শিলিগুড়িতে প্রথম ধরা পড়েছিল নিপাহ ভাইরাস, এবারও সতর্ক থাকতে হবে পশ্চিমবঙ্গকে। কেরলে মৃত ১১

কেরলে ছড়াচ্ছে মারণ ভাইরাস নিপাহর আতঙ্ক। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে এই মারণ ভাইরাসের আক্রমণে। কিন্তু কেরলের আগেও দেশের মধ্যে প্রথম আমাদের এরাজ্যে পদার্পণ ঘটেছিল নিপাহর। ২০০১ সাল নাগাদ শিলিগুড়ির এক নার্সিংহোমে কিছু রোগীর মধ্যে ছড়িয়েছিল এই ভাইরাস। সে যাত্রায় কারওর মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও, গোটা বিশ্বে হিউম্যান টু হিউম্যান ট্রান্সমিশনের সেটাই ছিল প্রকাশ্যে আসা প্রথম ঘটনা।

খিঁচুনি, স্নায়ু বৈকল্য, প্রচণ্ড জ্বর, শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে কেউ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে। এমনকী দেখা যেতে পারে ফেটাল এনসেফ্যালাটিসের মতো লক্ষণও। সে ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্নায়ু বিকল হয়ে রোগী কোমায় চলে যেতে পারেন। মৃত্যুও ঘটতে পারে। সেই কারণেই এই ভাইরাস অত্যন্ত বিপজ্জনক।
নিপাহর সংক্রামণ ও মারণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি এবং এখনও পর্যন্ত যেহেতু এই ভাইরাসের কোনও প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি, তাই কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত। উপরিউক্ত লক্ষণ গুলি দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আইসিইউ’তে রেখে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করা প্রয়োজন। যেহেতু এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে নিঃশ্বাসের দ্বারা সংক্রামিত হয় তাই রোগীকে আলাদা করে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন। মুখে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। বহু বছর বাদে এই বিপজ্জনক ভাইরাসের পাদুর্ভাব যখন দেশে ঘটেছে, আমাদের রাজ্যেরও মানুষেরও সতর্ক থাকা উচিত সব সময়।
১৯৯৮-৯৯ সাল নাগাদ মালয়েশিয়া এবং ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়েছিল এই জটিল-মারণ ভাইরাস। মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০০ জনের মৃত্যুও ঘটেছিল এই ভাইরাসের আক্রমণে। সেখানে শূকরের দেহ থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছিল এই ভাইরাসটি। আবার বাংলাদেশে মানব শরীরে এই ভাইরাসটি প্রবেশ করেছিল কিছুটা অন্যভাবে। ‘ফ্রুট ব্যাট’ নামে এক শ্রেণীর বাদুড় আছে যাদের দেহে প্রথমে বাসা বাঁধে (প্রাইমারি হোস্ট) এই ভাইরাস। এই ধরনের ভাইরাস সাধারণত প্রাইমারি হোস্টদের কোনও ক্ষতি করে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ওই ফ্রুট ব্যাটের খাওয়া তাল গাছের রস কোনওভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। সেখান থেকেই পরে তা আরও ছড়িয়ে পরে। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও কোনওভাবে বাদুড়ের দেহ থেকে প্রথমে শূকরের দেহে প্রবেশ করেছিল এই ভাইরাস। পরে তা মানুষের দেহে যায়। মানুষ এবং পশু উভয়ের শরীরেই বাসা বাঁধতে পারে এই ভাইরাস। আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে এলে মানুষের দেহে এবং মানুষ থেকে অন্য মানুষের দেহে ছড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে এই ভাইরাসের। বাংলাদেশের মতো কোনও ফল বা তরলের মাধ্যমে অথবা মূলত বাতাসের মাধ্যমে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের দ্বারা সংক্রামিত হয় এই ভাইরাস।
তবে ভারত, বাংলাদেশ বা মালয়েশিয়ার মতো এশিয়ার মতো দেশগুলিতে নিপাহর প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে বলে এই নয় যে শুধুমাত্র এশিয়ার দেশগুলিতেই এই ভাইরাস আক্রমণ শানাবে। যেহেতু ফ্রুট ব্যাটের দেহ এই ভাইরাসের প্রাথমিক আশ্রয়দাতা (প্রাইমারি হোস্ট) তাই যেখানে যেখানে এই প্রজাতির বাদুর পাওয়া যায় সেখানেই নিপাহর আক্রমণের আশঙ্কা থেকে যায়। এশিয়ার মতো ঘন-জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মানুষ এবং পশুর একে অপরের সংস্পর্শে আসার সুযোগ বেশি, তাই এখানে বেশি ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস। হতেই পারে ব্রাজিলের কোনও অংশে ফ্রুট ব্যাটের দেহে বাসা বেঁধেছে নিপাহ, কিন্তু ঘন অরণ্যের কারণে সেখানে মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তুর পরস্পরের সংস্পর্শে আসার সম্ভবনা কম, তাই সেখানে এই ভাইরাস আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি।

(কথা বলেছেন শুভঙ্কর বড়ুয়া)

Comments
Loading...