একটা ভাইরাস, তার জেরে সারা বিশ্ব আজ গৃহবন্দি। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে দেশে চলছে লকডাউন। বন্ধ স্কুল, কলেজ, অফিস ও দোকান-পাট। স্তব্ধ অর্থনীতি, কার্যত যেন থমকেই গিয়েছে মানব সভ্যতা। প্রতিদিন কাজ থেকে ছাঁটাই হওয়ার খবর, লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা করোনা আক্রান্তের সংখ্যা, আর সোশ্যাল মিডিয়া এবং খবরের চ্যানেলে প্রতিদিন করোনা নিয়ে একের পর এক তথ্যে প্রবল উদ্বেগে গৃহবন্দি মানুষ। একদিকে যখন একে অন্যকে সচেতন করার কথা বলা হচ্ছে, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মানার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তখন মাস্ক হ্যান্ড স্যানিটাইজারের আকাল। বাড়ছে কালোবাজারি। ফলে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশনের সমস্যা বাড়ার আশঙ্কা বেশি।

একে করোনায় রক্ষা নেই, অ্যাংজাইটি হয়ে দাঁড়িয়েছে দোসর। এই অবস্থায় কীভাবে অ্যাংজাইটি (anxiety) থেকে মুক্তি পাবেন, কীভাবে মানসিকভাবে সুস্থ রাখবেন নিজেকে?

 

লকডাউন পরিস্থিতিতে অ্যাংজাইটি এড়ানোর টিপস (Tips for Anxiety Relief)

anxiety recovery tips

 

১) সারাদিন বাড়িতে থাকছেন। ওয়ার্ক ফ্রম হোম করেও বাড়তি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ বোলাচ্ছেন। টিভি চ্যানেল ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছেন নানারকম খবর। করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবর অবশ্যই রাখবেন। কিন্তু ভুয়ো খবরে কান না দিয়ে সঠিক খবর জানুন। নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের খবরে মন দিন।

২) অ্যাংজাইটিতে ভুগছেন কি না সে ব্যাপারে সচেতন হন। অতিমারির আবহে কর্মসংস্থান কমছে, মৃত্যু বাড়ছে, এইসব খবরে উদ্বেগ, উত্তেজনা বাড়ছে নাকি অন্যেরা ভয় পাচ্ছেন বলে আপনিও ভয় পাচ্ছেন, সেটা একবার মাথা ঠান্ডা করে বিবেচনা করুন। বুঝতে শিখুন এতে আপনার করণীয় কী কী আছে। অযথা আতঙ্কে ভুগবেন না।

৩) আপনি এবং পরিবারের অন্যেরা যদি নিয়মবিধি মেনে চলেন, বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোওয়া, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ও বাড়ির অন্যান্য জিনিসপত্র জীবাণুমুক্ত করা, একান্ত প্রয়োজন না হলে বাইরে না যাওয়া ইত্যাদি মেনে চলেন সেক্ষেত্রে কিন্তু ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। তাই অযথা মানসিক চাপ বাড়াবেন না, তবেই হবে recovery from anxiety.

৪) একান্তই বাইরে বেরতে হলে মুখে মাস্ক পরে তবেই যান। বাইরের কাউকে এখন বাড়িতে নিমন্ত্রণ করবেন না। নিজেও অন্য কারও বাড়ি গিয়ে আড্ডা দেওয়ার কথা ভাববেন না। কষ্ট হলেও নিজের এবং সবার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে এটা করতেই হবে।

৫) অ্যাংজাইটি এড়াতে বন্ধুদের সঙ্গে বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে (যদি ভিডিও কল সম্ভব হয়) কথা বলুন, আড্ডা দিন। নিজের প্রিয় কাজগুলি করুন। এই সময়টাকেও নিজের মতো করে কাজে লাগান।

 

ডিপ্রেশন (Depression)

অ্যাংজাইটির থেকে বেশি মারাত্মক ডিপ্রেশন। আমরা কম বেশি সবাই এই শব্দের সাথে পরিচিত। বর্তমান সময়ে মানসিক এই ব্যাধি ক্রমশ মন থেকে বিস্তার লাভ করে প্রভাব ফেলে আপনার কাজে।

