We need to reinvent the socialist tradition by supporting new models of economic and community regeneration based on self-help to give people hope and dignity. For neoliberalism has taken away that dignity, and if the left does not address this, the ultra right will give them the catharsis of violence.

(Liz Fekete, ‘NEOLIBERALISM AND POPULAR RACISM: THE SHIFTING SHAPE OF THE EUPOPEAN RIGHT’. The Politics Of The Right, SOCIALIST REGISTER 2016)

গোপীবল্লভপুরে আমি প্রথম যাই ১৯৯৮ সালে পঞ্চায়েত ভোটের আগে। আজকাল পত্রিকা থেকে সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ঝাড়গ্রামে গিয়েছিলেন পঞ্চায়েত ভোটের আগে জঙ্গলমহলের খবর করতে। আমি গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গী হয়ে। এপ্রিলের বিকেলে যখন গোপীবল্লভপুরে পৌঁছালাম, রাস্তার ধারে বিরাট হাট বসেছে। এক লিটার সর্ষের তেলের দাম তখনও ৩০ টাকা পেরোয়নি, শহরের মধ্যবিত্ত তখনও রেশনে লাইন দিয়ে চিনি, গম নিত। ১০০ দিনের কাজ তখনও শুরু হয়নি, কিন্তু গোপীবল্লভপুরের হাটে জবরদস্ত কেনাকাটা ছিল। সেদিনই প্রথম দেখেছিলাম মোরগ লড়াই। আর দেখেছিলাম লাল ঝাণ্ডায় মোড়া গোপীবল্লভপুরে সিপিএমের জনসভার প্রস্তুতি।

তার বেশ কয়েক বছর বাদে, একটা লেখা পড়লাম, ‘গোপীবল্লভপুরে ফসল কাটার অভ্যুত্থান, ১৯৬৯ তৎকালীন গোপীবল্লভপুর’। লেখক সন্তোষ রাণা। ১৯৭৭ সালে গোপীবল্লভপুরের বিধায়ক সন্তোষ রাণা লিখছেন, ‘গোপীবল্লভপুরে থানায় পা দিলে মনেই হবে না, আপনি বাংলায় আছেন। ছোটনাগপুরের মালভূমি এগিয়ে এসে সুবর্ণরেখার ঢালে মিশেছে, নদীর ধারের কিছু গ্রাম বাদ দিলে লাল কাঁকড় মাটির ভূমি। লাঙল করতে গেলে চাষি ও বলদ উভয়েরই পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝরে। বাইরে থেকে চাকরি করতে আসা কিছু স্কুল মাস্টার, বিডিও অফিসের কর্মচারী, ব্যাঙ্ক কর্মচারী ও জঙ্গল অফিসার বাদে আর কেউই বাংলায় কথা বলেন না। কলকাতা থেকে কেউ গেলে লোকেরা বলেন ‘ঝনে বাঙ্গালি আসিচি’।

এই গোপীবল্লভপুরই দক্ষিণবঙ্গে নকশাল আন্দোলনের অন্যতম গর্ভগৃহ। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর মাসে সন্তোষ রাণা, আরও কিছু স্থানীয় এবং বাইরের যুবক এবং বিশাল সংখ্যক প্রান্তিক কৃষক, যারা মূলত মাল, সাঁওতাল, মুণ্ডা, তাঁতি, জেলে, একদিন সকালে জোতদারের ধান কাটা শুরু করল। নকশালবাড়ির প্রভাবে গোপীবল্লভপুরে কৃষক আন্দোলনের একটা সলতে পাকানো চলছিলই। ‘৬৯ এর নভেম্বরে তা হঠাৎই অগ্নুৎপাতের মতো আছড়ে পড়ল সেখানকার জোতদার, জমিদারদের মাঠে। জোতদারদের বাড়ি থেকে দু’দিনেই ১১ টা বন্দুক কেড়ে নিল কৃষকেরা। প্রায় ৬০-৭০ টা গ্রামের গরিব আদিবাসী মানুষের এই উৎসবের মেজাজে জোতদারের জমির ধান কাটা দেখে ঘাবড়ে গেল পুলিশ-প্রশাসনও।

