New National Education Policy: গুরুত্বহীন মাধ্যমিক! কী আছে নতুন জাতীয় শিক্ষা নীতিতে?

৩৪ বছর পর বদলে গেল প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। জাতীয় শিক্ষানীতির এই আমূল বদলের কথা বুধবার সাংবাদিক বৈঠক করে জানানো হয়েছে। কেন্দ্রের নয়া নীতিতে শিক্ষার অধিকারের আওতায় আনা হয়েছে ৩ থেকে ১৮ বছরের শিক্ষার্থীদের। ব্যাপক বদল আনা হয়েছে পরীক্ষা ব্যবস্থায়।

পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের নাম বদলে গিয়েছে। তার বদলে ফিরেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক। তাছাড়া New National Education Policy তেও সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এসেছে প্রচুর রদবদল। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, কী কী বদল?

 

National Education Policy 2020

নতুন শিক্ষানীতির খসড়া প্রস্তুতির সময় ইসরোর প্রাক্তন প্রধান কে কস্তুরিরঙ্গনের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিল কেন্দ্র। তারপর কেটে গিয়েছে 3 দশকেরও বেশি সময়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে জানান, গত ৩৪ বছরে শিক্ষানীতিতে পরিবর্তন হয়নি। আশা করছি, দেশের মানুষ এবং বিশ্বব্যাপী শিক্ষাবিদ এই নয়া শিক্ষানীতির প্রশংসা করবেন।

 

নয়া শিক্ষানীতিতে যে যে পরিবর্তন আসছে (Structural Changes in New National Education Policy)

new national education policy

 

আগে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ছিল ১০+২ ভিত্তিতে। সেই কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে New Nation Education Policy -তে তা করা হয়েছে ৫ + ৩ + ৩ + ৪। অর্থাৎ, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আরও তিন বছর যোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তিন বছর প্রাক প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা। প্রি-প্রাইমারি স্তরের জন্য সারা দেশে একটি অ্যাকটিভিটি ও লার্নিং বেসড শিক্ষানীতি তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে। তার জন্য জাতীয় শিক্ষা মিশন গঠিত হবে। বোর্ড পরীক্ষার গুরুত্ব কমানোর কথা বলা হয়েছে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে।

স্কুল শিক্ষায় বড় পরিবর্তন আসছে বর্তমানের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পাঠদানের পদ্ধতিতে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় দশম শ্রেণি পাশ করার পর বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য এই তিন বিভাগে ভাগ হয়ে যায় পড়াশোনার বিষয়। কিন্তু নতুন শিক্ষা নীতিতে এই বিভাগগুলিই উঠে যাবে।

উচ্চশিক্ষাতে যে বড়সড় রদবদলের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম মাল্টিপল এন্ট্রি অ্যান্ড এক্সিট সিস্টেম চালু করা। অর্থাৎ, শিক্ষাবর্ষের মাঝে কোনও পড়ুয়া কোনও কারণে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিলে পরে আবার সেখান থেকেই শুরু করতে পারবেন। একইভাবে স্নাতকোত্তর ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। সেখানে কেউ গবেষণা করতে চাইলে ৪ বছরের ডিগ্রি কোর্স করতে পারেন। আবার ৩ বছর স্নাতক স্তরে এবং এক বছর স্নাতকোত্তর পড়ার পরে সরাসরি পিএইচডি করতে পারবেন।

আর এম ফিল (M.phil) করার প্রয়োজন নেই। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও স্কুলের মতো মাল্টি ডিসিপ্লিনারি এডুকেশন চালু হচ্ছে। তাতে ‘মেজর ও মাইনর’ ব্যবস্থা থাকবে। যেমন, মূল বিষয়ের সহযোগী বিষয়গুলির পাশাপাশি সঙ্গীত, চিত্রকলার মতো বিষয়ও রাখতে পারবেন শিক্ষার্থীরা। আবার আমেরিকার ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের ধাঁচে গঠন করা হচ্ছে ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন। গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় অনুদানের জন্য এই ফাউন্ডেশন কাজ করবে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে ভারতের এই সংস্থার পার্থক্য হল বিজ্ঞানের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানও এই ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতিতে এর আগে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে তীব্র আপত্তি উঠেছিল। বুধবার মন্ত্রকের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, নয়া এই জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। সবকিছু পর্যালোচনার পরেই তৈরি হয়েছে শিক্ষা নীতির খসড়া। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্কুলশিক্ষায় শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে বদল আসছে। উচ্চশিক্ষায় মাল্টিপল এন্ট্রি–এক্সিট ব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষাকে একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতায় আনা, ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন গঠন করা হচ্ছে।