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা যেহেতু মানসিক ব্যাধি তাই সেটা কাটানোর জন্য শুরু থেকেই প্রতিকারের চেষ্টা করতে হবে।

 

কী করবেন? (How to Overcome Anxiety Disorder?)

how to overcome anxiety disorder

 

) বাস্তববাদী লক্ষ্য ঠিক করুন

”Keep yourself busy if you want to avoid depression. For me, inactivity is the enemy.” বলেছিলেন ম্যাট লুকাস। তাই বিষণ্ণতা থেকে নিজেকে দূরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল নিজেকে ব্যস্ত রাখা। এজন্য হালকা যে কোনও ধরনের কাজ করুন। প্রতিদিন লক্ষ্য নির্ধারণ করুন যে এই এই কাজগুলি শেষ করতেই হবে। কাজে ব্যস্ত থাকলে অপ্রয়োজনীয় সমস্যার দিকে মনোযোগ কম যাবে। যদি আমরা নিজেদের ব্যস্ত রাখি তাহলে বিষণ্ণতা কমতে বাধ্য।

 

) আপনজনদের সঙ্গে সময় কাটান

একা থাকলে ডিপ্রেশন বাড়তে পারে। লকডাউনের গৃহবন্দি দশাকে কাজে লাগিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঝালিয়ে নিন সম্পর্ক। তাঁদের সঙ্গেই সময় কাটান, যাদের সঙ্গ আপনার ভালো লাগে। এমনকী নিজের খারাপ লাগার কথা ও কারণ নিয়েও তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করুন।

 

) ইতিবাচক থাকা

ডিপ্রেশনে আমরা সবকিছুর মধ্যেই হতাশা প্রত্যক্ষ করি। তাই ডিপ্রেশন কাটানোর প্রথম শর্ত, সব কিছুর খারাপ দিক চিন্তা করা, নেতিবাচকতা খোঁজা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া। ইতিবাচক কথা চিন্তা করতে হবে। তার জন্য ভালো বই পড়ুন, সিনেমা দেখুন। আর এমন মানুষের সঙ্গে মিশুন যাঁরা জীবনের প্রতি ইতিবাচক চিন্তাভাবনা রাখেন।

 

 ) ধ্যান শরীরচর্চা

শরীর ও মন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাই আমাদের মনকে ভাল রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের সুস্থ শরীর বজায় রেখে চলতে হবে। এজন্য দরকার ধ্যান ও শরীরচর্চামূলক কাজ করা।

নিয়মিত শরীরচর্চায় এন্ড্রোফিন নামে হরমোন নিঃসরণ হয়। যা মন ভাল রাখতে সাহায্য করে। তাই বিষণ্ণতা কমানোর জন্য সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, ব্যায়াম করা, হাঁটার অভ্যাস রাখা জরুরি।

 

) স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া

হাভার্ড মেডিকাল কলেজের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েট বিষণ্ণতা থেকে উত্তরণে বা মন ভাল রাখতে সাহায্য করে।

 

কী কী খাবার খাবেন? (Foods that help overcome anxiety disorder)

depression and diet

 

অ্যাভোকাডো

এই ফলে উপস্থিত বেশ কিছু উপকারি ফ্যাট, প্রোটিন, ভিটামিন K, ভিটামিন B9, B6 এবং B5 শরীরে প্রবেশ করার পর মস্তিষ্ক যাতে চাঙ্গা থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে শুরু করে। ফলে স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে গিয়ে ডিপ্রেশনে বা অ্যাংজাইটিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় থাকে না বললেই চলে।

জাম

ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি এবং স্ট্রেসকে দূরে রাখতে বাস্তবিকই এই ফলের বিকল্প হয় না। জামের ভিতর থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে প্রবেশ করা মাত্র টক্সিক উপাদানকে বের করে দেয়। ফলে একদিকে যেমন ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে, তেমনি মন-মেজাজও এতটাই চাঙ্গা হয়ে ওঠে যে মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার কোনও আশঙ্কাই থাকে না।

