সরকার মানে পুলিশই। পঞ্চায়েত, ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিস সব বন্ধ। থানার আশপাশের এলাকায় কোনও দোকানদার পুলিশকে কিছু জিনিস বিক্রি করবেন না, ঘোষণা করেছে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি। কোনও হোটলে পুলিশকে খেতে দিচ্ছে না, চা দিচ্ছে না। এমনকী সিগারেটও বিক্রি বন্ধ করে দিল পুলিশকে। নন্দীগ্রাম থানার পুলিশ এবং সেখানে ডিউটি করতে যাওয়া অফিসারদের অসহনীয় পরিস্থিতি। ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে নন্দীগ্রাম থানার অফিসারদের দু’তিন ঘণ্টা লাগল। কোনও হোটেলে খাবার না দিলে এত পুলিশ কর্মী, অফিসার খাবেন কী?

থানা থেকে খবর গেল তমলুকে সিনিয়র অফিসারদের কাছে। ঘণ্টা তিনেক বাদে তমলুক থেকে পুলিশ অফিসাররা বড় ভ্যানে বস্তা করে চাল, ডাল পাঠালেন নন্দীগ্রাম থানায়। সঙ্গে প্রচুর সব্জি। কতদিন এই অবস্থা চলবে কেউ জানেন না। নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লকে যাও বা কিছু মানুষের সমর্থন তখনও শাসক দলের সঙ্গে ছিল, ৬ তারিখ মাঝরাত থেকে ৭ তারিখ ভোর পর্যন্ত খেজুরির দিক থেকে চলা সিপিআইএমের গুলিতে তিনজনের মৃত্যুর পর তাও পুরোপুরি চলে গেল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির দিকে। ১ নম্বর ব্লকজুড়ে তখন কার্যত তাণ্ডব চালাচ্ছে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি। কোথাও কোনও প্রশাসন নেই। প্রশাসন তখন থানায় বন্দি। ব্যস্ত ভাত, ডাল তরকারি রান্নায়। থানার পিছনে শুরু হল রান্না। বড়ো কড়াইতে ডাল হচ্ছে। বিয়ে বাড়ির রান্নার হাড়িতে ভাত বসল দুপুর একটায়। দুপুর তিনটে নাগাদ শুরু হল খাওয়া। সঙ্গী ভগীরথকে সঙ্গে  নিয়ে আমিও পুলিশের সঙ্গে খেতে বসে গেলাম থানার পাশে অস্থায়ী রান্নাঘর সংলগ্ন ত্রিপল ঢাকা খাবার জায়গায়। ৮ তারিখ থেকে বেশ কয়েক দিন  দুপুরে আমি, ভগীরথ, সহকর্মী সাংবাদিক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য থানার পাশে পুলিশের রান্না করা ভাত, ডাল ও তরকারি খেয়েছিলাম। কারণ, দুপুরে খাওয়ার জন্য থানার বাইরে বেরোতে পারতাম না।

সেই দিন সকালে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক নন্দীগ্রামে পৌঁছানোর নতুন উপায় বের করলাম। কয়েকজন মানে, যাঁরা ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির ভাষায়, পুলিশ এবং সিপিআইএমের মতোই তাদের জমি আন্দোলনের বিরোধী। বারবার দেখেছি, নন্দীগ্রামে বিরোধী বলে কিছু হয় না। ওখানে বিরোধী মানেই শত্রু। সেদিন সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছিলাম চণ্ডিপুরের মোড়ে। সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ ডিআইজি রমেশবাবুর কনভয় এল। তাঁর গাড়ির পিছন পিছন  গেলাম থানায়। থানা চত্বরে বসে আছি। হাঁটছি আর ভাবছি, কীভাবে কোন পথে ঢোকা যায় নন্দীগ্রামের আন্দোলস্থলে। আগের দিনের মতোই থানার বাইরে কয়েক’শো মানুষের জটলা। সুযোগ পেলেই আমাদের চ্যানেল এবং আরও দু’একটা সংবাদমাধ্যমের নাম করে গালিগালাজ করছে। কিছুক্ষণ বাদে দেখি, থানার ছাদে বসে মিটিং করছেন আইজি, ডিআইজি। থানা চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছি নানান রকম খবর আসছে। অধিকাংশই গুজব। নন্দীগ্রামের এও এক বিচিত্র বৈশিষ্ট। কেউ একটা বলল, কাক কান নিয়ে গেছে, ওমনি এক হাজার মানুষ ছুটল কাকের পেছনে। দৌড় যখন থামল তখন জমায়েতটা দাঁড়িয়েছে তিন হাজারে, বোম পড়ে গেছে ৪০ টা, গুলি চালানো হয়ে গেছে ১০ রাউন্ড। বাড়ি ভাঙা হয়েছে ২৫ টা। জখম ১০। তারপর সবশেষে বোঝা গেল, কে যেন একটা শুনেছিল, কিছু একটা হয়েছে!

দুপুরে সোজা উঠে গেলাম নন্দীগ্রাম থানার ছাদে আইজি অরুণ গুপ্তার কাছে। অনেকদিনের পরিচিত। থানার ছাদে বসে আছেন। বললাম, ‘নন্দীগ্রামে ঢুকব, আপনি ব্যবস্থা করে দিন।’ পুলিশ ঢুকতে পারছে না সব জায়গায়, কয়েকজন সাংবাদিকও ঢুকতে পারছেন না। কিন্তু রাস্তা কাটা নেই, এমন কিছু কিছু জায়গায় পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে। বললাম, ‘আমি থানা থেকে বেরলেই আন্দোলনকারীরা আক্রমণ করবে। কিন্তু এত দূর থেকে এসে থানায় বসে থাকব? কয়েকটা জায়গায় আপনাদের গাড়ি তো যাতায়াত করছে, আমি তাতে করে যাব।’ কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর আইজি ঢেকে পাঠালেন সেই জেলার এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরীকে। তাঁকে বলে দিলেন, তাঁর গাড়ি করে আমাকে নন্দীগ্রামের ভিতরে নিয়ে যেতে। কিন্ত কেউ যেন জানতে না পারে। সবার চোখ এড়িয়ে আমি জামার ভেতরে মাইক আর ভগীরথ জামার ভেতরে ক্যামেরা নিয়ে দুজনে বসলাম অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে। আমাদের দু’দিকে দুজন কনস্টেবল বসলেন, যাতে চট করে আমাদের কেউ দেখতে না পায় গাড়ির সামনে বন্দুক নিয়ে আরেকজন কনস্টেবল। আইজি বারবার বলে দিলেন, কেউ যেন জানতে না পারে, আর তাড়াতাড়ি ফিরতে। কিছু একটা হয়ে গেলে সর্বনাশ হবে। কথা দিলাম, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরব থানায়।

চলবে

(১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে নন্দীগ্রাম আসলে যা ঘটেছিল। প্রতি পর্বে লাল রং দিয়ে আগের পর্বের লিঙ্ক দেওয়া থাকছে)

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us