মাঝখানে পেরিয়েছে প্রায় পঞ্চাশ বছর। সুবর্ণরেখা, ডুলুং নদী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল। দক্ষিণবঙ্গে ভূমিহীন, দরিদ্র, আদিবাসী কৃষকের নেতৃত্বে সংঘটিত হওয়া নকশাল আন্দোলনের অন্যতম আতুঁড় ঘর এই গোপীবল্লভপুরে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে নজিরবিহীন উত্থান হল এক অতি দক্ষিণপন্থী দলের। গোপীবল্লভপুর ১ নম্বর ব্লকে ৭ টা গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট ৮০ টা আসনে ৫১ টা জিতল বিজেপি। পঞ্চায়েত সমিতিতে ১৮ টার মধ্যে বিজেপি জিতল ১৩ টা আসনে। দুটো জেলা পরিষদ আসনই জিতল বিজেপি। নকশাল আন্দলনের গোপীবল্লভপুরে, কৃষক আন্দোলেনের জমিতে আজ আরএসএস-বিজেপির এই রাজনৈতিক অভ্যুত্থান শুধু রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের নয়, কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বামপন্থীদেরও। বিজেপির এই জয় কি শুধুমাত্র স্থানীয় কোনও কারণে? নাকি গত কয়েক বছর ধরে দেশ, দুনিয়ায় সামাজিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ভারসাম্যের যে বদল হচ্ছে, তাই প্রভাব ফেলল সদ্য গঠিত ঝাড়গ্রাম জেলার এই ব্লকে?

বহু বছর সিপিএমের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সম্পাদক ছিলেন দীপক সরকার। তাঁর মতে, এক সময়ের অতি বাম, পরে সিপিএম অধ্যুষিত গোপীবল্লভপুর ব্লকে বিজেপির এই উত্থান আসলে ‘শূণ্যস্থান পূরণ’। ‘মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিকল্প চাইছেন। সাংগঠনিক এবং অন্য কিছু কারণে সিপিএম সেই জায়গা নিতে এখনও প্রস্তুত নয়। তাই মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন’।

সামনে থেকে গোপীবল্লভপুরে নকশাল আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং ১৯৭৭ সালের বিধায়ক সন্তোষ রাণার মতে, তাঁর এলাকায় বিজেপির এই সাফল্য আরএসএসের আদর্শগত কোনও কারণে নয়। ‘গোপীভল্লভপুরে কোনও মুসলমানই নেই। বিজেপি না জিতলেই ভাল হোত, কিন্তু আমার বাড়ি ধরমপুর গ্রামেও ওরাই জিতেছে। তৃণমূল ওখানে বলছে, ”দু’টাকার চাল নাও আর মুখে সেলাই করে থাকো”, কিন্তু মানুষ বলছে, দু’টাকার চাল তো আমার হক, তার জন্য মুখে সেলাই করব কেন? গোপীবল্লভপুরের মানুষ পঞ্চাশ বছর আগেও জোতদারের অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছে, আজও শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। পঞ্চায়েতের এই ফল ওখানকার মানুষের প্রতিবাদেরই পরম্পরা।’
কিন্তু সিপিএমের দীপক সরকার কিংবা নকশাল নেতা সন্তোষ রাণার ব্যাখ্যাও কি যথেষ্ট গোপীবল্লভপুরে বিজেপির এই সাফল্যের জবাব খুঁজতে? যে গোপীবল্লভপুরে ছ’য়ের দশকের শেষে গরিব আদিবাসী গ্রামের জোতদারদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল, আজ তো সেখানে কোনও জোতদার নেই! বরং বড়লোক থেকে গরিব প্রায় সবারই বিজেপিতে রূপান্তরিত হওয়া কি স্রেফ ‘শূন্যস্থান পূরণ’ কিংবা ‘মুখে সেলাই’ না করার মতো কোনও ব্যাপার?