 

Higher Studies Under New National Education Policy 2020

structural changes in new national education policy

 

দেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে যে একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে, সেগুলিকে এক ছাতার তলায় আনতে একটি নতুন কমিশন বা পর্ষদ গঠন করার কথা বলা হয়েছে নয়া শিক্ষানীতিতে। এছাড়া কলেজগুলিকে আরও স্বায়ত্ত্বশাসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কলেজের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে এই স্বায়ত্ত্বশাসন দেওয়া হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে।

নতুন এই education policy -তে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সেরা অন্তত ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে শাখা খোলার অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র। অন্যান্য স্বায়ত্ত্বশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিশেষ সুযোগ পাওয়া যাবে। উচ্চশিক্ষার উন্নতিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েহয়েছ

 

নয়া শিক্ষানীতিতে থাকছে না ইউজিসি (UGC), এআইসিটিই (AICTE)

national education policy 2020

 

বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে ইউজিসি, এআইসিটিই এবং ন্যাশনাল কনসার্ন ফর টিচার এডুকেশন। নয়া নীতিতে একটি মাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকবে। তার নাম উচ্চ শিক্ষা কাউন্সিল (HECI)। কলেজগুলির ক্ষেত্রে আরও স্বায়ত্ত্বশাসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কলেজের গ্রেড অনুযায়ী সেই স্বায়ত্ত্বশাসন বা (Autonomous) ট্যাগ দেওয়া হবে। ফিজ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা রয়েছে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায়। পুরো ব্যবস্থা চলবে ‘অনলাইন সেল্ফ ডিসক্লোজার পদ্ধতিতে।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষায় কী কী বদল এল (Points on New National Education Policy)

১) প্রথমেই যে বিষয়টি বলতে হয় তা হল, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের নাম বদলে হল শিক্ষামন্ত্রক। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে এই নামেই পরিচিত ছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক। পরে ১৯৮৫ সালে তা বদল হয়।

২) নতুন শিক্ষানীতিতে সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার। এর আওতায় আনা হয়েছে ৩ থেকে ১৮ বছরের পড়ুয়াদের।

৩) নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে দশম বা দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পড়ুয়াদের এখন হাতেকলমে শিক্ষায় জোর দিতে হবে। পড়ুয়াদের উপর থেকে চাপ কমানোর জন্য দু’ভাবে পরীক্ষা নেওয়া হবে- অবজেকটিভ (ছোটো প্রশ্ন) এবং ডেসক্রিপটিক (ব্যাখ্যামূলক)। বছরে দু’বার বোর্ড পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে।

৪) পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় জোর। প্রতিবছরের বদলে তৃতীয়, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব।

৫) ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে বৃত্তিমূলক শিক্ষা। দশম শ্রেণির পর কলা বিভাগ, বিজ্ঞান বিভাগ বা বাণিজ্য বিভাগের তফাত উঠে যাচ্ছে। যেমন, কেউ পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়লেও তার পাশে থাকতে পারে সঙ্গীত। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন নিয়ে পড়লেও থাকবে ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়ার সুযোগ।

৬) New National Education Policy অনুসারে, মার্কশিটে শুধুমাত্র নম্বর এবং পরিসংখ্যানের পরিবর্তে এবার প্রাধান্য পাবে পড়ুয়ার দক্ষতা এবং যোগ্যতার বিষয়টি। কারও উপর জোর করে কোনও ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হবে না। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষা ও আঞ্চলিক ভাষায় শিক্ষা ঐচ্ছিক হিসেবে ধরা হবে।

