গত ৬ বছরে বিজেপি ৬০০ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে শুধুমাত্র একটিই ইলেক্টোরাল ট্রাস্টের কাছ থেকে

গত ৬ বছরে একটি নির্দিষ্ট ইলেক্টোরাল ট্রাস্টের কাছ থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি একাই পেয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রকাশ, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপির তহবিলে সত্য ইলেকটোরাল ট্রাস্ট, যা পরবর্তীতে নাম বদলে হয় প্রুডেন্ট ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট, এই বিপুল টাকা অনুদান বাবদ তুলে দিয়েছে।
ডিএলএফ লিমিডেট, ভারতী এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড সহ আরও কয়েকটি সংস্থাকে নিয়ে তৈরি করা হয় সত্য-প্রুডেন্ট ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট। সেই ট্রাস্টের অর্থ বিতরণের হিসেব বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র একটি ট্রাস্টের কাছ থেকেই ২০১৭-১৮ সাল পর্যন্ত শেষ ৬ বছরে অনুদান বাবদ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পেয়েছে বিজেপি।
২০০৪-০৫ থেকে ২০১৭-১৮, এই সময়কালের মধ্যে করা তিনটি ভিন্ন সমীক্ষার ফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস বা এডিআর। সেই সমীক্ষায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সত্য ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট (পরবর্তীতে নাম বদলে প্রুডেন্ট ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট) কর্পোরেট ডোনেশনের তালিকার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এই ট্রাস্টেই অর্থ দেয় দেশের প্রথম সারির একাধিক কর্পোরেট সংস্থা। ডিএলএফ, ভারতী গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা এই ট্রাস্টের রমরমার কাছে পিছিয়ে পড়েছে আদিত্য বিড়লা গোষ্ঠীর জেনারেল ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুদানের প্রেক্ষিতে তর্কাতিতভাবে এক নম্বর প্রুডেন্ট ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট।
এডিআরের সমীক্ষায় উঠে এসেছে অনুদানের বৈষম্যের ছবিও। দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালের পর থেকে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার সিংহভাগ অনুদানই যাচ্ছে বিজেপির ভাঁড়ারে। অন্যদিকে, কংগ্রেস ও অন্যান্য জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো পাচ্ছে কেবলই ছিঁটেফোঁটা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৭-১৮ সালে বিজেপি এই ট্রাস্ট থেকে অনুদান পেয়েছে মোট ৪০৫.৫ কোটি টাকা সেখানে আরেক জাতীয় দল কংগ্রেসের কোষাগারে ঢুকেছে মাত্র ২৩.৯ কোটি টাকা।
এডিআর তাদের সমীক্ষার রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০০৪-০৫ থেকে ২০১১-১২ এবং ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৭-১৮, এই সময়কালের তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ইলেক্টোরাল ট্রাস্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুদানের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬০ শতাংশ।
শেষ ২ বছরে কর্পোরেট চাঁদা কিংবা ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে অনুদানের নিরিখে বাকিদের কয়েকশো যোজন পিছনে ফেলে দিয়েছে বিজেপি। কিন্তু এডিআরের তুলনামূলক সমীক্ষায় উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তা হল, ২০০৪-০৫ থেকে ২০১৭-১৮, এই সময়কালের মধ্যে করা তিনটি পৃথক সমীক্ষার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, কর্পোরেট সংস্থাগুলো জয়ের সম্ভাবনা বিচার করে চাঁদা দেয়। অর্থাৎ, ২০১৪ সালের আগে থেকেই বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা আঁচ করে, গেরুয়া শিবিরে ঢালাও চাঁদা দেওয়া শুরু করে কর্পোরেট সংস্থাগুলো। যাতে ক্ষমতায় এলে বিজেপি সরকারের সঙ্গে কাজ করতে সুবিধা হয়। আর এখানেই আশঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সমীক্ষক সংস্থা এডিআর। তাদের বক্তব্য, যে দলের জয়ের সম্ভাবনা আঁচ করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দেওয়া হল, ক্ষমতায় আসার পর তার ফায়দা তোলার চেষ্টা হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা। যা ভারতের মতো বৈচিত্রপূর্ণ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করছে এডিআর।
এডিআরের প্রধান কর্মকর্তা মেজর জেনারেল অনিল ভার্মা মনে করেন, কর্পোরেট চাঁদা দেওয়া হয় অনেকগুলো শর্তের কথা মাথায় রেখে। তাই শাসক দলের পক্ষে থাকতে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর মধ্যে এমন অনুদানের লড়াই। এই প্রসঙ্গেই তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, লোকসভা ভোটের ঠিক আগে মুম্বইয়ের একটি কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী মিলিন্দ দেওরাকে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানী। যা দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো সঙ্কেত নয়, বলছেন মেজর জেনারেল অনিল ভার্মা।

Comments are closed.