গোটা দুনিয়াতেই ২০১০-১২ সালের পর থেকে দক্ষিণপন্থী-অতি দক্ষিণপন্থী দলগুলির উত্থান হয়েছে দ্রুত গতিতে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ আজ ইউরোপ, আমেরিকা, তুরস্ক থেকে ভারত। ২০০৯-এর তুলনায় ২০১৪ সালের ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টারি নির্বাচনে সেই প্রবণতা স্পষ্ট। এই পাঁচ বছরে অস্ট্রিয়াতে ‘ফ্রিডম পার্টি অফ অস্ট্রিয়া’র ভোট ১২.৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৯.৭ শতাংশ। বেলজিয়ামে ‘নিউ ফ্লেমিশ অ্যালায়েন্সে’র ভোট ৬.১ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬.৪ শতাংশ। ডেনমার্কে ‘ড্যানিশ পিপলস পার্টি’র ভোট ১৫.৩ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬.৬ শতাংশ। অতি দক্ষিণপন্থীদের দ্রুত উত্থান হয়েছে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জার্মানি, সুইৎজারল্যান্ডসহ প্রায় গোটা ইউরোপেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তুরস্কতেও এখন তাদেরই দাপট। দুনিয়াজোড়া এই প্রবণতার বাইরে নয় ভারতও। যেখানেই বামপন্থী আন্দোলন, কন্ঠস্বর দুর্বল হয়েছে, অতি দক্ষিণপন্থীর উত্থান সেখানেই হয়েছে দ্রুত গতিতে।