৭) শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের প্রয়োগিক দিকের উপরে ভিত্তি করে বোর্ডের পরীক্ষা নেওয়া হবে। দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ডের পরীক্ষায় ৮ টি সেমেস্টারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ৫+৩+৩+৪ ভাগে ১৫ বছরের স্কুল স্তরে পড়াশোনা। এর মধ্যে তিন বছর প্রি-স্কুল পড়াশোনার সুপারিশ করা হয়েছে।

৮) স্নাতক স্তরে অনার্স কোর্স ৪ বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে প্রতি বছরের শেষে পড়ুয়ারা পাবেন সার্টিফিকেট। কোর্স শুরুর ১২ মাসের মধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে পড়ুয়ারা পাবেন ভোকেশনাল কোর্সের সার্টিফিকেট। দু’বছর বা ২৪ মাস পর ছাড়লে মিলবে ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট। চার বছরের কোর্স করলেই পাওয়া যাবে ডিগ্রি কোর্সের সার্টিফিকেট। ফলে চাকরির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে বলে দাবি। এবার থেকে M.Phil কোর্স উঠে যাচ্ছে।

২০৩৫ সালের মধ্যে ‘গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিয়ো’ ৫০ শতাংশ করার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র। যাঁরা মাঝপথে কোনও স্নাতক বা স্নাতকোত্তর কোর্সে যোগ দিতে বা ছেড়ে দিতে চান, সেজন্য একাধিক সুবিধা থাকছে। তিন বা চার বছরের স্নাতক স্তরে এবং এক বা দু’বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স চলবে। কোর্সে যোগ দেওয়া বা ছেড়ে দেওয়ার সময় ‘অ্যাকাডেমিক ব্যাঙ্ক অফ ক্রেডিট’ এর মাধ্যমে ওই পড়ুয়াদের ক্রেডিট দেওয়া হবে। পাঁচ বছরের ইন্টিগ্রেটেড স্নাতক বা স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হবে।

৯) ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা হবে ৪ বছরের ইন্টিগ্রেটেড বি.এড ডিগ্রি। শিক্ষকদের জন্য একটি নয়া এবং বিস্তারিত ‘ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ফর টিচারস এডুকেশন’ (এনসিএফটিই ২০২১) তৈরি করবে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচারস এডুকেশন (এনসিটিই)। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (এনসিইআরটি) সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সেই নয়া কাঠামো তৈরি হবে।

১০) আইন বা Law এবং মেডিক্যাল ছাড়া বাকি সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাতার তলায় আসতে চলেছে।

১১) সরকারি এবং বেসরকারি, সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন রেগুলেশন চালু হবে।

১২) যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা ক্ষেত্রে জিডিপির ৬ শতাংশ লগ্নি করবে সরকার।

১৩) আঞ্চলিক ভাষায় অনলাইন কোর্সে জোর।

১৪) সবার কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার উপর বিশেষ জোর। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দেশে ১০০ শতাংশ স্বাক্ষরতার লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে কেন্দ্র।

 

বিতর্ক

education for everyone

 

ইতিমধ্যে কেন্দ্রের New National Education Policy 2020 -এর বিরোধিতা করেছে বামেরা। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির অভিযোগ, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে ধ্বংস করে দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। সংসদকে পাশ কাটিয়ে, রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে আলোচনায় না গিয়ে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তাঁর আরও অভিযোগ, শিক্ষাকেও কেন্দ্রীভবন, সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভাগ করা হচ্ছে। শিক্ষার বাণিজ্যকরণ করা হচ্ছে। কেন্দ্রের নয়া শিক্ষানীতির তীব্র বিরোধিতা করেছে কেরলের বাম সরকারও।

শিক্ষাবিদদের মধ্যেও নয়া শিক্ষা নীতি নিয়ে দুই ধরনের মত

Comments
Loading...