বাদাম

এতে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন B2, ভিটামিন E, ম্যাগনেসিয়াম এবং জিঙ্ক। এই সবকটি উপাদান সেরাটোনিন হরমোনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে শরীরে উপস্থিত ক্ষতিকর টক্সিক উপাদানকে বের করে দেয়। ফলে কোনওভাবেই স্ট্রেস ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না।

টম্যাটো

এতে উপস্থিত লাইকোপেন নামক এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে প্রবেশ করার পর মন খারাপকে উৎখাত করতে বিশেষ ভূমিকা নেয়। এই কারণেই যাদের খুব চাপের কাজ করতে হয়, তাদের প্রতিদিন একটা করে কাঁচা টম্যাটো খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা।

মাছ

মাছে উপস্থিত ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন B, B6 এবং B12 এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয়, এই উপাদানগুলি মানসিক অবসাদের মতো রোগের আক্রমণ থেকে বাচ্চাদের বাঁচাতেও সাহায্য করমা

দই

এক বাটি টক দই খেলে শরীরে সরোটোনিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, যা স্ট্রেস কমানোর পাশাপাশি ব্রেন পাওয়ার বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাতে অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন কমে।

নারকেল

নারকেলে উপস্থিত বেশ কিছু উপকারি ফ্যাট শরীরে প্রবেশ করার পর মস্তিষ্কের অন্দরে ফিল গুড হরমোনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে ব্রেন পাওয়ার এতটা বাড়িয়ে দেয়, তাতে মানসিক অবসাদের প্রকোপ তো কমেই, সেই সঙ্গে বুদ্ধি এবং স্মৃতিশক্তিরও উন্নতি ঘটে।

রসুন

এতে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের অন্দরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাত্রা কমানোর মধ্যে দিয়ে স্ট্রেস এবং অ্যাংজাইটি কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয়, ছোট থেকেই নিয়মিত রসুন খাওয়ার অভ্যাস করলে হার্টের কর্মক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি ডায়াবেটিসের মতো রোগের আশঙ্কাও কমে।

 

) পছন্দের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা

family time and anxiety relief

 

বিষণ্ণতায় আমাদের অপছন্দের বা কঠিন কাজ করতে ইচ্ছা করে না। স্বাভাবিকভাবেই সেই সব কাজে আমাদের মন বসতে চায় না। এমন সময় আমাদের সেই কাজগুলো করা উচিত যা আমাদের আনন্দ দেয়, কঠিন কাজ হলেও করতে ভাল লাগে। পুরনো সেই সব কাজ যা ভালো লাগতো কিন্তু এখন আর করা হয় না, সেগুলো খুঁজে বের করুন। আড্ডা দেওয়া, বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা, রান্না করা বা যে কোনও কাজ যা আপনার করতে ভালো লাগে সেসব কিছুই anxiety recover করতে সাহায্য করে।

 

) ধৈর্যশক্তি

মানুষ যখন বিষণ্ণ থাকে, তাঁদের মধ্যে কাজ করে অস্তিরতা। যে কোনও সমস্যার তাঁরা চায় তাৎক্ষণিক বা দ্রুত সমাধান। আর এ সমাধান না পেলে তাঁরা আরও বেশি ডিপ্রেসড হয়ে পড়ে। এই সময় তাঁর সবচেয়ে বেশি যা করা দরকার তা হল ধৈর্য। বিশ্বাস রাখতে হবে যে সব কিছুর সমাধান আছে এবং সব ঠিক হবেই। প্রতিটি কাজের মাঝেই আমাদের বিশ্বাস আর ধৈর্য ধরে এগোতে হবে। মাথায় রাখতেই হবে, কোনও সমস্যার মতো ডিপ্রেশনও একবারে যাবে না। কিন্তু তা দুরারোগ্যও নয়। তাই সদর্থক থাকা একান্তই জরুরি।

ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকার জন্য The Bengal Story র পাঠকদের ধন্যবাদ। আমরা যে ধরনের খবর করি, তা আরও ভালোভাবে করতে আপনাদের সাহায্য আমাদের উৎসাহিত করবে।

Login Support us

You may also like

Asymptomatic Coronavirus Patients
Mask Guideline By Central Govt.