২০১৪ সালের শুরু। পশ্চিম মেদিনীপুরের কলেজ মাঠে সিপিএমের সমাবেশ। ধামসা-মাদল বাজিয়ে হাজার হাজার আদিবাসী হাজির সভায়। মিটিং শুরুর আগে জেলা নেতা-কর্মীদের বিপুল উচ্ছ্বাস-উত্তেজনা চোখে-মুখে। সমাবেশ শুরু হল। প্রধান বক্তা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নানা কথার মাঝে বললেন, ‘নেতাইয়ে যা হয়েছিল ঠিক হয়নি, আমাদের ছেলেরা ভুল করেছিল’। বক্তব্য শেষ করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বেরিয়ে গেলেন, মুখের হাজার ওয়াটের আলো নিভে গেল সিপিএম নেতা-কর্মীদের। কেন?
গোপীবল্লভপুরে নকশাল আন্দোলনেরই এক পরম্পরা একুশ শতকের গোড়ায় জঙ্গলমহলে মাওবাদী অভ্যুত্থান। যদিও তা অন্য চেহারায়। বহু সিপিএম নেতা-কর্মী খুন হন মাওবাদীদের হাতে। ২০০৯ সাল থেকে মাওবাদীদের প্রতিরোধ করতে গ্রামের পর গ্রামে রাস্তায় নামে সিপিএম বাহিনী। কোথাও সশস্ত্র শিবির গড়ে, কোথাও আবার গ্রামের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ব্যারিকেড করে। লালগড়ের নেতাইয়ের এমনই এক সশস্ত্র শিবির থেকে গুলি চালায় সিপিএম ক্যাডাররা, মৃত্য হয় একাধিক গ্রামবাসীর।
নেতাইয়ের ঘটনায় সমালোচনার ঝড় ওঠে সিপিএমের বিরুদ্ধে। জঙ্গলমহলে মুথ থবড়ে পড়ে সিপিএম। কাঠগড়ায় তোলা হয় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পার্টিকে। কিন্তু লালগড়, নেতাই, ধরমপুর, এনায়েতপুর থেকে সিঁজুয়া ঝাড়গ্রামের যেখানেই সিপিএমের সশস্ত্র শিবির হয়েছিল, ক্যাডাররা জানতেন, সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অনুমোদনেই তাঁদের ক্যাম্প চলছে। আর সব কিছুই যেহেতু আলিমুদ্দিন স্ট্রিট জানতো, জঙ্গলমহলের হাজার-লক্ষ সিপিএম কর্মীও জানতেন, পার্টি তাঁদের পাশেই আছে। ২০১২ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ওই মন্তব্যের পর কর্মীরা জানলেন, পার্টির জন্য জান কবুল লড়াই বৃথা। পার্টি পাশে নেই, থাকবে না। কারণ, দলের সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করেছেন, ‘নেতাই ভুল হয়েছিল’।
নেতাইয়ের হত্যাকাণ্ড কোনও মানুষই সমর্থন করেননি, কিন্তু মাওবাদীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে জঙ্গলমহলে নিজের মতো করে সশস্ত্রভাবে আত্মরক্ষার বন্দোবস্ত করেছিলেন সিপিএম কর্মীরা। যা পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জ্ঞাতসারে এবং অনুমোদনে সশস্ত্র শিবিরে পরিণত হয়েছিল। ঝাড়গ্রাম মহকুমার জঙ্গলমহলে সিপিএমের সংগঠনে ধস নামার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কারণ, মাঠে-ঘাটে লড়া কর্মীরা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ওই মন্তব্যের পর বুঝে গেলেন, পার্টি পাশে থাকবে না। সিপিএমের সংগঠনে হু-হু করে ধস নামল। সবাই তৃণমূলে যোগ দিলেন তা নয়, কিন্তু বসে গেলেন রাজনীতির ময়দান থেকে। এটাও জঙ্গলমহলের সঙ্গে বাকি রাজ্যের একটা মৌলিক ফারাক। গোটা রাজ্যে ২০০৯ সালের পর থেকেই সিপিএমের একটা অংশ তৃণমূলে যোগ দিতে শুরু করে। ২০১১ র পরে তা আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু জঙ্গলমহলে যেহেতু ২০১১ পর্যন্ত তৃণমূল-মাওবাদীদের সঙ্গে সিপিএমের ক্যাডারদের সরাসরি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে, সেখানে সিপিএমের সক্রিয় কর্মীদের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার হার তুলনায় অনেক কম। সরকার বদলের পর তাঁরা ঘরছাড়া হলেন, বসে গেলেন, কিন্তু তৃণমূলে গেলেন না। ‘হার্মাদ’ অভিযোগে তৃণমূলও নিল না তাঁদের। ২০১৬ সালের পর রাজ্যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত উত্থান হল বিজেপির। জঙ্গলমহলের সিপিএম কর্মী-ভোটারদের ঢল নামল বিজেপি শিবিরে। সিপিএম নেতৃত্ব পাশে নেই, থাকবে না। আর ২০১১ সালের আগে-পরে তৃণমূল এবং মাওবাদীদের সঙ্গে লড়াই করা সিপিএম কর্মীরা তখন কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বুঝে নিয়েছেন, তৃণমূলকে সবক শেখানোর এই মস্ত সুযোগ।
একদিকে দুনিয়াজোড়া দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থান। দেশে তাদেরই ‘শক্তিশালী’ সরকার। অন্যদিকে, কৃষক আন্দোলনের গর্ভগৃহে ক্রমান্বয়ে নকশাল এবং সিপিএমের সাংগঠনিক দুর্বলতা। সিপিএম নেতৃত্বের প্রতি গরিবের অনাস্থা। এক সঙ্গে জোড়া সুবিধে পেল বিজেপি। এর সঙ্গে যুক্ত হল আরও কিছু স্থানীয় ফ্যাক্টর (তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের দুর্নীতি, মানুষের নানান ব্যক্তিগত ক্ষোভ, শাসক দলের গোষ্ঠী লড়াই), যা রাজ্যের বাকি জায়গাতেও একইভাবে বর্তমান। কিন্তু এখানে বাকি সব স্থানীয় ফ্যাক্টরকে ছাপিয়ে গেল বামপন্থী শক্তির দুর্বলতা। শাসক বিরোধী প্রতিবাদের ভাষা জড়ো হল এক মঞ্চে।
১৯৯৮ সালে মোরগ লড়াই দেখেছিলাম গোপীবল্লভপুরে। বিশ বছর বাদে আজও গরিব আদিবাসী মানুষের মধ্যে একই লড়াই চলছে ক্ষমতা দখলের। মানুষের রুটি-রুজিকে হাতিয়ার করে বামপন্থীদের কন্ঠ যত দুর্বল হচ্ছে, ততই শক্তিবৃদ্ধি পাচ্ছে অতি দক্ষিণপন্থার। নকশাল আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর বাদে গোপীবল্লভপুরসহ ঝাড়গ্রামও এক নতুন লড়াইয়ের পরীক্ষাগার!

(কভার ছবিঃ স্বাতী সেনগুপ্ত)